রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ওফাত

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিদায় হজ্জ থেকে প্রত্যাবর্তন করে গভীরভাবে আল্লাহর ধ্যান ও ইবাদতে নিমগ্ন হয়ে থাকতে লাগলেন। প্রতি বছর তিনি রমযানে দশদিন ইতেকাফ করতেন, কিন্তু এ বছর ইতেকাফে রইলেন বিশ দিন। এক গভীর রজনীতে তিনি জান্নাতুল বাকী রওজা ভূমিতে উপস্থিত হয়ে শহীদের উদ্দেশ্যে আল্লাহর দরবারে করুণভাবে মুনাজাত করলেন। সেখান থেকে মসজিদে নববীতে এসে নামাযান্তে চির সহচর ও ভক্তবৃন্দের উদ্দেশ্যে আবেগপ্লুত ও মর্মস্পর্শী বক্তৃতা দিলেন।

এক বর্ণনায় দেখা যায়, একাদশ হিজরী আটাশে সফর মঙ্গলবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জান্নাতুল বাকীতে মৃতদের কবর জিয়ারত করে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে দেখলেন হযরত আয়েশা (রাঃ) মাথার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়েছেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্বীয় পবিত্র হাতখানা তাঁর মাথায় স্পর্শ করার সাথে সাথে যন্ত্রণা দূর হয়ে গেল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মাথা ব্যাথা শুরু হয়ে গেল এবং জ্বরও দেখা দিল। এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অন্তিম রোগ।

অপর বর্ণনায় বলা হয়েছে, উনত্রিশে সফর রবিবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এক জানাযায় নামায শেষ করে প্রত্যাবর্তনের পথেই তিনি মাথার ব্যথায় ও জ্বরে এতই দুর্বল হয়ে পড়েন যে, পায়ে হেঁটে গৃহে যাওয়া সম্ভব হলো না। তখন হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত আব্বাস (রাঃ) দুবাহু ধরে তাঁকে গৃহে পৌঁছালেন। (হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রাঃ থেকে বর্ণিত।)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর রোগের তীব্রতা ক্রমে বাড়তে লাগল। প্রথমে জ্বর, তার পরপরই হযরত রাসূলে করীম (সাঃ) অসহনীয় মাথার ব্যথায় অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তবুও যতক্ষণ সামান্যতম শক্তিও ছিল ততক্ষণ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মসজিদে নববীতে এসে নামায পড়িয়ে চললেন।

ওফাতের মাত্র পাঁচ দিন পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একটা পাথরের টবের উপর বসলে তাঁর মাথায় সাত বালতি পানি ঢালা হল। এতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) একটু সুস্থবোধ করলেন এবং মসজিদে নববীতে উপস্থিত হয়ে সাহাবায়ে কেরামদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেনঃ

” হে মুমিন মুসলিম! তোমরা জেনে রাখ, অতীতে যে অসংখ্য জাতি গত হয়ে গেছে, তারা তাদের নবী- রাসূলদের কবর সমূহকে সিজদাহের স্থানে পরিণত করেছিল। তোমরা সেভাবে আমার কবরকে সিজদাহের স্থানে পরিণত করো না। কারণ, নবী রাসূলদের কবরকে সিজদার স্থানে পরিণতকারীদের প্রতি আল্লাহর গজব অবতীর্ণ হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আল্লাহ রব্বুল আলামীন, তাঁর এক বান্দাহকে দু’টি ব্যাপারে ইখতিয়ার দিয়েছিলেন, হয় সে ইহলোক গ্রহণ করুক, না হয় পরলোক কামনা করুক। বান্দাহ, পরলোকই গ্রহ্ণ করেছেন।

গভীর জ্ঞানসম্পন্ন হযরত আবূ বকর (রাঃ) এ কথার তাৎপর্য অনুধাবন করে কান্না জড়িত কন্ঠে বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ)! আমার পিতা-মাতা আপনার উপর কোরবান হোক।

