নবুয়ত দান

তুর পাহাড়ে আল্লাহ তায়ালা মূসা (আঃ) -কে নবুয়ত প্রদান করেন। তিনি হযরত মূসা (আঃ) -কে লক্ষ্য করেন বলেনঃ

وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَىٰ

অর্থঃ আর আমি নবী হিসেবে তোমাকে মনোনীত করেছি। সুতরাং তোমার প্রতি যে সকল ওহী করা হয় তা অত্যন্ত মনোযোগের সাথে শুন।

অনন্তর আল্লাহ তায়ালা হযরত মূসা (আঃ)-কে দ্বীনের সকল মূল নীতিসমূহ শিখালেন দ্বীনের মূল বিষয়সমূহ হচ্ছে – তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাত। তাওহীদ সম্পর্কে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন –

إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَـٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي

নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই। সুতরাং আমার ইবাদত কর। আর আমাকে স্মরণের জন্য নামাজ কায়েম কর। (সূরা ত্বাহাঃ আয়াত- ১৪)

অতঃপর আখিরাত সম্পর্কে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন –

إِنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ أَكَادُ أُخْفِيهَا لِتُجْزَىٰ كُلُّ نَفْسٍ بِمَا تَسْعَىٰ

فَلَا يَصُدَّنَّكَ عَنْهَا مَن لَّا يُؤْمِنُ بِهَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ فَتَرْدَىٰ

কিয়ামত অবশ্যসম্ভাব্যী। আমি কিয়ামত আসার নিদির্ষ্ট তারিখ সমস্ত সৃষ্টির কাছে গোপন রাখতে চাচ্ছি। কিয়ামত এজন্য আসবে যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি স্বীয় কৃতকর্মের প্রতিফল পেতে পারে। কাজেই আপনাকে যেন এমন ব্যক্তি কিয়ামতের জন্য প্রস্তুত হওয়া থেকে বিরত না রাখতে পারে। যে এ সম্পর্কে বিশ্বাস রাখে না এবং স্বীয় প্রবৃত্তির অনুসরণ করে চলে। যদি কিয়ামতের জন্য প্রস্তুত হতে নিলির্প্ত হয়ে যাও তা হলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।

আল্লাহ তায়ালা নবুয়ত দিয়ে দ্বীনের মূল বিষয়সমূহ শিক্ষা দিয়ে ফেরাউনের হেদায়াতের জন্য মূসা (আঃ)-কে পাঠাতে চাইলেন। যেহেতু তিনি ফেরাউনের দ্বীনে হকের দাওয়াত দিতে গেলে ফেরাউন তাঁর দ্বীনের সভ্যতার প্রমাণ চাইবে সেহেতু এর সভ্যতা সম্পর্কে অলৌকিক নিদর্শন পেশ করার প্রয়োজন হবে। তাই আল্লাহ তায়ালা নবীকে অলৌকিক নিদর্শন সম্পর্কে অবগত করতে চান। এদিকে হযরত মূসা (আঃ) নবুয়ত পাওয়ার পর কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। এখানে উপস্থিত হয়েছিলেন এক উদ্দেশ্যে আর প্রাপ্ত হলেন নবুয়ত। তদুপরি তখন পর্যন্ত হযরত মূসা (আঃ) হতে আল্লাহ পাকের কথা শ্রবণের ভয় ও আতঙ্ক দূরীভূত হয়নি। তিনি ভীত হয়ে

পড়েছিলেন। আল্লাহ পাক তাঁর এ অবস্থার অবসানের জন্য অতি নম্রভাবে জিজ্ঞেস করলেন যে, وَمَا تِلْكَ بِيَمِينِكَ يَا مُوسَىٰ

হে মূসা! তোমার হাতে এটা কি? আল্লাহ তায়ালার বন্ধুসুলভ কথায় তাঁর মধ্যে যে হতভম্বতা ছিল দূরভীত হল। তিনি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। এ স্বাভাবিকতা আল্লাহর সাথে সহজভাবে কথা কলায় উদ্বুদ্ধ করল। তাই তিনি আল্লাহর জিজ্ঞাসার জবাবে বলেন-

