মি'রাজ সম্পর্কিত আলোচনা | আমার কথা
×

 

 

মি'রাজ সম্পর্কিত আলোচনা

coSam ১৫৫


মি'রাজ সংঘটিত হবার পূর্ব থেকে আল্লাহর রাসূল (স) আরও কতিপয় লোকের সাথে হজরত উম্মে হানী (রাঃ)-এর গৃহেই রাত যাপন করে আসছিলেন। মে রাজের পূর্ব রাতে হজরত জিবরাঈল ও মীকাঈল (আ) ও আর একজন ফেরেশতাসহ উম্মে হানীর গৃহে হাযির হন এবং পরস্পরের মধ্যে আলোচনায় তৃতীয় ফেরেশতা বলেন- নিদ্রিতদের মাঝে রাসূলুল্লাহ (স) কোন ব্যাক্তি, আমরা তাকে নিয়ে যাই; এ বলে ফেরেশতা ত্রয় অদৃশ্য হয়ে যান।

যে রাতে মি'রাজ সংঘটিত হয় সে রাতে রাসূলুল্লাহ (স) কোথায় অবস্থান করছিলেন- এতদসম্পর্কিত তিনটি রেওয়ায়েত রয়েছে। বোখারীর রেওয়ায়েত অনুযায়ী হাতীমে কাবায়, ওয়াকেদীর বর্ণনা মতে শেয়াব আবী তালেবে এবং তিবরানীর বর্ণনা অনুসারে উম্মে হানীর ঘরে হজরত হামযা ইবনে আবদুল মোত্তালিব এবং হযরত জাফর ইবনে আবী তালিবের মাঝখানে শায়িত ছিলেন। তাঁরা সবাই নিদ্রিত হয়ে পড়লে রাতে ঘরের ছাদ উন্মুক্ত হয়ে যায়। জিবরাঈল (আ) উন্মুক্ত ছাদ দিয়ে গৃহ প্রবেশ করেন এবং রাসূলুল্লাহ (স) কে উঠিয়ে হাতীমে কাবায় নিয়ে শয়ন করান।

এ সময় তিনি নিদ্রা ও জাগ্রত অবস্থার মাঝামাঝি অবস্থান করছিলেন। এতদ্ব্যতীত তিনি নিদ্রিত থাকলেও অন্তর সদা জাগ্রত থাকত। হজরত জিবরাঈল ও মীকাঈল (আ) বিদ্যমান। তাঁদের উপস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর বক্ষ বিদারণ কর্ম সংঘটিত হয়। কথিত আছে, এর পূর্বে আরও তিন বার তাঁর বক্ষ বিদারণ করা হয়েছিল। বক্ষ বিদারনের পর তাঁর সম্মুখে গাধা ও খচ্চরের মাঝামাঝি শ্বেত বর্ণের একটি জন্তু এনে হাযির করা হয়। এটির নাম বোরাক। এ জন্তুটি বিদ্যুত গতিসম্পন্ন বলেই এটিকে বোরাক নামে অভিহিত করা হয়েছে। কেননা, বোরাক শব্দটির মূল হচ্ছে বারকুন, অর্থ-বিদ্যুৎ।

এ জীবটি এক লাফে সেটির দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত অতিক্রম করতে পারত। রাসূলুল্লাহ (স) কে আহ্বান জানান হল বোরাকে আরোহনের জন্য কিন্তু তিনি যখন বোরাকে আরোহণ করতে যাচ্ছেন, অমনি বোরাকটি সরে দাঁড়াল। জিবরাঈল (আ) বোরাকের উদ্দেশ্য বলেন-দেখ, সমগ্র সৃষ্টির সেরা আল্লাহর হাবীব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) অদ্য তোমার পৃষ্টে আরোহণ করবেন। জিবরাঈল (আ) এর কথায় বোরাক লজ্জিত ও শান্ত হয়।

রাসূলুল্লাহ (স) বোরাকে আরোহণ করেন। সর্বপ্রথম খেজুর গাছে ভরা একটি প্রান্তরে উপনীত হলে জিবরাঈল (আ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এখানে অবতরণ করুন এবং অযু করে দু রাকআত নামায পড়ুন। খেজুর গাছে ভরা এ প্রান্তরেই আপনার হিজরতের স্থান। এ স্থানের নাম ইয়াসরিব। জিবরাঈল (আ)-এর কথামত রাসূলুল্লাহ (স) খেজুর গাছ ভরা প্রান্তরে অযু করে দু রাকআত নামায পড়ে সামনে অগ্রসর হয়ে সাদা রঙয়ের এক ভুমিতে উপনীত হন।

