হযরত মূসা (আঃ) ও মিশরের দক্ষ যাদুকর – পর্ব ৪ | আমার কথা
×

 

 

হযরত মূসা (আঃ) ও মিশরের দক্ষ যাদুকর – পর্ব ৪

coSam ২১১


হযরত মূসা (আঃ) ও মিশরের দক্ষ যাদুকর – পর্ব ৩ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

উল্লেখিত আয়াতসমূহে জাদুকরদের ও মূসা (আঃ)-এর মধ্যকার আলাপচারিতার বর্ণনা দেয়ার সাথে সাথে মূসা (আঃ)-এর প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে সান্ত্বনা বাণী উচ্চারিত হয়েছে। তাঁকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে যে, শংকার কোন কারণ নেই। জাদুকরদের সাথে প্রতিযোগিতায় আপনিই বিজয়ী হবেন। আল্লাহ তায়ালার আশ্বাস বাণীতে তিনি নিশ্চিন্ত মনে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন। আলোচনার সিদ্ধান্ত অনুসারে ফেরাউনের জাদুকররাই প্রথম তাদের যাদুর উপকরণগুলো ভূমিতে নিক্ষেপ করে।

এক বর্ণনায় রয়েছে, জাদুকরদের নিক্ষিপ্ত যাদুর উপকরণ ও লাঠিগুলো হাজার হাজার সাপের আকৃতি ধারণ করে ময়দানে দৌড়াদৌড়ি করতে শুরু করে। সমগ্র মাঠ সাপে সাপে ভরে উঠে এ যেন সাপেরই অরণ্য। এ অবস্থা উপস্থিত অগণিত দর্শকমণ্ডলীর মাঝে ভীষণ আতংকের সঞ্চার করে। এমনি আতংককর পরিস্থিতিতে মূসা (আঃ) তাঁর হস্তস্থিত লাঠিটি জমিনে নিক্ষেপ করলেন তৎক্ষণাৎ লাঠিটি এক বৃহত অজগরের রূপ ধারণ করে জাদুকরদের যাদুর সাপগুলো সবই এক গ্রাসে গিলে ফেলে। কথিত আছে, মূসা (আঃ)-এর নিক্ষিপ্ত লাঠি যখন বৃহদাকার অজগরের রূপ ধারণ করে তখন সেটির সত্তর সত্তর মস্তক বিশিষ্ট এবং প্রতি মস্তকে একটি করে প্রকাণ্ডমুখ ছিল। জাদুকররা তাদের যাদুর উপকরণ চার হাজার রশি মাঠে ফেলেছিল। এ অজগর এত প্রকাণ্ড ছিল যে, সবগুলো এক গ্রাসে গিলে ফেলে। মাঠে জাদুকরদের উপকরণ বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না। এতদসত্ত্বেও সেটির পেট ভর্তি হয়নি। এবার অজগর ফেরাউনের প্রাসাদ অভিমুখে ধাবমান হয়। ফেরাউন এ দৃশ্য দেখে তৎক্ষণাৎ পলায়ন করে। এ অহঙ্কারী মিথ্যা খোদায়ী দাবীদারের পলায়ন দৃশ্য তাঁর কৃত্রিম বান্দারা প্রাণভরে উপভোগ করে। সে যে তার দাবীতে একটা নির্জলা মিথ্যাবাদী তা বুঝতে আর কারোরই বাকী রইল না।

মূসা (আঃ)-এর নিক্ষিপ্ত লাঠি যখন সত্তর হাজার মস্তক বিশিষ্ট এক প্রকাণ্ড অজগরের আকৃতি ধারণ করে জাদুকরদের সব উপকরণ খেয়ে ফেলে তখন মুহূর্তের মধ্যে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। ফেরাউন তার দাবীতে সম্পূর্ণরূপে মিথ্যাবাদী, আর মোজেজার বিপরীত যাদু যে কোন কাজেরই নয় তাও প্রতিভাত হয়। এবার জাদুকররা ভীষণ চিন্তায় পড়ল-আমরা মিশরের শ্রেষ্ঠ জাদুকর। আমরা সর্বদাই ছিলাম প্রতিপক্ষের উপর বিজয়ী।

