রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে ইহুদীদের তর্ক | আমার কথা
×

 

 

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে ইহুদীদের তর্ক

coSam ১৯৯


১। একবার আবদুল্লাহ বিন সারিয়া নামক এক ইহুদী এসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করল, কোন ফেরেশতা আপনার ওহী বহন করে আনেন? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, হযরত জিবরাঈল ফেরেশতা। ইহুদী বলল, এ কারণেই আমরা আপনার উপর ঈমান আনতে পারছি না। কেননা, জিবরাঈল আমাদের শত্রু। জিবরাঈল মানুষের উপর আযাব নিয়ে হাযির হয়। কোথাও ভূমি উলটে দেয়। কোথাও চীৎকার দিয়ে মানুষকে ধ্বংস করে।

আবার কোথাও প্রস্তরখন্ড নিক্ষেপ করে। এভাবে কওমের পর কওম ধ্বংস করাই জিবরাঈলের কাজ। আর তিনি বনী ইসরাঈল বাংশে ওহী না এনে মক্কার উম্মি বংশে অহী এনেছেন। পারস্যের সম্রাট বোখতে নাছর যখন বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস করল তখন জিবরাঈল কোন কিছুই করেনি। জিবরাঈল আমাদের গোপন কথা মুহাম্মদের কাছে প্রকাশ করে দেয়। সুতরাং এ সমস্ত কারণে জিবরাঈল আনীত ওহীর প্রতি আমরা কখনও ঈমান আনতে পারি না। আর হযরত মিকাইল শান্তি-সমৃদ্ধি ও রিযিক নাযিল করনে। তাই জিবরাঈলের পরিবর্তে মিকাইল আসলে আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনব। –

ইহুদীদের এ জঘণ্য অশোভনীয় ও ঘৃণিত উক্তির জবাবে আল্লাহ এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ

অর্থঃ হে নবী! বলুন, যে ব্যক্তি জিবরাঈলের শত্রু হবে কারণ, তিনি (জিবরাঈল) আল্লাহর হুকুমেই কোরআন আপনার ক্বালবে নাযিল করেছেন। যে কোরআন তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যতা প্রতিপন্ন করছে এবং ঈমানদারদের জন্য সঠিক পথের সন্ধান ও বেহেশতের সুসংবাদ দিচ্ছে, যে ব্যক্তি আল্লাহ, তদীয় ফেরেশতাকুল তাঁর রাসূল এবং জিবরাঈল ও মিকাইলের শত্রু, নিঃসন্দেহে আল্লাহ অভিশ্বাসীদের শক্র। সূরা বাকারা-আয়াত – ১৭১-৮

২। পবিত্র কোরআনে যখন হযরত সুলায়মান (আঃ) কে একজন নবী বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তখন ইহুদিরা বিষ্ময় প্রকাশ করে বলল, সুলাইমান কখনও নবী হতে পারে না। সে ছিল একজন বড় যাদুকর। তখন ইহুদীদের এ উক্তির প্রতিবাদে আল্লাহ পাক এই আয়াত নাযিল করেনঃ

অর্থঃ এবং সুলাইমান কুফরী করেনি, তবে শয়তান দলই লোকদেরকে যাদু এবং ব্যাবিলনের হারুত-মারুত নামক ফেরেশতাদ্বয়ের প্রতি যা নাযিল হয়েছিল তা শিক্ষা দিয়ে কুফরী করল। সূরা আল বাকারা।

৩। হযরত ইবন মাসউদ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে মদীনার কোন এক শস্যক্ষেত্রের নিকট দিয়া যাচ্ছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাতে একটি খেজুর ডালের লাঠি ছিল। কিছু সংখ্যক ইহুদীর দেখা হতে তারা পরষ্পরকে বলতে লাগল, এ ব্যক্তিকে কিছু প্রশ্ন করা হউক। সে নাকি নবী হওয়ার দাবী করছে। তাদের মধ্যে একজন বলল, তাকে প্রশ্ন করা ঠিক হবে না। কেননা, যদি তোমাদের সঠিক উত্তর দিয়ে দেয়, তবে তার নবুয়ত প্রমাণিত হয়ে যাবে।

কিন্তু এ ব্যক্তি নিষেধাজ্ঞায় কর্ণপাত না করে রুহ সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে প্রশ্ন করল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট এ প্রশ্নের কোন উত্তর না থাকায় তিনি অহীর অপেক্ষায় নীরব রইলেন। ইহুদীরা তখন ঠাট্টা ও উপহাস করে বলতে লাগল, দেখ, দেখ, মুহাম্মদের শয়তান আসছে না। এজন্য সে চুপ হয়ে আছে। এমন সময় হযরত জিবরাঈল (আঃ) নিম্নলিখিত আয়াত নিয়ে উপস্থিত হন।

