লোকমান হাকিম – পর্ব ৪

লোকমান হাকিম – শেষ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

এরপর পুত্র রওনা হওয়ার প্রাক্কালে হযরত লোকমান হাকীম নসীহত করলেনঃ

(১) হে পুত্র! তোমার যাওয়ার পথে দেখবে একটি ঝর্ণা, তার তীরে রয়েছে একটি বৃক্ষ। সাবধান! এ বৃক্ষের ছায়ায় পথে বিশ্রাম করতে বসো না। আর এ বৃক্ষের নিচে যদি কোন বৃদ্ধ লোককে দেখতে পাও, তাহলে তার উপদেশ মত কাজ করো।

(২) তুমি যখন অমুক গ্রাম দিয়ে চলতে থাকবে, গ্রামবাসীরা তোমাকে খুব আদর-যত্ন করবে। তারা আমার ঘনিষ্ট বন্ধু। তাদের মধ্যে একটি ধনবতী সুন্দরী মহিলা আছে, তারা সে মহিলাকে তোমার কাছে বিয়ে দিতে চেষ্টা করবে, কিন্তু সাবধান! তুমি বিয়ে করতে রাজি হয়ো না।

(৩) যে লোকের কাছে তুমি অর্থ আদায়ের জন্যে চলেছ! সাবধান রাতে সেখানে থেক না।

পিতার উপদেশ এবং নসীহত গ্রহণ করে পুত্র আইকা সফরে যাত্রা করলেন। অনেকদূর অগ্রসর হয়ে প্রচণ্ড রৌদ্রতাপ এবং শ্রান্তিতে আইকা খুব ক্লান্তি অনুভব করলেন। ক্ষণিক পরেই তিনি ঝর্ণার পাশ্বে পিতার বর্ণনামত বৃক্ষটি দেখতে পেলেন এবং তার নীচে একজন দরবেশ চোখ বুজে ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে আছেন।

আইকার যদিও বিশ্রাম করার প্রবল ইচ্ছা ছিল কিন্তু পিতার উপদেশ স্মরণ হলে তিনি বিশ্রাম না করে আবার পথ চলতে লাগলেন, অমনি এ দরবেশ তাঁকে ডেকে বললেন, “হে যুবক! তোমার পিতা আমার কথা কিছু বলেছে? আইকা বললেন, হ্যাঁ, তিনি বলেছেন, আপনার উপদেশ পালন করে চলতে। দরবেশ বলেন, তাহলে আমি বলছি তুমি এখানে বিশ্রাম করল। সবুজ ঘাসে উপর শায়িত হয়ে আইকার চোখে ঘুম নেমে এল। একটু পরেই এ গাছ থেকে একটি বিষাক্ত সাপ নেমে এসে আইকাকে দংশন করতে উদ্যত হল।

দরবেশ দেখে সাপটিকে মেরে ফেললেন, অনেকক্ষণ কর আইকা ঘুম থেকে উঠল, দরবেশ বলেন, যে কারণে তোমার পিতা তোমাকে এ গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে নিষেধ করেছেন, এ দেখ! সে বিষাক্ত সাপটিকে শেষ করে দিয়েছি। এ কথা বলে একটা ছুরি দিয়ে সাপটির মাথা কেটে দরবেশ নিজের থলের ভিতর রেখে দিলেন।

তারপর দু’জন এক সাথে গন্তব্যস্থানের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। চলতে চলতে তার হযরত লোকমান হাকীমের বর্ণিত সে গ্রামে পৌঁছুলেন। গ্রামবাসী হযরত লোকমান এর পুত্র আইকাকে পেয়ে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে মেহমানদারী করল এবং পূর্বোল্লিখিত সুন্দরী ধনবতী মহিলাকে তারা কাছে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিল। পিতার উপদেশানুযায়ী বিয়েতে অস্বীকৃতি জানাল।