قَالَ هِيَ عَصَايَ أَتَوَكَّأُ عَلَيْهَا وَأَهُشُّ بِهَا عَلَىٰ غَنَمِي وَلِيَ فِيهَا مَآرِبُ أُخْرَىٰ

অর্থঃ এটা আমার লাঠি! আমি এর উপর ভর করি, আর এর দ্বারা আমার ছাগলসমূহের জন্য পাতা পাড়ি। (সূরা ত্বাহাঃ আয়াতাংশ- ১৮)

কথা বলতে বলতে হঠাৎ তাঁর মনে উদয় হল যে, কথা অধিক বলায় না জানি ভদ্রতার পরিপন্থী হয়ে যায়- তাই তিনি সাথে সাথে সংক্ষেপ করে বলেন- وَلِيَ فِيهَا مَآرِبُ أُخْرَىٰ

অর্থঃ এবং এর দ্বারা আমার আরো অনেক প্রয়োজন মিটিয়ে থাকি।

আল্লাহ তায়ালা হযরত মূসা (আঃ)-কে বলেন, ঠিক আছে। তবে তুমি তোমার লাঠি মাটিতে ফেল। আল্লাহর নির্দেশ পেয়ে হযরত মূসা (আঃ) তৎক্ষণাৎ হাতের লাঠি মাটিতে ফেলে দিলেন। আর তৎক্ষণাৎ লাঠিটি এক বিরাট অজগর সাপে পরিণত হল। তাঁর লাঠির মাথার দিকে দুটি চোয়ালের ন্যায় ছিল। সে অজগরের দুটি চোয়ালের সৃষ্টি হল। মনে হল যেন অজগরটি কাকেও গিলে ফেলার জন্য হা করে আছে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে-

قَالَ أَلْقِهَا يَا مُوسَىٰ

فَأَلْقَاهَا فَإِذَا هِيَ حَيَّةٌ تَسْعَىٰ

অর্থঃ আল্লাহ পাক বলেনঃ হে মূসা! তুমি এটি মাটিতে ফেল। তাই তিনি এটি মাটিতে ফেললেন। তৎক্ষণাৎ এটি একটি ধাবমান সাপে পরিণত হল। (ত্ব-হা)

সাধারণত অজগর সাপ খুব ধীর গতিতে চলে। কিন্তু এটি দ্রুত এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছিল যে, মনে হচ্ছিল যেন এটা একটি ছোট সাপ। কেননা, ছোট সাপই বেশি ছুটাছুটি করে। হযরত মূসা (আঃ) এত বড় সাপের হা করে এদিক সে দিক ছুটাছুটি দেখে ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি ভীত সন্ত্রস্ত্র এ স্থান ত্যাগ করতে চাইলেন। তখন আল্লাহ তাঁকে অভয় দানের উদ্দেশ্যে বলেন, হে নবী! তুমি ভউ পেও না এ সাপ তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। শত্রুকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে তোমাকে এ অলৌকিক নিদর্শন প্রদান করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে-

فَلَمَّا رَآهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَّىٰ مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ ۚ يَا مُوسَىٰ لَا تَخَفْ إِنِّي لَا يَخَافُ لَدَيَّ الْمُرْسَلُونَ

অতঃপর যখন তিনি ওটাকে চিকন সাপের ন্যায় নড়াচড়া করতে দেখলেন তখন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করলেন এবং পিছনে ফিরেও দেখলেন না। হে মূসা! সামনে অগ্রসর হও। ভয় কর না। নিশ্চয়ই তুমি নিরাপব লোকদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা নামলঃ আয়াতঃ ১০)

এ কথা শুনে হযরত মুসা (আঃ) প্রত্যাবর্তন করলেন। আল্লাহ পাক তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, এটা প্রকৃতপক্ষে সাপ নয় বরং অলৌকিক নিদর্শন প্রদর্শন করার পন্থা শিক্ষা দেয়ার জন্যই লাঠিকে সাপে পরিণত করা হয়েছে। সুতরাং তুমি নির্ভয়ে সাপটি হাত দিয়ে ধর। আমি একে পুনরায় লাঠিতে পরিণত করে দেব।

