হযরত ওমর (রাঃ) এর সরলতা | আমার কথা
×

 

 

হযরত ওমর (রাঃ) এর সরলতা

coSam ৩৩২


প্রজারা কিভাবে শান্তিতে থাকবে, কি করলে তাঁদের দুঃখ-কষ্ট দূর হবে খলিফা হযরত ওমর ফারুখ (রাঃ) সবসময় চিন্তা করতেন।  হযরত ওমর (রাঃ) রাত্রিতে একজন সঙ্গী নিয়ে রাজধানীর আশাপাশে নগরের পথে পথে, পল্লীর আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াতেন।  কে কোথায় কিভাবে আছে, কারো কোন বিপদ হয়েছে কি না, কেউ কোন অন্যায় করছে কি না, তাঁর সমাধান করে ফিরতেন। 

অন্যের উপর এ দায়িত্বপূর্ণ কাজের ভার দিয়ে তিনি নিশ্চিত হতে পারতেন না।  এক রাত্রিতে তিনি একটি কুটিরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এমন  সময় শুনতে পেলেন, ঘরের মধ্যে দুইজন চাপা স্বরে কথা বলছে। একজন বয়স্কা রমণী তাঁর কন্যাকে বলছিল, আমরা খুব গরিব। দুধ বিক্রয় করে যা সামান্য কিছু লাভ হয় তাতে আমাদের দু’বেলা চলতে চায় না। দুধে যদি কিছুটা পানি দেওয়া যায় তাতে কিছু লাভ বেশি হতে পারে। এতে আমাদের অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। কন্যা তাঁর মাতাকে বাধা দিল। 

বললেন, এটা তোমার অন্যায় হবে মা। খলিফা কি হুকুম জারি করেছন তা তোমার মনে নেই। দুধে পানি মিশালে আমাদের অন্যায় হবে। মাতা জবাব দিলেন কেউ বুঝুক, না দেখুন, কিন্তু আল্লাহ্‌ সকল দুনিয়া দেখছেন, তাঁর চোখকে কিছুতেই ফাকি দেওয়া যাবে না। আমরা মুসলমান, আমাদের এ অন্যায় কাজ করা উচিত নয়। মাতা বললেন , তুমি ঠিক কথা বলেছ মা। আর কখনো এমন অন্যায় চিন্তা করব না।  খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) মাতা ও কন্যার কথা শুনে পথ চলতে লাগলেন। 

সঙ্গী আসলামকে বললেন, মেয়েটির সাধুতার তুলনা হয় না। আগামীকাল দরবারে হাজির হওয়ার জন্য এদের ডেকে পাঠাবেন। আমি তাঁকে উপযুক্ত পুরষ্কার দেব। পরের দিন সঠিক সময়ে সভা বসল। আসলাম পূর্ব নির্দেশ অনুযারী মাতা ও কন্যাকে সভায় হাজির করলেন। হযরত ওমর (রাঃ) সে সভায় দেশের জ্ঞানী-গুনিদের হাজির হওয়া জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন এবং আপণ পুত্রদেরও দরবারে উপস্থিত থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন। খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) সভাস্থ সবার কাছে রাত্রির কাহিনী বর্ণনা করলেন। অপঃপর বললেন, এ বালিকাটি অতিশয় দরিদ্র।  এর পিতা নেই বালিকাটির সাধুতা আমাদের সকল মুসলমানদের একটি আদর্শ। এমন একটি মেয়ে এ দেশে আর একটিও নেই বললে চলে। 

এ ধরনের একজন সৎ বালিকাকে গ্রহণ করার জন্য আমার দরবারে কোন যুবক আছে কি? সভার লোকেরা অবাক হয়ে খলিফার মুখের দিকে চেয়ে রইল। হঠাৎ একপাশ হতে একটি যুবক উঠে দাঁড়াল। আস্তে আস্তে বললেন, হে  আমীরুল মুমিনীন! এ বালিকাটি যদিও খুব গরিব তবুও ওর মনটা খুবই মহৎ।  এ বালিকা কে স্ত্রীরূপে পাওয়া খুবি ভাগ্যের কথা।  তাঁর কথা শ্রবণ করে খলিফা খুব আনন্দিত হল। একজন মহৎ ব্যক্তি মহান আল্লাহর কাছ খুবই প্রিয়।  তুমি আমার সন্তান হয়েও একটি দরিদ্র এতীম কন্যাকে বিবাহ করতে রাজি হয়েছে এ জন্য তোমাকে আমি প্রার্থনা করছি যেন আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন তোমাদের ভাল রাখেন । খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) কোনদিন কোন কাজকেই ছোট মনে করতেন না। শাহী দরবারে বিচার-আচার এবং রাজ্য পরিচালনা শুরু করে নিজের ঘর সংসার এর কাজ তিনি নিজের হাতে করতেন। 