এখন আমাদের একি শোচনীয় পরাজয়। শুধু যে আমাদের বিদ্যার পরাজয় তাই নয়; বরং আমরা এতদিন পেশাগত কাজের যা ব্যবহার করে আসছি তার সবই মূসার দেখানো অজগরের পেটে। নিঃসন্দেহে মূসা (আঃ) যা দেখালেন তা কোন পেশাজীবী জাদুকরের জন্য কখনও সম্ভব নয়। এটা তাঁর দাবী মোতাবেক আল্লাহ প্রদত্ত মোজেজাই বটে। তৎক্ষণাৎ তারা সিজদায় পড়ে আল্লাহ তায়ালার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের ঘোষণা প্রদান করে।

এক বর্ণনায় আছে জাদুকররা বেহেশত দোযখ দর্শন ব্যতিরেকে সিজদা হতে মাথা তোলেনি। আরেক বর্ণনামতে জাদুকর দলের নেতা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। দলনেতা ঈমান এনেছে নেতৃত্বাধীন জাদুকররা এবং ফেরাউন সম্প্রদায়ের ছয় লক্ষ লোক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। আগে অভিশপ্ত ফেরাউনের প্রতিপক্ষ ছিল মাত্র দু ভাই হযরত হারুন অ মূসা (আঃ)। এখন জাদুকররাসহ আরও ছয় লক্ষ লোক তার প্রতিপক্ষ সুতরাং তার হুশ জ্ঞান ঠিকানায় থাকার কথা নয়।

কোরআনের ভাষায়-

فَغُلِبُوا هُنَالِكَ وَانقَلَبُوا صَاغِرِينَ

وَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ

قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ

رَبِّ مُوسَىٰ وَهَارُونَ

قَالَ فِرْعَوْنُ آمَنتُم بِهِ قَبْلَ أَنْ آذَنَ لَكُمْ ۖ إِنَّ هَـٰذَا لَمَكْرٌ مَّكَرْتُمُوهُ فِي الْمَدِينَةِ لِتُخْرِجُوا مِنْهَا أَهْلَهَا ۖ فَسَوْفَ تَعْلَمُونَ

لَأُقَطِّعَنَّ أَيْدِيَكُمْ وَأَرْجُلَكُم مِّنْ خِلَافٍ ثُمَّ لَأُصَلِّبَنَّكُمْ أَجْمَعِينَ

সুতরাং তারা সেখানে পরাজিত ও অপমানিত হল; আর জাদুকররা সিজদায় পড়ল। তারা বলতে লাগল, আমরা আল্লাহ তায়ালার প্রতি ঈমান এনেছি, যিনি মূসা এবং হারুনের রব। ফেরাউন বলল, তোমরা তার (মূসার) প্রতি ঈমান আনলে আমার অনুমতি ছাড়াই। নিশ্চয়ই এটা চক্রান্ত ছিল যা তোমরা করে দেখালে এ শহরে যেন তোমরা এখান হতে তার অধিবাসীদেরকে বের করে দাও, অতএব অতিশীঘ্র তোমরা এর পরিণাম জানতে পারবে। আমি তোমাদের একদিকের হাত ও একদিকের পা কাটব, অনন্তর তোমাদের সকলকে শূলে চড়াব।

জাদুকরদের মাধ্যমে মূসা (আঃ)-এর সাথে মোকাবিলায় অবতীর্ণ হওয়ার পিছনে ফেরাউনের মূল উদ্দেশ্যে ছিল বিজয়ী হয়ে নিজের মিথ্যা অসার খোদায়ী দাবীকে কন্টকমুক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী করা। অথচ এ মোকাবিলায় অবতীর্ণ হওয়াটাই শেষ পর্যন্ত তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। জনসাধারণের সম্মুখে তার মিথ্যার ফানুশ ফুটো হয়ে তার মুখোশ উন্মোচিত হয়ে পড়ে। ফলে সে তার এ ব্যর্থতাকে ঢাকার জন্য এক কুটকৌশলের আশ্রয় নেয়। সে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে একান্তই স্বাভাবিকভাবে জনসাধারণের উদ্দেশ্যে বলল, আমি মূসা (আঃ)-এর বিষয়টা আবার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখব।

