রাসূলুল্লাহ (সাঃ)- এর প্রথম ওহী

বোখারী শরীফে হযরত আয়েশা (রাঃ)-এর সূত্রে জিবরাঈল (আঃ)-এর প্রথম হেরা গুহায় আগমনের অবস্থা নিম্নোল্লিখিত ভাষায় বর্ণনা করেন- রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর উপর প্রথম দিকে সত্য খাবের ধারাবাহিকতা বিদ্যমান থাকে।


যে খাবই তিনি দেখতেন তার ব্যাখ্যা এতটা সুস্পষ্ট, উজ্জ্বল এবং সঠিক প্রমাণিত হত, যেমন শেষ রাতে পূর্বাকাশে শুভ্র আলোক রেখা প্রকাশিত হয়ে প্রভাতের ঘোষণা দিয়ে যায়। অনন্তর নির্জনতা তাঁর খুব প্রিয় হতে থাকে এবং তিনি হেরা গুহায় ইবাদতে মশগুল হন।


কখনও কখনও তিনি হেরা গুহার এবাদতে বিরতি দিয়ে পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে আসতেন। এ সময় হযরত খাদীজা (রাঃ) কিছু খাদ্যদ্রব্য তৈরী করে দিতেন এবং তিনি তা নিয়ে আবার হেরা গুহায় প্রত্যাবর্তন করে ইবাদতে মশগুল হতেন।


একদিন তিনি হেরা গুহায় ইবাদতে মশগুল রয়েছেন, এ সময় হঠাৎ ফেরশতা হযরত জিবরাঈল (আঃ) অবতরণ করে বলতে লাগলেন (ইক্বরা) “পড়ুন”, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন – (মা-আনা বিকারিয়িন) “আমি পড়তে জানি না”।


জিবরাঈল (আঃ)- এভাবে তিন বার বলেন এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও প্রতিবারই একই উত্তর দেন – মা আনা বিকারিয়িন – আমি পড়তে জানি না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আমি যখন ফেরেশতাকে জবাব দিলাম- আমি পড়তে জানি না।


রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন; আমি যখন ফেরেশতাকে জবাব দিলাম- আমি পড়তে জানি না, তখন তিনি আমাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেন যে, তাঁর ধরার কঠোরতাহেতু আমার কষ্ট অনুভব হচ্ছিল। অতঃপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলেন, পড়ুন। আমি উল্লিখিত জবাবই দিলাম- আমি পড়তে জানি না।


তখন ফেরেশতা পুনরায় আমাকে জড়িয়ে ধরেন এবং উল্লিখিত বাক্যের পুনরাবৃত্তি করেন। আমিও একই জবাবের পুনরাবৃত্তি করি। তৃতীয় বার ফেরেশতা আমাকে জড়িয়ে ধরার পর ছেড়ে দিয়ে বলেন- পড়ুন – আমার একই জবাব – আমি পড়তে জানি না।


তিন বার উল্লিখিত রূপ প্রশ্নোত্তর চলতে থাকে। চতুর্থবার ফেরেশতা কোরআন শরীফের ত্রিশতম পারার সূরা আলাকের নিম্নোক্ত কয়েকটি আয়াত তিলাওয়াত করেন –
উচ্চারণঃ “ইকরা বিসমি রব্বিকাল্লাযী খালাক্ব; খালাক্বাল ইনসা-না মিন আলাক্ব, ইক্বরা, ওয়া রব্বুকাল আকরামু ল্লাযী আল্লামা বিলক্বালামি; আল্লামাল ইনসা-না মা-লাম ইয়া’লাম।


অর্থঃ পড়ুন আপনার সেই রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন; সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তবিন্দু হতে; পড়ুন এবং আপনার রব অত্যন্ত দয়ালু, যিনি কলম দ্বারা মানুষকে বিদ্যা শিক্ষা দিয়েছেন; মানুষকে সে সব কিছু শিখিয়েছেন যা সে জানত না।


