মৃত্যুর পরের জীবন | আমার কথা
×

 

 

মৃত্যুর পরের জীবন

coSam ২২


মৃত্যু কী? পৃথিবীতে যত প্রাণি এসেছে তা একদিন না একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে। কোন প্রাণিই এ মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ থেকে নিষ্কৃতি পাবে না। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
“তুমি কি তাদেরকে দেখ নাই যারা মৃত্যুভয়ে হাজারে হাজারে স্বীয় আবাসভূমি পরিত্যাগ করেছিল ? অতপর আল্লাহ তাদেরকে বলেছিলেন : “তােমাদের মৃত্যু হােক।' তারপর আল্লাহ তাদের জীবিত করেছিলেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল; কিন্তু অধিকাংশ লােক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।” অন্য এক আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
“জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। 

কিয়ামতের দিন তােমাদেরকে তােমাদের কর্মফল পূর্ণ মাত্রায় দেয়া হবে। যাকে অগ্নি হতে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে দাখিল করা হবে সে-ই সফলকাম এবং পার্থিব জীবন ছলনাময় ভােগ ব্যতীত কিছুই নয়। “আল্লাহ অবশ্যই সেসব লােকের তওবা কবুল করবেন যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে এবং সতুর তওবা করে, এরাই তারা, যাদের তওবা আল্লাহ কবুল করেন।

আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। তওবা তাদের জন্য নয় যারা আজীবন মন্দ কাজ করে, অবশেষে তাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে : 'আমি এখন তওবা করছি' এবং তাদের জন্যও নহে, যাদের মৃত্যু হয় কাফির অবস্থায়। এরাই তারা যাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তির ব্যবস্থা করেছি।” যদিও আল্লাহ তা'আলা মৃত্যু সম্পর্কে এমন কঠিন কথা আল-কুরআনে ঘােষণা করেছেন তারপরও মানুষ এ বিষয়ে সম্পূর্ণ গাফিল।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :“ আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং তার প্রবৃত্তি তাকে যে কুমন্ত্রণা দেয় তা আমি জানি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর। স্মরণ রাখিও, দুই গ্রহণকারী ফেরেশতা তার দক্ষিণে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে; মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে তার জন্য তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে। মৃত্যুযন্ত্রণা সত্যই আসবে ; এটা হতেই তােমরা অব্যাহতি চেয়ে এসেছি।" মৃত্যু একটি অনিবার্য ও শাশ্বত সত্য বিষয়। ইসলামে এ বিষয়ে অনেক সতর্ক করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন :
“যে নিজেকে নির্বোধ করেছে সে ব্যতীত ইব্রাহীমের ধর্মাদর্শ হতে আর কে বিমূখ হবে। পৃথিবীতে তাকে আমি মনােনীত করেছি; আর আখিরাতেও সে অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণগণের অন্যতম। তার প্রতিপালক যখন তাকে বলিয়াছিলেন, ‘আত্মসমর্পণ কর', সে বলেছিল, “জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট আত্মসমর্পণ করলাম এবং ইবরাহীম ও ইয়াকূব এই সম্বন্ধে তাদের পুত্রগণকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিল : “হে পুত্রগণ! আল্লাহই তােমাদের জন্য এ দ্বীনকে মনােনীত করেছেন। সুতরাং আত্মসমর্পণকারী না হয়ে তােমরা কখনও মৃত্যুবরণ করােও না।

ইয়া'কুবের নিকট যখন মৃত্যু এসেছিল তােমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে? সে যখন পুত্রগণকে জিজ্ঞেস করেছিল : “আমার পরে তােমরা কিসের ইবাদত করবে?' তারা তখন বলেছিল : “আমরা আপনার ইলাহ-এর এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইব্রাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের ইলাহ-এরই ইবাদত করব। তিনি একমাত্র ইলাহ এবং আমরা তার নিকট আত্মসমর্পণকারী।' সে ছিল এক উম্মত, তা অতীত হয়েছে। তারা যা অর্জন করেছে তা তাদের। তােমরা যা অর্জন কর তা তােমাদের। তারা যা করত সে সম্বন্ধে তােমাদের কোন প্রশ্ন করা হবে না।” মৃত্যু নামক বস্তুকে আল্লাহ্ তা'আ কখন কোথায় কিভাবে সৃষ্টি করেছেন, তার সঠিক ইতিহাস জানা যায় না। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুকে নিরাকারভাবে সৃষ্টি করেছৈন। কোন কোন বিজ্ঞ আলিমের মতে, হযরত আদম (আঃ)-এর  সৃষ্টির অনেক আগে মহান আল্লাহ মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন।

এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন : “আল্লাহ্ তা'আলা মৃত্যু ও হায়াতকে সৃষ্টি করেছেন। এ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মৃত্যুকে প্রথমে উল্লেখ করেছেন, তাই এটা দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি মৃত্যুকে আগে সৃষ্টি করেছেন। অতপর জীবনকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা'আলা যা সৃষ্টি করেছেন, তার মৃত্যু অনিবার্য অর্থাৎ যার শুরু আছে, তার শেষও রয়েছে। অতএব, প্রত্যেক প্রাণিকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।

কেউ মৃত্যুর থেকে রক্ষা পাবে না। আল্লাহ্ তা'আলা কিভাবে মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন, সে বিষয়ে রাসূল (সাঃ) বলেছেন : "মৃত্যু বস্তুকে সৃষ্টি করে আল্লাহু তা'আলা শত-সহস্র আবরণের মধ্যে একে  অদৃশ্য করে রেখে দেন। আল্লাহ তা'আলা নভােমন্ডল ও ভূমন্ডলের সকল বন্ধু হতে বিরাট আকারে মহাশক্তিশালী ও শ্রেষ্ঠ রূপে মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন। এমনকি তা নভােমন্ডল ও ভূমন্ডল হতেও বেশি শক্তিশালী। মৃত্যুকে সৃষ্টি করে আল্লাহু তা'আলা মৃত্যুকে সত্তরটি মজবুত শিকল দ্বারা বেঁধে এক গােপন স্থানে রেখে দেন। উক্ত প্রত্যেকটি শিকলের দৈর্ঘ্য এক হাজার বছরের রাস্তার সমান দূরত্ব। আর এটিকে মহান আল্লাহু এমন এক জায়গাতে সংরক্ষিত অবস্থায় রেখেছেন যেখানকার সন্ধান কোন ফেরেশতা পর্যন্ত ও পায়নি।

তারা এটির অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন তখন যখন আল্লাহ্ তা'আলা হযরত (আঃ) কে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা'আলা মানুষের মৃত্যু ঘটানাের জন্য একজন ফেরেশতা নির্ধারণ করে রেখেছেন। যার নাম আজরাঈল। 

তার উপাধি হল 'মালাকুল মাউত। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেন :“বল : “তােমাদের জন্য নিযুক্ত মৃত্যুর ফেরেশতা তােমাদের প্রাণ হরণ করবে। অবশেষে তােমরা তােমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যানীত হবে। হায়, তুমি যদি দেখতে। যখন অপরাধীরা তাদের প্রতিপালকের সম্মুখে অধােবদন হয়ে বলবে : হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা প্রত্যক্ষ করলাম ও শ্রবণ করলাম, 

এখন তুমি আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ কর, আমরা সুকর্ম করব, আমরা তাে দৃঢ় বিশ্বাসী।' আমি ইচ্ছা করলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে সৎপথে পরিচালিত করতাম; কিন্তু আমার এই কথা অবশ্যই সত্য: আমি নিশ্চয়ই জিন ও মানুষ উভয় দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করব।” মৃত্যু সৃষ্টির পর আল্লাহ তা'আলা মালাকুল মউত তথা আজরাঈল (আঃ) কে বললেন: হে মালাকুল মউত! আজ হতে তােমাকে আমি মৃত্যু নামক বস্তুর উপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ও শক্তি অর্পণ করলাম। মালাকুল মউত আল্লাহ্ তা'লার এ নির্দেশ শ্রবণ মাত্রই জিজ্ঞেস করলেন : হে দয়াময় আল্লাহ্! মৃত্যু আবার কী বস্তু? তখন আল্লাহ্ তা'আলা মৃত্যুর চতুর্দিকের শত আবরণ উন্মুক্ত করে বললেন : হে মালাকুল মউত। এই দেখ মৃত্যু নামক বস্তু।

এর উপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব আমি তােমাকে দিয়েছি। এরপর আল্লাহু তা'আলা সকল ফেরেশতাকে এ মৃত্যু নামক ভয়ঙ্কর জিনিস দেখানাের জন্য মৃত্যুকে তার শত আবরণের উন্মুক্ত করতে বললেন এবং ফেরেশতাগণকে সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হয়ে মৃত্যুর প্রতি দৃষ্টিপাত করতে নির্দেশ দিলেন। তারা আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পেয়ে সকলেই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং মৃত্যুকে দেখার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন।

এ সময় আল্লাহ্ তা'আলা মৃত্যুকে হুকুম করলেন : হে মৃত্যু! তুমি তােমার সকল পাখা মেলে এদের উপর উড়ে ভ্রমণ কর এবং তােমার সকল মুদিত চোখ খুলে তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত কর।

