তায়েফবাসীর অত্যাচার | আমার কথা
×

 

 

তায়েফবাসীর অত্যাচার

coSam ৯০


আবদে ইয়ালীল ভ্রাতৃত্রয় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর আহ্বানে তারা কোনরুপ সহযোগিতার মনোভাব প্রদর্শন তো করলই না, উপরন্তু নানাভাবে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতে শুরু করল। অতিথি পরায়নতা আরবের চিরন্তন সামাজিক রীতি সত্ত্বেও সকীফ প্রধানত্রয় চিরন্তন সে আরবীয় রীতির প্রতিও সম্মান প্রদর্শন করেনি।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যখন অনুভব করলেন- সকীফ প্রধানদের সহযোগিতা পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই, তখন তিনি তাদেরকে নিরপেক্ষতা অবলম্বনের অনুরোধ করলেন। নবী (সাঃ) চিন্তা করলেন, এদের সহযোগিতা তো পাওয়াই গেল না, তদুপরি এরা সর্বসাধারণকে উচকিয়ে দিলে। এখানে ইসলামের প্রচারও করা যাবে না। কিন্তু পাষন্ড সকীফ প্রধানরা নবী করীম (সাঃ) এর নিরপেক্ষ থাকার অনুরোধও রক্ষা করেনি। বরং সমাজের অজ্ঞ মূর্খ দুষ্ট লোকগুলো এবং তাদের দাসগুলোকে নবীজী (সাঃ) এর বিরুদ্ধে উচকিয়ে দেয়।

তিনি পথে নামলেই অজ্ঞ লোকেরা এবং দাসগুলো তাঁর চতুর্দিকে জড় হয়ে ইট পাথর মারতে শুরু করত। চলতে শুরু করলে ইট পাথর মারতে মারতে তাঁর পশ্চাদানুসরণ করত। কখনও কখনও তারা সারি বেঁধে পথের দুধারে বসে যেত এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরণযুগলের উপর পাথর নিক্ষেপ করত। এতে তাঁর পদযুগল রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়।    

প্রস্তরাঘাতে নবীজী (সাঃ) অবসন্ন হয়ে পড়লে জালেমরা দু' হস্ত ধরে তাঁকে দাঁড় করিয়ে দিত। যখন চলতে শুরু করতেন তখন আবার পাথর নিক্ষেপ শুরু করত। তাদের অমানবিক জুলুম উৎপীড়নেও নবীজী (সাঃ) এর মন কিছুমাত্র দমিত হয়নি। তিনি দশ দিন পর্যন্ত তায়েফে ঘুরে ঘুরে সর্বসাধারণ মানুষকে আল্লাহর প্রতি আহ্বান জানাতে থাকেন। 

তায়েফ সমাজপতিদের লেলিয়ে দেয়া পাষণ্ডদের যুলুম নির্যাতন এবং পাথর নিক্ষেপে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় তিনি যখন মক্কা অভিমুখে যাত্রার সিদ্ধান্ত নেন তখন এদের অত্যাচার ভীষণতর রুপ ধারণ করে। ক্ষত বিক্ষত হয়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। তাঁর দেহ থেকে শোণিতধারা প্রবাহিত হতে থাকল।

এ অবস্থায় যায়দ বিন হারেসা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে কাঁধে বহন করে দ্রুত তায়েফ নগরীর সীমা পার হন। পথের পাশেই ছিল মক্কাবাসী দু সহোদর ওতবা ও শায়রার প্রাচীর বেষ্টিত আঙ্গুর বাগান। তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে সেখানে এনে তোলেন। এখানে অবস্থান কালে যায়দের সেবা শুশ্রুষায় তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেন।

