হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৪ | আমার কথা
×

 

 

হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৪

coSam ৩৫২


অতঃপর তিনি প্রকাশ্য জনসভায় ভাষণ দিতে শুরু করেন। কথিত আছে, তাঁর প্রথম ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন যে, তিনি নিজে এই ওয়াজ-নসীহতে শামিল হননি। প্রায় চল্লিশ জন তাপসের ধারাক্রমিক অনুরোধে তিনি এ কাজে ব্রতী হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, প্রায় দুশ’জন বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী সাধকের তিনি সেবা করেছেন। আর তাঁর শিক্ষাগুরু সংখ্যাও ছিল প্রায় ষাট। যাই হোক, তাঁর ভাষণের এই ভূমিকা খুবই উল্লেখযোগ্য। তাঁর উপদেশমালাও ছিল তেমনি মূল্যবান। তাঁর উপদেশবাণীগুলো নিম্নরূপঃ

১. যিনি ডান হাতে আল্লাহ্‌র কুরআন ও বাম হাতে নবীজীর হাদীস নিয়ে পথ চলেন, যাতে কোনরূপ হোঁচট খেতে না হয় বা কোন প্রকার সন্দেহ ও বিপদ্গামী হতে না হয়, এমন লোকেরই সাধনমার্গে পথ চলা শোভা পায়।

২. তিনি বলেন, তাঁর যা কিছু মাহাত্ম্য মর্যাদা, সবই অর্জিত হয়েছে ক্ষুধা, রাত্রি জাগরণ ও সংসার বৈরাগ্যের ফলে।

৩. হযরত আলী (রঃ) সম্বন্ধে তিনি বলেন, তিনি মারেফাতের মৌলিক তত্ত উদ্ঘাটন করেন। সাধনায় কষ্টসহিষ্ণুতাঁর দরজায় উন্মুক্ত করেন। আল্লাহ্‌ তাঁকে বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারা পরিশোভিত করেন মারেফাতের ক্ষেত্রে। হযরত আলী (রঃ) বলেন, আল্লাহ্‌ আমাকে নিজেই তাঁর আত্মপরিচয় দান করেছেন। আল্লাহ্‌ এমন এক সত্তা, যার কোন তুলনা হয় না। কোন আকারের আদলে তাঁকে কল্পনা করা যায় না। কোন সৃষ্টির দ্বারা তাঁকে অবধারণ করা যায় না। তিনি কোন কিছুর অনুরূপ নন এবং কোন কিছু থেকে সৃষ্টিও নন। তাঁর সত্তা এমন নয় যে, অন্য কোন বস্তুর সাহায্য তাঁর পরিচয় দান করা যেতে পারে।

সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী তিনি, যিনি আল্লাহ্‌র সত্তা বিষয়ে জ্ঞান রাখেন।

হযরত আলী (রঃ) বলেন, দশ হাজার নিষ্ঠাবান শিষ্য নিয়ে আমি মারেফাতের পথে, একত্ববাদের সমুদ্রে ডুব দিয়েছিলাম। সেই সমুদ্র থেকে উত্থিত হয়ে আমি ঈমানের এক সূর্যে রূপান্তরিত হয়ে গেলাম। ব্যস, এতটুকু যে বুঝে নিল, বুঝে নিক, এর বেশী আর ব্যাখ্যা করা চলে না। তাতে পভ্রষ্টতার আশঙ্কা আছে।

৪. হযরত জুনায়েদ (রঃ) বলেন, হাজার বছরের আয়ুলাভ করলেও আল্লাহ্‌র নিষেধ ছাড়া তিনি পুণ্য চর্চা থেকে পলকের তরেও বিরত হবেন না।

৫. সৃষ্টি জগতে যে পাপকর্ম চলে, তা আমার ক্লেশের কারণ। কেননা, সৃষ্টি মাত্রকেই আমি আমার শরীরের অঙ্গ বলে মনে করি। কেননা, মুমিন বা বিশ্বাসী একটি মাত্র সত্তার মতো। এই জন্যে রাসূলে কারীম (রঃ) বলেন, আমাকে যত বেশী দুঃখ-কষ্ট দেওয়া হয়েছে, ততটা তাঁর কোন নবীকে দেওয়া হননি।

৬. আমি দীর্ঘ দিন ধরে পাপীদের অবস্থা কী হবে তাই নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। কিন্তু এখন আমার নিজের কাজে নিজেরই খবর নেই। আকাশ পৃথিবীর খবরও জানি না।

৭. দশ বছর ধরে হৃদয় আমার হেফাজত করেছে, আমিও তাঁর হেফাজত করছি। কিন্তু এখন অবস্থা এমন যে, আমি তাঁর খবর রাখি না, সেও আমার খবর রাখে না।

৮. মারেফাত সাধনার সাধারণ শাখাগুলো বিশ বছর ধরে মানুষকে বলে আসছি। কিন্তু গূঢ় কথা প্রকাশ করিনি। কেননা, সে ব্যাপারে জিভকে নিষেধ করা হয়েছে। আর মনকেও তা অনুধাবন করতে অক্ষম করা হয়েছে।

৯. রোজ কিয়ামতে আল্লাহ্‌ যদি আমাকে বলেন, আমার দিকে দৃষ্টিপাত কর, তবে আমি বলব, না, দৃষ্টিপাত করব না। কেননা, চোখ তো আমার আপন নয় বরং অপর তুল্য। অতএব, বন্ধুর দিকে নিজস্ব দৃষ্টি মাধ্যমে না দেখা হলে আমি এ কাজ থেকে বিরত থাকব।

১০. যখন জানতে পারলাম, অন্তর থেকে যা বলা হয় তাই হল বিশুদ্ধ কালাম। তখন আমি আমার ত্রিশ বছরের নামাজ আবার নতুনভাবে পড়লাম। তারপর ত্রিশ বছর ধরে আমি এই রীতি পালন করছি যে, নামাজের মধ্যে যদি পৃথিবীর কথা মনে আসে তাহলে আমি নামাজের পুনরাবৃত্তি করি। যার মধ্যে পরকালের কথা মনে হয় তাতে সেজদায়ে সহু আদায় করি।

সূত্রঃ তাযকিরাতুল আউলিয়া


পরবর্তী গল্প
হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৫

পূর্ববর্তী গল্প
হযরত জুনায়েদ বাগদাদী (রঃ) – পর্ব ৩

ক্যাটেগরী