হযরত আবুল আব্বাস কাসসাব (রঃ) | আমার কথা
×

 

 

হযরত আবুল আব্বাস কাসসাব (রঃ)

coSam ৮৭


আধ্যাত্মিক জগতের কার্য-নির্বাহক নামে যিনি পরিচিত ছিলেন, তিনি হলেন হযরত আবুল আব্বাস কাসসাব (রঃ)। তাঁর ধর্মনিষ্ঠা আর পবিত্রতার কারণে তিনি প্রবৃত্তির ত্রুটি-বিচ্যুতি নিখুঁতভাবে নির্ণয় করতে পারতেন। হযরত শায়খ আবু সাঈদ (রঃ) ও হযরত আবুল খায়ের (রঃ)-এর বিখ্যাত তাপস ছিলেন তাঁর প্রিয় শিষ্য। সুযোগ শিষ্য হযরত সাঈদ (রঃ)-কে তিনি একবার বলেন, যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, তুমি আল্লাহকে চিনেছ? তো উত্তরে হ্যাঁ বলো না। কারণ সেটি শিরক তুল্য। আবার চিনিনা তাও বলো না। কেননা, সেটি কুফরী তুল্য। বরং বলবে, আল্লাহ তাঁর রহমত গুণে নিজ অস্তিত্ব ও গুণের পরিচয় আমাকে দান করেছেন। তিনি আরও বলেন, ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক আল্লাহর স্বভাব তোমাদের গ্রহণ করতে হবে। না হলে সব সময় দুঃখকষ্ট পেতে হবে।

তিনি যেসব তত্ত্ব কথা বলতেন সেগুলি নিম্নরূপঃ

১. আল্লাহ যদি তোমার মঙ্গল কামনা করেন তাহলে নফস সম্পর্কিত জ্ঞান দান করবেন। তারপর তোমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একটি একটি করে নিজের কাছে নিয়ে তোমাকে অস্তিত্বহীন করবেন। আর সেই অস্তিত্বহীনতার মধ্যে তাঁর নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ করবেন। তখন সব সৃষ্ট বস্তুকে তুমি তোমার মতই দেখতে থাকবে। যাবতীয় সৃষ্ট বস্তু তখন দেখাবে একটি বলের মতো, মনে হবে সেটি ঘোরাচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ।

২. সবাই আল্লাহ থেকে মুক্তি কামনা করে, কিন্তু আমি তাঁর দাসত্বের প্রত্যাশী। কেননা দাসের শান্তি ও নিরাপত্তা ধ্যানেই নিহিত। বস্তুতঃ দাসের মুক্তির মধ্যে থাকে তার ধ্বংস।

৩. তোমাদের ও আমার মধ্যে পার্থক্য কেবল এটুকু যে, আমি আমার বিষয় পেশ করি আল্লাহর সামনে। আর তোমরা পেশ কর আমার সামনে। আমি তাকে দেখি ও তাঁর থেকে শুনি। আর তোমরা দেখ ও শোন আমার থেকে। অথচ মানুষ হিসেবে তোমাদের ও আমার মধ্যে কোন প্রভেদ নেই।

৪. সংসারী লোককে ভালোবাসার চেয়ে এক গ্লাস কম খাওয়াও বেশী পুণ্যের। আর সংসারীরা যে জিনিসকে বেশী মূল্যবান মনে করে, পরিণামে তার দাম কানাকড়িও নয়।

৫. সুফী মাত্রই কোন বস্তু বা মর্যাদা লাভের প্রত্যাশী, কিন্তু আমি নই। আমি শুধু একটি বিষয়ের প্রত্যাশী। আল্লাহ যেন আমার আমিত্ব দূর করেন।

৬. আমি যখন খাদ্য গ্রহণ করি, তখন আমার মধ্যে পাপ স্পৃহা দেখা দেয়, আর যখন অনাহারে থাকি তখন এবাদতে প্রেরণা সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ আহারের মাধ্যমে আল্লাহর এবাদতে প্রতি আলস্য, অবহেলা ও পাপসক্তি জন্মে। আর অনাহারে রিপুর কামনা অবদমিত হয়। ফলে স্বঃস্ফুর্তভাবে মন

এবাদতের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, আহার বর্জন করা এবাদত তুল্য। এটা এবাদতের দিকে মনকে আকৃষ্ট করে।

৭. হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) মৃত নন, বরং তোমাদের চোখই মৃত।

৮. পুণ্যবান লোক শান্তির পাত্র, ভয়ের নয়। কেননা, তারা আল্লাহর সঙ্গলাভ করেন আর তাঁর সহযোগেই মানুষকে দেখে থাকেন।

