হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৯ | আমার কথা
×

 

 

হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৯

coSam ১৮৩


হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৮ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

৪২. একবার এক তরুণ জনসভায় তাঁর বক্তৃতা শুনে এমন অভিভূত হয়ে পড়ে যে, বাড়ি ফিরে গিয়ে তওবা করে সে তার সর্বস্ব বিলিয়ে দেয় আর এক হাজার টাকা উপহারস্বরূপ হযরতকে দিতে যায়। লোকে বলতে লাগল, তুমি এক দীনদার ব্যক্তিকে দুনিয়ায় বাঁধতে চাও? সঙ্গে সে টাকাগুলি দজলা নদীতে ফেলে দিল। তারপর চলে এল হযরত জুনায়েদ (রঃ)-এর দরবারে। সব শুনে তিনি বললেন, তুমি তোমার ধন-সম্পত্তির মায়া পরিত্যাগ করলেও এভাবে কিছু কিছু করে তা বর্জন করলে কেন? তোমার উচিত ছিল একসঙ্গে সবকিছুর মায়া ছেড়ে দেওয়া।

৪৩. একবার তাঁর এক শিষ্যের মনে হয়, সে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছে। অতএব, পীরের সান্নিধ্য সংস্পর্শের আর প্রয়োজন নেই। এখন নির্জনবাসই শ্রেয়। অতএব, শুরু হল তাঁর নির্জনবাস। আর প্রতি রাতে সে স্বপ্ন দেখতে লাগল, ফেরেশতারা সঙ্গে একটি উট এনে তাকে বলছেন, চল, তোমাকে আমরা জান্নাতে নিয়ে যাব। একদিন তো সে উটের ওপর চড়েই বসে। সত্যিই ফেরেশতারা অতি মনোরম একটি স্থানে তাকে নিয়ে যায়। সেখানে সুদর্শন লোকের সমাবেশ ও রকমারি উত্তম আহার্য। কাছেই স্বচ্ছ সুপেয় পানির ফোয়ারা। সে সেখানে নেমে পড়ল, দেখল সে তাঁর বাড়িতেই শুয়ে আছে।

বেশ কিছুদিন ধরে এই অবস্থা চলতে থাকে আর সে নিজের মুখেই মানুষের কাছে তার স্বপ্নের বিবরণ দিয়ে বলতে থাকে যে, সে রোজ রাতে একবার করে জান্নাতে যায়। অবশেষে হযরত জুনায়েদ (রঃ)-এর কানেও কথাটা চলে আসে। তিনি একদিন চলে গেলেন তাঁর শিষ্যের বাড়িতে। দেখলেন বেশ কয়েকজন অনুচর নিয়ে জমকালোভাবে সে বসে আসে। তিনি তাঁর অবস্থার কথা জানতে চাইলে সে সবিস্তারে স্বপ্নের বৃত্তান্ত বলল। তিনি তাকে বললেন, তুমি যদি আজও এরূপ স্বপ্ন দেখ, তাহলে তোমার জান্নাতে উপস্থিত হয়ে তুমি ‘লা হাওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ কালামটি তিনবার পাঠ করবে।

সেই রাতে আবার সেই স্বপ্ন। সেই ফেরেশতা, সেই জান্নাত। শিষ্য মুর্শিদের নির্দেশমতো জান্নাতে গিয়ে ঐ কালামটি পাঠ করল। আর সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত ফেরেশতাগণের আনন্দ-মহফিল ভেঙে গেল। তাঁরা তাকে একা ফেলে রেখে কে কোথায় ছুটে পালাল। এবার সে দেখল, সে একটি বিদ্ঘুটে ঘোড়ায় চড়ে অতি বিশ্রী একটা জায়গায় পৌছে গেছে। আর সেখানে পড়ে আছে মৃত পশুর দুর্গন্ধে ভরা কয়েকখানি হাড়। তখন সে তার ভুল বুঝতে পেরে অস্থির হয়ে উঠল। সকালে বিছানা থেকে উঠেই ছুটে গেল মুর্শিদের বাড়িতে। এখন সে উপলব্ধি করল, পীরকে পরিত্যাগ করে মুরীদের পক্ষে নির্জনবাস বড় বিপজ্জনক।

