বদরযুদ্ধ ও ফলাফল | আমার কথা
×

 

 

বদরযুদ্ধ ও ফলাফল

coSam ১৭৪


আল্লাহ তাআলার এ নির্দেশে মুসলামদের মনে সাহস সঞ্চার হল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাত্র তিনশ তেরজন মুজাহিদ নিয়ে কাফিরদের মোকাবেলা করার জন্য মদীনা হতে বের হলেন। কিছুদূর অগ্রসর হয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর অনুগত মুজাহিদদেরকে লক্ষ্য করে বলেন, আমরা তো কাফিরদের প্রতি আক্রমণ করতে আসিনি। আমরা কেবল কাফিরদের আক্রমণ ঠেকাতে এসেছি, কিন্তু শুনা যায়, তাদের সৈন্যবাহিনী আমাদের তুলনায় অনেক বেশি এবং শক্তিশালী। এখন তোমরা বল, আমরা কি মদীনায় ফিরে গিয়ে আত্মরক্ষা করব, না তাদের বিরুদ্ধে মদীনার বাইরে অবস্থান নিয়ে যুদ্ধ করব।

জবাবে সাহাবায়ে কিরাম বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা হযরত মূসা (আ)-এর শিষ্য নই। যারা বিপদের সময় তাকে বলেছিল, যাও তুমি ও তোমার রবই গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা বসলাম। ইয়া রাসূলুল্লাহ!! আমরা সকলে আপনার জন্য উ্ৎসর্গীত। আমরা সংখ্যায় সামান্য এবং শত্রুগণ অনেক বেশি তজ্জন্য ভাবনার কিছু নেই। আমরা এখানেই যুদ্ধ করব। একথা বলে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর হস্তধারণ করে তাঁদের দৃঢ়সঙ্কল্প প্রকাশ করলেন।

ওদিকে মক্কায় কাফিররা বদর প্রান্তরে এসে শিবির স্থাপন করল। মুসলিম বাহিনী তাদের অদূরে একটি অনুকূল স্থানে গিয়া তাঁবু গাড়লেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বয়ং বদর প্রান্তরের সর্বত্র ঘুরে এসে তাঁবুর মধ্যে তিনি তাঁর কামরায় বসে আল্লাহর দরবারে সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করেন। তারপর সাহাবীদের নিয়ে নামায আদায় করলেন।

নামায আদায় করে মুসলামানরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। এ সময় শত্রুপক্ষ মুসলামদের প্রতি অবিরাম তীর বর্ষণ করতে লাগল একটি তীর সাহাবী মেহজার বক্ষে ভেদ করলে তিনি বদর প্রান্তরে সর্বপ্রথম শাহাদতের নিয়ামত লাভ করলেন। অতঃপর আর একজন সাহাবী পানি পান করার জন্য একটি কূপের দিকে যাচ্ছিলেন, তিনিও কাফিরদের অতর্কিত তীর নিক্ষেপে শাহাদত বরণ করলেন। এভাবে মুসলামানদের দুজন মুজাহিদ যুদ্ধ শুরু হবার পূর্বেই শাহাদত বরণ করলেন।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর স্বল্পসংখ্যক সৈন্যকে কাতারবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে যুদ্ধ সংক্রান্ত শরীয়তসিদ্ধ কতকগুলো উপদেশ প্রদান করলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন, কোনক্রমেই তোমরা কোন তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাবে। তারা আক্রমণ করলে তোমরা প্রতি আক্রমণ করবে।

দোসরা হিজরী সতেরই রমজান শক্রবার জুমআর নামায অন্তে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।

মক্কায় কাফির কুরাইশরা তাদের সৈন্য-সামন্তের আধিক্য এবং অস্ত্র-শস্ত্রের প্রাচুর্যে বিশেষভাবে সুসজ্জিত ছিল। সুতরাং নেহায়েত তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের সাথে তারা বার বার দ্বৈরথ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য মুসলিম সেনাদের আহ্বান করতে লাগল। মুসলমানদের পক্ষ হতে হযরত ওমর (রাঃ)-এর ক্রীতদাস মুজ্জা ময়দানে এসে অল্পক্ষণের মধ্যেই শাহাদতবরণ করলেন। এর পরে আরও দু'জন মুসলমান শাহাদাত বরণ করলেন।

