হযরত ওমর (রাঃ) এর খুতবা

হযরত আনাস (রাঃ) বলিয়াছেন যে, তিনি হযরত ওমর (রাঃ) এর সেই সর্বশেষ খুতবা শুনিয়াছেন যাহা তিনি মিম্বরে বসিয়া দিয়াছিলেন। আর ইহা রাসূল (সাঃ)-এর ওফাতের পরদিনের ঘটনা। হযরত আবু বকর (রাঃ) চুপচাপ বসিয়াছিলেন, কোন কথা বলিতেছিলেন না। হযরত ওমর (রাঃ) বলিলেন, আমি আশা করিয়াছিলাম যে, রাসূল (সাঃ) ততদিন দুনিয়াতে জীবিত থাকিবেন যে, আমরা সকলে তাহার পূর্বে চলিয়া যাইব এবং তিনি আমাদের সকলের পরে যাইবেন।

এখন হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর ইন্তিকাল হইয়া গেলেও আল্লাহ তায়ালা তোমাদের মাঝে এক নূর (অর্থাৎ কোরআন) রাখিয়াছেন যাহা দ্বারা তোমরা হেদায়াত লাগ করিতে পার। আর ইহা দ্বারাই আল্লাহ তায়ালা হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) কে হেদায়াত দান করিয়াছেন। আর (দ্বিতীয় কথা হইল) হযরত আবু বকর (রাঃ) রাসূল (সাঃ)-এর বিশিষ্ট সাহাবী এবং (তিনি হিজরতের রাত্রিতে রাসূল (সাঃ) সহ) দুইজনের দ্বিতীয় জন ছিলেন। আর তিনি তোমাদের কাজের ব্যাপারে সমস্ত মুসলমানদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত ব্যক্তি। অতএব তোমরা উঠ এবং তাহার হাতে বাইয়াত হইয়া যাও।

ইতিপূর্বে সাকীফায়ে বনি সায়েদায় (অর্থাৎ বনু সায়েদার বৈঠাকখানায়) হযরত আবু বকর (রাঃ) এর হাতে এক জামাত বাইয়াত হইয়াছিলেন। তারপর মসজিদের মিম্বরের উপর সাধারণভাবে মুসলমানদের বাইয়াত গ্রহণের কাজ সম্পন্ন হইয়াছে। ইমাম যুহরী (রহঃ) বর্ণনা করেন যে, হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) বলিয়াছেন, আমি সেদিন হযরত ওমর (রাঃ) কে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর উদ্দেশ্যে বলিতে শুনিয়াছি যে, আপনি মিম্বরে উঠুন। হযরত ওমর (রাঃ) তাহাকে এই ব্যাপারে বারবার পীড়াপীড়ি করিতেছিলেন। অবশেষে তিনি স্বয়ং তাহাকে মিম্বরের উপর উঠাইয়া দিলেন এবং সাধারণ মুসলমান তাহার হাতে বাইয়াত হইলেন।

হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, সাকীফায়ে বনী সায়েদায় হযরত আবু বকর (রাঃ) এর হাতে বাইয়াত সংঘটিত হওয়ার পর (রাসূল (সাঃ) ইন্তেকালের) দ্বিতীয় দিন হযরত আবু বকর (রাঃ) মিম্বরে বসিলেন। হযরত ওমর (রাঃ) দাঁড়াইয়া হযরত আবু বকর (রাঃ)এর পূর্বে কথা বলিলেন। তিনি আল্লাহ তায়ালার যথোপযুক্ত হামদ ও সানা বর্ণনা করিয়া বলিলেন, হে লোকসকল! গতকাল আমি তোমাদের সম্মুখে একটি কথা বলিয়াছিলাম যাহা না আল্লাহ তায়ালার কিতাবে রহিয়াছে আর না আমি উহাতে পাইয়াছি আর না রাসূল (সাঃ) আমার নিকট হইতে এই বিষয়ে কোন অঙ্গীকার লইয়াছেন, বরং শুধু আমার ধারণা ছিল যে, রাসূল (সাঃ) আমাদের সকলের পরে দুনিয়া হইতে যাইবেন। এইজন্য আমি গতকাল বলিয়াছিলাম যে, রাসূল (সাঃ) ইন্তিকাল করেন নাই, তাহা আমার ভুল ছিল। আল্লাহ তায়ালা আপন সেই কিতাবকে তোমাদের মাঝে বিদ্যমান রাখিয়াছেন যাহা দ্বারা তিনি রাসূল (সাঃ) কে হেদায়াত দান করিয়াছিলেন। যদি তোমরা সেই কিতাবকে

