মদীনা মুনাওওয়ারায় যিয়ারতের বিশেষ কয়েকটি স্থান | আমার কথা
×

 

 

মদীনা মুনাওওয়ারায় যিয়ারতের বিশেষ কয়েকটি স্থান

coSam


১. জান্নাতুল বাকীঃ-
মদীনা শরীফের কবরস্থানের নাম ‘জান্নাতুল বাকী। মসজিদে নববীর সন্নিকটে পূর্ব দিকে অবস্থিত। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, আহলে বায়ত (নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরিবার), আযওয়াজে মুতাহারাত (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ খাদীজা ও মায়মূনা ব্যতীত), শােহদা, আইম্মায়ে কেরাম ও আওলিয়ায়ে কেরাম এই কবরস্থানে সমাধিস্থ রয়েছেন। এখানে হযরত উসমান (রাঃ)-এর মাযার থেকে যিয়ারত শুরু করুন। অনেকের মত হল হযরত আব্বাস (রাঃ)-এর কবর থেকে যিয়ারত শুরু করা।

২. শােহাদায়ে উহুদঃ-
এটি উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে একটি কবরস্থান। বৃহস্পতিবার সকালে উহুদের শহীদগণের যিয়ারতের উদ্দেশ্যে এখানে যান। প্রথমে কবরস্থানের পাশে অবস্থিত মসজিদে হামযায় দুই রাকআত নামায আদায় করুন। অতঃপর হযরত হামযা (রাঃ)-এর মাযার যিয়ারত করুন। পার্শ্বেই হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জাহশ (রাঃ) এবং হযরত মুসআব ইবনে উমাইর (রাঃ)-এর মাযার রয়েছে, তাদেরকেও সালাম পেশ করুন। ৭০জন শহীদ সাহাবায়ে কেরাম এখানে সমাধিস্থ রয়েছেন। সম্ভব হলে পাহাড়ে আরােহণ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “তােমরা উহুদ পাহাড়ে আগমন করলে এখানকার বৃক্ষ থেকে কিছু খাও, এমনকি কাটাদার বৃক্ষ হলেও।” 

৩. মসজিদে কোবাঃ-
হিজরতের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হস্তে এই মসজিদ নির্মাণ করেছেন। এটিই মুসলমানদের প্রথম মসজিদ। যেদিন সুযােগ হয় এই মসজিদের যিয়ারত করুন, তবে শনিবার দিন উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তি মসজিদে কোবায় এসে দুই রাকআত নামায আদায় করবে, তার একটি উমরার সমতুল্য ছওয়াব হবে। 
৪. মসজিদে জুমুআঃ-
এ মসজিদটি কোবার পথের সন্নিকটবর্তী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বপ্রথম এই মসজিদে জুমুআর নামায আদায় করেন। 
৫. মসজিদে কেবলাতাইনঃ-
এই মসজিদের মুসল্লীগণ বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে নামায পড়তে থাকা অবস্থায় কেবলা পরিবর্তনের কথা জানতে পেরে তৎক্ষণাত নামাযের মধ্যেই কা'বা শরীফের দিকে ফিরে যান। একই নামাযে দুই কেবলার দিকে ফিরে নামায পড়ার কারণে এটাকে মসজিদে কেবলাতাইন বলা হয়।

৬. মাসাজিদে সাবআঃ-
সালা’ পাহাড়ের পশ্চিম প্রান্তে মসজিদে ফাতাহ অবস্থিত। এই মসজিদের নিকটেই পাশাপাশি মসজিদে সালমান ফার্সী, মসজিদে আবু বকর, মসজিদে ওমর, মসজিদে আলী, মসজিদে সাআদ ইবনে মুআয় নামক মসজিদ সমূহ ছিল। অতীতের মত এখনও এগুলােকে ‘মাসাজিদে সাবআ বা সাত মসজিদ বলা হয়। যদিও মসজিদে ফাতাহ সহ মােট মসজিদের সংখ্যা ছিল ৬টি। বর্তমানে (২০০৬ সালে) রয়েছে মাত্র তিনটি (মসজিদে ফাতাহ, মসজিদে ওমর এবং মসজিদে সাদ ইবনে মুআয। ২০০৩ সালের হজ্জের পর মসজিদে সালমান ফার্সী ও মসজিদে আবু বকর ভেঙ্গে তদস্থলে একটি বড় মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।)। যিয়ারতের গাড়ী হাজীদেরকে সাধারণতঃ এসব মসজিদের স্থানে নিয়ে যেয়ে থাকে। নিম্নে ছয়টি মসজিদ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদান করা হল। মসজিদে ফাতাহঃ এটি সালা' পাহাড়ের পশ্চিমাংশে অবস্থিত।

