বদর যুদ্ধের পটভুমি | আমার কথা
×

 

 

বদর যুদ্ধের পটভুমি

coSam ১৫৭


১৩ বছর মক্কীজীবনে কুরাইশ কাফেররা ইসলামের নবী ও মুসলামানদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়েছে। অবশেষে আল্লাহর হুকুমে মুসলামানরা ও রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় হিজরতের কারণে তাদের শিকার হাত ছাড়া হয়ে গিয়েছে। ফলে মুসলামানদের ও ইসলামের নবীর ব্যাপারে তাদের গাত্রদাহ আরও বহু গুনে বেড়ে গেছে। অধিকন্তু মদীনায় ইসলামের দ্রুত প্রসার লাভ এবং ক্রমবর্ধিঞ্চু ক্ষমতা মক্কায় কুরাইশদের মনে ঈর্ষা এবং শত্রুতা প্রবল থেকে প্রবলতর করে তুলল। সুতরাং তারা মুসলামান উন্নতির গতি ব্যহত এমনকি তাদের মূলোৎপাটন তথা দুনিয়া থেকে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করতে সংকল্প ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল।

রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর হিজরতের পূর্বে মদীনা বাইরের যে কোন প্রকার আক্রমণমুক্ত স্থান ছিল। কিন্তু আল্লাহর নবী ও তাঁর অনুসারীদের বাসস্থানে পরিণত হওয়ার এখন মদীনা মক্কার কুরাইশদের ক্রোধের লক্ষ্যস্থলে পরিণত হল। মুসলমানদের আশ্রয় দেয়ায় কুরাইশরা মদীনাবাসীকে বিদ্রোহী এবং শত্রু বলে ঘোষণা করল। ফলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ও মুসলমানদের সাথে মদীনার মুসলিম- অমুসলিম সকল নাগরিকদের শাস্তি প্রদান করতে বদ্ধপরিকর হল।

মদীনাবাসীদের স্বগ্রোত্রীয় আবদুল্লাহ ইবনে উবাই নামক একজন ধনী ও প্রতিপত্তিশালী লোক ছিল। ইসলাম গ্রহণের আগে মদীনার বিভিন্ন সম্প্রদায় এ লোককে নিজেদের অধিপতি করবার জন্য প্রস্তুত হল। তার জন্য শাহী টুপি পর্যন্ত বানিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাশরীফ আনার পর সকলেই তার প্রতি আকৃষ্ট হল। ফলে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি ঈর্ষাম্বিত এবং অসন্তুষ্ট হল আর তাকে নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে ধরে নিল।

এসব খবর মক্কায় কাফেরদের জানা ছিল। তারা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইবর কাছে একখানা পত্র লিখল, হে মদীনাবাসী! তোমরা আমাদের মতাবলম্বী হয়েও আমাদের পরম শত্রু মহাম্মদকে নিজের দেশে আশ্রয় দান করেছ। হয় তোমরা তাকে ধ্বংস করে দাও, আর না হয় তাকে তোমাদের দেশ হতে বের করে দাও। আমরা আমাদের দেব-দেবীর শপথ করে বলছি, যদি এ দুটি পথের কোন একটি তোমরা গ্রহণ না কর, তা হলে নিশ্চয়ই আমরা আমাদের সর্বশক্তি নিয়ে তোমাদের উপর হামলা করব। তোমাদের যুবকদেরকে হত্যা করব এবং তোমাদের নারীদেরকে হস্তগত করব।

মক্কার কুরাইশদের প্রেরিত এ পত্রে মদীনার ভীষণ চাঞ্চল্যের, সৃষ্টি হল এবং এটা নিয়ে খুবই জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে গেল। এ খবর রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কানেও পৌঁছুল। উপরুন্তু তাঁর নিকট এমন সংবাদও পৌঁছল যে, আবদুল্লাহ বিন উবাই রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এবং মক্কা হতে আগত মুসলিম মুহাজিরদেরকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। এ সকল খবরের প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) একদিন আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর নিকট গিয়ে তাকে উপদেশ দান করলেন। শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সহিত তার একটি সন্ধিচুক্তি হয়ে গেল। কিন্তু তা সত্ত্বেও আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইয়াহুদীদের সাথে মিলিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র পাকাতে লাগল।

একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ)- একটি খচ্চরে চড়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। ঘটনাক্রমে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খচ্চরের খুরের আঘাতে মাটি উড়ে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর মুখে পড়ল।