৪৪. আর একজন শিষ্যের নির্জনবাসের সময় মন্দ চিন্তা করার ফলে তিন দিন ধরে মুখখানি কালো হয়ে থাকল। তিন দিন পর তার মুখের কালিমা যখন দূর হল, তখন হযরত জুনায়েদ (রঃ) তাকে এক চিঠিতে জানালেন, আল্লাহ্‌র দরবারে পৌঁছে শিষ্টাচার রক্ষা করতে হয়। তুমি তা করনি বলে তোমার চেহারায় যে কালিমা দেখা দিয়েছিল তা দূর করতে আমাকে তিন দিন ধরে ধোপার মতো খাটতে হয়।

৪৫. আর একবার অত্যন্ত গরম পড়ায় এক শিষ্যের নাক থেকে রক্ত পড়তে থাকে। তো শিষ্য গরমের নিকুচি করে ছাড়ল। হযরত জুনায়েদ (রঃ) তাতে ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, তুমি আমার সামনে থেকে দূর হও। তুমি আল্লাহ্‌র কাজের সমালোচনা শুরু করছ। আর কিছুতেই আমার সঙ্গে থাকতে পার না।

৪৬. একবার এক শিষ্য তাঁর সঙ্গে কিছু অশিষ্ট আচরণ করে লজ্জায় এক মসজিদে আশ্রয় নেয়। হযরত জুনায়েদ (রঃ) একদিন কোথাও যাচ্ছিলেন। হঠাৎ ঐ শিষ্যের ওপর তাঁর চোখ পড়ে। আর বেচারা সঙ্গে সঙ্গে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। একেবারে মাথা ফেটে রক্তারক্তি কাণ্ড। আর ঐ রক্তধারায় লিখিত হতে লাগল। ‘আল্লাহু জাল্লা জালালুহু’ কালামটি। তা দেখে হযরত জুনায়েদ (রঃ) বললেন, তুমি আমাকে দেখাতে চাও যে, তুমি মারেফাতের উচ্চ পর্যায়ে উঠে গেছ? মনে রেখ, ছোট ছোট ছেলেরাও কিরে তোমার সমান হতে পারে। কিন্তু বয়ঃপ্রাপ্ত পুরুষকে তো ধ্যানের সীমা পর্যন্ত পৌঁছুতে হয়। তাঁর কথায় লোকটির মনে এমন আঘাত লাগল যে, সে আর সামলাতে না পেরে তৎক্ষণাৎ ছটফট করতে করতে মৃত্যুমুখে পতিত হল। তার মৃত্যুর কিছুদিন পর এক সাধক তাঁকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলেন সে কোন স্তরে আছে? সে বলল, বেশ কিছুদিন ধরে আমি ছুটাছুটি করছি। কিন্তু এখনও কুফরীর সীমানায় রয়ে গেছি। ধর্ম ও তওহীদ এখনও অনেক দূরে। এখন আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি, যে, যেসব ধরনা নিয়ে আমি এতদিন গর্ব করতাম, তা ছিল সম্পূর্ণ ভ্রান্ত।

৪৭. হযরত জুনায়েদ (রঃ) তাঁকে এক শিষ্যকে বড় ভালোবাসতেন। তা দেখে অন্য শিষ্যদের মনে হিংসা জন্মে। আর সেটি হযরতের নজর এড়িয়ে গেল না। একদিন তিনি প্রত্যেক শিষ্যকে একটি করে মোরগ আর ছুরি দিয়ে বললেন, তোমরা প্রত্যেকে এমন জায়গায় গিয়ে এগুলি জবাই করে আন, যেন কেউ সেখানেই জবাই করাটা দেখতে না পায়। সবাই তাই করলেন। কিন্তু তাঁর স্নেহভাজন শিষ্যটি মোরগ জবাই না করে ফিরে এলেন। কারণ কি জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, আমি এমন জায়গা খুঁজে পেলাম না, যেখানে আপনার নির্দেশমত মোরগ জবাই করতে পারি। কেননা, আল্লাহ্‌র দৃষ্টি সর্বত্রই। তাঁকে এড়িয়ে কোন স্থানেই মোরগ জবাই করা সম্ভব নয়। তাঁর কথা শুনে সবাই তাদের অজ্ঞতা বুঝতে পারলেন। তওবা করলেন। সেদিন থেকে তাঁর প্রতি তাদের হিংসা-বিদ্বেষের অবসান ঘটল।

সূত্রঃ তাযকিরাতুল আউলিয়া

হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ১০ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

পরবর্তী গল্প
হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ১০

পূর্ববর্তী গল্প
হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৮

ক্যাটেগরী