মজবুত করিয়া ধরিয়া থাক তবে আল্লাহ তায়ালা তাহাকে যে সমস্ত বিষয়ে হেদায়াত দান করিয়াছেন তোমাদিগকেও সেই সমস্ত বিষয়ে হেদায়াত দান করিবেন। আর আল্লাহ তায়ালা তোমাদের (খিলাফাতের) বিষয়কে তোমাদের মধ্য হইতে সর্বশেষ ব্যক্তির হাত সন্নিবেশিত করিয়া দিয়াছেন। যিনি রাসূল (সাঃ)-এর সাহাবী ও সওর গুহার সঙ্গী। অতএব তোমরা সকলে উঠিয়ে তাহার নিকট বাইয়াত হইয়া যাও। সকীফায় বাইয়াত সংঘটিত হওয়ার পর আজ পুনরায় সাধারণভাবে মুসলমানগণ হযরত আবু বকর (রাঃ) এর হাতে বাইয়াত হইলেন।

তারপর হযরত আবু বকর (রাঃ) কথা বলিলেন। সর্বপ্রথম আল্লাহ তায়ালার যথোপযুক্ত হামদ সানা বর্ণনা করিয়া বলিলেন, আমাকে তোমাদের শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হইয়াছে। অথচ আমি তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নই। তিনি এই কথা বিনয়ের কারণে বলিয়াছেন, নতুবা উম্মতের সমস্ত ওলামায়ে কিরামের মতে হযরত আবু বকর (রাঃ) সমস্ত সাহাবাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি। যদি আমি সঠিকভাবে কাজ করি তবে তোমরা শোধরাইয়া দিবে। সত্য কথা আমানত, আর মিথ্যা খেয়ানত।

তোমাদের মধ্যে দুর্বল ব্যক্তি আমার নিকট সবল। সে যে কোন অসুবিধার কথা আমার নিকট লইয়া আসিবে আমি তাহা দুর্বল যতক্ষণ না আমি তাহার নিকট হইতে দুর্বলের হক উসুল করিয়া দিব, ইনশাল্লাহ। যে কোন জাতি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা ছাড়িয়া দিবে আল্লাহ তায়ালা তাহাদের উপর লাঞ্ছনা আরোপ করিয়া দিবেন। আর যে কোন জাতি অশ্লীল কাজের প্রসার ঘটাইবে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে তাহাদের ভাল মন্দ লোক সকলকে ব্যাপকভাবে সাজা দিবেন। তোমরা আমাকে মান্য কর যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তাহাঁর রাসূল (সাঃ) কে মান্য করি। যদি আমি আল্লাহ ও তাহাঁর রাসূলের নাফরমানী করি তবে তোমাদের উপর আমাকে মান্য করা জরুরী নয়। এখন নামাযের জন্য দাঁড়াইয়া যাও। আল্লাহ তায়ালা তোমাদের উপর রহমত বর্ষণ করুন। (বিদায়াহ)

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমি হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) কে কোরআন পড়াইতাম। একদিন হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) নিজ অবস্থানকালে ফিরিয়া আসিয়া আমাকে তাহার অপেক্ষারত পাইলেন। আর ইহা হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) এর শেষ হজ্জে মীনায় অবস্থানকালীন সময়ের ঘটনা। হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) আমাকে বলিলেন, এক ব্যক্তি হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ)এর নিকট আসিয়া বলিল, অমুক ব্যক্তি বলিতেছে যে, যদি হযরত ওমর (রাঃ) এর ইন্তিকাল হইয়া যায় তবে আমি অমুক (অর্থাৎ হযরত

তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রাঃ))এর হাতে খেলাফতের বাইয়াত হইয়া যাইব। আল্লাহর কসম, হযরত আবু বকর (রাঃ) এর হাতে বাইয়াত এইভাবে আকস্মিকভাবে হইয়াছিল এবং তাহা পূর্ণ হইয়াছিল। অতএব আমিও আকস্মৎ এইভাবে অমুকের হাতে বাইয়াত হইয়া যাইব তখন তাহার বাইয়াতও পূর্ণ হইয়া যাইবে এবং সকলে তাহার হাতে বাইয়াত হইয়া যাইবে।

এই কথা শুনিয়া হযরত ওমর (রাঃ) বলিলেন, ইনশাল্লাহ আমি আজ সন্ধ্যায় লোকদের মধ্যে দাঁড়াইয়া বয়ান করিব এবং তাহাদের এই ধরণের লোকদের ব্যাপারে সাবধান করিব যাহারা মুসলমানদের নিকট হইতে খেলাফতের বিষয়কে এইভাবে আকস্মাৎ ছিনাইয়া লইতে চাহিতেছে। (অর্থাৎ পরামর্শ ও চিন্তা ফিকির ব্যতিত এবং খেলাফতের কাজের জন্য যোগ্যতার বিচার ছাড়াই নিজের খলীফা বানাইতে চাহিতেছি।) হযরত আবদুর রহমান (রাঃ) বলেন, আমি হযরত ওমর (রাঃ) কে বলিলাম, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি এরূপ করিবেন না, কারণ হজ্জের মৌসুমে সাধারণতঃ আজেবাজে বিবেক বুদ্ধিহীন লোকজন জমা হইয়া থাকে। আপনি যখন বয়ানের জন্য দাঁড়াইবেন তখন মজলিসে এই ধরণের লোকজনই বেশী থাকিবে। (জ্ঞানী গুণী লোক মজলিসে কম স্থান পাইবে।)

এমতাবস্থায় আমার আশঙ্কা হয় যে, আপনি কোন কথা বলিবেন আর এই ধরণের লোক তাহা লইয়া ছড়াইয়া পড়িবে, না তাহারা আপনার কথা পরিপূর্ণভাবে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিবে, আর না সঠিকভাবে তাহা অন্যদের নিকট পৌঁছাইতে পারিবে। অতএব আপনি মদীনায় পৌঁছা পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করুন। কারণ মদীনা হিজতের স্থান ও সুন্নাতে নববীর ঘর। সেখানে যাইয়া আপনি লোকদের মধ্য হইতে ওলামা ও সর্দারদেরকে পৃথক করিয়া লইয়া যাহা বলিতে ইচ্ছা করেন বলিবেন। তাহারা আপনার কথা পরিপূর্ণভাবে বুঝিতেও পারিবে এবং সঠিকভাবে অন্যদের কাছেও পৌঁছাইতে পারিবে। হযরত ওমর (রাঃ) আমার রায় গ্রহণ করিয়া বলিলেন, আমি যদি সহী সালামতে মদীনায় পৌঁছিয়া যাই তবে ইনশাল্লাহ আমি আমার সর্বপ্রথম বয়ানে লোকদের এই বিষয়ে অবশ্য বলিব।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমরা যখন যিলহজ্জ মাসের শেষের দিকে জুম্মার দিন মদীনায় পৌঁছিলাম তখন আমি দ্বিপ্রহরের সময় কঠিন গরমের পরওয়া না করিয়া দ্রুত মসজিদে গেলাম। আমি সেখানে পৌঁছিয়া দেখিলাম, হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রাঃ) আমার পূর্বেই পৌঁছিয়া গিয়াছেন এবং মিম্বরের ডান দিকে বসিয়া রহিয়াছেন। আমি পাশাপাশি তাহার হাঁটুর সহিত লাগাইয়া বসিয়া গেলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই হযরত ওমর (রাঃ) আসিলেন। আমি তাহাকে দেখিয়া বলিলাম, আজ হযরত ওমর (রাঃ) এই মিম্বরের উপর এমন কথা বলিবেন যাহা আজকের

