হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৮ | আমার কথা
×

 

 

হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৮

coSam ৩৭৭


হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৭ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

৩৭. একবার হযরত সোহায়েল (রঃ) হযরত জুনায়েদ (রঃ)-কে এক চিঠিতে লেখলেন, আলস্য ও উদাসীনতা পরিহার করুন। কেননা, নিদ্রাপ্রিয় লোকের মনোবাঞ্ছা কখনও পূর্ণ হয় না। যেমন হযরত দাউদ (আঃ)-কে আল্লাহ্‌ বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবাসে বলে দাবী করে অথচ রাতে ঘুম যায়, সে নিশ্চয় মিথ্যাবাদী। হযরত জুনায়েদ (রঃ) সে চিঠির উত্তর জানান, আল্লাহ্‌র রাস্তায় জেগে থাকা অবশ্যই আমাদের একটি কর্তব্য। কিন্তু আমাদের ঘুমের সঙ্গেও আল্লাহ্‌ প্রদত্ত কাজের সম্পর্ক আছে। আর জেগে থাকা অপেক্ষা ঐ ঘুমের মুল্য অনেক বেশী। যেমন আল্লাহ্‌ বলেছেন, নিদ্রা আল্লাহ্‌র তরফ থেকে তাঁর প্রিয় বান্দাগণের প্রতি এক মূল্যবান উপহারস্বরূপ।

৩৮. একদিন এক পুত্রহারা জননী তাঁর দরবারে এসে কাতর প্রার্থনা জানায়, তার একমাত্র পুত্র নিরুদ্দেশ। পুত্রের বিরহে তার আহার-নিদ্রা, শান্তি সব ঘুচে গেছে। তিনি যেন তার জন্য দোয়া করেন, সে যেন তার হারানো নিধি ফিরে পায়। হযরত জুনায়েদ (রঃ) তাকে আশ্চস্ত করে বিদায় দিলেন। কিন্তু কয়েকদিন পরে সে আবার এসে অনুরূপ অনুরোধ করে। তিনি আবারও তাকে সবর করতে বললেন। সবর না করেই বা উপায় কী। সে আবার ফিরে যায়। আর অপেক্ষা করতে থাকে দিনের পর দিন। কিন্তু, কোথায় তার পুত্র! এখনও যে তার পাত্তা পাওয়া গেল না। পুত্রের বিচ্ছেদ-বেদনা ক্রমশঃ তার কাছে অসহ্য মনে হল। প্রায় পাগলিনী অবস্থায় সে আবার এল হযরত জুনায়েদ (রঃ)-এর দরবারে। সেই একই আবেদন। দয়া করে দোয়া করুন। আল্লাহ্‌ যেন আমার ছেলে কে মিলিয়ে দেন।

হযরত জুনায়েদ (রঃ) পুত্রহারা জননীকে আবারও জিজ্ঞেস করলেন, সে আরও কিছু দিন ধৈর্যধারণ করতে পারে কিনা। কিন্তু বেচারী জানান, তা পক্ষে তার আর মোটেই সম্ভব নয়। আপাততঃ তার যা মনের অবস্থা, তাতে ছেলেকে না পেলে সে হয়তো প্রাণে মারা যাবে। তখন হযরত জুনায়েদ (রঃ) বললেন, তা যদি হয়, তাহলে সে বাড়ি ফিরে যাক। গিয়ে দেখবে যে তার আগেই ছেলেটি বাড়িতে পৌঁছে গেছে।

আর দেরী না করে মহিলা যেন উড়ে চলল বাড়ির পানে। গিয়ে দেখে, সত্যিই তার হারানো নিধি বহাল তবিয়তে বাড়িতে বসে আছে।