কিন্তু দরবেশ তাঁকে বললেন, তোমার পিতা তোমাকে আমার উপদেশ মেনে চলতে নির্দশ দিয়েছেন। আমি তোমাকে বলছি, তুমি রাজী হয়ে যাও। তাতে তুমি অপরুপ সুন্দরী স্ত্রী তো লাভ করবেই তার উপর বহু সম্পদের অধিকারীও হবে। তাছাড়া কোন শঙ্কট দেখা দিলে আমি তো আছি। অগত্যা, দরবেশের কথায় আইকা ওই রমণীর বিয়ে করল। তারপর রাত নামলে দরবেশ আইকাকে নির্জনে ডেকে নিয়ে তার কাছে রাখা সে সাপের মাথাটা পাত্রে দিয়ে বলে এ সাপের মাথাটায় আগুন ধরিয়ে দেবে এবং সে আগুনের ধোয়া যেন স্ত্রীর গোপন অঙ্গে পৌঁছে। তারপর একটু বিলম্ব করে তোমার স্ত্রীর সাথে মিলবে। আইকা দরবেশের কথামত কাজ করল। জলন্ত আগুনের কিছু ধোয়া যখন তার স্ত্রীর সারা গুপ্তঙ্গে স্পর্শ করল হঠাৎ সে চিৎকার দিয়ে বেহুশ হয়ে পড়ল এবং সাথে সাথে তার সে অঙ্গ থেকে একটা বড় ধরণের কীট বের হয়ে আগুনের পাত্রটির উপর লাফিয়ে পড়ে জ্বলে ভম্মিভূত হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আইকার স্ত্রীর জ্ঞান ফিরে এলো। তখন সে সম্পূর্ণ সুস্থ।

তখন তারা পরমানন্দে মিলিত হয়ে বাকি রাত নিদ্রায় কাটিয়ে দিল। পরদিন ভোরে আইকা দরবেশের কাছে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করল। দরবেশ এবার এর নিগুঢ় রহস্য প্রকাশ করে বলেন, এ কীটটির দংশনে সে সাথে সাথে মারা যেত।

এভাবে অনেক পুরুষই অকালে প্রাণ হারিয়েছে। এ কারণেই তোমার পিতা এ মহিলাকে বিবাহ করেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু আল্লাহর মর্জিতে সে বালা এখন দূর হয়ে গেছে। এখন তুমি পরমানন্দে স্ত্রীর সাথে মিলিত হতে পারবে। প্রবৃত্তির খায়েশে আইকা কিছুদিন শ্বশুরালয়ে অবস্থান করে আবার দু’জনই গন্তব্যস্থনের উদ্দেশে রওনা হল।

আইকা দরবেশ সমেত পিতার দেনাদারের বাড়ি পৌঁছে দেখল তা শহরে একপ্রান্তে একটি নদীর তীরে অবস্থিত। যাহোক, গৃহকর্তা যত্নসহকারে মেহমানদ্বয়কে আপ্যায়ন করালেন এবং মিনতিসহকারে বলেন, আজ রাতটা এ গরীব খানায় আপনাদেরকে আতিথ্য গ্রহণ করতে হবে, আগামীকাল আপনাদের পাওনা টাকা নিয়ে আপনারা বিদায় হয়ে যাবেন।

আইকা পিতার আদেশে কিছুতেই সেখানে রাত যাপন করতে রাজী হল না। কিন্তু দরবেশ বাধা দিয়ে বলেন, এক রাত এখানে থেকে যেতে দোষ কি? উনি যখন এত করে বলছেন, আমরা আজ রাত এখানে থেকেই যাই। দরবশের কথায় আইকা রাজি হয়ে গেল।

করজদার ব্যক্তির বৈঠকখানা ছিল একেবারে নদী সংলগ্ন। রাতে আহারের পর সে বৈঠকখানায় তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হল। গৃহকর্তার একটি ছেলেও সে ঘরে শয়ন করে ছিল। আসলে সে ব্যক্তি ছিল ভয়ঙ্কর চরিত্রের। যাদের কাছে থেকে সে টাকা আনত, টাকার জন্যে তারা তাগাদা দিতে এলে রাতে সে ঘরে তাঁদেরকে শয়ন করতে দিত, আর গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁদেরকে নদী গর্ভে নিক্ষেপ করত, এভাবে বহু লোকের প্রাণহানী ঘটিয়ে সে তাদের টাকা আত্মসাৎ করে নিত।

লোকমান হাকিম – শেষ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

আরো পড়তে পারেন

দুঃখিত, কপি করবেন না।