অর্থঃ "আপনাকে তারা রুহু সম্বন্ধে প্রশ্ন করছে। আপনি বলে দিন-রুহ আমার রবের আদেশ হতে (এটা আল্লাহর একটি আদেশ মাত্র।)”

৪। ইহুদীরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে হযরত মূসার নয়টি নিদর্শন বা আয়াত সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করল। তদুত্তরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ১। আল্লাহর সাথে কোন কিছু শরীক না করা, ২। জ্বেনা না করা, ৩। অন্যায়ভাবে হত্যা না করা, ৪। যাদু না করা, ৫। চুরি না করা, ৬। নির্দোষ ব্যক্তিকে কতল করার উদ্দেশ্যে ক্ষমতাশালী ব্যক্তির নিকট নিয়ে না যাওয়া, ৭। সূদ না খাওয়া। ৮। সতী নারীর প্রতি অপবাদ না দেয়া এবং ৯। শনিবারে মাছ না ধরা।

৬। তারা জিজ্ঞেস করল- আসমান যমীন এবং অন্যান্য মাখুলুক কতগুলো এবং সে গুলোর কোনটি কোন দিনে সৃষ্টি করা হয়েছে? আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন, রবি ও সোমবারে যমীন সৃষ্টি করা হয়েছে। মঙ্গলবার পর্বতমালা সৃষ্টি করা হয়েছে। বুধবারে সাগর পানি ও অপরাপর জীবজন্তু এবং বৃক্ষরাজি সৃষ্টি করা হয়েছে। বৃহস্পতিবারে আসমানসমূহ সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রুবার চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-তারা এবং ফেরেশতাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং শুক্রুবার দিনের শেষ ভাগে সর্বশেষ আদমকে সৃষ্টি করেছেন। শনিবারে কিছুই সৃষ্টি করেন নি। মোট ছয়দিন যাবতীয় মাখলুক সৃষ্টি করেছেন।

৭। ইহুদীরা ঋতুবর্তী স্ত্রীলোকের সাথে মিলন করত। তাদের সাথে এক সাথে পানাহার ও শয়ন করত। কিন্তু নাসারারা হায়েযা স্ত্রীকে সম্পূর্ণ পৃথক অবস্থায় রাখত। তাদের সাথে পানাহার বর্জন করত। ইহুদীরা এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে প্রশ্ন করলে এ আয়াত নাযিল হয়।

অর্থঃ এবং তারা আপনাকে হায়েযের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছে। আপনি বলে দিন, তা অপবিত্র অতএব হায়েয অবস্থায় তোমরা স্ত্রীলোকদেরকে দূরে রাখ।

৮। একদল ইহুদী একবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে প্রশ্ন করল, হযরত ইয়াকুব (আঃ) নিজের উপর কোন কোন জিনিস হারাম করেছিলেন? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আল্লাহর নামে শপথ করে বলেন, হযরত ইয়াকুব (আঃ) একবার কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে মানত করেছিলেন-যদি আল্লাহ আমাকে রোগমুক্ত করেন, তা হলে আমার প্রিয় খাদ্য উটের গোশত আমার জন্য হারাম করে দিব। আল্লাহ পাক তাঁকে আরোগ্য করলেন। তাই তিনি তাঁর মানত অনুসারে উটের গোশত হারাম করেছিলেন।

৯। একদিন জনৈক ইহুদী জিজ্ঞেস করল, হে মুহাম্মদ! হাশরের ময়দানে যখন আসমান যমীন ভিন্নরুপে রুপান্তরিত হবে, তখন মানুষ কোথায় অবস্থান করবে? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, পুলসিরাতের নিকট অন্ধকার ধোঁয়ার মধ্যে।

সে আবার প্রশ্ন করল, সর্বপ্রথম জান্নাতে কারা প্রবেশ করবে? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, দরিদ্র মুহাজিররা। সে জিজ্ঞেস করল, বেহেশতে সর্বপ্রথম খাদ্য কি দেয়া হবে? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, মাছের কলিজার অগ্রভাগ। সে বলল, তারপর কি দেয়া হবে? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, একটি ষাড়ের গোশত যা এখনও বেহেশতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারপর সে জিজ্ঞেস করল, বেহেশতবাসীর পানীয় বস্তু কি হবে? তিনি বলেন, সালসাবিল নামক নহরের পানি। ইহুদী বলল, তাহলে আপনিই সত্য নবী।

১০। মদিনার অপর এক ইহুদী রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করল, হযরত ইউসূফ আঃ স্বপ্নে যে তারকাসমূহ দেখতে পেয়েছিলেন, এদের নাম কি? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) চুপ করে রইলেন এমন সময় জিবরাঈল (আঃ) হাজির হয়ে তাঁকে নামগুলো বলে দিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, তারকা সমূহ হচ্ছেঃ ১। হেরসান, ২। তারেক, ৩। জাইয়াল, ৪। কাতফান, ৫। ফারযে, ৬। ওয়াচ্ছাব, ৭। আমুদান, ৮। কাবেস, ৯। জারুহ, ১০। মাসীহ, ১১। ফাইলাক এবং ১২। চন্দ্র ও সূর্য

