হযরত আইয়ুব (আঃ) এর কঠিন পরীক্ষা– পর্ব ৬

হযরত আইয়ুব (আঃ) এর কঠিন পরিক্ষা – পর্ব ৫ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

গভীর রজনীতে নবী বিবি রহিমাকে ডেকে উঠালেন এবং বললেন, আমার বিছানার কাছে কোথায় শরাব ও শূকুরের মাংস আছে দেখ এবং অতি সত্বর তা দূরে নিক্ষেপ করে ফেল। ঐ বস্তু এখানে থাকার কারণে আমি আল্লাহ্‌র তাজাল্লি দর্শনে ব্যর্থ হচ্ছি। বিবি রহিমা তখন নিদ্রা থেকে উঠে চতুর্দিকে ভাল করে খোঁজাখুঁজি করলেন। কিন্তু কোথাও তিনি শরাব ও শূকুরের মাংস পেলেন না। নবী তখন তাঁকে বললেন, তোমার আনা সে ওষুধগুলো কোথায়? বিবি রহিমা বললেন, সেগুলো এখানেই আছে। নবী বললেন সেগুলোকে এখান থেকে সরিয়ে ফেল। বিবি রহিমা, তখন ক্ষুন্ন মনে ওষুধগুলোকে নিয়ে অনেক দূরে রেখে এলেন।

 তারপরে শেষ রজনীতে হযরত আইয়ুব (আঃ) চিৎকার দিয়ে বললেন, হ্যাঁ, এবার আমি তাজাল্লির দর্শন লাভ করেছি। হে রহিমা, এখন ভেবে দেখ ঐ ওষুধগুলো ছিল শরাব ও শূকুরের মাংস। ঐগুলো আমার নিকটে থাকায় আমি আজ তিন রাত্র পর্যন্ত আল্লাহ্‌র তাজাল্লি দর্শনে ব্যর্থ হয়েছি। এগুলো যে তোমাকে দিয়েছে সে মানুষ নয়। সে হল আমার দুশমন অভিশপ্ত শয়তান। অতএব, এখন পাঠ কর। “আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতোয়ানির রাজিম।”

হযরত আইয়ুব (আঃ) একইভাবে দীর্ঘ আঠার বছর যাবত নির্মম রোগ যাতনা ভোগ করছিলেন। শেষ দিকে যখন পোকাগুলো তাঁর চোখও জিহ্বা আক্রমন করল, তখন তিনি খুব কেঁদে আল্লাহ্‌র দরবারে আরজ করে বললেন, হে খোদা! আমার চোখ দ্বারা স্ত্রীকে দর্শন করি এবং সূর্য দেখে নামাযের ওয়াক্ত নিরূপণ করি। আর জিহ্বা দ্বারা তোমার জেকের-আজকার করে থাকি। অতএব এ দুটি যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে তোমার এবাদাত সঠিকভাবে করা আমার জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে।

এ দোয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্‌ তা’য়ালা তাঁর নবীকে জানিয়ে দিলেন, আমি অচিরে আপনাকে রোগমুক্ত করব এবং আপনার স্ত্রীকে পুরস্কৃত করব। একদিন ভোরবেলা বিবি রহিমা কাজে বের হয়ে যাবার পরে হযরত জিব্রাইল (আঃ) এসে হযরত আইয়ুব (আঃ)-কে বললেন, আপনি পা দিয়ে মাটির উপর লাথি মারুন। সেখানে মাটির একটি নহর সৃষ্টি হবে। আপনি নহরের পানি দ্বারা গোসল করুন এবং পেট ভরে পানি পান করুন। আপনি অল্পক্ষণের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠবেন। হযরত আইয়ুব (আঃ) জিব্রাঈলের পারামর্শ অনুসারে মাটির উপর লাথি মারলেন।