পূর্বে এই মিম্বরে আর কেহ বলে নাই। হযরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রাঃ) আমার এই কথা অস্বীকার করিয়া বলিলেন, আমার ধারণা হয় না যে, হযরত ওমর (রাঃ) আজ এমন কথা বলিবেন যাহা তাহার পূর্বে আর কেহ বলে নাই। কেননা দ্বীন তো রাসূল (সাঃ)-এর যুগে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছে অতএব নতুন কথা কিভাবে বলিবেন।

হযরত ওমর (রাঃ) মিম্বরে বসিলেন। মুয়াজ্জিন আজান শেষ করিলে হযরত ওমর (রাঃ) দাঁড়াইলেন এবং আল্লাহ তায়ালার যথাযথ হামদ ও সানা বর্ণনা করিয়া বলিলেন, আম্মাবাদ, হে লোকসকল! আমি একটি কথা বলিব যাহা বলার জন্য পূর্ব হইতেই আমার ভাগ্যে লেখা হইয়াছে। হইতে পারে এই কথা আমার মৃত্যুর পূর্বলক্ষণ হইবে। অতএব যে ব্যক্তি আমার কথা স্মরণ রাখিতে পারে এবং ভালভাবে বুঝিতে পারে সে যেন আমার এই কথা দুনিয়ার যেখান পর্যন্ত তাহার বাহন তাহাকে লইয়া যায় সেখানকার লোকদের নিকট বর্ণনা করে।

আর যে ব্যক্তি আমার কথা ভালভাবে বুঝিতে সক্ষম না হয় আমি তাহাকে এই অনুমতি দান করি না যে, সে আমার ব্যাপারে ভুল কথা বলে। সকলকে ভালভাবে মনোযোগী করার জন্য উপরোক্ত কথাগুলি বলিয়া তিনি বলিলেন, আল্লাহ তায়ালা হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) কে হক দিয়া প্রেরণ করিয়াছেন এবং তাহার উপর কিতাব নাযিল করিয়াছেন। তাহার উপর যাহা কিছু নাযিল হইয়াছিল উহাতে (ব্যভিচারীকে) রজম (অর্থাৎ পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা) এর আয়াতও ছিল। (সেই আয়াত এইরূপ ছিল)- الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما

আয়াতের শব্দ পরবর্তীতে রহিত হইয়া গেলেও উহার হুকুম বহাল রহিয়াছে।) আমরা সেই আয়াত পড়িয়াছি এবং মুখস্ত করিয়াছি এবং উহাকে ভালোভাবে বুঝিয়াছি। আর রাসূল (সাঃ) নিজেও রজম করিয়াছেন এবং আমরাও তাহার পর রজম করিয়াছি। কিন্তু আমার আশঙ্কা হয় যে, দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পর কেহ এরূপ বলিবে যে, আমরা তো রজমের আয়াত আল্লাহর কিতাবে পাইতেছি না। এইভাবে আল্লাহ তায়ালার ফরযকৃত হুকুম ছাড়িয়া দিয়া লোকেরা গোমরাহ হইয়া যাইবে। ব্যভিচারীকে পাথর নিক্ষেপে হত্যা করার হুকুম অবশ্যই আল্লাহর কিতাবে ছিল। বিবাহিত পুরুষ বা মহিলা যদি যেনা করে এবং উহার সাক্ষী পাওয়া যায় অথবা যেনা দ্বারা গর্ভ ধারণ হইয়া থাকে বা উহার স্বীকারোক্তি পাওয়া যায় তবে রুজম অর্থাৎ পাথর নিক্ষেপে হত্যা করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জরুরী। শুনিয়া রাখ, আমরা (কোরআনে) এই আয়াতও পাঠ করিতাম-

