হযরত মূসা (আঃ)-এর তুর পাহাড়ে গমন

বনী ইসরাইলরা যে দুঃসহ অস্থিরতার মধ্যে কালাতিপাত করেছে এখন তা হতে মুক্তি লাভ করে বিপদমুক্ত হয়েছে। বেশ সুখ শান্তিতেই তাদের সময় অতিবাহিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় বনী ইসরাইলীদের মধ্য হতে কিছু লোক হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে আবেদন করল যে, হে নবী! যদি আমাদের জন্য আল্লাহর তরফ হতে কোন কিতাব এবং শরীয়ত থাকত তা হলে আমরা এখন নিঃসঙ্কোচে আল্লাহর ইবাদতে মনোনিবেশ করতে পারতাম।

অবশ্য আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে পূর্বেই হযরত মূসা (আঃ)-কে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল যে, বনী ইসরাইলীরা যখন ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তিলাভ করবে তখন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে শরীয়ত প্রদান করবেন। এখন সে সময় উপস্থিত সে কারণেই হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর ইঙ্গিতে তুর পর্বতে গমন করলেন। সেখানে আল্লাহ তায়ালার ইবাদতের জন্য এতেকাফ করলেন। তুর পর্বতে গমন কালে হযরত হারুন (আঃ)-কে বনী ইসরাইলদের দায়িত্বে রেখে গেলেন। হযরত মূসা (আঃ) সেখানে ত্রিশ দিন পর্যন্ত এতেকাফ করলেন। ত্রিশ রাত এতেকাফের পর তার মধ্যে যে হালত সৃষ্টি হওয়ার প্রয়োজন তা না হওয়ায় আল্লাহ পাক তাঁর জন্য আরও দশদিন সময় বৃদ্ধি করে দিলেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন-

وَوَاعَدْنَا مُوسَىٰ ثَلَاثِينَ لَيْلَةً وَأَتْمَمْنَاهَا بِعَشْرٍ فَتَمَّ مِيقَاتُ رَبِّهِ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً ۚ وَقَالَ مُوسَىٰ لِأَخِيهِ هَارُونَ اخْلُفْنِي فِي قَوْمِي وَأَصْلِحْ وَلَا تَتَّبِعْ سَبِيلَ الْمُفْسِدِينَ

অর্থঃ এবং আমি মূসা হতে ত্রিশ রাতের ওয়াদা গ্রহণ করেছিলাম এবং ত্রিশ রাতের সাথে আরও দশরাত মিলিয়ে পূর্ণ করে দিলাম। এভাবে তাঁর রবের নির্ধারিত সময় চল্লিশ দিনে পূর্ণ হল। মূসা (আঃ) তুর পর্বতে আসার পূর্বে তাঁর ভাই হারুনকে বলেন, তুমি আমার সম্প্রদায়ে আমার স্থলাভিষিক্ত থাকবে এবং তাদের সংশোধন করবে আর ফাসাদকারীদের রাস্তা অবলম্বন করবে না। (সূরা আরাফ – আয়াতঃ ১৪২)

ত্রিশদিনের ইতিকাফের সময় একাধারে ত্রিশদিন পর্যন্ত হযরত মূসা (আঃ)-কে রেখেছিলেন। এ ত্রিশদিনের ভিতর তিনি ইফতার করেননি। ত্রিশ রোজা পূর্ণ হওয়ার পর তিনি ইফতার করেন এবং তিনি দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজেন। আল্লাহ তায়ালার তরফ হতে ইরশাদ হল যে, রোজাদারের মুখ থেকে যে বিশেষ ধরণের গন্ধ বের হয় তা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় যেহেতু দাঁত মেজে আপনি উক্ত গন্ধ দূর করে দিয়েছেন- এজন্য আরও দশদিন রোজা রাখতে হবে যাতে মুখের মধ্যে আবার উক্ত গন্ধের সৃষ্টি হয়। তাই আল্লাহ আরও দশদিন ইতিকাফে নির্দেশ দিলেন। চল্লিশদিন পূর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ তায়ালার সাথে হযরত মূসা (আঃ)-এর সরাসরি কথাবার্তা হয়।

