হেশাম ও আইয়্যাশের উপর কুরাইশদের অত্যাচার | আমার কথা
×

 

 

হেশাম ও আইয়্যাশের উপর কুরাইশদের অত্যাচার

coSam ১১৫


হযরত ওমর (রাঃ) এর মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় হিজরতের সংবাদ অবগত হয়ে হিশাম ও আইয়্যাশসহ কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে বিশজন মুসলমান হযরত ওমর (রাঃ)-এর সাথে মদিনায় গমনোদ্দেশে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। সিদ্ধান্ত হল রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে তারা নির্দিষ্ট স্থানে হযরত ওমর (রাঃ)-এর সাথে মিলিত হবেন এবং সেখান থেকে সবাই মিলে মদিনার দিকে যাবেন। আইয়্যাশ কোন প্রকারে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছতে সক্ষম হলেও হিসাম পথিমধ্যে কুরাইশ গুপ্তচর দ্বারা নিবৃত হন। নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে না পৌঁছায় হিশামকে রেখেই হযরত ওমর (রাঃ) সঙ্গী ও অন্যান্য মুসলমানদেরকে নিয়ে মদীনা অভিমুখে রওয়ানা করেন।

আইয়্যাশ আবু জাহেলের বৈপিত্রেয় ভাই ছিলেন। আইয়্যাশের দেশত্যাগ করায় আবু জাহেলের গায়ে আগুন ধরে যায়। তাই আইয়্যাশের মদিনা শরীফে পৌঁছার কিছু দিন পরই আবু জাহেল ও হারেস বিন হিশাম মদিনায় উপনীত হয়। তারা নানা প্রকার ছলচাতুরী দিয়ে আইয়্যাশকে বুঝাল যে, বৃদ্ধা মা তাঁর মাথায় তেল দিবেন না মাথা আঁচড়াবেন না, ছায়ায় যাবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। মায়ের কষ্ট সইতে না পেরে তারা অনিচ্ছা সত্বেও তাঁকে নিতে এসেছে। এভাবে দুষ্ট দুর্মতি আবু জাহেল ও হারেস বিন হিশাম আইয়্যাশকে তাদের প্রতারণা জালে আবদ্ধ করে ফেলে।

আইয়্যাশ বিষয়টা হযরত ওমর (রাঃ) কে অবগত করান। হযরত ওমর (রাঃ) তাঁকে বিশেষভাবে সতর্ক করে বলেন, এরা নির্ঘাত তোমাকে প্রতারণা জালে আবদ্ধ বিপদগ্রস্ত করার বদমতলব নিয়ে এখানে এসেছে। সুতরাং তুমি কোন অবস্থাতেই এদের প্রতারণার ফাঁদে পা দিবে না। তিনি হযরত ওমর (রাঃ) মায়ের দুর্দশায় তাঁর মানসিক বিচলতার কথা জানিয়ে বলেন- একবার গিয়ে মাকেও সান্ত্বনা দিয়ে আসি এবং তাড়াহুড়া করে আসার জন্য ধনসম্পদ ফেলে এসেছি সেগুলোও এখানে আনা যাবে।

ওমর (রাঃ) বলেন, দেখ আইয়্যাশ তোমার আবু জাহেল এবং হারেসের প্রতারণার জালে পা দেয়া আমার কাছে কিছুতেই যুক্তি সঙ্গত মনে হচ্ছে না। এদের সাথে না যাওয়াটাই তোমার বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তবে একান্ত যদি যেতেই চাও তবে আমার এ দ্রুতগামী উটটি নিয়ে যাও। পথে বিপদের কোন প্রকার লক্ষণ দেখতে পেলে এ উট ছুটিয়ে মদিনায় ফিরে আসবে। এর পরও পুনরায় ওমর (রাঃ) আইয়্যাশকে বলেন- দেখ! কুরাইশদের মধ্যে আমার অর্থ সম্পদের পরিমাণ একেবারে কম নয়। আমার সম্পদের অর্ধেকাংশ আমি তোমাকে দিচ্ছি। তবুও তুমি আবু জাহেল ও হারেসের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে মক্কা গমনের দুরাকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগ কর। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, তুমি এদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বিপদগ্রস্ত হতে চলেছে। অতএব তুমি মক্কা গমনের ইচ্ছা ত্যাগ কর। কিন্তু আইয়্যাশ ওমর (রাঃ)-এর উপদেশ পরামর্শ উপেক্ষা করে তাঁর প্রদত্ত উটে আরোহণ করে মহা প্রতারক আবু জাহেল ও হারেস বিন হিসামের সাথে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন।

