নাজরান প্রতিনিধি দল

নাজরান আরব দেশীয় খ্রীষ্টানদের কেন্দ্রভূমি। ইয়ামানের নিকট অবস্থিত একটি বিস্তৃত এলাকার নাম। সপ্তম হিজরী সনে অথবা তারও কিছু পরে রাসূল (সাঃ) নাজরান এলাকায় ইসলাম অধিবাসীদের একটা সংশয়ের জবাব দিতে ব্যর্থ হয়ে মদীনায় ফিরে আসেন। এর পর রাসূল (সাঃ) জনৈক দূতকে পত্র দিয়ে নাজরানবাসীর নিকট পাঠান, যাতে নাজরীনবাসীর প্রতি ইসলাম গ্রহণের আহবান ছিল। এ পত্র পেয়ে নাজরানের খ্রীষ্টান বিশপ অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে শোরাহবিল নামক জনৈক বিচক্ষণ হামাদানবাসী খ্রীষ্টানের পরামর্শ কামনা করেন।

শোরাহবিল বিচলিত বিশপকে বলেন, কর্তব্য আপনাকেই স্থির করতে হবে। তবে আমি এটুকু বলতে পারি, এ কালে ইসমাইল বংশ হতে একজন রাসূলের আগমন ঘটবে এ কথা আমরা বহু দিন থেকেই শুনে আসছি। আলোচ্য আরবীয় রাসূল হয়ত সে লোকই হবেন। আরেকজন বিশিষ্ট খ্রীষ্টানকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও অনুরূপ জবাবই দেন। এতে বিশপ ফাঁপরে পড়েন। তিনি গির্জার উপর চটের পর্দা ঝুলাতে এবং অবিরাম ঘন্টা বাজাতে নির্দেশ দেন।

সেকালে ভয়ংকর বিপদের সংবাদ দিতে এরূপ করার রীতি তাদের মাঝে প্রচলিত ছিল। এ গির্জার অধীন তেহাত্তরটি গ্রাম ছিল। তাদের লোক সংখ্যা সম্পর্কে শুনা যেত- নাজরানী খ্রীষ্টানরা যেকোন যুদ্ধে তারা একলক্ষ যোদ্ধা ময়দানে নামাতে সক্ষম হত। অসময়ে ঘন্টাধ্বনি এবং গির্জার উপর চটের পর্দা ঝুলান দেখে খ্রীষ্টানরা বিচলিত হয়ে গির্জা অভিমুখে ছুটে আসে। লোকজন একত্রিত হলে প্রধান পাদ্রী তারেক রাসূল (সাঃ)-এর চিঠি পাঠ করে শুনান।

পত্র পাঠের পর তারা দীর্ঘ আলাপ আলোচনার শেষে তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, প্রধান প্রধান বিশপ, যাজক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সাথে নিয়ে অবিলম্বে মদীনা গমন করবেন। তারা মদীনায় পৌঁছে মুহাম্মাদ ও তাঁর প্রচারিত দ্বীন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তী কর্তব্য স্থির করবেন। সেমতে ষাট জন যাজক ও বিশিষ্ট ব্যক্তির এক প্রতিনিধিদল নবম হিজরীতে মদীনায় পৌঁছেন। এ প্রতিনিধি দল আসর নামাযের সময় মদীনায় মসজিদে নববীতে পৌঁছেন এবং সেখানে উপাসনার অনুমতি চান, এতে সাহাবায়ে কিরাম আপত্তি করা সত্ত্বেও রাসূল (সাঃ) নাজরান প্রতিনিধি দলকে মসজিদে উপাসনার অনুমতি দেন।

তারা নিজেদের ধর্মীয় রীতিতে পূর্ব দিকে ফিরেই উপাসনা শেষ করে। এ প্রতিনিধি দলের সাথে আগত প্রধান বিশপ আয়হাম এবং প্রধান পুরোহিত আগমনকালেই রাসূল (সাঃ)-এর সাথে মোলাআনা করার বদ মতলব এঁটে আসে। আমি মিথ্যাবাদী হলে আমার উপর লালত হোক একে অন্যকে এ বলে লানত করাকে পরিভাষায় মোলআনা বলা হয়। কিন্তু রাসূল (সাঃ)-এর চেহারা দর্শনেই তাদের বুক কেঁপে উঠে। তারা পরস্পরে বলাবলি করতে লাগল, মোলাআনা করে কাজ নেই। ইনি প্রকৃতই আল্লাহর রাসূল হলে আমাদের সর্বনাশ হবে।