এ সময় কাফের সৈন্যদের পক্ষ হতে আসোয়াদ ইবনে আবদুল আসাদ ময়দানে উপস্থিত বিশেষভাবে আসফালন করছিল। হযরত আমীর হামযাহ (রাঃ) অগ্রসর হয়ে তাকে হত্যা করে। অতঃপর কাফেরদের তরফ থেকে ওতবা শায়বা এবং আলীদ এসে হুঙ্কার দিতে শুরু করল। তখন মুসলামানদের পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশে হযরত আলী (রাঃ) আমীর হামযাহ (রাঃ) এবং ওবাইদা (রাঃ) এগিয়ে গেলেন এবং আলী (রাঃ) অলীদকে, হামযাহ (রাঃ) শায়বাকে এবং ওবাইদা (রাঃ) ওতবাকে হত্যা করলেন।

এর পরপরই উভয়পক্ষে ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। এ সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত আবূবকর (রা)-কে লক্ষ্য করে বলেন, আবূবকর! আমাদের জন্য আল্লাহর সাহায্য নাযিল হয়েছে কিছুক্ষণের মধ্যে কাফির সেনানায়ক আবু জাহলের পতন ঘটল। মুসলমানরা বিপুল-বিক্রমে কাফির সৈন্য সংহার করে চললেন। কাফিরদের বিপর্যয় দেখা দিল।

তারা যুদ্ধ ক্ষেত্র হতে পলায়ন করতে শুরু করল। অল্পক্ষণের মধ্যে তাদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটল। এ যুদ্ধে কাফের পক্ষের আবূ জাহল, ওতবা ও শায়বা প্রমুখ এগারজন নেতাসহ মোট সত্তরজন মুজাহিদ শাহাদাতবরণ করেন। এ যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষে সবুজ পাগড়িধারী বহুসংখ্যক আশ্বারোহী সৈন্য দৃষ্ট হয়েছিল, তারা সকলেই ছিলেন আল্লাহ্‌র ফেরেশতা।

যুদ্ধে মুসলমানরা একশত পঞ্ছাশটি উট, অশ্ব এবং বিপুল পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য অস্ত্র-শস্ত্র গনীমতের মাল হিসেবে লাভ করেছিল। এ যুদ্ধে কুরাইশরা এরূপ শোচনীয় পরাজিত হবে তা তারা কল্পনাও করতে পারেনি।

যুদ্ধ শেষে কাফের বন্দীদেরকে মদীনায় নিয়ে যাওয়া হল। তারপর তাদের নিকট হতে অবস্থাভেদে কাউকে মুক্তিপণের বিনিময়ে কাউকেও বিনা মুক্তিপণে, কাউকেও বিশেষ শর্তে মুক্তি দেয়া হল।

রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর চাচা আব্বাসও (রা) এসময় বন্দী হয়েছিলেন। তাকেও মুক্তি পণের বিনিময়ে মুক্তি দেয়া হয়। রাসূলুল্লাহ (স)-এর জামাতাও বন্দী হয়েছিলেন। তিনি অর্থ সংগ্রহ ব্যর্থ হয়ে স্ত্রী জয়নবের গলার হার মুক্তিপণ হিসেবে রাসূল (সঃ)-এর খেদমতে পেশ করল। এ হার দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) মনে খুব ব্যথা পেলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর নিকট হতে এ হার না রেখে কয়েকটি শর্তের ভিত্তিতে ছেড়ে দেয়া হল।

বদর যুদ্ধে মুসলামানদের চরম বিজয়ের ফলে ইসলামের একটি নব যুগের সূচনা হল। এতে মুসলমানদের মনে দারুণ সাহসের সঞ্চার হল এবং ইসলামের প্রতি তাদের আস্থা অধিকতর সুদৃঢ় হল।

তাছাড়া এতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর সম্মান ও মর্যাদা দূর দূরান্তরে ছড়িয়ে গেল। পক্ষান্তরে এ যুদ্ধে বর্বর কুরাইশদের শক্তির গর্ব অনেকাংশে খর্ব হয়ে গেল। যে সকল মুসলিম মুজাহিদ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর শ্রেষ্ঠ সাহাবীর মর্যাদা লাভ করলেন। 

পরবর্তী গল্প
নবী-করীম (স)-কে হত্যার আরেক ষড়যন্ত্র

পূর্ববর্তী গল্প
বদর যুদ্ধের পটভুমি

ক্যাটেগরী