যী-কারাদ অভিযান | আমার কথা
×

 

 

যী-কারাদ অভিযান

coSam ১৭০


মদীনা থেকে মঞ্জিল দূরে বনু গাতফানের মহল্লার নিকট সালা পর্বতের নীচে অবস্থিত একটি ঝরণার নাম। রাসূল (সাঃ)-এর দুধালো উষ্ট্রীসমূহ এ অঞ্চলে চরান হত। তিনি স্বীয় খাদেম বারাহকে উষ্ট্রীগুলোর সংবাদ সংগ্রহের জন্য কারাদে পাঠান। রাবাহের সাথে সাহাবী স্বীয় হযরত সালামা ইবন আকওয়া (রাঃ)-ও ছিলেন। তিনি ছিলেন দুর্ধর্ষ তীরন্দাজ। তারা খুব ভোর রাতে যখন সেখানে উপনীত হন তখন বনু ফযরের ওয়ায়না ইবনে হেসন অতর্কিতে হামলা চালিয়ে রাসূল (সাঃ)-এর দুধালো উষ্ট্রীগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ মত প্রকাশ করেছেন যে, ওয়ায়না ইবনে হোসেনের সাথে আরও চল্লিশ জন অশ্বারোহী ছিল। রাসূল (সাঃ)-এর উষ্ট্রীগুলোর মধ্যে যে বিশটি খুব বেশি দুধ দিত সে উষ্ট্রীগুলো লুণ্ঠনকারীরা নিয়ে যায়।

হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া (রাঃ) সানিয়াতুল বেদা এলাকায় পৌঁছে রাসূল (সাঃ)-এর উষ্ট্রী লুণ্ঠিত হবার সংবাদ অবগত হন। কারাদে যাবার সময় তিনি হযরত আবু তালহার ঘোড়াটি বাহন হিসেবে নিয়েছিলেন। তিনি সাথে রাহাহকে তালহার নিকট থেকে (রাঃ)-কে এটি পৌঁছে দিয়ে এ ঘটনার সংবাদ দিব। রাবাহকে বিদায় দিয়ে তিনি একাই শত্রুর মোকাবিলার জন্য অগ্রসর হন। তিনি পাহাড়চূড়ায় আরোহণ করে শত্রুর বাহন দেখতে পেয়ে খুব জোরে চিৎকার করে বলেন, সর্বনাশ, সর্বনাশ তাঁর চিৎকার শব্দ মদীনার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। তিনি উষ্ট্রী লুণ্ঠনকারীদের নিকটবর্তী হয়ে তাদের লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করতে থাকেন। শত্রুরা তখন নিজেদের পশুপালকে পানি পান করাচ্ছিল। তাদের মধ্য কেউ যদি পাল্টা তীর নিক্ষেপ উদ্যত হত তবে হযরত সালামা (রাঃ) সে লোকটির পায়ে তীর নিক্ষেপ করে তাকে আহত করে ফেলতেন। এভাবে যে-ই পাল্টা তীর নিক্ষেপ করতে উঠত তিনি, তাকেই তীর নিক্ষেপে আহত করতেন।

তিনি তীর নিক্ষেপ করে তসকর দলের লোক বুঝে উঠার পূর্বেই গাছ টিলা ও প্রস্তরের আড়ালে লুকিয়ে যেতেন। সুতরাং শত্রুরা বুঝতেই পারত না কোথা হতে তাদের প্রতি তীর আসছে আর কেইবা নিক্ষেপ করছে। ফলে শত্রু দলের কারোরই পক্ষেই তাঁর সম্মুখ আসার সুযোগ ঘটেনি। তিনি তীর নিক্ষেপ করে শত্রু দলের একেক জনকে আহত করে বলতেন আমি আকওয়ার পুত্র।

তীর নিক্ষেপ তাঁর অব্যর্থ লক্ষ্য। ফলে লুটেরার দল লুণ্ঠিত উষ্ট্রগুলো ফেলেই পলায়ন করে। তারা সামনে চলে গেলে তিনি সেগুলো মদিনার দিকে প্রেরণ করে নিজে তাদের পিছনে ছুটেন। দস্যু দলের পলায়ন পথে একটি গিরিপথ ছিল। তারা সেখানে পৌছুলে হযরত সালামা (রাঃ) শত্রুদের পিছনে পিছনে তীর নিক্ষেপ করতে করতে ধাওয়া করতে থাকেন।

উষ্ট্রী লুণ্ঠিত হবার খবর মদীনায় পৌঁছুলে রাসূল (সাঃ) সাহাবী হযরত মিকদাদ বিন আমর (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলেন, তুমি অতিদ্রুত চলে যাও। সালামা একাকী শত্রুর মোকাবিলা করছে। তিনি একটি দ্রুতগামী অশ্বে আরোহণ করে কারাদ অভিমুখে রওয়ানা হন। তাঁর পিছু পিছু হযরত ওব্বাদ বিন বিশর, হযরত ওসায়দ বিন হোযায়র, হযরত বা'দ বিন যদি প্রমুখ সাহাবীও অশ্বারোহণ করে রওয়ানা দেন। এর অল্প পরেই রাসূল (সাঃ) মদীনার শাসনভার হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ)-এর হাতে ন্যস্ত করে ঘটনাস্থলের দিকে রওয়ানা হন। পরিশ্রান্ত লুটেরা পথে বিশ্রামের জন্য বসে।