অতপর মৃত্যু আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে তার সকল পাখা মেলে এবং চোখ খুলে ফেরেশতাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করতঃ তাদের মাথার উপর দিয়ে চক্রাকারে ঘুরতে আরম্ভ করল। ফেরেশতাগণ মৃত্যুর ভয়ঙ্কর বিরাট ও বিশাল আকৃতি দর্শন করে সকলেই বেহুশ হয়ে অচেনভাবে যমীনে পড়ে গেল। এ অবস্থায় তারা এক হাজার বছর অতিবাহিত করল।

এরপর আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে তারা সজাগ হয়ে আল্লাহর দরবারে করজোড়ে মিনতি করল : হে মহান প্রভু! আপনি কি এটি অপেক্ষা আরাে কোন বিশাল ভয়ঙ্কর বস্তু কিছু সৃষ্টি
করেছেন? আল্লাহু তা'আলা তাদের প্রশ্নের জবাবে বললেন : হে ফেরেশতাগণ! তােমরা জেনে রাখ, আমি সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং মহিয়ান, গরিয়ান ও সর্বশ্রেষ্ঠ। আমার সৃষ্ট সকল প্রাণিকূলকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।

তার কবল থেকে কেউ রক্ষা পাবে না, এমনকি তােমরাও না। অতপর আল্লাহু তা'আলা মালাকুল মউত ফেরেশতা আজরাঈল(আঃ)-কে উদ্দেশ্য করে বললেন : হে মালাকুল মউত! দুনিয়ার সকল প্রাণির রূহ কবজ করার দায়িত্ব আমি তােমাকে অর্পণ করলাম। এ কথা শ্রবণে মালাকুল মউত বললেন : হে আল্লাহ রাব্বল আলামীন! মৃত্যু আমার অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী আমি কীভাবে তাকে আমার অধীনস্থ করব? আল্লাহু তা'আলা বললেন : তুমি ঘাবড়িও না, আমি এ মুহূতে মৃত্যুকে তােমার অধীনস্থ করে দিলাম।

এরপর ফেরেশতা মালাকুল মউত আল্লাহর সামনে আরজ করে বললেন : হে শক্তিমান আল্লাহ! আমাকে একটু সময় দিন যাতে আমি ভূমন্ডল ও নভােমন্ডল ঘুরে ভ্রমণ করে সকল প্রাণি জগতটাকে আমার শক্তি ও দায়িত্ব কর্তব্যের কথা জানিয়ে আসি। আল্লাহ্ তাকে এ অনুমতি প্রদানের পর মালাকুল মউত বিদ্যুৎ বেগে ভ্রমণ করে ভয়ঙ্কর শব্দে গর্জন করে বলতে শুরু করল, হে আল্লাহর সৃষ্টি প্রাণিকূল।

তােমরা জেনে রাখ, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি যে কাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পেয়েছি, তা দ্বারা আমি সকল বন্ধুকে বন্ধুর মিলন হতে, স্বামীকে তার স্ত্রীর সম্মুখ হতে এবং স্ত্রীকে তার স্বামীর সখ হতে বিচ্ছিন্ন করে তার প্রাণবায়ু কেড়ে নিব এভাবে। মালাকুল মউত সমগ্র দুনিয়া ঘুরে ঘুরে এ সকল কথা ঘােষণা করে দিলেন। মালাকুল মউত আরাে বলবেন: হে হতভাগ্য মৃত্যু পথযাত্রী। তুমি কি আখিরাতের জন্য কোন সৎকাজ করেছ? যা আজকে তােমার উদ্ধারকারী, সাহায্যকারী হিসেবে তােমার সাথী হবে।

কিন্তু আফসোস! তুমি জীবনভর আখিরাতের পাথেয় হিসেবে কিছুই সংগ্রহ করনি, তুমি যা অর্জন করেছ তা আজকে কোন কাজেই আসবে না।

একথা শ্রবণে মমূর্ষ ব্যক্তি তার মুখমন্ডল অন্য পার্শ্বে ঘুরিয়ে নিবে; কিন্তু যমদূত মুহুতের মধ্যে সেদিকেও উপস্থিত হয়ে বলতে থাকবে : হে হতভাগ্য বান্দা! তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ? আমি তাে তােমার আত্মার হরণকারী, আমি তােমার সম্মুখে তােমার পিতা-মাতার রূহ কবজ করেছি, তখন তুমি তাদের সম্মুখেই দন্ডায়মান ছিলে। কিন্তু তুমি কি তখন অনুধাবন করতে পারনি যে, মৃত্যু কী বস্তু? কিভাবে রূহ কবজ করা হয়।”

পরবর্তী গল্প
শবে বরাত-এর আমলসমূহ

পূর্ববর্তী গল্প
ছফিয়্যাহ-বিনতে-আব্দুল-মুতালিব

ক্যাটেগরী