জিবরাঈল (আ) বলেন, এখানে নামুন এবং দু রাকআত নামায পড়ুন। এ জায়গায় নাম মাদইয়ান। ফেরেশতা জিবরাঈল (আ)-এর কথানুযায়ী রাসূলুল্লাহ (স) সেখানে অবতরণ করে নামায পড়েন। তার পর সামনে অগ্রসর হলেন। এক স্থানে গিয়ে জিবরাঈল (আ) বলেন, এখানে নামুন এবং দু রাকআত নামায পড়ুন। নামায পড়া শেষ হলে জিবরাঈল (আ) বলেন, আপনি এখন বায়তুল লাহমে (বেথেলহাম) নামায পড়লেন। এটা হজরত ঈসা (আ)-এর জন্মস্থান। এখান থেকে তাঁরা সামনে অগ্রসর হন এবং বরযখ জগতের কতিপয় বিস্ময়কর অবস্থা প্রত্যক্ষ করেন।

এ সময়ে এক বৃদ্ধা রমনীকে রাস্তায় দাঁড়ানো দেখতে পান। রাসূলুল্লাহ (স) জিবরাঈল (আ)-কে রাস্তায় দাঁড়ানো বৃদ্ধা রমনীটির পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন সামনে চলুন। কিছুদুর অগ্রসর হয়ে পথের পাশে এক বৃদ্ধকে দেখতে পান-বৃদ্ধ তাঁকে ডাকছে। জিবরাঈল (আ) বলেন, সামনে চলুন। কিছুদুর এগুবার পর এক সম্প্রদায়ের সাথে সাক্ষাত হল- যারা তাঁকে আসসালামু আলাইকা ইয়া- আউয়ালু, আসসালামু আলাইকা ইয়া- আ-খিরু, আসসালামু আলাইকা ইয়া-হা-শিরু বলে সালাম জানায়। জিবরাঈল (আ)-এর পরামর্শমত তিনি তাঁদের সালামের উত্তর দেন। 

 

সালামের জবাব দানের পর জিবরাঈল (আ) বলেন- পথে বৃদ্ধাকে দেখেছেন, সে হচ্ছে দুনিয়া, আর এরপর যে বৃদ্ধকে দেখেছেন, সে হচ্ছে অভিশপ্ত ইবলীস। যে সম্প্রদায় আপনাকে সালাম করলেন তাঁরা হলেন হযরত ইবরাহীম, হযরত মূসা ও হযরত ঈসা আলাইহিমুস সালাম। তিবরানীর বর্ণনা মোতাবেক, এর পর রাসূলুল্লাহ (স) এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে হাজির হন, যারা দিনে দিনে শস্য বপন ও কর্তন করে। তিনি এ সম্প্রদায়ের পরিচয় জানতে চান হযরত জিবরাঈল (আ) বলেন- এরা হচ্ছেন আল্লাহর পথের মুজাহিদ। এঁদের একেকটি আমল সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।

তাঁরা যা খরচ করেন আল্লাহ তার উত্তম প্রতিফল দেন। এর পর তিনি এমন এক সম্প্রদায়কে দেখতে পান, পাথরের আঘাতে যাদের মস্তক চূর্ণবিচূর্ণ করা হচ্ছে, পূণরায় পূর্বাবস্থায় ফিরে আসছে আবার চূর্ণ করা হচ্ছে, পুনঃপুন এরূপ করা হচ্ছে। জিবরাঈল (আ) বলেন, এরা হচ্ছে নামাযে গাফিল সম্প্রদায়। তার পর এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে হাযির হলেন যারা যাক্কুম এবং দোযখের পাথর খাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (স) এ সম্প্রদায়ের পরিচয় জানতে চাইলে জিবরাঈল (আ) বলেন-এরা যাকাত প্রদান করে না। এর পর এক সম্প্রদায়ের কাছে আসলেন, যাদের সামনে দুটি ডেকচি, একটিতে পঁচা গলা গোশত এবং অপরটিতে রান্না করা ভাল গোশত রয়েছে, কিন্তু এরা ভাল গোশত রেখে পঁচা গলা গোশতই খাচ্ছে।