এরপর হুযুরে পাক (সাঃ) হযরত আবূ বকর (রাঃ) কে সান্তনা দিয়ে অনেকটা হালকা মনে বলেন, তোমাদের কারও আমার উপর যদি কোন দাবী থাকে, অথবা আমার কাজে বা কথায় তোমরা যদি কোন কষ্ট বা আঘাত পেয়ে থাক, এখনই তোমরা তোমাদের ক্ষতিপূরণ বা প্রতিশোধ আমার থেকে নিয়ে নিতে পার। কারণ আমি চাই না, কারও কাছে পার্থিব বা মানসিকভাবে ঋণী থেকে যাই। উপস্থিত মুসলমানরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কথা শুনে, হু হু করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন, তাঁরা বলেন, হুযুর আপনার কথার প্রশ্নই উঠে না। তবুও এ ধরনের কথা বলে আমাদেরকে আকুল করে তুললেন।

হঠাৎ সাহাবী হযরত ওয়াক্কাস (রাঃ) বলে উঠলেন, হে আল্লাহর নবী (সাঃ)। কোন এক সময় আপনি আমার পিঠে চাবুকের আঘাত করেছিলেন, এ ব্যাপারে এমন কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, বলুন?

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ওয়াক্কাস! সত্যই তুমি বন্ধুর কাজ করলে। দুনিয়ার সর্বপ্রকার দাবী ও ঋণ মুক্ত হয়ে আমি আমার আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতে চাই। অতএব ভাই! তুমি এখনই আমার পৃষ্ঠে এ চাবুকের আঘাত করে আমাকে ঋণ মুক্ত করে দাও। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে চাবুক নিয়ে অগ্রসর হতে বলেন। উপস্থিত সাহাবীগণ ওয়াক্কাসের এ ব্যবহারে বিচলিত ও হতবাক হয়ে গেলেন। সকলে পৃষ্ঠমুক্ত করে দিয়ে বলেন, হে ওয়াক্কাস! তোমার যত ইচ্ছে আমাদের পিঠে চাবুকের আঘাত কর, একটির পরিবর্তে দশটি আঘাত কর। তবুও রোগাক্রান্ত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পিঠে আঘাত কর না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, না, তা হয় না, আমার সহচরবৃন্দ! তোমরা যদি আমাকে ভালবাস তাহলে আমার ঋণ, আমাকেই পরিশোধ করতে দাও।

ওয়াক্কাস চাবুক হাতে নিয়ে বলেন, হে আল্লাহর নবী! আপনি যখন আমার পিঠে চাবুকাঘাত করেছিলেন, তখন তা ছিল অনাবৃত। আর আপনার পিঠ যে পোশাকাবৃত।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মৃদু হেসে বলেন, হে ওয়াক্কাস! তুমি ঠিকই বলেছ। কিন্তু আমি তো কোন দিন আমার উন্মুক্ত পিঠ কাহাকেও প্রদর্শন করিনি, তবুও আজ ঋণমুক্তির জন্য তা করব। একটু আড়ালে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জামা খুলে পৃষ্ঠদেশ উন্মুক্ত করে ওয়াক্কাসকে চাবুক দিয়ে আঘাত করতে বলেন, ওযাক্কাস হাতের চাবুক ফেলে দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ঘাড়ের উপর মোহরে নবুয়তের উপর চুম্বন করেই তাঁর পদতলে লুটিয়ে পড়ে ক্রন্দন করতে করতে বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) । আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমি শুধু মোহরে নবুয়তের স্পর্শলাভের সৌভাগ্যের জন্যে এ ছলনা করেছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, যাও আল্লাহ আজ তোমার মনের বাসনা পূর্ণ করেছেন, তোমার জন্যে দোযখের আগুন আজ থেকে হারাম হয়ে গেল।

ক্রমেই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দুর্বল থেকে দূর্বলতর হতে লাগলেন। তিনি মসজিদে উপস্থিত হতে অক্ষম হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নির্দেশে তাঁর এ কঠিন অসুস্থ অবস্থায় হযরত আবূবকর (রাঃ) মোট সতের ওয়াক্ত নামাযের ইমামতী করলেন। শুক্রুবার থেকেই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অবস্থা অত্যন্ত খারাপের দিকে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ তিনি চেতন অবস্থায় আবার কিছুক্ষণ তিনি অচৈতন্যাবস্থায় কাটাতে লাগলেন।