আল্লাহ পাক এরশাদ করেন-

قَالَ خُذْهَا وَلَا تَخَفْ ۖ سَنُعِيدُهَا سِيرَتَهَا الْأُولَىٰ

অর্থঃ বলেন হে মূসা (আঃ) তুমি এটা নির্ভয়ে ধর। শীঘ্রই আমি এটাকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিব। (ত্ব-হা)

হযরত মূসা (আঃ) এ নির্দেশ পাওয়ার পর নির্ভয়ে সাপটি ধরলেন। আর সাথে সাথে এটা পুনরায় দু চোয়াল ওয়ালা লাঠিতে পরিণত হয়ে গেল।

অতঃপর আল্লাহ হযরত মূসা (আঃ)-কে দ্বিতীয় অলৌকিক নিদর্শন প্রদান করেন। তিনি হযরত মূসা (আঃ) -কে বলেন-

اسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوءٍ وَاضْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ ۖ فَذَانِكَ بُرْهَانَانِ مِن رَّبِّكَ إِلَىٰ فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ ۚ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ

অর্থঃ তুমি তোমার হাত বুকের ভিতরের অংশে রাখ। এটা খুবই উজ্জ্বল হয়ে প্রকাশ পাবে। কিন্তু মনে রাখবে কোন রোগের কারণে এরূপ হবে না। বরং ভয় দূরীকরণার্থে তোমার হাত পুনরায় আপনা বগলের সাথে সংযুক্ত কর। (তখন তা পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে)। এ দুটি আপনার রবের পক্ষ থেকে দলিল। ফেরাউন ও তাঁর পরিষদের কাছে গমনের জন্য। কেননা, তারা অত্যন্ত পাপাচারী জাতি। (সূরা কাসাসঃ আয়াত- ৩২)

আল্লাহ পাক বলেনঃ হে মূসা! আমার অসংখ্য নিদর্শনসমূহের হতে আমি তোমাকে এ দুইটি নিদর্শন প্রদান করেছি যেন ফেরাউনকে এবং তার অধীনস্থ লোকদেরকে আমার তাওহীদের দিকে আহবান করবে। কেননা, তারা আমার নাফারমানিতে লিপ্ত রয়েছে। তুমি আমার পক্ষ হতে প্রেরিত সত্যতার প্রমাণস্বরূপ তোমাকে উল্লেখিত নিদর্শনদ্বয় দেয়া হল। সুতরাং তুমি ফেরাউনকে সত্য পথের দিকে আহবানের জন্য মিশর চলে যাও। কোরআনের ভাষায়-

لِنُرِيَكَ مِنْ آيَاتِنَا الْكُبْرَى

اذْهَبْ إِلَىٰ فِرْعَوْنَ إِنَّهُ طَغَىٰ

অর্থঃ যেন আমি স্বীয় কুদরতের বড় বড় নিদর্শন হতে তোমাকে কোন কোন নিদর্শন প্রদর্শন করতে পারি। (সূরা ত্ব-হাঃ আয়াত- ২৩-২৪)

হযরত মূসা (আঃ) ফেরাউনের কাছে দ্বীনে হকের দাওয়াত দাওয়াত নিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ পাওয়ার পর আল্লাহর দিকে রুযু হলেন, এত বড় দায়িত্ব একমাত্র আল্লাহর সাহায্য ছাড়া আদায় করা সম্ভব নয়। অধিকন্তু দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অহংকারী ও অত্যাচারী শাসক ফেরাউনের কাছে দ্বীনে হকের কথা বলতে গিয়ে বিভিন্ন প্রকার বিপদাপদের মধ্যে পতিত হওয়া অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং আসন্ন বিপদাপদের মোকাবিলায় যে সাহসের প্রয়োজন তাও একমাত্র আল্লাহর তরফ থেকেই পাওয়া সম্ভব। তাই তিনি স্বীয় শক্তি সামর্থের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভরসা করেন এবং আল্লাহ তায়ালার কাছে কয়েকটি প্রার্থনা করেন। প্রথমে প্রার্থনা হল- رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي হে আমার রব! আপনি আমার অন্তর প্রশস্ত করে দিন। যাতে আমার অন্তর নবুয়তের দায়িত্ব বহন করার ক্ষমতা পায়। তদুপরি দ্বীনে হকের দাওয়াত দিতে গিয়ে মানুষের কাছ থেকে কত কটুকথা, তিরস্কার, ভৎর্সনা এবং উপহাস বিদ্রূপ শুনতে হবে। হে আমার রব! এসব কিছু সহ্য করে দ্বীনে হকের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার শক্তি দান করুন।

