হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) – পর্ব ১৪ | আমার কথা
×

 

 

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) – পর্ব ১৪

coSam ১২৮


হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) – পর্ব ১৩ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

আরবের মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড লড়াই খ্রীষ্টান সেনাদের। যুদ্ধক্ষেত্র রোম। রোমক সেনাদের তুলনায় মুসলিম বাহিনীর বেশ দুর্বল। কিন্তু তবুও তাঁরা সাধ্যমতো যুদ্ধে যাচ্ছেন। কিন্তু এক সময় হটে আসতে বাধ্য হন। তখন হঠাৎ কিছু মুসলিম সেনার মুখ থেকে বেরিয়ে এল বায়েজীদ (রঃ) আমরা বিপন্ন। সাহায্য করুন। আর এই আর্তকন্ঠ গিয়ে পৌছাল কয়েকশ মাইল দূরে, যেখানে বায়েজীদ (রঃ) বোস্তামে অবস্থান করছেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি এক মুঠো ধুলো নিয়ে শূন্যে উড়িয়ে দিলেন। আর যুদ্ধরত মুসলিম সেনারা দেখতে পেলেন, বিশাল এক অগ্নিশিখা একদিক থেকে ধেয়ে আসছে খ্রীস্টান বাহিনীর দিকে। ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে প্রাণরক্ষার তাগিদে তারা যে যেদিকে পারলেন ছুটে পালালেন যুদ্ধে জয়ী হলেন মুসলিম সেনাদল।

সশিষ্য তিনি মোরাকাবায় মগ্ন। আর এ সময়ে এলেন এক দরবেশ। তিনিও মোরাকাবায় বসলেন। ধ্যানভঙ্গ হবার পর দরবেশ তাঁকে শুধালেন, এতক্ষণ আপনি কোথায় ছিলেন? হযরত বায়েজীদ (রঃ) বললেন, আল্লাহ্‌র দরবারে। দরবেশ বললেন, আমিও তো ছিলাম সেখানে। কই, আপনাকে তো দেখলাম না?

তিনি বললেন, আপনি ছিলেন পর্দার বাইরে। আর আমি ভেতরে। আমাকে দেখবেন কী করে? তিনি আরও বললেন, যে ব্যক্তি তরীকতের সুন্নত অনুসরণ না করে নিজেকে তরীকত-পন্থী বলে, স্পষ্টতই সে মিথ্যাবাদী। সত্য এই যে, শরীয়ত বাদ দিয়ে কখনও তরীকত লাভ করা যায় না।

বিপদের সময় তিনি আল্লাহ্‌র কাছে ধৈর্য্যধারনের শক্তি প্রার্থনা করতেন। বলতেন, প্রভু! আপনি যখন খাবার জন্য আমাকে রুটি দিয়েছেন, তখন তরকারিও দান করুন তবেই তো ভালোভাবে রুটি খেতে পারব। অর্থ্যৎ আল্লাহ্‌ যদি বিপদ দিয়েছেন তো ধৈর্য্যের ক্ষমতাও দান করুন।

একবার হযরত আবু মূসা (রঃ) তাঁর কাছে জানতে চান, কিভাবে তাঁর রাত কাটে। তিনি বললেন, আল্লাহ্‌র ধ্যানে থেকে কখন দিন যায় রাত আসে, তিনি বুঝতে পারেন না। তিনি আরও বললেন, আল্লাহ্‌ তাঁকে জানিয়েছেন, এবাদাত যথেষ্ট হয়েছে। এবার তিনি যদি তাঁর সাক্ষাত চান তো তাঁর দরবারে সুপারিশের জন্য দু’টি বস্তু পাঠান, যা তাঁর খাজাঞ্চিখানায় নেই। কিন্তু বস্তু দু’টি কী? আল্লাহ্‌ জানান, সে বস্তু দু’টি হল, বিনয় ও নম্রতা। তিনি আরও বললেন, অপদস্থ হও। বিপদ-আপদ বরণ কর। কেননা, আমার মধ্যে এ বস্তু দু’টি নেই।

