দাম্পত্যজীবন ইসলাম ও নারী | আমার কথা
×

 

 

দাম্পত্যজীবন ইসলাম ও নারী

coSam ২০


নারীর প্রতি প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মনােভাব সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রাচ্যে নারীর ভালােবাসা মর্যাদা ও আভিজাত্যের জন্য হানিকর। তাদের জীবনব্যবস্থায় নারী একটা কমদামি কুপির মতাে, যা ঘরকে আলাে দেয় ঠিকই; কিন্তু গৃহকোণকে কালাে করে ফেলে। অন্যদিকে প্রতীচ্যে নারীই সব—যেন পূজ্য দেবী। রীতিমতাে তাদের শ্লোগান—দেবী খুশি, তাে সবই খুশি। সেখানে কোনাে মত বা মতাদর্শের গ্রহণযােগ্যতাও নির্ভর করে—তাতে নারীকে কেমন মূল্য দেওয়া হয়েছে তার ওপর। ইসলামের সরল পথ বিপরীতমুখী দুই প্রান্তিকতাকেই প্রত্যাখ্যান করে। ইসলামে নারী না জীবনের সব, না জীবনের গজব।

ইসলামে নারীর সুন্দরতম ব্যাখ্যা : নারী—জীবন ও জগতের টানাপােড়েনে, সুখে-দুখে পুরুষের সঙ্গিনী, সান্ত্বনা ও প্রশান্তি। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً
অর্থ : তাঁর একটি নিদর্শন এই যে, তিনি তােমাদের থেকেই সৃষ্টি করেছেন তােমাদের স্ত্রীগণকে, যেন তােমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করাে। আর তিনি তােমাদের মাঝে স্থাপন করেছেন ভালােবাসা ও মায়া। (সূরা রুম, আয়াত : ২১)
 
পরিবারের প্রতি কেমন ছিলেন প্রিয় রাসূল 
যাই হােক, ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকার আমাদের আলােচ্য বিষয় নয়। আমরা শুধু দেখানাের চেষ্টা করব—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হযরত আয়েশা রাযি.-এর দাম্পত্যজীবন কেমন ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন "তােমাদের মধ্যে সেই সবচেয়ে ভালাে মানুষ, যে তার স্ত্রীর কাছেও সবচেয়ে ভালাে মানুষ। আমি আমার স্ত্রীর কাছেও সবচেয়ে ভালাে মানুষ।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্যের যথার্থতা পাওয়া যায় হযরত আয়েশা রাযি.-এর সঙ্গে তার দীর্ঘ নয় বছরের দাম্পত্যজীবন থেকে।

এতদিনের দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনে (ঈলার ঘটনা ছাড়া) পারস্পরিক মননামালিন্যের একটি ঘটনাও ঘটেনি। সবসময় মেহ, মায়া, ভালােবাসা ও আন্তরিকতার সম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে নবীপরিবারের পার্থিব-জীবন কত অভাব-অনটন ও কঠিনতার মধ্য দিয়ে কেটেছে তা কল্পনা করলেই সেই প্রেম ও ভালােবাসার গভীরতা অনুভব করা যায়।

জীবনসঙ্গিনীর প্রতি ভালােবাসা 
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-কে খুবই ভালােবাসতেন। সাহাবা কেরাম রাযি. সকলেই তা জানতেন। সেজন্য তারা সেদিনই হাদিয়া পাঠাতেন, যেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে থাকতেন। তারা এটা ইচ্ছাকৃতভাবেই করতেন। পবিত্র স্ত্রীগণ কষ্ট পেতেন; কিন্তু কিছু বলার ছিল না। অবশ্য একবার সকলে মিলে হযরত ফাতেমা রাযি.-এর সাহায্য নিলেন। হযরত ফাতেমা রাযি. বিষয়টি উত্থাপন করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—আমার কলিজার টুকরা, যাকে আমি চাই তাকে তুমি চাইবে না! জগৎ-জননীকে বেশি কিছু বলতে হলাে না।