তদুপরি নবুয়তের এত বড় দায়িত্ব পালন করা সহজ কাজ নয়। আল্লাহ তায়ালা যাতে তাঁর কাজ সহজ করে দেন সে জন্য তাঁর দরবারে দোয়া করেন- وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي আমার দায়িত্ব আমার জন্য সহজ সাধ্য করে দিন। কেননা কোন কাজ সাধ্য হওয়া বা কঠিন হওয়া আল্লাহ পাকের কুদরতী হাতে। তিনি কোন কার্যকে সহজ করতে চাইলে তা যত কঠিন হউক না কেন তা অতি সহজ হয়ে পড়ে। আবার কোন কাজ কঠিন করতে চাইল তা যত সহজই হোক তা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন সহজ সাধ্য করে দেয়ার জন্য আল্লাহ পাকের কাছে প্রার্থনা করেন।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিশু অবস্থায় হযরত মূসা (আঃ)-কে ফেরাউন কোলে দেয়ার পর তিনি ফেরাউনের দাড়ি ধরে টেনে তার মাথা নত করিয়ে ফেলায় সে পরিষদের সামনে নিজেকে অপমানিত বোধ করে। ফেরাউন এতে ক্রোধান্বিত হয়ে শিশু মূসা হত্যা করতে উদ্যত হলে তার স্ত্রী বাঁধা হয়ে দাঁড়ালেন, তিনি বলেন- সে অবুঝ শিশু। তার স্ত্রী আছিয়ার এ দাবীর সত্যতা প্রমাণের জন্য শিশু মূসার সামনে জ্বলন্ত অঙ্গার ও লাল হীরক খণ্ড রাখা হয়েছিল। শিশু মূসা এ জ্বলন্ত অঙ্গার মুখে পুরে দিয়েছিলেন। ফলে তাঁর জিহ্বা পুড়ে গিয়েছিল। আর এতে তিনি ভাল করে কথা বলতে পারতেন না বরং কথা বলতে গেলে মুখে জড়তা এসে যেত। তাই তিনি আল্লাহ পাকের কাছে আবেদন করেন যে- وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي

يَفْقَهُوا قَوْلِي অর্থঃ এবং আমার জিহ্বার জড়তা দূর করে দিন যাতে লোকে আমার কথা বুঝতে পারে। (সূরা ত্ব-হাঃ আয়াত- ২৮)

দ্বীনে হকের তাবলীগ করতে গিয়ে কোন মানবীয় দুর্বলতা যেন পিছু টানতে না পারে সেজন্য তিনি বলেন, হে আমার রব! আমি সর্বাবস্থায়ই যেন আপনার নির্দেশ পালনে সম্পুর্ণরূপে প্রস্তুত থাকি। কিন্তু যেহেতু আমি মানুষ, তাই আমি দুর্বল ও সামর্থহীন। সর্বক্ষেত্রে আপনার সাহায্য ও অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল। হে আমার রব! আপনি তো জানেন ফেরাউন সারা মিশরে তাঁর অত্যাচারের জাল বিস্তার করে রেখেছে। সমস্ত মিশরে তাঁর মতের বিরুদ্ধে কোন কিছু করার শক্তি কারো নাই। তাছাড়া আমি তার কওমের এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলাম। আর এই কারণেই আমি মিশর ত্যাগ করে মাদইয়ান চলে গিয়েছিলাম। আমার ভয় হয় আমি মিশরে পৌঁছুলে তারা আমাকে দেখামাত্রই না হত্যা করে ফেলবে। তা হলে আমি তার কাছে আপনার পয়গাম কিভাবে পৌঁছাতে পারব? আপনার পয়গাম তাদের সামনে প্রকাশ করবার পূর্বেই তো আমার জীবন শেষ হয়ে যাবে।