যদি সত্যবাদী প্রমাণিত হয় তবে আমিও তার প্রতি ঈমান আনব এবং জনসাধারণকেও ঈমান আনার অনুমতি দেব। অথচ তার অনুমতির প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করেই জাদুকররা তাদের নেতাসহ এবং সাথে ফেরাউনের জাতীয় ছয় লক্ষ লোক মূসা (আঃ)-এর উপর ঈমান আনে। ফেরাউন নিজেকে শেষ রক্ষার জন্য জাদুকরদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ফেরাউন যখন জাদুকরদের ঈমান আনার কারণে হত্যার হুমকি দেয়, তার এ হুমকির জবাবে তারা যে মর্মস্পর্শী জবাব প্রদান করেছিল। কোরআনের ভাষায়-

قَالُوا لَن نُّؤْثِرَكَ عَلَىٰ مَا جَاءَنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالَّذِي فَطَرَنَا ۖ فَاقْضِ مَا أَنتَ قَاضٍ ۖ إِنَّمَا تَقْضِي هَـٰذِهِ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا

إِنَّا آمَنَّا بِرَبِّنَا لِيَغْفِرَ لَنَا خَطَايَانَا وَمَا أَكْرَهْتَنَا عَلَيْهِ مِنَ السِّحْرِ ۗ وَاللَّهُ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ

إِنَّهُ مَن يَأْتِ رَبَّهُ مُجْرِمًا فَإِنَّ لَهُ جَهَنَّمَ لَا يَمُوتُ فِيهَا وَلَا يَحْيَىٰ

وَمَن يَأْتِهِ مُؤْمِنًا قَدْ عَمِلَ الصَّالِحَاتِ فَأُولَـٰئِكَ لَهُمُ الدَّرَجَاتُ الْعُلَىٰ

جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ وَذَ‌ٰلِكَ جَزَاءُ مَن تَزَكَّىٰ

অর্থঃ তারা বলল, আমরা কখনই তোমাকে প্রাধান্য দেব না, সে সব নিদর্শনের বিপরীতে যা আমরা পেয়েছি। আর এ সত্তার বিপরীতে যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তোমার যা করার আছে কর, এ পার্থিব জীবনে কিছু করা ছাড়া তোমার আর কি বা করার আছে, এখন তো আমরা আমাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছি যেন তিনি আমাদের পাপরাশি মার্জনা করে দেন এবং যে জাদু সম্পর্কে তোমরা আমাদের উপর শক্তি প্রয়োগ করছ, তাও যেন তিনি আমাদেরকে ক্ষমা

করেন; আল্লাহ বহু গুণেই উত্তম এবং চিরস্থায়ী। যে অপরাধী হিসেবে স্বীয় রবের কাছে হাজির হবে তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম, সেখানে সে না মরবে আর না বাঁচবে। আর যে রবের কাছে বিশ্বাসী রূপ হাজির হবে, উপরন্তু যে নেক আমল করেছে, তবে এমন লোকদের জন্য অতিশয় উচ্চ মর্যাদা রয়েছে; অর্থাৎ উদ্যানসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে ঝরণা ধারা প্রবাহিত, তাতে তারা চিরকাল থাকবে, আর যে পবিত্র এটাই তার পুরষ্কার।

হযরত মূসা (আঃ) ও মিশরের দক্ষ যাদুকর – শেষ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন


পরবর্তী গল্প
হযরত মূসা (আঃ) ও মিশরের দক্ষ যাদুকর – শেষ পর্ব

পূর্ববর্তী গল্প
হযরত মূসা (আঃ) ও মিশরের দক্ষ যাদুকর – পর্ব ৩

ক্যাটেগরী