শনিবার দিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কিছুটা সুস্থবোধ করলেন। জোহরের নামাযের জন্যে মসজিদে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করলেন এবং হযরত আব্বাস (রাঃ) -র কাঁধে ভর দিয়ে তিনি মসজিদে উপস্থিত হয়ে জামাতে নামায আদায় করলেন। ইমামতী করেছিলেন হযরত আবূ বকর (রাঃ)। জামাত শেষে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) অসুস্থতার কারণে হযরত আয়েশা (রাঃ) এর হুজরায় চলে এলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জানতেন তাঁর অন্তিম মুহুর্তটি একেবারেই আসন্ন। রবিবার দিন ভোরেই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর সমস্ত গোলামকে আজাদ করে দিলেন। দুনিয়ার যত তুচ্ছ সম্পদই হোক না কেন, তা ঘরে রেখে আল্লাহর প্রিয় হাবীব, তাঁর প্রিয় মাবুদের সাথে সাক্ষাত করতে যাবেন, এটা তার জন্যে হবে বড়ই লাজ্জার ব্যাপার। একথা চিন্তা করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ঘরে সামান্য যে সাতটি স্বর্ণ দীনার জমা ছিল, তা এনে গরীবদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। তাছাড়া ঘরের যথা সর্বস্ব তাঁর সামনে এনে দীন দুঃখীদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হল। এমন কি গৃহে জীবনের শেষ রজনীতে প্রদীপ জ্বালানোর মত তেল কিনবার সম্বলটুকুও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর গৃহে অবশিষ্ট রইল না। এক প্রতিবেশী থেকে ধার করে এনে সে রজনীতে প্রদীপ জ্বালানো হল। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দেহ বর্মটি কিছু গমের বিনিময়ে এক ইয়াহুদীর কাছে বন্ধক ছিল। তাঁর ব্যক্তিগত যুদ্ধাস্ত্র সমূহ মুজাহিদদের মধ্যে দান করে দিলেন। গায়ের যুব্বাটি হযরত ওয়াস করণী (রাঃ) এর কাছে পৌঁছিয়ে দিতে অছিয়ৎ করলেন।

এভাবে সারা জাহানের বাদশা, দু’জাহানের সাফায়েতকারী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা আহমদ মুজতবা (সাঃ) নিঃস্ব একেবারে নিঃস্ব হয়ে চললেন দুনিয়া থেকে।

বারই রবিউল আউয়াল সোমবারের পূর্বরাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অস্থিরতা ও শরীরের যন্ত্রণা অপেক্ষাকৃত কম ছিল। মসজিদে নববীতে ফযরের জামাত চলছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর কক্ষ এবং মসজিদের মধ্যকর লটকানো পর্দাটি সরিয়ে নিতে ইঙ্গিত করলেন। পর্দাটি সরান হলে রোগ শয্যায় কাতর শায়িত দু’জাহানের শ্রেষ্ঠ মানব, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সে নামায আদায়ের অপূর্ব দৃশ্য নিষ্পলক দৃষ্টিতে প্রাণ-ভরে দেখে নিলেন। খুশীতে তাঁর মন ভরে গেল, মনে হলো তাঁর চেহারা মোবারক প্রফুল্লাতা ও হাস্যজ্জ্বলতার আভায় ভরে উঠেছে। এ ছিল সাহাবায়ে কিরামদেরকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর শেষ দেখা। এর পরই তাদের দৃষ্টি থেকে রাসূলুল্লাহ চিরদিনের জন্যে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

এরপরই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর রোগ যন্ত্রণা আবার ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে লাগলো। প্রবল যন্ত্রণায় তিনি একাত ওকাত হচ্ছিলেন। বলছিলেন, আয়েশা! খায়বারের ইহুদি নারীর গোশতে মিশ্রিত বিষক্রিয়া এতদিনে আমার শরীরে প্রতিক্রিয়া শুরু করল। ক্রমশঃই তাঁর দেহ মোবারক অবসন্ন হয়ে আসছিল। চেহারা মোবারক কখন পান্ডুবর্ণ আবার কখনও লালবর্ণ হতে লাগল। মেসওয়াক করাতে ইঙ্গিত করলে, হযরত আয়েশা (রাঃ) রাসূলুলাহ (সাঃ) কে মিসওয়াক করিয়ে দিলেন। এ আস্তিরতার মধ্যেও স্বীয় মহিষীদেরকে প্রয়োজনীয় উপদেশ দিলেন, হযরত আলী (রাঃ) কে কাছে ডেকে আনলেন।