হযরত সালামা (রাঃ) এ ক্ষেত্রেও তীর নিক্ষেপ করে দুর্ভাগাদেরকে উত্তক্ত করে তোলেন। এ সময় লুটেরার একজন তার সঙ্গীকে বলল তীর নিক্ষেপকারী আজ আমাদেরকে অতিশয় হয়রান পেরেশান করে তুলেছে, ঠিক তখনই পিছন দিকে থেকে মুসলিম বাহিনী এসে উপস্থিত হয়। মুহরেয (রাঃ) শত্রু দলকে দেখতে পেয়েই তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। অন্যান্য সাহাবী তাঁকে বলেন, একা শত্রুর উপর আক্রমণ চালাতে নিষেধ করে বলেন, রাসূল (সাঃ) এসে গেলে একত্রে আক্রমণ চালান যাবে, রহমান ফেজারীর সাথে মোকাবিলা করে শহীদ হন। হযরত মুহরেয (রাঃ)-কে আখরাস এবং কোসায়রও বলা হত।

মুহরেয (রাঃ)-এর শাহাদতের পর হযরত মিকদাদ ইবনে আমর (রাঃ) আক্রমণ চালিয়ে আবদুর রহমান ফেজারীকে হত্যা করেন। এ সময়ও হযরত সালামা (রাঃ) শত্রু দলের উপর উপর্যুপরি তসকররা এ সময় যীকারাদ নামক ঝর্ণা থেকে পানি পান করছিল। হযরত সালামা (রাঃ) পাহাড়ের উপর চড়ে পানি পানরত শত্রুদের উপর তীর নিক্ষেপ করতে থাকেন। ফলে তারা আর পানি পান করতে পারল না। এ সময় রাসূল (সাঃ) সাতশ মুজাহিদ নিয়ে যীকারাদ ঝর্ণা এলাকায় উপনীত হন। এ সময় লুটেরা দলের সবাই পলায়ন করে।

শত্রু দল পালিয়ে গেছে হযরত সালামা (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল শত্রু দল তৃষ্ণার্ত। এ অবস্থায় হামলা করলে সহজেই তাদেরকে কাবু করা যাবে। রাসূল (সাঃ) মৃদু হেসে বলেন, সালামা! আল্লাহ তায়ালা যখন বিজয়ী করেছেন, তখন নম্র ব্যবহার কর।

এক বর্ণনায় আছে মুজাহিদ বাহিনীর সদস্যদেরকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করে শত্রুর খোজে বিভিন্ন দিকে পাঠান হয়। হযরত সালামা (রাঃ) ও একশ মুজাহিদ নিয়ে বের হয়ে বনু গাতফানের পল্লীতে চলে যান। সেখানে পলায়নপর লুটেরা খাওয়ার আয়োজন করছিল। হযরত সালামা (রাঃ)-কে দেখামাত্র তারা খাদ্যদ্রব্য এবং উটগুলো ফেলে দৌড়ে পালায়। তিনি শত্রু দলের উটগুলো নিয়ে বিজয়ী বেশে রাসূল (সাঃ)-এর খিদমতে হাজির হন। এ অভিযানে দুজন সাহাবী শাহাদাত প্রাপ্ত হন। এবার রাসূল (সাঃ) মুসলিম বাহিনীকে নিয়ে মদীনাভিমুখে রওয়ানা দেন এবং ফেরার পথে সালামা ইবনুল আকওয়া (রাঃ)- স্বীয় বাহনে তুলে নিয়ে যান।

যীকারাদ অভিযানে সময়কাল নির্ধারণ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন গ্রন্থকার অভিযান হিজরী ষষ্ঠ সনে হুদাইবিয়ার সন্ধির পূর্বে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া (রাঃ)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমরা যখন হুদাইবিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন করি, তখন রাসূল (সাঃ)-এর দূরের উষ্ট্রীসমূহ লুণ্ঠিত হয় এবং এ অভিযান (যীকারাদ) হতে প্রত্যাবর্তনের তিন দিন পর রাসূল (সাঃ)-এর নেতৃত্বে আমরা খায়বর অভিযানে বের হই। উল্লিখিত রেওয়ায়েত অনুসারে হুদাইবিয়ার সন্ধির পরেই যীকারাদ অভিযান হয়েছে বলে মনে হয়।

পরবর্তী গল্প
যাতুর রেখা অভিযান ও অভিযানের কারণ - প্রথম পর্ব

পূর্ববর্তী গল্প
ইকফের ঘটনা

ক্যাটেগরী