তিনি ফিরে এলেন। পবিত্র স্ত্রীগণ আবারও পাঠাতে চাইলেন, কিন্তু তিনি অসম্মত হলেন। অবশেষে তারা হযরত উম্মে সালামা রাযি.-কে পাঠালেন। তিনি অত্যন্ত বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমতী ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয়ও ছিলেন। তিনি সুযােগ বুঝে খুবই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিষয়টি তুললেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—উম্মে সালামা, আয়েশার ব্যাপারে কিছু বােলাে না; কেননা সে ছাড়া আর কোনাে স্ত্রীর বিছানায় আমার ওপর ওহী নাজিল হয়নি।

একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপহার হিসেবে একটি হার পেলেন। তিনি বললেন আমি এটা তাকেই দেব, যাকে সবচেয়ে বেশি ভালােবাসি। সবাই বলাবলি করলেন, ইবনে কুহাফার মেয়েই (হযরত আয়েশা রাযি.) এটা পাবে। কিন্তু রাসূলের ভালােবাসার বহিঃপ্রকাশ কখনােই রঙ-রঙের কাপড়চোপড় ও চকচকে গহনায় ছিল। তিনি এটা তাঁর ছােট্ট নাতনী, হযরত যায়নাব রাযি.-এর নয়নমণি হযরত উমামা রাযি.-কে দান করলেন। হযরত আমর ইবনুল আস রাযি. যখন গাযওয়ায়ে সুলাসিল থেকে ফিরে এলেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন—হে আল্লাহর রাসূল, আপনি সবচেয়ে কাকে বেশি ভালােবাসেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশাকে।

হযরত আমর রাযি. আরজ করলেন—হে আল্লাহর রাসূল, প্রশ্ন পুরুষদের ব্যাপারে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—আয়েশার পিতাকে।
একদিন হযরত উমর রাযি. হযরত হাফসা রাযি.-কে বােঝাচ্ছিলেন মা, আয়েশাকে হিংসা কোরাে না; তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় পাত্রী।
কোনাে এক সফরে হযরত আয়েশা রাযি.-এর সওয়ারি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে এক দিকে ছুট দেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতটাই পেরেশান হয়ে গিয়েছিলেন যে, তার পবিত্র জবান থেকে বের হয়ে গেল।

হায় হায়, আমার স্ত্রীর কী হবে! একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে এলেন। দেখলেন, হযরত আয়েশা রাযি. মাথাব্যথায় কাতরাচ্ছেন। তিনি বলে ফেললেন, —ওহ, মাথাটা গেল! এ সময়ই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হয়েছিলেন এবং এটাই ছিল তাঁর মৃত্যুরােগ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুশয্যায় শায়িত থেকে বারবার জিজ্ঞেস করতেন, আজ কী বার? সাহাবা কেরামের বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তারা তাকে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন।

সেখানেই হযরত আয়েশা রাযি.-এর কোলে মাথা রেখে আপন প্রভুর সমীপে আত্মনিবেদন করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করতেন—হে আল্লাহ, যা আমার নিয়ন্ত্রণে (অর্থাৎ স্ত্রীগণের প্রতি আচার-ব্যবহার ও লেনদেন), তাতে অবশ্যই সমতাবিধান করি; কিন্তু যা আমার নিয়ন্ত্রণে নয় (অর্থাৎ হযরত আয়েশার প্রতি ভক্তি ও ভালােবাসা), তাতে আমাকে ক্ষমা কোরাে। সাধারণ মানুষ ভাবতে পারেন, হযরত আয়েশা রাযি.-এর প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালােবাসার কারণ হয়তাে তার সৌন্দর্য হবে।