হযরত ইমাম হাসান (রাঃ) ও হযরত হুসাইন (রাঃ) এর দিকে লক্ষ্য করে বলেন, তোমরা সকলে আমার হৃদয়ের এ পুত্তলিদ্বয়কে সম্মান কর। প্রাণপ্রিয় কন্যা ফাতেমা (রাঃ) বিহ্বল ব্যাকুল কণ্ঠে বার বার বলতে লাগলেন, হায় মাবুদ! আমার বাবার কষ্ট লাঘব করে দাও। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ভাবী বিচ্ছেদ বেদনায় উপস্থিত জন সমুদ্রের সকলেই এমনই ম্রিয়মান হয়ে পড়লো যেন সকলে বোবা হয়ে গেল। কারও মুখে কোন কথা বের হচ্ছিল না। ঠিক এমনি সময়ে আল্লাহ পাকের নির্দেশে মালাকূল মওত আজরাঈল (আঃ) এক আরবী লোকের বেশে রাসূলে পাক (সাঃ) এর গৃহের দরজায় এসে আওয়াজ করলেন, হে নবী গৃহবাসীরা! আমি কি ভিতরে আসতে পারি? বারবার এ আওয়াজ শুনে মা ফাতেমা (রাঃ) বলে উঠলেন, তুমি পরে এস। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কর্ণে এ কন্ঠস্বর পৌঁছালে, তিনি বুঝতে পারলেন, গৃহের দরজায় আজরাঈল (আঃ) উপস্থিত হয়েছেন। তখন তিনি কন্যা ফাতেমা (রাঃ) কে বলেন, মা আমার! তাকে ভিতরে আসতে অনুমতি দাও।

অনুমতি লাভের পর মালাকুল মওত আজরাঈল (আঃ) ভিতরে প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে সসম্মানে সালাম করে জানালেন, হে আল্লাহর নবী (সাঃ) মহান আল্লাহ আমাকে আপনার কাছে এ বলে পাঠিয়েছেন যে, আপনি দুনিয়াতে অবস্থান করতে চাইলে, যতদিন ইচ্ছা থাকতে পারেন। আর আপনার প্রিয় মাবুদের সন্নিধানে যেতে চাইলেও যেতে পারেন। আপনি কোন পথ অবলম্বন করবেন, বলুন। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) উত্তর দিলেন, ভাই আজরাইল! দুনিয়াতে থাকার আমার কোন সাধ বা আগ্রহ নেই। আমি আমার প্রিয় মাবুদের সন্নিধানে যাবার জন্যেই ব্যাকুল হয়ে আছি। তবে আমার শুধু একটি ভাবনাই থেকে গেল, আমার বিদায়ের পর আমার অসহায় দুর্বল উম্মতদের কি হবে?

এ সময় জিবরাঈল (আঃ) উপস্থিত হয়ে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) কে সালাম করে পাশে বসলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে লক্ষ্য করে বলেন, ভাই জিবরাঈল! এ অন্তিম মুহুর্তে আমি আমার উম্মতদের মুক্তি ও নিরাপত্তার খোশ-খবরী শুনে যেতে চাই। আপনি শীঘ্রই আমার মাবুদ থেকে খোশ-খবরটা এনে আমাকে অবহিত করুন। জিবরাঈল (আঃ) আল্লাহ পাক থেকে খোশ খবর আনলেন যে, আল্লাহ পাক ওয়াদা করেছেন যে, আপনার উম্মতরা বেহেশতে না যাওয়া পর্যন্ত অন্য কোন নবীর উম্মতরা বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এই উক্তি শুনে বলেন, হে বন্ধু! আমি এতে আমি এতে নিশ্চিন্ত হতে পারলাম না। আমি আমার মাবুদ থেকে জানতে চাই, আমার গুনাহগার উম্মতদেরকে আল্লাহ কিভাবে বেহেশতে নিবেন? পুনঃ আল্লাহতায়ালা জিব্রাঈলের মাধ্যমে জানালেন, হে রাসূল! আপনার উম্মতের মৃত্যুর এক বছর পূর্বেও যদি খালেছ নিয়তে আল্লাহর দরবারে স্বীয় গুনাহ খাতার জন্যে তওবা করে, তাহলে আল্লাহ তাদের সারা জীবনের গুনাহ মাফ করে বেহেশতে দান করবেন।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এবারও বলেন, হে জিবরাঈল! এ কথায় আমার মনে শান্তি এল না। আমার উম্মতের মৃত্যুর এক বছর নির্ণয় করবে কিভাবে? যেহেতু এতে তাদের কোন ফায়দা হবে না।