ত্রিশদিন এবং পরে আরও দশদিন ইতিকাফ সেরে আল্লাহ পাকের সাথে কথাবার্তা বলার পর মূসা (আঃ) আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখার আগ্রহ সৃষ্টি হল। তাই তিনি আরজ করলেন, হে আমার রব! আপনার অতুলনীয় সৌন্দর্য একবার স্বচক্ষে দেখতে আমার প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। আপনি স্বীয় অনুগ্রহে আমার সাথে কথাবার্তা বলে আমাকে প্রবল ধন্য করেছেন। আপনি অনুগ্রহ করে আমাকে আপনার দর্শন নসীব করে আমার অতৃপ্ত আত্মাকে তৃপ্ত করুন।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন হে মূসা! এ নশ্বর দুনিয়ার অবস্থান করে অবিনশ্বর সত্তার দর্শন লাভে আপনি কোন দিনই সমর্থ হবেন না। কেননা, আমার নূরের ঝলক সহ্য করার মত শক্তি সমর্থ নশ্বর জগতের মানুষের মধ্যে আমি রাখি নি। তবে আপনার সান্ত্বনার জন্য আমি এতটুকু বলতে পারি যে, আমি এ পর্বতের উপর আমার নূরের সামান্য বিকরণ বিচ্ছুরিত করছি। পাহাড় তো শারিরীক দিক থেকে এ নশ্বর দুনিয়ার মানুষ অপেক্ষা অনেক বেশী মজবুত। এর সহ্য ক্ষমতাও অধিক। এ সত্বেও পর্বত আমার নূরের বিকিরণ সহ্য করতে সক্ষম হবে না। আপনি পরবত গায়ে দৃষ্টি দিয়ে দেখুন। পর্বত আমার নূরের বিকিরণ সইতে পারলে আপনি আমার দর্শন লাভ করে সহ্য করবার সম্ভাবনা রয়েছে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে-

وَلَمَّا جَاءَ مُوسَىٰ لِمِيقَاتِنَا وَكَلَّمَهُ رَبُّهُ قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنظُرْ إِلَيْكَ ۚ قَالَ لَن تَرَانِي وَلَـٰكِنِ انظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي ۚ فَلَمَّا تَجَلَّىٰ رَبُّهُ لِلْجَبَلِ جَعَلَهُ دَكًّا وَخَرَّ مُوسَىٰ صَعِقًا ۚ فَلَمَّا أَفَاقَ قَالَ سُبْحَانَكَ تُبْتُ إِلَيْكَ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُؤْمِنِينَ

অর্থঃ আর মূসা যখন আমার নির্ধারিত সময়ে পৌঁছুলেন এবং রব তাঁর সাথে কথোপকথন করলেন, তখন তিনি নিবেদন করলেন, হে আমার রব! আমাকে আপনার দর্শন নসীব করুন, যেন আমি আপনাকে এক নজর দর্শন করতে পারি, আল্লাহ বলেন, আপনি কক্ষনও আমাকে দর্শন করতে পারবেন না, তবে আপনি এ পর্বতের প্রতি দৃষ্টি দিন, যদি সেটি স্বস্থানে স্থির থাকে তবে আপনিও আমাকে দেখতে পাবেন, অতঃপর তাঁর রব যখন পর্বতের উপর স্বীয় নূরের বিকিরণ ঘটালেন, তখন পর্বতকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলল এবং মূসা সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললেন। অনন্তর যখন জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন নিবেদন করলেন, নিশ্চয়ই আপনার সত্তা পবিত্র, আমি আপনার প্রতি প্রত্যাবর্তন করছি এবং প্রতি আমি সর্বপ্রথম ঈমানদার।

আল্লাহ তায়ালার দর্শন লাভের জন্য মূসা (আঃ) আবেদন করলে তিনি স্বীয় নূরের বিকিরণ তুর পর্বতের উপর রাখেন। এতেই তুর পর্বত খান খান হয়ে যায়। এমনকি পর্বতের একাংশ সমতল ভূমিতে পরিণত হয়। এ দৃশ্য দেখে মূসা (আঃ)-এর সংজ্ঞা হীন হয়ে পড়েন। অনন্তর যখন সংজ্ঞা ফিরে আসল তখন তিনি নিবেদন করলেন, হে আমার রব! নশ্বর দুনিয়াতে অবস্থান করে আপনার অবিনশ্বর সত্তার দেখা পাওয়া অসম্ভব। এর জন্য মৃত্যু। সুতরাং এ অত্যাকাঙ্খা প্রকাশের জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমা ভিক্ষা চাচ্ছি।

আর কখনও এ ধরণের কোন অসম্ভব আবেদন আপনার দরবারে পেশ করব না। কিন্তু মূসা (আঃ)-এর অন্তর আল্লাহ তায়ালাকে স্বচক্ষে দর্শন লাভের বাসনা অতৃপ্তই থেকে যায়। তাঁর মনের অতৃপ্ততার প্রতি লক্ষ্য করে আল্লাহ তাঁকে সাত্ত্বনা দিয়ে বলেন, হে মূসা! মানবীয় সীমাবদ্ধতার কারণে আপনি আমাকে স্বচক্ষে দর্শন লাভের বাসনা অতৃপ্তি বোধের কোন হেতু নেই। কেননা, আমি আপনার সাথে বিনা মাধ্যমেই সরাসরি কথা বলেছি। আপনাকে রিসালাতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছি। আমার দেয়া এসব বিষয় কি আপনার সুউচ্চ মর্যাদা প্রকাশের জন্য যথেষ্ট নয়? কাজেই এখন আর আপনার অতৃপ্তি বোধের কোন কারণ নেই। সাধ্যের সীমার বাইরে কোন অসম্ভব বিষয় অর্জিত না হবার দুঃখিত ও চিন্তিত হওয়া নিরর্থক। তাই আপনি এমন মনকে শান্ত ও চিন্তামুক্ত করুন।