কিন্তু এ ধারণা একেবারেই ভুল। পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে হযরত যায়নাব রাযি., হযরত জুওয়াইরিয়া রাযি., হযরত সাফিয়্যাহ রাযি. প্রমুখের সৌন্দর্যও কম ছিল না। তাদের সৌন্দর্যের কথা হাদীস, তারীখ ও সিয়ারগ্রন্থগুলােতে এসেছে। তা ছাড়া অল্পবয়স্কা ও প্রায়কুমারী স্ত্রীও ছিলেন। কিন্তু আয়েশা রাযি.-এর সৌন্দর্যের কথা হাদীস, তারীখ ও সিয়ারে আসেনি বললেই চলে। অবশ্য হযরত উমর রাযি. তাঁর কন্যা হযরত হাফসা রাযি.-কে বলেছিলেন হযরত আয়েশা রাযি.-কে হিংসা কোরাে না; কারণ তিনি তােমার চেয়ে বেশি সুন্দরী এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় পাত্রী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উমর রাযি.-এর মন্তব্য শুনে ঈষৎ হেসেছিলেন।

কিন্তু এই হাদীস থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু প্রমাণিত হয় না যে, তিনি হযরত হাফসা রাযি.-এর চেয়ে সুন্দর ছিলেন। প্রকৃত প্রস্তাবে, হযরত আয়েশা রাযি.-এরই বর্ণনা, সহীহ মুসলিম ও আবু দাউদের বিবাহ অধ্যায়ে হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, বিবাহে পাত্রী-নির্বাচনে চারটি গুণ দেখা হয় : সম্পদ, সৌন্দর্য, বংশ, ধার্মিকতা; কিন্তু তােমরা ধার্মিক মেয়ে খুঁজো। সুতরাং পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে তাঁরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবার কথা, যার দ্বারা ধর্মের সেবা হবে সবচেয়ে বেশি। হযরত আয়েশা রাযি.-এর মাসায়েল-দক্ষতা, ইজতিহাদ-ক্ষমতা, ধর্মীয় বিধি-বিধানের জ্ঞান শুধু নারী নয়, পুরুষদেরকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

পবিত্র স্ত্রীগণের তুলনায় তাঁর বিশিষ্টতা এখানেই। এজন্যই তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বেশি প্রিয় ছিলেন। আল্লামা ইবনে হাযাম আল মালিল ওয়ান নাহাল গ্রন্থে এ ব্যাপারে বিশদ ও প্রামাণ্য আলােচনা করেছেন। সিহাহগ্রন্থে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :"পুরুষদের মধ্যে অনেকেই কামেল হয়েছিলেন; কিন্তু নারীদের মধ্যে কামেল হয়েছিলেন শুধু ইমরানপুত্রী মারইয়াম ও ফেরাউনপত্নী আসিয়া। নিঃসন্দেহে সকল খাদ্যের ভেতর সারিদ যেমন শ্রেষ্ঠ, তেমনি সকল নারীর ওপর আয়েশা শ্রেষ্ঠ।

এই হাদীস থেকেই বােঝা যায়, এই ভক্তি-ভালােবাসার প্রকৃত কারণ কী? বাহ্যিক সৌন্দর্য-শােভা, নাকি সুপ্ত জ্ঞানের আভা। সুপ্ত প্রতিভা ও জ্ঞানে-গুণে হযরত আয়েশা রাযি.-এর পর হযরত উম্মে সালামা রাযি.এর অবস্থান। তিনিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন; অথচ তিনি ছিলেন বয়ােবৃদ্ধা। হযরত খাদীজা রাযি.-এর ইন্তেকাল হয়েছিল পঁয়ষট্টি বছর বয়সে; কিন্তু তাঁর প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালােবাসা এমন ছিল যে, হযরত আয়েশা রাযি.-ও ঈর্ষা করতেন। একবার তিনি মন্দভাবে হযরত হযরত খাদীজা রাযি.-এর নাম নেওয়ার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন। 