অন্য লোকের জন্য কিছু ফেলে রাখতেন না। দরকার হলে তিনি প্রতিবেশি এবং ওপর লোকের কাজও করে দিতেন।  কোন বিধবা রমনীর জন্য পানি এবং সওদাপত্র এনে দেওয়ার কেউ নেই। খলিফা তাঁর দুর্দশার সংবাদ জানতে পারলে পানি আনার জন্য মশক নিয়ে যেতেন। যাদের গৃহে পানির অভাব তিনি তাদের সকলকের গৃহে মশক পিঠে বয়ে পানি নিয়ে পৌঁছে দিতেন। অতঃপর যাদের সওদাপত্র এনে দেয়ার লোকের অভাব তিনি তাঁদের জন্য বাজার নিয়ে আসত।  এক দ্বিপ্রহরে অত্যন্ত প্রখর রৌদ্রে খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) ছুটাছুটি করছিলেন। মদিনায় একজন অতিশয় গণ্যমান্য ব্যক্তি সে সময়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে এলেন। 

তিনি খলিফা কে ব্যস্থ হয়ে রৌদ্রের মধ্যে  ঘোরা ঘুরি করতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আমিরুল মুমিনীন, আপনি দুপুর বেলা এ দারুণ রোদে এমনভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কেন? তা অনুমান করতে পারছি না। হযরত ওমর (রাঃ) জবাব দিলেন, বায়তুলমালের একটি উট হারিয়ে গেছে। চারিদিক খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে পড়লাম অথচ উটটির সন্ধান পাচ্ছি না। গণ্যমান্য ব্যক্তিটি জবাব দিলেন, এ সামান্য কাজে আপনার সময় ব্যয় করা হয়তো ঠিক নয়। এজন্য একজন লোক নিয়োগ করা প্রয়োজন। 

খলিফা একটু হেসে জবাব দিলেন, নিজে যা পারা যায় তা অপরের জন্য ফেলে রাখতে নেই। বায়তুলমাল আমার নিজের সম্পত্তি নয়, সুতরাং এটা তুচ্ছ বা অবহেলার বস্তু নয়। গণ্যমান্য ব্যক্তি পুনারায় কথা বলতে সাহস পেলন না। তিনি জানতেন খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) সারা মুসলিম জাহানের বাদশা। তাঁর ইঙ্গিতে হাজার জাহার সিপাহী অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। একদা খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তার তাঁকে সামান্য দু’চার ফোঁটা মধু মিশিয়ে ওষুধ খেতে বললেন, বায়তুল মালের হযরত ওমর (রাঃ) ভাণ্ডারে  যথেষ্ট পরিমাণে মধু মজুদ আছে। 

তিনি ইচ্ছা করলে যত ইচ্ছা মধু ব্যাবহার করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না। নামায পড়ার সময়ে মসজিদে সব লোক জমায়েত হলে তিনি মধুর প্রয়োজনের কথা তাঁদের কাছ বললেন। তাঁরা এক বাক্যে অনুমতি প্রদান করার পরে তিনি তাঁর প্রয়োজন মত সামান্য পরিনাণ মধু গ্রহন করলেন। সিরিয়া এবং আরবে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল।  খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) দিবারাত্রি পরিশ্রম করে দুর্ভিক্ষ এলাকায় সেবাকার্য করতে লাগলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন, যতদিন দুর্ভিক্ষ শেষ না হবে ততদিন তিনি মাখন ও দুধ আহার করবেন না। 

পরবর্তী গল্প
হযরত ওমর (রাঃ) এর হিজরত ও আযান

পূর্ববর্তী গল্প
হযরত ওমর (রাঃ) এর শাসন ব্যাবস্থা

ক্যাটেগরী