ফেরেশতা বলার পর রাসূলে পাক (সাঃ) উপরোক্ত আয়াতসমূহের পুনরাবৃত্তি করেন এবং এ আয়াতগুলো তাঁর স্মৃতিতে আত্নস্থ হয়ে যায়। এরপর তিনি হেরায় ওহী অবতরণের প্রথম ঘটনা হতে মুক্তি লাভ করেন। ওহীর কাঠিন্যহেতু তাঁর শরীর কাঁপছিল।


শরীরে কম্পন নিয়েই তিনি হেরা গুহা থেকে গৃহাভিমুখে যাত্রা করেন। তিনি ঘরে প্রবেশ করতেই হযরত খাদীজা (রাঃ)-এর উদ্দেশ্যে বলেন-আমাকে বস্ত্রাবৃত করে দাও। হযরত খাদীজা (রাঃ) তৎক্ষণাৎ তাঁর গায়ে চাদর ছড়িয়ে দেন।


তিনি যখন কিছু স্বস্থি ফিরে পান তখন হযরত খাদীজা (রাঃ)-কে ঘটনা বিস্তারিত শুনান এবং সাথে সাথে এও বলেন – আমি জীবন শংকা বোধ করছি।


রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর মুখে সমগ্র ঘটনা শুনে হযরত খাদীজা (রাঃ) নিবেদন করলেন-আল্লাহর কসম! আল্লাহ তাআলা কখনো আপনাকে লজ্জিত করবেন না।


কেননা, আপনি আত্নীয়দের সাথে সদাচরণ করেন, আত্নীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, মেহমানদারী করেন, নিরাশ্রয়কে আশ্রয় দেন, গরীব নিঃস্বের জন্য কর্মসংস্থান করেন, সত্যের প্রতিষ্ঠায় কঠোর থেকে কঠোর বিপদ মসিবত বরণ করেন।


এসব কথাবার্তার পর হযরত খাদীজা (রাঃ) রাসূলে পাক (সাঃ)-কে তাঁর চাচাত ভাই ওয়ারাকা বিন নওফেলের কাছে নিয়ে যান। ওয়ারাকা বিন নওফেল জাহেলিয়াত যুগের সেসব ব্যক্তিবর্গের একজন, যারা সত্যিকারার্থেই হযরত ঈসা (আঃ)-এর দ্বীন কবুল করেন।


তিনি ইবরানী ভাষা সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন এবং ইনজীল কিতাব লেখার কাজ করতেন। তিনি অত্যধিক বয়ষ্ক এবং দৃষ্টিশক্তিহীন হয়ে পড়েছিলেন। হযরত খাদীজা (রাঃ) ওয়ারাকাকে বলেন, হে আমার ভাই! আপনার এ ভাতিজার কথা একটুখানি শুনুন।


ঘটনা শুনে ওয়ারাকা বলেন-ইনি তো সেই ফেরেশতা, যিনি হযরত মূসা (আঃ)-এর কাছে ওহী নিয়ে আসতেন। যদি আমি সে সময় পর্যন্ত জীবিত থাকতাম-যখন আপনার জাতি আপনাকে মক্কা থেকে বহিষ্কার করবে। রাসূলে আকরাম (সাঃ) বিষ্ময়ের সুরে প্রশ্ন করলেন-আমার জাতি কি আমাকে দেশছাড়া করবে!


ওয়ারাকা বলেন-নিঃসন্দেহে এমনটাই হবে। যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা’আলা আপনাকে মনোনীত করেছেন, অতীতে এ উদ্দেশ্যে মনোনীতদের সবার সাথে এ আচারণই করা হয়েছে।


অতএব, তখন যদি আমি জীবিত থাকি তবে পূর্ণ শক্তি সামর্থ সহকারে আপনার সাহায্য করবো। কিন্তু ওয়ারাকা সে সুযোগ পাননি। এর পূর্বেই তাঁর ইনতিকাল হয়ে গেছে। প্রথম ওহী অবতরণের পর কিছুদিন তা বন্ধ থাকে।

আরো পড়তে পারেন

দুঃখিত, কপি করবেন না।