জিবরাঈল (আঃ) আবার আল্লাহ তাআলার দরবার থেকে নতুন প্রতিশ্রুতি আনলেন যে, আমার হাবীবের উম্মতেরা সারা জীবন গুনাহে লিপ্ত থেকেও যদি মৃত্যুর পূর্বক্ষণে আল্লাহর ভয়ে খালেছ অন্তরে তওবা করে তবে আমি তাদের গুনাহর রাশি ক্ষমা করে বেহেশত নসীব করে দিব।

আল্লাহর দরবার থেকে এ প্রতিশ্রুতি লাভ করে কিছুটা নিশ্চিত হয়েও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর অন্তরে পরিপূর্ণ শান্তি এল না। উম্মতের সব রকম কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্যে তাঁর মন কিছুটা খালী রয়ে গেল। মহান রাব্বুল আলামীন স্বীয় হাবীবের মনের এ অবস্থাটা জানতেন, তাই আল্লাহর দরবার থকী সরাসরি এলাহাম এল, হে আমার হাবীব! আপনার চিন্তার কোন কারণ নেই। আপনি জেনে রাখুন, আপনার উম্মত হিসেবে তাদের প্রতি আপনার যতটুকু দরদ, আমার বান্দা হিসাবে তাদের উপর আমার দরদ এতটুকু কম নয়। আপনার উম্মতদের ভালো এবং ফয়দার জন্যে আপনি যা কিছু করতে ইচ্ছে করেন তাই আমি মঞ্জুর করব। অতএব, তাদের যাবতীয় বিষয় আমার উপর সোপর্দ করে আপনি নিশ্চিন্ত হোন।

মহান আল্লাহ পাকের এ ভরসা লাভ করে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মন কানায়-কানায় শান্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। এবার তিনি প্রশান্ত মনে মালাকুল মওত আজরাঈল (আঃ) কে ইঙ্গিত করলেন, তাঁর কর্তব্য সম্পাদন করতে।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর রুহ মোবারক বের করে নেয়ার জন্য আজরাঈল (আঃ) প্রথমে তাঁর সিনার উপর একখানা হাত রাখলেন, তাতে হুযুর পাক (সাঃ) এর চেহারা মোবারকের রং একেক বার একেক রকম হতে লাগল। রুহ কবজের কষ্টে তাঁর দেহ মোবারক ঘর্মাক্ত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলে উঠলেন, হে মালাকুল মওত! তুমি একটু বিরত হও, আর আমাকে বল আমার উম্মতদেরকেও কি এমনি কষ্ট দিয়ে জান কবজ করবে? আজরাঈল (আঃ) বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জান কবজে এর চেয়ে লঘু কষ্ট আর হয় না এবং অন্যান্যদের এর চেয়ে দশগুণ বেশী কষ্ট দিয়ে জান কবজ করি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলে উঠলেন, হায় হায়! তুমি বল কি? আমার দুর্বল উম্মতেরা কিভাবে এত মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করবে। হে মালাকুল মওত তুমি আমার উপর যত বেশি সম্ভব কষ্ট দিয়ে আমার জান কবজ করো না। মালাকুল মওত বলেন, হে উম্মতের দরদী রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমার প্রতি এ মর্মে নির্দেশ আছে যে, যারা আপনার খাঁটি উম্মত, তাদের জান যেন আমি এমনভাবে কবজ করি যেমন কোন দুগ্ধ পোষ্য শিশু মাতৃক্রোড়ে স্তন্য পান করতে করতে আরামে ঘুমিয়ে পড়ে। এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মনে শান্তি ফিরে এল।