আল্লাহ হযরত মূসা (আঃ)-কে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, তুমি ভয় পেওনা না, তারা এরূপ করতে সক্ষম হবে না। অতঃপর তিনি স্বীয় কথা বলার জড়তার কথা প্রকাশ করে আল্লাহ পাকের কাছে একজন সাহায্যকারী ও সহায়ক চান। তন্মধ্যে তিনি স্বীয় জ্যৈষ্ঠ ভ্রাতা হারুনের কথা বলেন। কেননা, ফেরাউনের দরবারে যখন তিনি তাঁর রবের সংবাদ হাযির করবেন তখন হয়ত তিনি মুখের জড়তার জন্য সবকথা গুছিয়ে বলতে পারবেন না। তখন তাঁর উপস্থাপিত বক্তব্যকে পরিষ্কার ভাষায় সাফ সাফভাবে দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে অকাট্য করে ফেরাউন ও তার লোকদের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজন হবে। আর সে জন্য এরূপ গুণবিশিষ্ট একজন লোকের প্রয়োজন। এ কাজের জন্য হযরত হারুন (আঃ)-কে নির্ধারণ করার জন্য তিনি প্রস্তাব পেশ করেন –

وَاجْعَل لِّي وَزِيرًا مِّنْ أَهْلِي هَارُونَ أَخِي اشْدُدْ بِهِ أَزْرِي وَأَشْرِكْهُ فِي أَمْرِي

অর্থঃ আর আমার জন্য একজন সাহায্যকারী নিযুক্ত করে দিন। আমার পরিজন হতে অর্থাৎ আমার ভাই হারুনকে। আর তার দ্বারা আমার শক্তি বৃদ্ধি করে দিন এবং তাকে আমার কাজে সহকারী করে দিন। (সূরা ত্ব-হাঃ আয়াত-২৯-৩১)হযরত মূসা (আঃ) তাঁর সাহায্যকারী হিসেবে ভাই হারুনকে নির্ধারিত করবার প্রস্তাব দিয়েছে এজন্য যে হযরত হারুন (আঃ) ছিলেন সুস্পষ্টভাষী এবং হযরত মূসা (আঃ)-এর বক্তব্যকে যুক্তি প্রমাণ দিয়ে অকাট্য করে তুলবার যোগ্যতা রাখতেন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হচ্ছে-

অর্থঃ তিনি আবেদন করলেন হে আমার রব! আমি তাদের এক লোক হত্যা করেছিলাম, সুতরাং আমার ভয় হচ্ছে তারা আমাকে হত্যা করবে। আর আমার ভাই হারুন, আমার চেয়ে বাকপটু, কাজেই তাঁকে আমার সহযোগীরূপে আমার সাথে নবুয়ত দান করুন, তিনি আমার সত্যতা প্রতিপাদন করবেন, আমার ভয় হচ্ছে তারা আমাকে মিথ্যা সাবস্ত্য করবে। আল্লাহ বলেন, আমি এখনই তোমার ভাইকে দিয়ে তোমার বাহু শক্তিশালী করে দিচ্ছি এবং তোমাদের উভয়কে এক বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করছি, তারা কাছে আসতে পারবে না, তোমরা আমার মোজেজাসমূহসহ যাও। যারা তোমাদের অনুসরণ করবে, জয়ী হবে।

অন্য একস্থানে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন-

অর্থঃ আল্লাহ পাক বলেন, হে মূসা! আপনার আবেদন মঞ্জুর করা হল। (সূরা ত্ব-হা)

আল্লাহ তায়ালা হযরত হারুন (আঃ)-কে নবুয়ত প্রদান করলেন। হযরত মূসা (আঃ) -কে পরিষ্কারভাবে অবগত করালেন যে, তোমার ভাই হারুন-কেও নবুয়ত প্রদান করা হয়েছে।

