রোমের বাদশাহর নিকট রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দূত | আমার কথা
×

 

 

রোমের বাদশাহর নিকট রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দূত

coSam ১৩৫


রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর আবির্ভাবকালের পূর্বে পঞ্চাশোর্ধ কাল রোম এবং পারস্য সম্রাটের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ-বিগ্রহ অব্যাহত থাকে। যুদ্ধের প্রথম দিকে রোমের বাদশাহ পরাজিত হয় এবং মিসর, সিরিয়া এশিয়া মাইনের প্রভৃতি দেশ পারস্য সম্রাটের দখলে চলে যায়। এরপর হিরাক্লিয়াস রোম সম্রাজের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন।

তাঁর প্রবেষ্টায় হারানো অঞ্চলসমূহ পরে পুনরুদ্ধার হয়। এ বিজয় লাভের পর রোমের বাদশাহ তীর্থ করতে বায়তুল মুকাদ্দাসে উপনীত হন। এ সময় সাহাবী হযরত দেহইয়া কালবীর (রাঃ) রোমের বাদশাহকে লেখা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চিঠি নিয়ে প্রথমে বোসরার গর্ভনর হারেসের নিকট গমন করেন।

বোসরার গভর্নর হযরত দেহইয়া কালবীর (রাঃ) এর সাথে আদী বিন হাতেমকে দিয়ে রোমের বাদশাহ হিরাক্লিয়াসের দরবারে পাঠিয়ে দেন। তাঁরা সম্রাটের দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চিঠি হস্তান্তর করেন। রাসূল (রাঃ) এর দূত দেহইয়া কাবলী (রাঃ) এর নিকট সকল বৃত্তান্ত শুনে বাদশাহর কৌতূহল আরও বেড়ে যায়। যেহেতু তিনি খ্রীস্টান তাই যীশু (ঈসা আ) এর চিঠি হস্তান্তর করেন।

রাসূল (সাঃ) এর দূত দেহইয়া কাবলী (রাঃ) এর নিকট চিঠি হস্তান্তর করেন। রাসূল (সাঃ) এর দূত দেহইয়া কাবলী (রাঃ) এর নিকট সকল বৃত্তান্ত শুনে বাদশাহর কৌতূহল আরও বেড়ে যায়।

যেহেতু তিনি খ্রীস্টান তাই যীশু (ঈসা আঃ) এর প্রতিশ্রুতি ভাববাদীর প্রতীক্ষায় ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চিঠি পেয়ে তিনি সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং ধর্মযাজকদের নিয়ে দরবারে অনুষ্ঠানের নির্দেশ দেন। আরও আদেশ করলেন, সাম্রাজ্যের যে প্রান্তেই আরব দেশের কোন লোককে পাওয়া যাবে, তাকেও যেন এ দরবারে হাযির রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এ সময় আবূ সুফিয়ান কতিপয় কুরাইশ বণিকসহ রোম সাম্রাজ্যের সিরিয়ার অবস্থান করেছিলেন।

পরবর্তীকালে আবূ সুফিয়ানের বর্ণনা-- মুহাম্মদের পত্র পেয়ে কায়সার (রোমের বাদশাহর উপাধি) আমাদেরকে ডেকে পাঠান, আমি সঙ্গীদের নিয়ে দরবারে উপস্থিত হয়ে দেখি, কায়সার উপবিষ্ট। কায়সার দোভাষীর সাহায্যে আমাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যকার যে লোকটি নিজেকে নবী বলে দাবী করেছেন, তোমাদের মাঝে তাঁর সর্বাপেক্ষা নিকটাত্মীয় কে? বললাম, আমি। সে আমার চাচাত ভাই। তখন সম্রাট আমাকে সামনে এগিয়ে এসে আর সবাইকে আমার পিছনে উপবেশন করতে নির্দেশ দেন।

এরপর সম্রাট বিশেষ তাকিদ সহকারে আমার সাথীদের বলেন, আমি এ লোকটিকে কতগুলো কথা জিজ্ঞেস করব। সে যদি মিথ্যা বলে তবে তোমরা আমাকে তা বলে দিবে। এ সময়কাল বর্ণনায় আবূ সুফিয়ান বলেন, একে তো রোম সম্রাট, তদপরি আমার সাথে যতগুলো মানুষ, আরও রয়েছেন আদী বিন হাতেম ও দেহইয়া কালবী কাজেই কোন ব্যাপারে মিথ্যা বলার সাহস আমার হল না। অবস্থার প্রেক্ষিতে বাধ্য হয়েই সত্য বলতে হল।

রোম কায়সার ও আবূ সুফিয়ানের মাঝে এ সময় যেসব কথোপকথন হয়েছিল, তা নিম্নে প্রদত্ত হল-

বাদশাহঃ তোমাদের মাঝে যে লোকটি নিজেকে নবী বলে দাবী করছে, তাঁর বংশ কিরুপ?

আবূ সুফিয়ানঃ খুবই ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত।

বাদশাহঃ তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে কাউ কি রাজা ছিলেন।

আবূ সুফিয়ানঃ না,

বাদশাহঃ এর পূর্বে কি তোমাদের মাঝে কেউ নিজেকে নবী বলে দাবী করেছিল?