মসজিদটি ভূমি থেকে প্রায় সাড়ে চার মিটার উঁচু। খন্দক যুদ্ধের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে তিন দিন- সােম, মঙ্গল ও বুধবার দুআ করেছিলেন, আল্লাহ পাক দুআ কবূল করেন এবং মুসলমানগণ বিজয়ী হন। সর্ব প্রথম হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ এ মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদে সালমান ফার্সীঃ এটি মসজিদে ফাতাহ থেকে দক্ষিণে নীচে অবস্থিত। খন্দক যুদ্ধের খন্দকের পরিকল্পনাকারী সাহাবী হযরত সালমান ফার্সীর নামে মসজিদটির নামকরণ করা হয়। খন্দক যুদ্ধের সময় এখানেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায পড়েছেন। এ মসজিদটিও সর্ব প্রথম হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ নির্মাণ করেন। ২০০৩ সালে মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলা হয়।

মসজিদে আলীঃ- 
মসজিদে সালমান ফার্সী থেকে দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত ছিল। সর্বশেষ ১৮৫১ খৃষ্টাব্দ মােতাবেক ১২৬৮ হিজরীতে সুলতান আব্দুল মজীদ (১ম) এ মসজিদটির সংস্কার করেছিলেন। এ মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জামাআত হত। ১৪১৪ হিজরীতে মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলা হয়।
মসজিদে আবু বকরঃ- 
এ মসজিদটি মাসাজিদে সাবআ এলাকার সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত। অনেকগুলাে সিড়ি ঘেঁটে উপরে উঠতে হয়। কেউ কেউ এটাকে “মসজিদে আলী” নামে অভিহিত করে থাকেন, কিন্তু এটা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। ২০০৩ সালে মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলা হয়। 

মসজিদে ওমরঃ- 
এটি মসজিদে সালমান ফার্সী থেকে দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত। এ মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জামাআত হয়।
মসজিদে সা'দ ইবনে মুআযঃ- 
এটি মসজিদে ওমর থেকে দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত। কেউ কেউ এটাকে মসজিদে ফাতেমা নামে অভিহিত করে থাকেন, কিন্তু এটা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। 

৭. মসজিদে বনী হারামঃ-
মসজিদে ফাত্যহের নিকটবর্তী এই মসজিদেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায পড়েছেন। সালা" পাহাড়ের পিছনে অবস্থিত জাবালে যুবাব (বর্তমানে বিলুপ্ত)-এর পাশ দিয়ে মসজিদে বনী হারামে যাওয়ার রাস্তা রয়েছে। 
৮. মসজিদে গামামাহঃ- 
এ মসজিদটি মসজিদে নববীর দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই ঈদের নামায এখানে আদায় করতেন। 
৯. মসজিদে অবূ বকরঃ-
মসজিদে গামামা-র নিকট উত্তর দিকে অবস্থিত। হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) এখানে ঈদের নামায আদায় করেছিলেন বিধায় এর নাম। মসজিদে আবু বকর হয়ে থাকবে। 
১০. মসজিদে আলীঃ-
এই মসজিদও মসজিদে গামামাহ-র নিকট অবস্থিত। হযরত উছমান (রাঃ) যখন গৃহে অন্তরীণ ছিলেন, তখন হযরত আলী (রাঃ) এখানে ঈদের নামায আদায় করেছিলেন। সম্ভবতঃ এ কারণেই এর নাম হয়ে থাকবে মসজিদে আলী।
১১. মসজিদে ওমরঃ-
এখানে হযরত ওমর (রাঃ) কখনও কখনও নামায পড়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও এখানে ঈদের নামায পড়েছেন বলে কেউ কেউ বর্ণনা করেছেন। মসজিদে ওমর মসজিদে গামামাহ-র সামান্য দক্ষিণে অবস্থিত।

১২. মসজিদু’স সাজদাহঃ- 
এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাজদারে শোকর আদায় করেছিলেন। দীর্ঘ সাজদা থেকে মাথা তুলে তিনি উপস্থিত হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ)-কে বলেছিলেন, জিব্রীল (আঃ) এসে আমাকে বললেন, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আপনার প্রতি দুরূদ পাঠ করে আমি তার প্রতি রহমত করি, যে ব্যক্তি আপনাকে সালাম করে আমি তাকে সালাম করি। তাই আমি শােকর আদায় করণার্থে সাজদা করলাম। মসজিদটি বর্তমানে "মসজিদে আবু যর” নামে পরিচিত। এ মসজিদটি মসজিদে নববীর পূর্ব পাশ দিয়ে উত্তর দিকে যে রাস্তাটি গিয়েছে তার কিছুটা সামনে গিয়ে চৌরাস্তা পার হয়ে সামনে ডান দিকে রাস্তা মােড় নেয়ার সময় ডান দিকে অবস্থিত। 
১৩. মসজিদুল-ইজাবাহঃ-
এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই রাকআত নামায পড়ে তিনটি দুআ করেছিলেন, যার দুটো কবুল হয়। দুআ তিনটি ছিল এই (এক) আল্লাহ তা'আলা যেন এই উম্মতকে দুর্ভিক্ষ দিয়ে ধ্বংস না করেন। এটি কবুল হয়। (দুই) আল্লাহ তা'আলা যেন এই উম্মতকে নিমজ্জিত করে ধ্বংস না করেন। এটিও কবুল হয়। (তিন) এই উম্মত পারস্পরিক যুদ্ধবিগ্রহে যেন লিপ্ত হয়। এটি কবুল হয়নি। এ মসজিদটি মসজিদে নববীর পূর্ব পাশ এবং জান্নাতুল বাকী'র উত্তর পাশ দিয়ে যে রাস্তাটি পূর্ব দিকে গিয়েছে সে রাস্তা দিয়ে অগ্রসর হয়ে জান্নাতুল বাকী’র উত্তর পূর্ব কোণে চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে বাঁ দিকে (উত্তর দিকে তাকালেই দৃষ্টিগােচর হয়। 