এই মহাজ্ঞানী মহাতাপস যখন আল্লাহ্‌র গুণাবলীর বিবরণ দান করতেন, তখন স্বাভাবিক অবস্থায় থাকতেন। কিন্তু যখন আল্লাহ্‌র সত্তা সম্পর্কিত বক্তব্য রাখতেন, তখন নিজের মধ্যে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারতেন না। এই অবস্থায় প্রায়ই তিনি বলতেন, যখন যেখানে থাকি, আল্লাহকে খুব কাছেই দেখতে পাই। অন্য যেকোন সাধকের তুলনায় তাঁর তত্ত্ব-জ্ঞান ছিল গভীর। একজন দরবেশ বললেন, আমি আল্লাহ্‌র সেই দাসের প্রতি আশ্চর্যবোধ করি, যে আল্লাহকে জানার পরও তাঁর এবাদত করে না, কিন্তু হযরত বায়েজীদ (রঃ) বললেন, আমি আশ্চর্যবোধ করি সেই লোকের প্রতি, যে আল্লাহকে জানার পর এবাদাতে রত হয়।

তাঁর এই মন্তব্যের অর্থ হল, আল্লাহকে সত্যিকারের জানা বা চেনার পর মানুষের আর স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি থাকে না। তখন তাঁর পক্ষে এবাদাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজের কথা বললেন। প্রথমবার হজ্জ করতে গিয়ে তিনি কাবাঘর জিয়ারত করেন। দ্বিতীয়বারে কাবাঘরের মালিক অর্থাৎ আল্লাহ্‌র জিয়ারত করেন। কিন্তু তৃতীয় দফায় না কাবা, না তার মালিক, কাউকে দেখতে পাননি। কেননা, তখন তিনি আল্লাহকে এত বেশী স্মরণ করতে থাকেন যে, তিনি তাঁর ভিতরের এবং বাইরের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন।

আল্লাহ্‌র ধ্যানে তিনি এমন গভীরভাবাবেগে মগ্ন হন যে, তার আত্ন-বিস্মৃতি ঘটে। একদিন এক অভদ্র লোক তাঁর বাড়ীর দরজায় এসে ‘বায়েজীদ কোথায়’, ‘কোথায় বায়েজীদ’ বলে চীৎকার করতে থাকে। বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, অনেক দিন থেকে আমিও তাঁকে খুজছি। কিন্তু কোথায় তিনি! লোকটি হযরত বায়েজীদ (রঃ)-কে চিনত না। সুতরাং এ কথার মর্ম উপলব্ধি করার ক্ষমতা তার ছিল না। এ ঘটনার যারা প্রত্যক্ষদর্শী, তারাও কিন্তু হযরত বায়েজীদ (রঃ)-কে এ বিষয়ে কোন প্রশ্ন করল না। তারা এর গূঢ়ার্থ জানতে চাইল মিশরের প্রখ্যাত সাধক হযরত যুনযুন (রঃ)-এর কাছে। হযরত যুনযুন (রঃ) বললেন, তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে আল্লাহ্‌র মধ্যে বিলীন হয়ে গেছেন। তাই এখন আর নিজেকে চিনতে পারেন না।

তাঁর সাধনার স্বরূপ উপলব্ধি করা সত্যিই কঠিন। বিশেষ করে উচ্চ পর্যায়ে। তবে নিম্নতম স্তরের অবস্থা সম্বন্ধে তিনি বললেন, নফস বা প্রবৃত্তিকে আল্লাহ্‌র পথে আকৃষ্ট করার জন্য তিনি একবার খুব চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রবৃত্তি তাঁর কথা শোনে না। তিনিও নাছোড়বান্দা। সহজে ছেড়ে দেবার পাত্র নন। তিনি তার পানি বন্ধ করে দিলেন। আর তাকে বলে দিলেন, যদি এখনও তুমি এবাদতে রত না হও, তাহলে পিপাসায় ছটফট করে মারা যাবে।

হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) – পর্ব ১৫ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

পরবর্তী গল্প
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) – পর্ব ১৫

পূর্ববর্তী গল্প
হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রঃ) – পর্ব ১৩

ক্যাটেগরী