আবূ সুফিয়ানঃ না, আমাদের বংশের কেউ এর পূর্বে নবী হওয়ার দাবী করেনি।

বাদশাহঃ নবী বলে দাবী করার এ লোক কখনও কি মিথ্যা কথা বলেছে?

অথবা অন্যায়ভাবে কেউ তাঁর প্রতি মিথ্যা কথা বলার দোষারোপ করেছে।

আবূ সুফিয়ানঃ না, নবী হওয়ার দাবীদার ব্যক্তি জীবনে কখনো মিথ্যা বলেনি। তবে একটি ঘটনায় মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।

বাদশাহঃ সে মিথ্যা ঘটনাটি কি?

আবূ সুফিয়ানঃ তিনি বলেন, কোন এক রাতে বায়তুল্লাহ শরীফ হতে বায়তুল মুকাদ্দাস এসে প্রভাত হওয়ার পূর্বেই মক্কায় প্রত্যবর্তন করেছেন।

জনৈক পরিষদ সদস্যঃ তিনি অবশ্যই বায়তুল মুকাদ্দাস এসেছেন। তাঁর আসার ঘটনা সত্য।

বাদশাহঃ কি করে বুঝতে পারলে?

পরিষদ সদস্যঃ আমি মসজিদের দরজা বন্ধ না করে কখনও শয়ন করতাম না। এ নির্দিষ্টি রাতে বহু চেষ্টা করেও একটি দরজা বন্ধ করতে পারিনি। লোকজন ডেকে তাঁদের সাহায্য নিয়েও দরজাটি বন্ধ করা গেল না। মনে হল যেন একটি পাহাড় তাঁর উপর চাপিয়ে রাখা হয়েছে। দরজাটি খোলা রয়ে গেল। ভোরে উঠে দেখি মসজিদের কোণে সাখরায়ে বায়তুল মুকাদ্দাস নামক পাথরটিতে একটি ছিদ্র এবং এতে জানোয়ার বাধার চিহ্ন দেয়া যায়। বাহশাহ বলেন, এ কারণেই দরজা বন্ধ করতে পারনি।

বাদশাহঃ আচ্ছা বল তো, কোন শ্রেণীর লোক তাঁর অধিকতর অনুসারী? বড়লোক না গরীব? আবূ সুফিয়ানঃ তাঁর অনুসারীদের অধিকাংশই দীন দুঃখী, গরীব এবং নব্যযুবক শ্রেণীর।

বাদশাহঃ নবী দাবীদারের ভক্ত অনুসারীদের সংখ্যা দিন দিন কি কমছে না বাড়ছে?

আবূ সুফিয়ানঃ না, বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে।

বাদশাহঃ তাঁর দ্বীন গ্রহণের পর তাঁর প্রতি অসুন্তুষ্ট হয়ে কেউ কি সে দ্বীন ত্যাগ করেছে?

আবূ সুফিয়ানঃ না।

বাদশাহঃ তোমাদের সাথে তাঁর কি কোন যুদ্ধবিগ্রহ ঘটেছে?

আবু সুফিয়ানঃ জিহাঁ, কয়েকবারই তাঁর সাথে মাদের যুদ্ধবিগ্রহ হয়েছে?

বাদশাহঃ ফলাফল কি হয়েছে?

আবূ সুফিয়ানঃ কখনও আমরা বিজয়ী হয়েছি এবং কখনও তিনি বিজয়ী হয়েছেন।

বাদশাহঃ তিনি কি কখনও প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেননি? তবে বর্তমানে আমাদের সঙ্গে তাঁর একটি সন্ধি চুক্তি রয়েছে। দেখা যাক তিনি কি করেন। তবে আমরা খুবই সংকিত।

বাদশাহঃ নবী হবার দাবীদার কি শিক্ষা দিয়ে থাকেন?

আবূ সুফিয়ানঃ তিনি এক অদ্বিতীয় আল্লাহর ইবাদত করতে বলেন। তাঁর ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন। পুরুষানুক্রমে আমরা সেসব দেবীর উপসনা করে আসছি, তিনি আমাদেরকে সেসব পরিত্যাগ করতে বলেন। তিনি বলেন, আল্লাহ, সর্বশক্তিমান ও করুণাময়, সর্বত্র বিদ্যামান। অতএব তাঁর ইবাদতে অথবা তাঁর নিকট প্রার্থনা জানাতে কোন মধ্যস্থ বা সুপারিশকারীর প্রয়োজন হয় না। তিনি আল্লাহর ইবাদত করতে, আত্মীবর্গের সাথে সদ্ব্যবহার করতে আদেশ করেন। উপার্জিত সম্পদের চল্লিশ ভাগের এক ভাগ গরীব নিঃস্বদের মাঝে বন্টন করে দিতে বলেন, সচ্চরিত্র সত্যবাদী ও সরুচিসম্পন্ন হতে সকলকে তাকিদ করেন। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করতে এবং আমানতে খিয়ানত করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন।

পরবর্তী গল্প
খালেদ, ওসমান ও আমরের ইসলাম গ্রহণ

পূর্ববর্তী গল্প
ইয়ামানের শাসক বাযানের ইসলাম গ্রহণ

ক্যাটেগরী