উম্মতদেরকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কত যে ভালোবাসতেন, তাদের জন্য তিনি কত চিন্তিত, উদ্বিগ্ন ছিলেন, মৃত্যু শিয়রেও তিনি হায় উম্মতী, হায় উম্মতী, বলতে বলতে এ নশ্বর পৃথিবী থেকে চির বিদায় নিলেন। এরই মধ্যে মালাকুল মওত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পবিত্র রুহমোবারক সযত্নে ধারণ করতঃ মহান আল্লাহর দরবারে রওনা হয়ে গেলেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন। নিমিষের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ইনতিকালের খবর সারা মদীনায় ছড়িয়ে পড়ল। মুসলমানরা এ মর্মান্তিক দুঃসংবাদের আঘাতে একেবারে ম্রিয়মান হয়ে গেলেন। প্রত্যেক মুসলমানের কলিজা আকষ্মিক এ সংবাদের আঘাতে যেন ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে গেল। দুনিয়ার অন্তঃস্থল থেকে যেন এক অন্তর্ভেদী আর্তনাদ ভেসে উঠছে-নেই, নেই রে!

আমাদের প্রিয় নবী আর ইহজগতে নেই। বিশ্ব নবীর সে বিরহ বেদনায় সমগ্র মুসলিম জগত মূহ্যমান, দিশেহারা, ভাষা-হারা, বাকরুদ্ধ, শক্তিহীন, আভিভাবকহীন, পরম অসহায়। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে। সাহাবী বেলাল (রাঃ) বেহুঁশ হয়ে মদীনার পথে পথে ঘুরে ঘুরে যাকেই পায়, তাকেই জিজ্ঞেস করেন, তোমরা আমার প্রিয় নবী (সাঃ) কে কি কেউ দেখেছ? সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আনাস (রাঃ) এ শেলাঘাত সহ্য করতে না পেরে প্রাণত্যাগ করলেন। হযরত ওমর (রাঃ) এর মত দৃঢ় চেতা ও জ্ঞানী, বিচক্ষণ সাহাবী দিশেহারা হয়ে উন্মুক্ত তরবারী হাতে বেরিয়ে বলতে লাগলেন, যে বলবে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইন্তিকাল করেছেন, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেব। আমার নবী (সাঃ) মৃত্যুবরণ করেন নি, করতে পারেন না। পিতা-পাগলিনী হযরত ফাতেমা (রাঃ), হযরত আবূ বকর (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ) প্রমুখ প্রচন্ড শোকের আঘাতে এক নির্বাক অনড় পাথরে পরিণত হয়ে গেলেন।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর দাফন কাফনের কথা স্মরণ হতেই আস্তে আস্তে একে একে প্রায় সকলেই কিছু কিছু প্রকৃতিস্থ হয়ে উঠলেন।

রবিউল আউয়ালের তের তারিখ রোজ মঙ্গলবার প্রত্যুষে হযরত আব্বাস (রাঃ) হযরত আলী (রাঃ) এবং আরোও কতিপয় সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নামাযে জানাযার জন্যে দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বন্যার ঢলের মত লোক আসতে লাগল। অসংখ্য লোক দলে দলে বহুবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর জানাযা আদায় করলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ওফাতের বত্রিশ ঘন্টা পর বুধবার দিবাগত রাতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে সমাধিস্থ করা হলো। হযরত আলী (রাঃ) ফজল ইবনে আব্বাস, উসামা, ইবনে যায়েদ এবং আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) লাশ মোবারক কবরে রাখলেন। সারা জগতের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন (সাঃ) কে এরপর মাটি দিয়ে চিরদিনের জন্যে মানুষের চোখের আড়ল করে দেয়া হল। আর লক্ষ কোটি কণ্ঠে আকাশ-বাতাস অনুরণিত করে উচ্চারিত হতে লাগল। ইন্না লিল্লা হি ওয়া ইন্না ইলাই হি রাজিঊন।

আরো পড়তে পারেন

দুঃখিত, কপি করবেন না।