৩৯. একদিন এক চোর হযরত জুনায়েদ (রঃ)-এর একটি জামা চুরি করে নিয়ে গেল। তারপর অন্য একদিন সে যখন জামাটি বাজারে বিক্রি করছে, এমন সময় সেখানে হযরত নিজেই হাজির। জামাটি যে কিনবে সে চোরকে ঝামেলার ফেলেছে। বলছে, যদি কেউ সাক্ষ্য দেয় যে জামাটি তার, তবেই সে সেটি কিনতে পারে, নইলে নয়। ভারি মুশকিলে পড়ে গেল বেচারা চোর। চোরের হয়ে কে সাক্ষ্য দেবে। কিন্তু, তার দুশ্চিন্তার অবসান ঘটিয়ে হযরত জুনায়েদ (রঃ) এগিয়ে এসে বললেন, আমি জানি এ জামাটি এখন এর। অতএব ক্রেতার আর অসুবিধা রইল না। দিব্যি সে জামাটি কিনে নিল।

৪০. একদিন এক নিঃস্ব লোক হযরত জুনায়েদ (রঃ)-এর কাছে তার অভাবের ফিরিস্ত দিয়ে আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে অভিযোগ জানান। আর তিনি তার অভাব মোচনের জন্য না করে বলে বসলেন, আল্লাহ্‌ তোমাকে এই অবস্থায়ই রাখুন। লোকটি চমকে উঠে বলল, আপনি আমার ওপর অসুন্তষ্ট কেন হুজুর?

হযরত বললেন, তুমি যা বললে, আল্লাহ্‌ তাঁর বিশেষ প্রিয় বন্ধুদেরই তা দান করেন। কিন্তু তাঁরা তোমার মতো আল্লাহ্‌র বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন না।

একদিন শিষ্য সমভিব্যাবহারে তিনি বসে আছেন। এমন সময় এক ধনী ব্যক্তি সভা থেকে একজন দরবেশকে ডেকে নিয়ে বাইরে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল, ঐ দরবেশের মাথায় খাবারের খাঞ্চা চাপিয়ে দিয়ে তিনি আবার ফিরে আসছেন। দৃশ্যটি দেখামাত্র হযরত বলে ওঠলেন, ওটা লোকটার মুখের ওপর ছুড়ে মার। এটা বয়ে আনার জন্য এই দরবেশ ছাড়া সে কী আর লোক পেল না? তাঁর জানা উচিত, তাপস-দরবেশগণ বিত্তশালী না হলেও তাঁদের মর্যাদা ধনীদের চেয়ে ঢের বেশী। আর তাঁরা পার্থিব বস্তুর কিছুটা মুখাপেক্ষী হলেও পরকালের পুরস্কারের অংশ তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট।

৪১. হযরত জুনায়েদ (রঃ)-এর এক বিত্তশালী শিষ্য তাঁর কাজে প্রচুর ধন-সম্পদ খরচ করেন। বাকী থাকে কেবল তাঁর বাড়িখানি। হযরত জুনায়েদ (রঃ) তাঁকে বাড়িখানিও বিক্রি করে মূল্যের টাকাটা তাঁকে দিয়ে দিতে বললেন। শিষ্য তাই করলেন। কিন্তু, টাকা দিতে এলে হযরত বললেন, তিনি টাকা নিয়ে কী করবেন। ওগুলো নদীতে ফেলে দেওয়া হোক। শিষ্য আবারও তাঁর আদেশ পালন করলেন। এখন তিনি নিঃস্ব কর্পদকশূন্য হয়ে পীরের সান্নিধ্যে থেকে গেলেন। হযরত তাঁকে তাঁর কাছ থেকে চলে যাবার জন্য ধমক দিলেন। ভৎসনা করলেন। কিন্তু তিনি শুনলেন না। বহু অনুনয়-বিনয় ও কাকুতি-মিনতি করে অবশেষে হযরতের অনুমতি আদায় করে ছাড়লেন। আর অল্প দিনের মধ্যেই তিনি সাধনায় সিদ্ধিলাভ করলেন।

সূত্রঃ তাযকিরাতুল আউলিয়া

হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৯ পড়তে এখানে ক্লিক করুন


পরবর্তী গল্প
হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৯

পূর্ববর্তী গল্প
হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৭

ক্যাটেগরী