জিবরাঈল (আ) এ সম্প্রদায়ের পরিচয়ে বলেন, এরা সে সম্প্রদায়, যারা ঘরে পবিত্র স্ত্রী রেখে পরস্ত্রীর কাছে গমন করে কামপ্রবৃত্তি পূর্ণ করে। এরপর এমন এক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন, যে একটি লাকড়ির বোঝা বেঁধেছে যা বহন করতে পারছে না, এতদাসত্ত্বেও সে আরও লাকড়ি একত্র করছে। রাসূলুল্লাহ (স) এ লোকটি সম্পর্কে জানতে চাইলে জিবরাঈল (আ) বলেন-এ সে ব্যক্তি, যার দায়িত্বে মানুষের অনেক অধিকার রয়েছে, যা সে আদায় করতে পারছে না, অথচ আরও লোকের অধিকার নিজের মাথায় তুলে দিচ্ছে। এর পর রাসূলুল্লাহ (স) এমন কিছু লোকের কাছ দিয়ে পথ অতিক্রম করেন, যাদের জিহ্বা প্রতিনিয়ত কাঁচি দিয়ে কর্তিত হচ্ছে। একবার কাটলে পূর্বাবস্থায় ফিরে যাচ্ছে, আবার কাটা হচ্ছে।

এদের পরিচয় জিজ্ঞেস করা হলে জিবরাঈল (আ) বলেন, এরা সেসব বক্তা যারা মানুষকে পথভ্রষ্টতার নিক্ষেপ করেছে। তার পর একটি ছোট পাথরের কাছে উপনীত হন। দেখলেন, সে পাথর থেকে বিরাটকায় এক বলদ বের হয়ে আবার তাতে প্রবিষ্ট হবার চেষ্টা করছে, কিন্তু সক্ষম হচ্ছে না। রাসূলুল্লাহ (স) এর রহস্য জানতে চাইলেন জিবরাঈল (আ) বলেন, এটা সে ব্যক্তির অবস্থা, যে চিন্তা ভাবনা ছাড়াই এমন কথা মুখ থেকে বের করে, যে জন্য তাকে লজ্জিত হতে হয়, কিন্তু পরে সে মুখের বের করা কথা ফিরিয়ে নিতে পারে না। তার পর এমন এক ময়দানে পৌছুলেন সেখানে মনোমুগ্ধকর বায়ু এবং মেশক আম্বারের সুগন্ধ প্রবাহিত হচ্ছে। একটি শব্দও শুনতে পান। জিবরাঈল (আ) কে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি।

তিনি বলেন, এটা বেহেশতের আওয়াজ ও সুগন্ধ। এর পর এক ভয়ংকর ময়দানে পৌঁছেন এবং বিকট আওয়াজ শুনতে পান। জিবরাঈল (আ) বলেন, এটা দোযখের শব্দ। বায়হাকীর রেওয়ায়েতে উল্লেখিত সব ঘটনার সাথে অতিরিক্ত আরেকটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, আমার ডান ও বাম দিক হতে দুজন লোক ডাক দেয়, আরেকজন মহিলাও ডাক দেয়, আমি কারো ডাকেই সাড়া দেইনি। জিবরাঈল (আ) বলেন, ডান দিক ও বাম দিকের আহ্বানকারী যথাক্রমে ইহুদী এবং খ্রীষ্টান আর মহিলাটি হচ্ছে দুনিয়া। যদি আপনি এদের আহবানে সাড়া দিতেন, তবে আপনার উম্মত ইহুদী, খ্রীষ্টান ও দুনিয়াদার হত।

উল্লিখিত ঘটনা ছাড়াও আরও বহু আজব ঘটনা দেখার কথা বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে উক্ত হয়েছে। শুধু নমুনা স্বরুপ এখানে অল্প কয়েকটি উল্লেখ করা হল।

পরবর্তী গল্প
খাযরাজী প্রতিনিধি দলের কাছে ইসলামের দাওয়াত

পূর্ববর্তী গল্প
রাসূলুল্লাহ (স)-এর মিরাজ

ক্যাটেগরী