১৪. মসজিদুল মুছতারাহঃ
এটাকে পূর্বে মসজিদে বানু হারেছা বলা হত। বানু হারেছা নামক আনছারী গােত্র এখানে বসবাস করত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উহুদ যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনকালে এখানে আরাম গ্রহণ করেছিলেন। মসজিদটি গাড়ীতে উহুদ পাহাড়ে যাওয়ার সময় উহুদ পাহাড়ের কিছু পূর্বেই রাস্তার বাম পাশে রাস্তা সংলগ অবস্থিত । এটাকে মসজিদুল এছতেহা-ও বলা হয়। 
১৫. মসজিদুশ শায়খাইনঃ-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উহুদ যুদ্ধে গমন কালে শুক্রবার আসর, মাগরিব ও ইশার নামায এখানে আদায় করেন এবং রাত্রযাপন করে শনিবার সকালে এখান থেকে উহুদ প্রান্তরে গমন করেন। এখানেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সৈনিক নির্বাচন করেন এবং ছােট সাহাবীদেরকে ফেরত পাঠান। এ মসজিদটি মসজিদুল-মুছতারাহ থেকে ৩০০ মিটার দক্ষিণে চৌরাস্তা থেকে ২০ মিটার পূর্বে অবস্থিত। এ মসজিদকে  মসজিদুল উদওয়া, মসজিদুল বাদায়ে’, মসজিদুদ্দিরূয়ে প্রভৃতি নামেও ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন। 

১৬. মসজিদুর রায়াঃ-
এটাকে মসজিদে যুবাব'-ও বলা হয়। এ মসজিদটি যুবাব নামক একটি ছােট পাহাড়ের উপর অবস্থিত, যে পাহাড়ে খন্দক খননের কাজ পরিদর্শনের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর তাবু স্থাপন করা হয়েছিল এবং তিনি এখানে নামাযও পড়েছেন। তরীকুল উয়ূন-এর শুরুতে বাম পাশে মসজিদটি অবস্থিত। 
১৭. মসজিদুল-ফাযীখঃ-
এটাকে 'মসজিদে শাস' বা 'মসজিদে বান্ নাযীর'-ও বলা হয়। বানু নাযীর গােত্রের সাথে যুদ্ধের সময় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে নামায পড়েছিলেন। মসজিদটি কোবার পাশে ‘আওয়ালী' নামক এলাকায় অবস্থিত ? 
১৮. মাশূরাবাহ উম্মে ইবরাহীমঃ-
এখানে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পুত্র ইবরাহীমের মাতা মারিয়া কিতিয়া বসবাস করতেন। এখানেই ইবরাহীম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখানে যাতায়াত করতেন এবং বিবিদের সঙ্গে ঈলা করার সময় দীর্ঘ একমাস এখানে তিনি অবস্থান করেছিলেন। পরবর্তীতে এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল, যাকে “মসজিদে মাশরাবাহ উম্মে ইবরাহীম' বলা হত। বর্তমানে এখানে কোন মসজিদ নেই। এটি একটি কবরস্থান। যা আওয়ালী নামক এলাকাতে মুছতাশা ঝারা ও মুছতাফা ওয়াতানী-এর মাঝে অবস্থিত। 

১৯. মসজিদুল ফাহুহঃ-
বর্ণিত আছে যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উহুদ যুদ্ধের পর এখানে হো ও আসরের নামায পড়েছিলেন। এ মসজিদটি এখন (২০০০ইং) ভগ্ন অবস্থায় রয়েছে। এ স্থানটি মাকবারাতুশ শুহাদা-এর উত্তর দিক দিয়ে কিছু দূর অগ্রসর হয়ে উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে (যাওয়ার সময় ডান দিকে অবস্থিত এর উত্তরে উহুদ পাহাড়ে কিছুটা উচুতে গুহার ন্যায় একটি ফাটল রয়েছে; বলা হয় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়া সাল্লাম উহুদ যুদ্ধে আহত হয়ে এখানে অবস্থান নিয়েছিলেন।  

সূত্রঃ আহকামে যিন্দেগী

পরবর্তী গল্প
ছফিয়্যাহ-বিনতে-আব্দুল-মুতালিব

পূর্ববর্তী গল্প
উম্মে সালামা (আরবের বিধবা)-শেষ পর্ব

ক্যাটেগরী