তখনি সেখানে একটি পানির ফোয়ারার সৃষ্টি হল। প্রথমে পানি খুব বেগে অনেক উপর পর্যন্ত উঠল। পানি ছিটকে গিয়ে হযরত আইয়ুব (আঃ) – এর শরীরে পতিত হতে আরম্ভ করল। আল্লাহ তা’য়ালার এ রহমতের পানি হযরত আইয়ুব (আঃ) – এর শরীরের যেখানে লাগল সেখানের ক্ষত সঙ্গে সঙ্গে ভাল হয়ে নতুন চামড়ায় আবৃত হল। কিছু সময় এভাবে পানি উদগিরন হওয়ায় তাঁর শরীরের প্রায় সমস্ত ক্ষত শোয়াঅবস্থায় আরোগ্য হল। তাঁর শরীরের শক্তি ফিরে এল। তখন তিনি উঠে ফোয়ারার কাছে বসে ভালো করে গোসল করলেন।

এতে তাঁর শরীর পূর্বের চেয়ে অনেক উজ্জ্বল ও সুন্দর হল। ক্ষতের কোন দাগ বা চিহ্ন তাঁর শরীরে দেখা গেল না। মুখমণ্ডল চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি গোসল সমাধা করে পেট ভরে পানি পান করলেন। পানিতে তাঁর ক্ষুধা, তৃষ্ণা সম্পূর্ণ দূরীভূত হয়ে গেল। এ সময় তিনি দেখলেন একটি লোক একটি থলে ভর্তি করে কিছু কাপর-চোপড় এনে নবীর হাতে দিয়ে বললেন, এগুলো আপনার জন্য। এ কথা বলে লোকটি চলে গেলেন। হযরত আইয়ুব (আঃ) কাপড়ের পোটলা খুলে জামা, পাজামা, টুপি, রুমাল ও চপ্পল দেখতে পেলেন। তখন তিনি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন এবং জামা-কাপড় পরিধান করে বর্ণনাতীত সৌন্দর্যের অধিকারী হলেন। তাঁর মনে অশেষ তৃপ্তি এল। তিনি দীর্ঘ আঠার বছর রোগে ভোগার পরে আজকে পরিপূর্ণ ভাবে আরোগ্য লাভ করেলেন এবং হাটা চলা করতে সক্ষম হলেন। তিনি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে করতে কিছু দূর গিয়ে একটি পুলের উপর বসলেন। সন্ধ্যা সমাগত প্রায়, এমন সময় বিবি রহিমা কষ্টোপার্জিত অর্থ দ্বারা কিছু খাবার কিনে দ্রুত স্বামীর নিকট আসলেন। তিনি সেখানে পৌঁছে স্বামীকে তাঁর বিছানায় দেখতে না পেয়ে হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন।

তিনি সেখানে বসে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করলেন এবং বিনয়ের স্বরে বলতে লাগলেন আমার প্রানের স্বামীকে কে নিয়ে গেল, না বাঘে খেল। হায় হায়! আমার স্বামী এভাবে গায়েব হয়ে যাবে।

জানলে আমি কখনো অন্যত্র যেতাম না। আমি কপাল পোড়া, আমি দুর্ভাগা, কেন আমি কাজ করতে গেলাম। হে খোদা! তুমি যদি আসমানে থাক তবে আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দাও। কি অপরাধে তাকে উধাও করলে আমাকে কৈফিয়ত দাও। হে রহমান, তুমি দয়ার সাগর। তুমি তোমার নবীকে এত কঠিন পরীক্ষা করেও তোমার তৃপ্তি হল না। শেষ পর্যন্ত আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিলে। তোমার নিকট আমার অন্তর নিংড়ানো আরজ তুমি আমার স্বামীকে ফেরত দাও।

সূত্রঃ কুরআনের শ্রেষ্ঠ কাহিনী

হযরত আইয়ুব (আঃ) এর কঠিন পরিক্ষা – পর্ব ৭ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

আরো পড়তে পারেন

দুঃখিত, কপি করবেন না।