৯. দুনিয়া অপবিত্র। এজন্য যার মন দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট, সে দুনিয়ার চেয়েও অপবিত্র।

১০. আল্লাহ স্থিতি, লয়, আঁধার ও আলো সবকিছু থেকে পবিত্র এবং সব কিছুর ঊর্ধ্বে।

১১. আল্লাহ কিছু লোক সৃষ্টি করেছেন যারা ইহকালের সুখ-শান্তি দুনিয়াদার মানুষকে দেন আর পরলোক ওয়ালাদের জন্য রেখে দেন পারলৌকিক সুখ-শান্তি অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া তারা কোন কিছুর জন্য লালায়িত নন।

১২. এমন লোকের সঙ্গ চাই, যাদের সঙ্গ-প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সবকিছু আলোকিত করে দেয়।

১৩. আল্লাহর নৈকট্য যারা অর্জন করেছেন, তারা সৃষ্টি থেকে দূরে থাকেন এবং তাদের অবস্থার কথা সৃষ্টিজগত কিছুই জানে না।

১৪. আল্লাহকে যিনি পুরোপুরি চিনেছেন, তাঁর মধ্যে এমন শক্তি থাকে না যিনি নিজেকে আল্লাহর আরেফ বলতে পারেন।

১৫. আল্লাহ ছাড়া যে অন্য বস্তুরও প্রত্যাশা করে, সে মূলত দুই আল্লাহর এবাদতকারী মুশরিক।

১৬. আমি চাই না যে, তোমরা আমার আদব রক্ষা কর। কেননা যেই জননী স্বল্প-বুদ্ধিমতী যে তাঁর শিশু সন্তানের কাছ থেকে আদব আশা করে।

১৭. হাশরের মাঠে আল্লাহ যদি আমার হাতে সমগ্র হিসাব-নিকাশের ভার তুলে দিতেন, তাহলে সকলের হিসাব মুলতবী রেখে কেবল ইবলিসেরই হিসাব নিতাম। কিন্তু আমি জানি, তা সম্ভব নয়।

১৮. দুনিয়াদার মানুষ আমার মর্যাদা বুঝতে পারে না। কেননা, সবাই নিজ নিজ অবস্থা অনুযায়ী আমার বিচার করে। অর্থাৎ তারা যে যেমন আমাকেও তদ্রূপ ভাবে।

১৯. আমার অস্তিত্ব হযরত আদম (আঃ)-এর জন্য গৌরবের কারণ। এবং রাসূল (সাঃ)-এর জন্য চোখ স্নিগ্ধ হওয়ার উসিলা। অর্থাৎ রোজ কিয়ামতের দিনে হযরত আদম (আঃ) গৌরব বোধ করবেন যে, আমি তাঁরই এক সন্তান এবং রাসূল (সাঃ)-এর চোখ এ জন্য স্নিগ্ধ হবে যে, আমি তাঁরই এক উম্মত।

২০. রোজ কিয়ামতে যখন জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তখন সাধকগণ কোন খানে থাকবেন? এ প্রশ্নের উত্তরে হযরত আবুল আব্বাস (রঃ) বলেন, সাধকগণের স্থান না দুনিয়াতে, না আখেরাতে।

২১. এক ব্যক্তি স্বপ্নে কিয়ামত দেখে হযরত আবুল আব্বাস (রঃ)-কে অনেক খুঁজলেন, কিন্তু দেখতে পেলেন না। পরদিন তাঁকে স্বপ্নের কথা বলা হলে তিনি বললেন, আমার যখন অস্তিত্বই নেই, তখন তুমি আমাকে দেখবে কিভাবে? মানুষ আমাকে রোজ কিয়ামতে দেখুক, আমি যে তা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

২২. একদিন তিনি নির্জন সাধনায় মগ্ন। এমন সময় আযান শোনা গেল। আযান শুনে তিনি বললেন, আমার পক্ষে এটি খুবই কষ্টকর যে, আমি তাঁর সামনে থেকে উঠে তাঁর দরবারে যাই। শেষ পর্যন্ত তিনি অবশ্য নামাজের জন্য বাইরে এলেন এবং যথাস্থানে গিয়ে নামাজ পড়লেন।

পরবর্তী গল্প
হযরত আবু ইয়াকুব ইবনে ইসহাক নহর জওয়ান (রঃ) – পর্ব ১

পূর্ববর্তী গল্প
হযরত হুসাইন মানসুর হাল্লাজ (রঃ) – শেষ পর্ব

ক্যাটেগরী