কাজেই তুমি অনতিবিলম্বে মিশরে রওয়ানা হয়ে যাও। এদিকে আল্লাহ তায়ালা হযরত হারুন (আঃ)-কে ফেরেশতার মাধ্যমে অবগত করালেন যে, তাঁকে নবুয়ত প্রদান করা হয়েছে। হযরত মূসা (আঃ)-এর পুরা ঘটনাও তাঁকে অবগত করান হল। সাথে সাথে এও বলে দেয়া হল যে, তিনি যেন হযরত মূসা (আঃ)-এর দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। আর মূসা (আঃ) মিশরে আগমন করছেন। তিনি যেন অনতিবিলম্বে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য এগিয়ে যান। তিনি মূসা (আঃ)-কে অভ্যর্থনার জন্য শহরের বাহিরে এসে অপেক্ষা করতে থাকেন।

হযরত মূসা (আঃ) আগুনের উদ্দেশ্যে পাহাড়ে গমনের পর তাঁর প্রত্যাবর্তনের বিলম্ব দেখে তাঁর স্ত্রী সফূরা চিন্তিত হয়ে পড়েন। পুনঃ পুনঃ পথের দিকে তাকাচ্ছিলেন। ইতোমধ্যে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে তাঁর এক সন্তান জন্মগ্রহণ করে। আল্লাহ তায়ালার সাথে কথাবার্তা শেষে হযরত মূসা (আঃ) স্ত্রীর কাছে প্রত্যাবর্তন করেন। অপেক্ষমাণ স্ত্রীকে সমস্ত ঘটনা সবিস্তরে বর্ণনা করেন।

তাঁর গৃহের লোকেরা সবাই বনী ইসরাইলী এবং নবীর বংশধর। অতিথি পরায়নতা তাদের বংশগত ঐতিহ্য তাই হযরত মূসা (আঃ)-এর জননী তাদেরকে অতিথি হিসেবে সাদরে গ্রহণ করেন এবং বিশেষ ভাবে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে স্বগৃহে অবস্থান করতে দিলেন। ক্ষণিক পরেই হযরত হারুন (আঃ) গৃহে ফিরেন। তিনি এতক্ষণ হযরত মূসা (আঃ)-এর অপেক্ষায় শহরের বাইরে অবস্থান করছিলেন। সন্ধ্যার পর পর্যন্ত বিলম্ব করেও হযরত মূসা (আঃ)-এর সন্ধ্যান না পেয়ে নিরাশ হয়ে আগামী দিনে পুনরায় অভ্যর্থনার জন্য আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। তারা হযরত মূসা (আঃ)এর জন্য সদর রাস্তা ধরে শহরে প্রবেশ করেছিলেন। তাই তাদের সাথে সাক্ষাত ঘটেনি। হযরত হারুন (আঃ) গৃহে প্রত্যাবর্তনের পর এক মুসাফির আগমন সংবাদ পেয়ে মুসাফিরের সাথে সাক্ষাতের জন্য গেলেন। তিনি সেখানে গিয়েই বুঝতে পারলেন মুসাফির আর কেউ নন তাঁর ভ্রাতা হযরত মূসা (আঃ)। তাঁরা পরস্পর পরিচিত হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন। অতঃপর হযরত হারুন (আঃ) স্বীয় ভ্রাতার স্ত্রী সন্তানকে অন্দর মহলে নিয়ে গেলেন। মাতার কাছে হযরত মূসা (আঃ)-এর আগমন সংবাদ প্রদান করলেন। সংবাদ পেয়ে দৌড়ে এসে হযরত মূসা (আঃ)-কে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

হযরত মূসা (আঃ) তাঁর এত দিনের সমস্ত কাহিনী মাতার কাছে সবিস্তরে বর্ণনা করলেন। হযরত মূসা (আঃ) হযরত হারুন (আঃ)-কে জানালেন যে, আল্লাহ তায়ালা তাঁদের উভয়কে নবুয়ত প্রদান করেছেন। ফেরাউনকে সত্য দ্বীনের প্রতি আহবানের দ্বায়িত্ব প্রদান করেছেন। কাজেই আমাদের প্রধান ও প্রথম দায়িত্ব হল ফেরাউনকে দ্বীনে হকের দিকে আহবান করা কাজেই আমাদের উভয়কে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি প্রস্তুত নিতে হবে।

আরো পড়তে পারেন

দুঃখিত, কপি করবেন না।