জীবনসঙ্গীর প্রতি ভালােবাসা হযরত আয়েশা রাযি.-ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনেক ভালােবাসতেন। শুধু তাই নয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি তাঁর ভীষণ অনুরাগ ও আসক্তি ছিল। অন্য কেউ রাসূলকে ভালােবাসার কথা বললে তার খুব কষ্ট হতাে। পবিত্র স্ত্রীগণের প্রতি তার খুব নজর থাকত। কখনাে এমন হতাে যে, রাতে ঘুম ভেঙে গেছে, দেখেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাশে নেই; তিনি অস্থির হয়ে যেতেন। একবার রাতে ঘুম ভেঙে গেলে রাসূলকে পেলেন না। ঘর অন্ধকার। এদিক-সেদিক হাতড়াতে লাগলেন। অবশেষে রাসূলের কদম মােবারকে হাত পড়ল।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেজদারত অবস্থায় আল্লাহর দরবারে রােনাজারি করছেন। আরও একবার একই ঘটনা ঘটলে তিনি ভেবেছিলেন রাসূল হয়তাে অন্য কোনাে স্ত্রীর ঘরে গেছেন। উঠে এদিক-সেদিক দেখতে লাগলেন। পরে বুঝতে পারলেন, তিনি তাসবিহ-তাহলিলে রত আছেন। হযরত আয়েশা রাযি. মনে-মনে লজ্জিত হলেন। অবচেতন মনে বলে ফেললেন—আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কোরবান হােন; আমি কোন ধ্যানে ছিলাম, আর আপনি কোন ধ্যানে ছিলেন।  

আরেক রাতের ঘটনা। ঘুম ভাঙলে দেখলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নেই। প্রায় অর্ধেক রাত অতিবাহিত হয়েছে। এদিক-সেদিক খুঁজলেন, কিন্তু প্রিয়তমের কোনাে সাড়াশব্দ নেই; খুঁজতে খুঁজতে গােরস্তানে পৌছে গেলেন, দেখলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ ও ইস্তিগফারে মশগুল। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে এলেন। সকালে রাসূলের কাছে ঘটনাটি ব্যক্ত করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রাতে কারও ছায়া লক্ষ করেছিলাম; তা হলে তুমিই ছিলে? 

কোনাে এক সফরে হযরত আয়েশা রাযি. ও হযরত হাফসা রাযি. রাসূলের সঙ্গে ছিলেন। প্রতি রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাওদায় তাশরিফ আনতেন। যখন কাফেলা চলত, তখন কথাবার্তাও চলত। একদিন হযরত হাফসা রাযি. বললেন আয়েশা, চলাে, আমরা হাওদা বদলাবদলি করি। হযরত আয়েশা রাযি. উদারতা ও সরলতার পরিচয় দিলেন। রাতে আগের মতােই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর হাওদায় এলেন; কিন্তু সেখানে হযরত হাফসা রাযি.-কে দেখতে পেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাম দিয়ে বসে পড়লেন।

এদিকে হযরত আয়েশা রাযি. অধীর আগ্রহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতীক্ষা করছেন। যখন কাফেলা থামল, তখন আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। হাওদা থেকে নেমে পড়লেন, দুই পা ঘাসের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে বললেন—আল্লাহ, আমি তাে ওনাকে কিছু বলতে পারব না; কিন্তু তুমি তাে একটা সাপ বা বিচ্ছু পাঠাতে পারাে! একটা সাপ বা বিচ্ছু পাঠাও, এসে আমার পায়ে কামড় দিক। দেখুন, এই কথাটায় নারীমনের কেমন তীব্র ভালােবাসা ও বিরহ জ্বলে উঠেছে!  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈলা করেছিলেন। অর্থাৎ একমাস পবিত্র স্ত্রীগণের কাছে যাবেন না, শপথ করেছিলেন।