মক্কার নিকটবর্তী হলে আবু জাহেল বলল, আমাদের উটটি একেবারে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই তোমার উটটি থামিয়ে আমাদের একজনকে তোমাদের সাথে লও। এখানেও আইয়্যাশ হযরত ওমর (রাঃ)-এর উপদেশ ও পরামর্শ বিস্মৃত হয়ে তাঁর উট থেকে নামতেই আবু জাহেল ও হারেস অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে তাঁর হাত পা বেঁধে ফেলে এবং এ অবস্থায়ই তাকে উটের পিঠে তুলে মক্কায় প্রবেশ করে। আবু জাহেল এ সময় রীতিমত বিজয়ানন্দে উৎফুল্ল। সে ডেকে ডেকে  মক্কাবাসীকে নিজের সফলতা আর আইয়্যাশের অবস্থা দেখিয়ে বলছি, এ সব বোকা নির্বোধ গুলোকে এভাবেই জব্দ করতে হয়।

আইয়্যাশের সহযাত্রী হিশাম তো আগেই গুপ্তচরের হাতে বন্দী অবস্থায় ছিল। এবার আইয়্যাশ ও হিশামকে একত্রে বন্দী রেখে ইসলাম ত্যাগের জন্য জুলুম নির্যাতন চালান হতে থাকে। তাদের বন্দী অবস্থায়ই রাসূল (সাঃ) মদীনায় হিজরত করেন। তিনি মদীনায় হিজরত করলে হিশাম ও আইয়্যাশের প্রতি তাদের অত্যাচার উৎপীড়ন চরম আকার ধারণ করে। রাসূল (সাঃ) একদিন মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলেন- মক্কায় বন্দী উৎপীড়ন অত্যাচারিত হিশাম ও আইয়্যাশকে উদ্ধারে কে আত্মত্যাগের স্বীকারে প্রস্তুত আছ? তখন ওলীদ নিজের সম্মতি কথা জানাল।

স্বীকারোক্তি মতে ওলীদ মক্কায় এসে গোপনে হিশাম ও আইয়্যাশের অবস্থানস্থল সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে থাকেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর তাঁদের আত্মীয়া এক মেয়েলোকের মাধ্যমে জানতে পারলেন হিশাম ও আইয়্যাশকে নগর পার্শ্বে একটি ছাদহীন গৃহে কয়েদ করে রাখা হয়েছে। প্রখর রোদের তাপে তারা সেখানে ছটপট করেন। আবু জাহেলের অনুমতি সাপেক্ষে তাদের আত্মীয় স্বজন মাঝে মধ্যে তাদেরকে কিছু খাদ্যদ্রব্য দিয়ে আসেন। ওলীদ সন্ধ্যার পর সে গৃহের কাছে গমন করেন, যেখানে হিশাম ও আইয়্যাশ বন্দী। তিনি বহু কষ্টে প্রাচীর টপকে ভিতরে লাফিয়ে পড়েন। এবার গৃহদ্বার উন্মুক্তকরণের ব্যবস্থা হল বটে, কিন্তু বন্দীদ্বয়ের গায়ে কঠিন লৌহ শৃঙ্খল। এ অবস্থায় তাদেরকে নিয়ে পলায়ন অসম্ভব। অবশেষে ওলীদ এক খণ্ড প্রস্তর এনে শৃঙ্খলের নীচে স্থাপন করে এমন জোরে তরবারি দ্বারা আঘাত করেন যে, লৌহ শৃঙ্খল ছিন্ন হয়ে যায় এবং তিনি বন্দীদ্বয়কে নিয়ে মদীনাভিমুখে পলায়ন করেন।

 

পরবর্তী গল্প
আবু সালামা দম্পতির প্রতি কুরাইশদের নির্মম জুলুম

পূর্ববর্তী গল্প
কুরাইশদের চৈতন্যোদয়

ক্যাটেগরী