এ ধরণের বিভিন্ন প্রশ্ন করে তারা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে বিব্রত করত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে একবার ইহুদী বজ্র ও বিদ্যুৎ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, রাইয়াস নামক ফেরেশতা একটি আগুনের কোড়া দ্বারা মেঘমালাকে এদিক-সেদিক হাঁকিয়ে নিত। তাঁরই কোড়ার আঘাতে যে ধ্বনি হয়, তা বজ্র এবং যে অগ্নিশিখা প্রজ্জলিত হয় তা বিদ্যুৎ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর এ উত্তরটি বাহ্যিক দৃষ্টিতে আধুনিক বিজ্ঞানের বিরোধী। তবে সুষ্ঠুভাবে বিচার করলে কোন বিরোধ থাকে না। কেননা, বৈজ্ঞানিকরা বাহ্যিক কারণের প্রতি লক্ষ্য করে বলেছেন-মেঘে মেঘে সংঘর্ষে বজ্র ও বিদ্যুৎ সৃষ্টি হয়। আর শরীয়ত সে সংঘর্ষের মূল কারণের প্রতি লক্ষ্য রেখেছে এবং তাই বর্ণনা করেছে।

এক বার হুইয়া বিন আখতাব ইহুদী সূরায়ে বাকারার প্রারম্ভের খন্ড বর্ণমালা অর্থ্যাৎ আলিফ, লাম-মিম এ অক্ষরগুলোর তিলাওয়াত শুনে বলল, আবজাদের হিসেব অনুযায়ী এ অক্ষরগুলোতে মুহাম্মদী ধর্মের সময়ের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। সে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিকট এসে বলল, তোমার পূর্বে বহু নবী পাঠান হয়েছে। কিন্তু তোমাকে ব্যতীত আল্লাহ আর কাকেও রাজ্যের আয়ু ও উম্মতের দানাপানির সময় সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেননি। হুইয়া বলল, আলিফ এক, লাম ত্রিশ এবং মিম চল্লিশ-মোট একাত্তর বছর এ ধর্মের আয়াত।

সুতরাং এমন সংকীর্ণ ধর্মে কোন জ্ঞানী সম্পৃক্ত হতে পারে না। হুইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করল, হে মুহাম্মদ! এ ধরনের আরও কোন শব্দ তোমার কোরআনে আছে কি? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ হ্যাঁ। আলিফ লাম, মিম, সোয়াদ। হুইয়া বলল, এবার কিছু সময় বেড়ে যাবে কারণ আলিফ এক, লাম ত্রিশ, মীম চল্লিশ এবং সোয়াদ নব্বই-মোট একশ একষট্টি বছর।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন আরও আছে। আলিফ, লাম, রা। এবার আরও বৃদ্ধি পেয়ে। আলিফ এক, লাম ত্রিশ এবং রা দুশ- মোট দুশ একত্রিশ বছর। তিনি বলেনঃ আরও আছে আলিফ, লাম, মীম, রা। হুইয়া বলল, মুহাম্মদের ধর্ম এবং উম্মতের আয়ু সম্বন্ধে কিছুই বুঝতে পারলাম না। তখন আল্লাহ পাক নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন-

অর্থঃ তিনি এ আল্লাহ যিনি আপনার উপর এমন কিতাব অবতীর্ণ করেছেন যে কিতাবের কিছু আয়াত (মুহকামাত) সুস্পষ্ট অর্থবোধক নয় (যার জ্ঞান আল্লাহই ভাল রাখেন) এবং খন্ড বর্ণমালাগুলো সে মুতাশাবিহাতের অন্তর্ভুক্ত।

আর একবার কতিপয় ইহুদী মহানবী (সাঃ) কে প্রশ্ন করল, আল্লাহ কিসের দ্বারা সৃষ্টি এবং কে তাঁকে সৃষ্টি করেছে? তাদের এ প্রশ্নের সূরায়ে ইখলাস নাযিল হলঃ

অর্থঃ আপনি বলে দিন- তিনি এক আল্লাহ তিনি কারও মুখাপেক্ষি নয় তিনি কাউকেও জন্ম দেননি এবং নিজেও জন্মগ্রহণ করেননি এবং তাঁর সমকক্ষও কেউ নেই। 

পরবর্তী গল্প
যেনা সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা

পূর্ববর্তী গল্প
রাসূলে আকরাম (সাঃ) এর জন্য আবাস নির্মাণ

ক্যাটেগরী