হযরত আইয়ুব (আঃ) এর কঠিন পরীক্ষা– পর্ব ৭

হযরত আইয়ুব (আঃ) এর কঠিন পরিক্ষা – পর্ব ৬ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

 অনেকক্ষণ বিলাপ করার পরে বিবি রহিমা উঠে দাঁড়ালেন এবং এদিন সেদিক ছুটাছুটি করে কারো নিকট জিজ্ঞাসা করে কোন খোঁজ পাওয়া যায় কিনা সে চেষ্টা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণ ছুটাছুটি করার পরে পুলের উপর বসা ভালো পোশাক-পরিচ্ছদ পরা এক ব্যক্তিকে দেখে তাঁর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, জনাব! এখানে গাছের নিচে এক রোগী ছিল, আপনি কি তাঁর খবর জানেন? হযরত আইয়ুব (আঃ) এতক্ষন দূরে বসে রহিমার অবস্থা লক্ষ্য করছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর পরিচয় না দিয়ে বললেন, রোগী তোমার কি হয়? বিবি রহিমা বললেন, তিনি আমার স্বামী। তিনি একজন আল্লাহর নবী। তাঁর নাম হযরত আইয়ুব (আঃ) তিনি দীর্ঘদিন যাবত রোগাগ্রস্থ অবস্থায় এখানে আছেন। একমাত্র আমিই তাঁর দেখাশুনা করে থাকি আমি কাজ করার জন্য বাইরে গিয়েছিলাম। এ ফাকে তাকে কি বাঘে খেয়েছে, না কেউ তাকে মেরে দূরে নিক্ষেপ করেছে।

 আমি কিছুই জানতে পারিনি। আপনি দয়া করে একটু খুঁজে দিবেন? হযরত আইয়ুব (আঃ) জিজ্ঞেস করলেন তাকে দেখতে কেমন দেখায়। রহিমা বললেন, কিছুটা আপনার চেহারার সাথে মিল আছে। বিবি রহিমার অস্থিরতা দেখে হযরত আইয়ুব (আঃ) আর ধৈর্য ধারণ করতে পারলেন না। তখন বললেন আমিই তোমার সেই আইয়ুব।

এ কথা শুনে বিবি রহিমা তাঁর দিকে আর একবার ভালো করে তাকিয়ে দৌড় দিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ্‌ আল্লাহ আপনাকে এভাবে সুস্থ করেছেন। তা আমি কখনই কল্পনা করতে পানি নি। হযরত আইয়ুব (আঃ) তখন নহরের ঘটনাসহ জিব্রাইলের আসমানের খবরাদী তাঁর নিকট বললেন। তাঁরপর তাকে পানির নহর দেখালেন। হযরত আইয়ুব (আঃ) বিবি রহিমাকে উক্ত নহরে গোসল করার জন্য অনুরোধ করলেন। বিবি রহিমা তাঁর স্বামীর কথা অনুসারে যখন নহরে গোসল করলেন তখন তাঁর চেহারা চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল এবং আঠার বছরের যুবতীর ন্যায় রূপ লাবণ্য তিনি ফিরে পেলেন।

তখন উভয় নিজ বাড়িতে ফিরে যাবার জন্য পথ অতিক্রম করতে আরম্ভ করলেন। কিছুক্ষণ পথ চলার পরে তারা বাড়িতে এসে দেখলেন তাদের দালান-কোঠা সব কিছু পূর্বের ন্যায় অক্ষত অবস্থায় আছে। তারপর তারা ভিতরে প্রবেশ করে দেখলেন তাদের ছেলে-মেয়ে সকলে বসে খেলছে। পিতা মাতাকে দেখে তারা সকলে এসে তাদের জড়িয়ে ধরল এবং কয়েকদিন যাবত তারা কোথায় ছিল তাঁর কৈফিয়ৎ চাইল। হযরত আইয়ুব (আঃ) বললেন, আমরা আল্লাহ্‌র তা’য়ালার দাওয়াতে গিয়েছিলাম। ছেলেমেয়েরা হাউ মাউ করে উঠল তাঁদেরকে কেন এখানে ফেলে রেখে গেলেন। উত্তরে হযরত আইয়ুব (আঃ) বললেন তা তোমাদেরকে পরে বলব।