অর্থঃ নিজের বাপদাদা ব্যতীত অন্য কাহারো সহিত নিজের বংশসূত্র স্থাপন করিবে না, কারণ বাপদাদার বংশ পরিত্যাগ করা কুফুরী (অর্থাৎ নেয়ামতের নাশুকরী। (এই আয়াতের শব্দ যদিও রহিত হইয়া গিয়াছে কিন্তু হুকুম বহাল রহিয়াছে। আর শুনিয়া রাখ, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলিয়াছেন, আমার প্রশংসায় এরুপ বাড়াবাড়ি করিও না যেরুপ হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিমাস সালামের প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করা হইয়াছে। আমি তো শুধু একজন বান্দা। অতএব তোমরা (এরূপ) বল যে, তিনি আল্লাহর বান্দা ও তাঁহার রাসূল। আর আমার নিকট এই সংবাদ পৌঁছিয়াছে যে, তোমাদের মধ্য হইতে কেহ এইকথা বলিতেছে যে, ওমর মারা গেলে আমি অমুকের হাতে বাইআত হইয়া যাইব। সে যেন এই ধোকা না খায় যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) এর বাইআত আকস্মিকভাবে হইয়াছিল এবং তাহা পূর্ণ হইয়াছিল।

শুনিয়া রাখ, সে বাইআত প্রকৃতই এইভাবে (অকস্মাৎ) ঘটিয়াছিল, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা উহার অকল্যাণ ও খারাবী হইতে (সমগ্র উম্মতকে) বাঁচাইয়া দিয়াছেন। আজ তোমাদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর ন্যায় কেহ নাই যাহার সম্মান সকলের নিকট স্বীকৃত এবং দূর ও নিকটের সকলেই তাহাকে মান্য করিবে। আর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ইন্তেকালের সময় আমাদের ঘটনা এই যে, হযরত আলী, হযরত যুবাইর এবং তাহাদের সহিত আরো কতিপয় লোক রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কন্যা হযরত ফাতেমা (রাঃ) এর ঘরে রহিয়া গিয়াছিলেন। অপরদিকে আনসারগণ সাকীফায়ে বনি সায়েদায় সমবেত হইলেন আর মুহাজিরগণ হযরত আবু বকর (রাঃ) এর নিকট জমায়েত হইলেন।

আমি তাহাকে বলিলাম, হে আবু বকর! চলুন আমরা আমাদের আনসারী ভাইদের নিকট যাই। সুতরাং আমরা আনসারদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলাম। পথে দুইজন নেক ব্যক্তি হযরত উয়াইম আনসারী (রাঃ) ও হযরত মা’ন (রাঃ) এর সহিত সাক্ষাত হইল। তাহারা আনসারগণ যাহা করিতেছিলেন সে ব্যাপারে সংবাদ দিলেন এবং আমাদেরকে আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করিলেন। হে মুহাজিরীনদের জামাত,আপনারা কোথায় যাইতেছেন? আমি বলিলাম, আমরা আমাদের আনসারী ভাইদের নিকট যাইতেছি। তাহারা উভয়ে বলিলেন, আনসারদের নিকট আপনাদের যাওয়ার প্রয়োজন নাই, হে মুহাজিরগণ, আপনারা নিজেরাই নিজেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত করিয়া লউন। আমি বলিলাম, আল্লাহর কসম, না আমরা তো অবশ্যই তাহাদের নিকট যাইব।

সুতরাং আমরা গেলাম এবং তাহাদের নিকট পৌঁছিলাম। তাহারা সকলে সাকীফায়ে বনি সায়েদায় সমবেত ছিল এবং তাহাদের মাঝে এক ব্যক্তি চাদর জড়াইয়া বসিয়াছিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, এই ব্যক্তি কে? তাহারা বলিল, ইনি হযরত সা’দ ইবনে ওবাদাহ (রাঃ)। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, তাহার কি হইয়াছে? তাহারা বলিল, ইনি অসুস্থ। অতঃপর আমরা যখন বসিয়া গেলাম তখন তাহাদের মধ্য হইতে এক ব্যক্তির কথা বলার জন্য দাঁড়াইল এবং আল্লাহ তায়ালার হামদ ও সানা বর্ণনা করিয়া বলিল, আম্মাবাদ, আমরা আল্লাহর (দ্বীনের) আনসার অর্থাৎ সাহায্যকারী এবং ইসলামের সৈন্যদল, আর হে মুহাজিরগণ, আপনারা আমাদের নবীর জামাত, আপনাদের মধ্য হইতে কিছু লোক এমন কথা বলিতেছেন যাহা দ্বারা বুঝা যায় যে, আপনারা আমাদিগকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিতে চান এবং খেলাফতের বিষয় হইতে দূরে সরাইয়ে রাখিবার ইচ্ছা পোষণ করেন।