ফলে সে অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, মাটি উড়িয়েও না, আরও বলল, হে মুহাম্মদ! তুমি কখনও ইসলামের কথা বলতে আমার নিকট আগমন করো না।

এ সময় আনসার প্রধান সা'আদ ইবনে মাআয ওমরা পালনের জন্য মক্কায় গমন করেন। আবূ জাহল তাকে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলল, তোমরা মক্কার ধর্ম পরিত্যাগীদেরকে আশ্রয় দিয়েছ, সুতরাং কা'বাগৃহে জিয়ারতে আসতে পারবে না। হযরত সা'আদ ইবনে মাআয (রা) অতি-শান্তভাবে উত্তর দিলেন, তোমরা কা'বা জিয়ারতে আসতে বাধা দিলে আমরা তোমাদের বাণিজ্যপথ বন্ধ করে দিব।

মদীনার কিছুসংখ্যক লোকের মনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)- এবং মুহাজিরদের উপর ঈর্ষা এবং হিংসা ছিল। তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রাধান্য সইতে পারছিল না বরং তাকে মদীনা হতে বিতাড়িত করার ষড়যন্ত্র করছিল। তারা খাজরাজ বংশীয় উক্ত নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর নেতৃত্বে কুরাইশদের সাথে গোপনে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বিরুদ্ধাচরণ করতে লাগল। মদীনার এ সব মুনাফিকদের সহযোগিতা লাভের ফলে মক্কায় কুরাইশদের সাহস অনেকাংশে বেড়ে গেল। এ সমস্ত মুনাফিক গোপনে কুরাইশদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। ইসলামের প্রতি তাদের এ গোপন শত্রুতা মুসলমানদের প্রতি তাদের আক্রমণের ইন্ধন যোগাতে লাগল।

ইতোমধ্যে কর্জ বিন জাবির আল ফেইরী হঠাৎ মদীনার চারণ ভুমিতে অতর্কিতে অভিযান চালিয়ে তথা হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর কয়েকটি উট লুণ্ঠন করে নিয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পক্ষ হতে বদর পর্যন্ত ধাওয়া করা হয়, কিন্তু সে দ্রুত পালিয়ে যায়। এর পরও কুরাইশ দস্যুরা মাঝে মাঝে এরূপ মদীনা সীমান্তে দস্যুপনা চালাতে লাগল।

তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) এদের এ অসৎকার্য-কলাপ বন্ধের উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহ ইবনে জাহাশের নেতৃত্বে মদীনার উপকণ্ঠে একটি পর্যবেক্ষক দল প্রেরণ করেন। তাদের দ্বারা একটি দুস্কৃতকারী কুরাইশ দলের একজন লোক নিহত এবং তিনজন বন্দী হয়। ফলে মক্কায় কুরাইশরা মুসলামানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বদ্দপরিকর হয় এবং তারা তখন শুধু সময়ের অপেক্ষা করতে থাকে।

অন্যদিকে এসময় কুরাইশ নেতা আবূ সুফিয়ান ব্যবসায় পণ্য নিয়ে সিরিয়া হতে মক্কা প্রত্যাবর্তন করছিল। রাসূলুল্লাহ (সঃ) দুজন লোক বদরের নিকটবর্তী স্থানে প্রহরী হিসেবে মোতায়েন রাখছিলেন। আবূ সুফিয়ান মদীনার মুনাফিকদের মারফত এ খবর জানতে পেরে নতুন পথে মক্কার দিকে যেতে লাগল।

কিন্তু সে আবার দ্রুত মক্কায় কুরাইশদের নিকট এরূপ খবর পাঠাল, মদীনার সীমান্তে সে মুসলামানদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। এ সংবাদ মক্কায় তুমুল হৈ-চৈ পড়ে গেল এবং সংবাদের সত্যতা যাচাই না করেই মক্কার কুরাইশদের এক হাজার যোদ্ধা আবূ জাহলের নেতৃত্বে মুসলামানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে বের হল। এ সংবাদ শুনে রাসূলুল্লাহ (সঃ) বিচলিত হয়ে পড়লেন। তখন তাঁর উপর আয়াত নাযিল হলঃ

যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে তোমরাও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, আর সীমালঙ্ঘন কর না। কারণ সীমালংঘণকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না।

পরবর্তী গল্প
বদরযুদ্ধ ও ফলাফল

পূর্ববর্তী গল্প
কিবলা পরিবর্তন

ক্যাটেগরী