ওদিকে মাঠ থেকে পুরানো খাদেম এসে বললে, হে আল্লাহ্‌র নবী! আপনার পশু পক্ষী ও বাগ বাগিচা যা ধ্বংস হয়েছিল আজকে তা আমরা পূর্বের অবস্থায় ফিরে এল সব কিছু ফিরে পেয়েছি। কিভাবে এগুলো সজিব হয়ে পূর্বের অবস্থায় ফিরে এল তা আমরা কিছুই বলতে পারি না। কিছুক্ষণ পরে আর একজন খাদেম এসে বলল, হুজুর! আপনার ধন-দৌলত ও আসবাবপত্র যা মানুষ লুট করে নিয়েছিল তা সম্পুর্ণ আমরা ফিরে পেয়েছি।

 সমস্ত মালপত্র আমাদের এ প্রাসাদের কয়েকটি কক্ষে রক্ষিত আছে। হযরত আইয়ুব (আঃ)-এর নিকট আরো কয়েকজন পুরাতন খাদেম এসে তাঁর বন্ধু-বান্ধব ও উম্মতের আগমনের ও খোজ-খবর নেবার চেষ্টার কথা নবীকে জানালেন। নবী কথা শুনে আর কাল বিলম্ব না করে এবাদতে মশগুল হলেন। হযরত আইয়ুব (আঃ) পূর্বের চেয়ে আরো অধিক সম্পদশালী হলেন। পূর্বের চেয়ে অধিক সুখ শান্তিতে বসবাস করতে আরম্ভ করলেন। এবং তাঁর আরো কয়েকটি সন্তান-সন্ততি জন্ম গ্রহণ করে দৃষ্টান্তহীন আনন্দ উজ্জ্বল জীবন-যাত্রার মান লাভ করলেন।

একদিন হযরত জিব্রাইল (আঃ) এসে বললেন, নবী! আপনি রোগাগ্রস্ত অবস্থায় রহিমার চুল কাটার ঘটনা শুনে ক্রোধান্বিত হয়ে কছম করেছিলেন যে তাঁকে একশত বেত্রাঘাত করবেন। সে ক্ষেত্রে আপনি যে ঘটনার জন্য কছম করেছিলেন তা মিথ্যা বলে প্রমানিত হয়েছে বটে কিন্তু আপনার কছমের শর্ত বাতিল হয় নি। অতএব আপনি একশত গমের শীর্ষ একত্রিত করে বিবি রহিমার শরীরে মৃদু আঘাত করুন। তাতে আপনার কছমের শর্ত পূরণ হয়ে যাবে। হযরত আইয়ুব (আঃ) জিব্রাইলের পরামর্শ অনুসারে একশত শুকনা গমের শীষ একত্রিত করে বিবি রহিমার শরীরে মৃদু আঘাত করে কছমের শর্ত পূরণ করলেন।

হযরত আইয়ুব (আঃ)-এর প্রতি এহেন পরীক্ষা দ্বারা পৃথিবীর মানব সন্তানকে এ শিক্ষার প্রদান করা হয়েছে যে বিপদ দ্বারা আল্লাহ্‌ মানুষকে পরীক্ষা করে খাঁটি ঈমানদার করে গড়ে নেন। মহাবিপদেও কোন দিন ধৈর্যহারা হতে নেই। পরিণাম অবশ্যই মঙ্গলজনক হয়ে থাকে। আল্লাহ্‌র রাজিতে রাজি থেকে এবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থাকাই মুমিনের চিহ্ন। যে যত বড় লোক পরীক্ষাও তাঁর উপর তত কঠিন হয়ে থাকে। আরো অনেক উপদেশ ও নিদর্শন হযরত আইয়ুব (আঃ)-এর ঘটনার মাঝে নিহিত রয়েছে। মুমিনদের জন্য ঘটনা এক বিরাট অনুশীলন।

হযরত আইয়ুব (আঃ) একশত আটষট্টি বছর জীবিত থেকে দুনিয়ার মানুষকে চরম ধৈর্যের শিক্ষা প্রদান করে ইহলোক ত্যাগ করেন।

সূত্রঃ কুরআনের শ্রেষ্ঠ কাহিনী

হযরত আইয়ুব (আঃ) এর নবুয়তী ও সম্পদ সম্পর্কে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

আরো পড়তে পারেন

দুঃখিত, কপি করবেন না।