এই ব্যক্তি (কথা শেষ করিয়া) চুপ করিলে আমি কথা বলিতে চাহিলাম। আমি কিছু বক্তব্য সাজাইয়া লইয়াছিলাম যাহা আমার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয় ছিল এবং হযরত আবু বকর (রাঃ) এর উপস্থিতিতে আমি তাহা ব্যক্ত করিতে চাহিতেছিলাম। এইজন্য আমি তাহাকে শান্ত রাখিতে চেষ্টা করিতেছিলাম (যাহাতে তাহার রাগারাগির কারণে আমার কথা বলার সুযোগ নষ্ট না হইয়া যায়। অথচ তিনি আমার অপেক্ষা অধিক ধৈর্যশীল ও ধীর-গম্ভীর ছিলেন। কিন্তু হযরত আবু বকর (রাঃ) বলিলেন, হে ওমর, শান্ত হইয়া বস। আমি তাহাকে অসন্তুষ্ট করিতে চাহিলাম না। (অতএব বসিয়া গেলাম এবং তিনি কথা বলিলেন।) তিনি আমার অপেক্ষা অধিক জ্ঞানী ও ধীর-গম্ভীর ছিলেন। আল্লাহর কসম, আমি মনে মনে যে সকল পছন্দনীয় কথা বলার জন্য সাজাইয়া লইয়াছিলাম হযরত আবু বকর (রাঃ) সাজানো ছাড়াই উপস্থিত বক্তব্যে সেই সকল কথা হুবহু বলিয়া দিলেন, বরং তাহা অপেক্ষা উত্তম বলিলেন। তারপর ক্ষান্ত হইলেন।

তিনি তাহার বক্তব্যে বলিলেন, আম্মাবাদ, তোমরা নিজেদের ব্যাপারে যে সকল গুনের কথা উল্লেখ করিয়াছ, প্রকৃতই তোমরা উহার অধিকারী। কিন্তু সমগ্র আরব এই খেলাফতের বিষয়ে একমাত্র কোরাইশকেই উপযুক্ত মনে করে এবং কোরাইশগণ সমগ্র আরবের মধ্যে বংশ ও শহর হিসাবে সর্বাপেক্ষা উত্তম। আমার নিকট এই দুইজনের যে কোন একজন তোমাদের খলিফা হওয়ার জন্য পছন্দ হয়। অতএব তোমরা দুইজনের যে কোন একজনের হাতে বাইআত হইয়া যাও।

এই বলিয়া তিনি আমার ও হযরত আবু ওবায়দা ইবনে জাররাহ (রাঃ) এর হাত ধরিলেন। হযরত আবু বকর (রাঃ) এর উপস্থিতিতে আমি লোকদের আমীর হইয়া যাই ইহা অপেক্ষা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয় এই যে, আমাকে সামনে ডাকিয়া বিনা অপরাধে আমার গর্দান উড়াইয়া দেওয়া হয়। বর্তমানে তো আমার মনের অবস্থা ইহাই তবে যদি মৃত্যুর সময় আমার মনের অবস্থা পরিবর্তন হইয়া যায় তাহা ভিন্ন কথা।