বাইরে হযরত আয়েশা রাযি.-এর গৃহের সঙ্গে লাগানাে একটি ওপরতলা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাস এখানেই অবস্থান করেছিলেন। পবিত্র স্ত্রীগণ শোকাচ্ছন্ন ছিলেন। আবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে যাবেন তাও সম্ভব ছিল না। হযরত আয়েশা রাযি.-এর অবস্থা ছিল তিনি শুধু দিন গােনেন, কবে মাস পুরবে। মাস পূর্ণ হবার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরেই এসেছিলেন। পবিত্র স্ত্রীগণের মধ্যে বিভিন্ন স্তরের নারী ছিলেন। আমীর-ওমরা ও নেতৃবর্গের কন্যাও ছিলেন। তারা এমন অভাবের জীবন মেনে নিতে চাইতেন না।

এ কারণে ইচ্ছাধিকার প্রদান করে আয়াত নাজিল হয় : যে চায় সে নবীস্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে তুষ্ট থাকুক, আর যে না চায় সে নবীপরিবার থেকে পৃথক হয়ে যাক। নবীপরিবারে এমন হতভাগী কেউই ছিলেন না, যিনি এই ভূষণ ত্যাগ করবেন। সবাই নবীস্ত্রী হয়ে থাকাকেই প্রাধান্য দিলেন। তবে এই সিদ্ধান্তগ্রহণে সর্বাগ্রে থাকলেন হযরত আয়েশা রাযি.। তিনিই সর্বপ্রথম নিজের সিন্ধান্ত জানিয়ে রাসূলকে মিনতি করেছিলেন— রাসূল, আমার নির্ণয় দয়া করে কাউকে জানাবেন না। এই কথায়ও তাঁর নারী-স্বভাবের আলােকিত বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠে।

টানাপােড়েনের শেষ পরিণতিতে ইরজার আয়াত নাজিল হয় যেই স্ত্রীকে ইচ্ছা রাখবেন, যাকে ইচ্ছা ত্যাগ করবেন। দয়ার নবী কাউকে ত্যাগ করেননি। কিন্তু ইচ্ছাধিকার তার বলবৎ ছিল। হযরত আয়েশা রাযি. বলতেন—হে আল্লাহর রাসূল, যদি ক্ষমতাটা আমাকে দেওয়া হতাে, তা হলে এ মর্যাদায় অন্য কাউকে প্রাধান্য দিতাম না। গাযওয়ায়ে মুতায় হযরত জাফর তাইয়্যার রাযি.-এর শাহাদাতের খবর এলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনঃকষ্টে আচ্ছন্ন ছিলেন। ইসলামে বিলাপ করা নিষিদ্ধ। কেউ এসে সংবাদ দিল, হযরত জাফরের গৃহে নারীগণ বিলাপ করছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—নিষেধ করাে। লােকটা ঘুরে এসে বলল—আমার কথা শুনছে না। 

রাসূল বললেন—ওদের মুখে মাটি পড়ক। লােকটা ঘুরে এসে আবার কিছু বলতে লাগল। হযরত আয়েশা রাযি. দরজার ওপাশ থেকে অস্থির হয়ে যাচ্ছিলেন; লােকটা না রাসূলের কথা মানছে, না রাসূলকে ছাড়ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়শই হযরত আয়েশা রাযি.-এর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার ঠিক এভাবেই বিশ্রাম করছিলেন। হঠাৎ হযরত আবু বকর রাযি. কোনাে কারণে রাগান্বিত অবস্থায় ভেতরে এলেন, এবং মেয়েকে সজোরে খোঁচা মারলেন। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন—আমি শুধু এজন্য নড়ে উঠিনি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে।

   

পরবর্তী গল্প
কবরের আযাব সত্য-১ম পর্ব

পূর্ববর্তী গল্প
আয়েশা রাঃ সংসার-জীবন নবীপরিবারের বাসগৃহের চিত্র

ক্যাটেগরী