নাজরান প্রতিনিধি দল রাসূল (সাঃ)-এর সাথে দ্বীন নিয়ে অনেক আলাপ আলোচনা করে। দীর্ঘ আলোচনার পর তারা নিশ্চিত হয় যে, এ বিষয়ে তারা সুবিধা করতে পারবে না। পক্ষান্তরে মোলাআনারও সাহস তাদের হচ্ছে না। উপায়ান্তর না দেখে তারা সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব করে নবপ্রতিষ্ঠিত আরব সাধারণতন্ত্রের সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে এজন্য তাদেরকে কি পরিচয় কর প্রদান করতে হবে তা মীমাংসা করার জন্য রাসূল (সাঃ)-কে অনুরোধ জানায়। রাসূল (সাঃ)-এর স্বভাবজাত উদারতার ফলে অল্পক্ষণের মধ্যেই সন্ধির শর্তগুলো স্থির হয়ে যায়। তখন রাসূল (সাঃ) নাজরানবাসীকে নিম্নোক্তদ্ধৃত বিষয়বস্তু সম্বলিত একখানা সনদপত্র লিখে দেন।

রাসূল (সাঃ) প্রতিজ্ঞা সম্ভাব্য সকল পন্থায় আমরা নাজরানবাসীকে নিরাপদ রাখব, তাদের দেশ, তাদের বিষয় সম্পত্তি, ধন-সম্পদ, ধর্মীয় যাবতীয় আচার অনুষ্ঠান আগের ন্যায় অক্ষুণ্ণ থাকবে। তাদের সামাজিক আচার ব্যবহার, বিষয়গত স্বত্বাধিকার এবং ধর্মীয় সংস্কারে মুসলমানরা অর্থ বিনিময়ে ব্যতিত নাজরানবাসীদের নিকট থেকে অন্য কোন প্রকার উপকার গ্রহণ করতে পারবে না। তাদের নিকট থেকে ওশর আদায় করা হবে না, তাদের দেশের অভ্যন্তরে দিয়ে সৈন্য চালনা করা হবে না। তাদের কোন ধর্মাযাজক পুরোহিতকে পদচ্যুত করা হবে না। কোন সন্নাসীর সাধনার বিঘ্ন সৃষ্টি করা হবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ শান্তি ও ন্যায়ের মর্যাদা রক্ষা করে চলবে, ততক্ষণ এ সনদের শর্তগুলো সমভাবে বলবত থাকবে। তারা অত্যাচারী বা অত্যাচারিত না হোক।

নাজরান প্রতিনিধি মদীনা থেকে দল নিজদেশে গমনের পর সেখানকার প্রধান বিশপের চাচাত ভাই বেশর জনসম্মুখে প্রকাশ করলেন, ইনিই প্রত্যাশিত শেষনবী। আমি তাঁর সন্নিধানে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। নাজরানের গির্জায় একজন তপস্যামগ্ন সন্নাসী ছিলেন। তিনিও পাদ্রীদের মুখে সব বৃত্তান্ত শুনে মদীনায় ছুটে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। এসব মনীষীর প্রচার প্রচারণায় দিন দিন নাজরান অঞ্চলে ইসলামের প্রসার হতে থাকে।

এভাবে দাওস, আসাদ, কেন্দা, আশআর, হেমইয়ার প্রভৃতি আরবের প্রাচীন সম্ভ্রান্ত গোত্রের পৌত্তলিক, খ্রীষ্টান ও অগ্নিপূজকদের অধিকাংশই রাসূল (সাঃ) সমীপে দূত বা প্রতিনিধি দল প্রেরণপূর্বক ইসলাম গ্রহণ করে। অবশিষ্ট কিছু গোত্র সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়ে করদানে স্বীকৃত হয়। কালক্রমে এরাও ইসলামের মাহাত্ম্যে আকৃষ্ট হয়ে মুসলমান হয়ে যায়।

আরো পড়তে পারেন

দুঃখিত, কপি করবেন না।