আনসারদের মধ্য হইতে এক ব্যক্তি বলিল, আমি খুজলিযুক্ত উটের জন্য চুলকাইবার খুঁটি ও ফলযুক্ত গাছের জন্য ভারবাহী খুঁটি হইতে পারি অর্থাৎ আমি এই বিষয়ে উত্তম সামাধান দিতে পারি। আর তাহা এই যে, হে কুরাইশ, আমাদের মধ্য হইতে একজন আমীর হইবে এবং তোমাদের মধ্য হইতে একজন আমীর হইবে। এই কথার পর সকলেই কথা বলিতে আরম্ভ করিল এবং শোরগোল হইতে লাগিল। পরষ্পর মতবিরোধ সৃষ্টি হওয়ার আশংকা দেখা দিল। তখন আমি বলিলাম, হে আবু বকর, আপনার হাত প্রসারিত করুন। তিনি হাত প্রসারিত করিলে আমি সর্বপ্রথম তাহার হাতে বাইআত হইয়া গেলাম।

তারপর মুহাজিরগণ বাইআত হইলেন। অতঃপর আনসারগণ বাইআত হইয়া গেলেন। এইভাবে আমরা হযরত সা’দ ইবনে ওবাদাহ (রাঃ) এর উপর জয়ী হইলাম। (অর্থাৎ তিনি আর আমীর হইতে পারিলেন না) এমতাবস্থায় তাহাদের একজন বলিল, তোমরা তো সা’দকে মারিয়া ফেলিলে। আমি বলিলাম, আল্লাহ তায়ালা তাহাকে মারিয়া ফেলুক। (অর্থাৎ তিনি যেমন এই পরিস্থিতিতে হকের পক্ষে সাহায্য করিলেন না তেমনি আল্লাহ তায়ালা যেন আমীর হওয়ার ব্যাপারে তাহাকে সাহায্য না করেন।)

হযরত ওমর (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম, এই পরিস্থিতিতে আমরা যত বিষয়ে অংশগ্রহণ করিয়াছি উহাতে হযরত আবু বকর (রাঃ) এর হাতে বাইআতের ন্যায় কার্যকর ও উপযুক্ত ব্যবস্থা আমরা আর কিছু পাই নাই।

আর (হযরত আবু বকর (রাঃ) এর হাতে আকস্মিকভাবে আমার বাইআত শুরু করাইয়া দেওয়ার কারণ এই ছিল যে,) আমাদের আশংকা হইতেছিল যে, যদি আমরা বাইআতের কাজ শেষ না করিয়া হইতেছিল যে, যদি আমরা বাইআতের কাজ শেষ না করিয়া আনসারদেরকে এইখানে রাখিয়া যাই তবে আমাদের যাওয়ার পর তাহারা অন্য কাহারো হাতে বাইআত হইয়া যাইবে। অতঃপর পছন্দ না হইলেও (তাহাদের সহিত একতা রক্ষার খাতিরে) আমাদেরকেও বাইআত হইতে হবে। অথবা আমাদিগকে তাহাদের বিরোধিতা করিতে হইবে। আর তখন ফাসাদ ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হইবে। অতএব (মূল কথা হইল,) যে ব্যক্তি মুসলমানদের সহিত পরামর্শ ব্যতীত কোন আমীরের হাতে বাইআত হইবে তাহার এই বাইআত শরীয়তমতে গ্রহণযোগ্য হইবে না।

আর না সেই আমীরের বাইআতের কোন মূল্য হইবে। বরং (হক কথা না মানার কারণে) আশংকা হয় যে, (শরীয়তের হুকুম অনুযায়ী) তাহাদের উভয়কে কতল করিয়া দেওয়া হইবে।

যুহরী (রহঃ) হযরত ওরওয়া (রাঃ) হইতে বর্ণনা করেন যে, সেই দুই ব্যক্তি যাহাদের সহিত হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) এর সাক্ষাৎ হইয়াছিল তাহারা হইলেন হযরত উয়াইম ইবনে সায়েদাহ (রাঃ) ও হযরত মা’ন ইবনে আদী (রাঃ)। হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে যে, যিনি এই কথা বলিয়াছিলেন যে, এই বিষয়ে আমার নিকট উত্তম সমাধান রহিয়াছে, তিনি হযরত হুবাব ইবনে মুনযির (রাঃ) ছিলেন, (বিদায়াহ)

আরো পড়তে পারেন

দুঃখিত, কপি করবেন না।