উল্লেখিত ঘটনার পর আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাইলের জন্য মূসা (আঃ)-এর প্রতি তৌরাত কিতাব অবতীর্ণ করেন। আল্লাহর মূসা (আঃ)-এর প্রতি নাজিলকৃত এ কিতাব সবুজ রং বিশিষ্ট যমরুদ পাথরে লিপিবদ্ধ ছিল। আবার কারো কারো মতে ফলকের সংখ্যা ছিল সাত। আজকের মতে এগুলো পাথর ফলক নয়; বরং জান্নাতি কুল বৃক্ষের শুকনা কাঠের ফলক। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন-

وَكَتَبْنَا لَهُ فِي الْأَلْوَاحِ مِن كُلِّ شَيْءٍ مَّوْعِظَةً وَتَفْصِيلًا لِّكُلِّ شَيْءٍ فَخُذْهَا بِقُوَّةٍ وَأْمُرْ قَوْمَكَ يَأْخُذُوا بِأَحْسَنِهَا ۚ سَأُرِيكُمْ دَارَ الْفَاسِقِينَ

অর্থঃ আর আমি কয়েকখানা ফলকে সর্বপ্রকার উপদেশ এবং সর্ববিষয়ের বর্ণনা তাঁকে লিখে দিয়েছি, অতএব সেগুলো দৃঢ়তার সাথে ধরুন এবং স্বীয় কওমকে আদেশ করুন যেন সেসবের ভাল ভাল আদেশগুলো পালন করে, আমি শীঘ্রই তোমাদেরকে নাফরমানদের অবস্থানস্থলে দেখাচ্ছি।

আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আসমানী গ্রন্থ লাভের প্রতিশ্রুতি পেয়ে হযরত মূসা (আঃ)-এর কওমের কয়েকজনসহ তুর পর্বতে গমন করেছিলেন। কারো কারো মতে মূসা (আঃ) তখন বনী ইসরাইলীদেরকে বললেন, তোমাদের কামনা পূরণ কল্পে আল্লাহ পাক আমাকে কিতাব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যেন সে কিতাবের বিধান অনুসারে তোমাদের শরিয়ত শিখাতে পারি

তোমাদের আকাঙ্ক্ষিত গ্রন্থ লাভের জন্য আল্লাহ পাক আমাকে তুর পর্বতে গমনের নির্দেশ দিয়েছেন। মূসা (আঃ)-এর কথা শ্রবণ করে বনী ইসরাইলের কিছু লোক বলল, স্বচক্ষে না দেখে পর্যন্ত আপনার কিতাবপ্রাপ্তির বিষয়ে আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস জমবে না; সুতরাং আমাদের কিছু লোককেও আপনার সাথে নিয়ে চলুন। মূসা (আঃ) বলেন, ঠিক আছে, তোমরা কয়েকজনও পবিত্র পরিচ্ছন্ন পোশাকাদি পরে আমার অনুগমন করে চলে। তখন বনী ইসরাইলের উনসত্তর ব্যক্তি তাঁর সাথে তুর পর্বতে গমন করে। এদের মধ্যের একজনের নাম ছিল ইউশা ইবনে নূন।

আবার কারো কারো মতে মূসা (আঃ) তাঁর সাথে গমনেচ্ছুক বনী ইসরাইলীদেরকে লক্ষ্য করে বলেন, আমি আগেই চলে যাই। তোমরা আমার পিছনে আস। এর কারণস্বরূপ বলা হচ্ছে, কিতাব লাভের বিষয় জানার পর মূসা (আঃ)-এর মনে আল্লাহ পাকের সাক্ষাত লাভের অত্যাধিক আগ্রহ জন্মে। তাই তিনি সাথে গমনেচ্ছুক লোকদেরকে পিছনে রেখেই তুর পর্বতে গমন করেন। তদুপরি তাঁর প্রতি সেখানে ত্রিশ দিন ইতিকাফ করার নির্দেশ ছিল। এ দ্বিবিধ কারণে তিনি তাঁর সাথে গমনকারী লোকদেরকে পিছনে রেখেই তুর পর্বতে চলে যান।

আরো পড়তে পারেন

দুঃখিত, কপি করবেন না।