এদিকে রাসূলুল্লাহ আহাজারী করতে ছিলেন। অপরদিকে আল্লাহর আরশ জোশ মেরে উঠল। দুশমনের নৃশংস ব্যবহারে আল্লাহর গজব তাদের অতি সন্নিকটে উপনীত হল। নবীজী (সাঃ) আকাশ পানে তাকিয়ে দেখেন এক খন্ড মেঘমালা দেখা যাচ্ছে। এ মেঘখন্ড তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। এতে হযরত জিবরাঈল (আঃ) ও পর্বতের জিম্মাদার ফেরেশতা উপবিষ্ট ছিলেন। হযরত জিবরাঈল এসে রহমাতাললিল আলামীনের খেদমতে সালাম পেশ করে বলেন, আল্লাহ পাক আপনার প্রতি এই যুলুমের কারণে আমার সাথে মালাকে জবাল অর্থাৎ পাহাড়ের ফেরশতাকে প্রেরণ করেছেন। আপনি নির্দেশ দিলেই তায়েফের উভয় পার্শ্বের পাহাড় দুটি তাদের উপর এসে তাদেরকে পিষে দেয়া হবে।

জঘণ্যতম অপরাধী ও ঘোর দুশমনের উপর প্রতিশোধ নেয়ার এবং তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করার মহান সুযোগ তিনি লাভ করলেন। কিন্তু উম্মতের দরদী নবী উত্তর করলেন, হে জিবরাঈল! আমাকে আল্লাহ রহমতস্বরুপ পাঠিয়েছেন। আমার গোত্রের লোকেরা আমাকে চিনতে পারেনি বলে আমাকে কষ্ট দিচ্ছে আমি তাদের ধ্বংস কামনা করতে পারি না। তারা ধ্বংস হয়ে গেলে আমি কার কাছে আল্লাহর দ্বীন প্রচার করব? আমি তাদের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ও তাদের হিদায়েত প্রার্থনা করি। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন- হে আল্লাহ কওমকে হিদায়াত কর। কারন তারা আমাকে চিনতে পারে নি। তারা চিনতে না পারলেও হয়ত তাদের সন্তানের মধ্যে এমন লোক পয়দা হবে যারা আল্লাহর বন্দেগী করবে।

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাঃ হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি একদিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! ওহুদের দিবস হতে অধিক মুসীবতের দিবস আপনার জীবনে এসেছি কি? তিনি উত্তরে বলেন, আমার জীবনের সর্বাপেক্ষা কঠিন দুর্যোগের দিবস ছিল তায়েফের দিনে।

তায়েফ হতে মক্কায় প্রত্যাবর্তন কালে হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) পথে বাতনে নাখলা নামক স্থানে অবস্থান করেন। তিনি সেখানে ফযরের নামায পড়ার সময় সিরিয়া এলাকার নসীবীন নামক স্থান হতে সাত জন জিন এসে তাঁর কুরআন পাঠ শুনল। তিনি বাতনে নাখলায় দশ দিন অবস্থান করেছিলেন। তখন আল্লাহ পাক সেখানেই ওহীর মারফত জিনদের আগমনের কথা জানিয়ে দেন এবং এ আয়াত নাযিল করেন।
অর্থঃ এবং যখন আমি একদল জ্বিনকে আপনার দিকে পরিচালিত করেছি যারা কোরআন শ্রবণ করতে লাগল, তারা যখন তাঁর কাছে হাজির হল তখন তারা পরস্পরকে বলল, তোমরা চুপ থাক। তারপর যখন তিলাওয়াত শেষ হল তারা স্বীয় গোত্রের কাছে প্রত্যাবর্তন করে ভয় প্রদর্শন করতে লাগল। তারা বলল, হে আমাদের জাতি। নিশ্চয় আমরা এমন কিতাব শুনেছি যা হযরত মূসার পর অবতীর্ণ হয়েছে যা তার পূর্বেকার কিতাবকে সত্যায়িত করে, যা সত্য ও সরল পথের দিকে হিদায়াত করে। হে আমাদের জাতীয় লোকেরা। তোমরা আল্লাহর আহবায়কের আহ্বানে সাড়া দাও এবং তাঁর প্রতি ঈমান আন। তা হলে তিনি তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন এবং যন্ত্রণাদায়ক আজাব হতে মুক্তি দিবেন। 

সূরা আহকাফঃ আয়াত ২৯-৩১ 

 

পরবর্তী গল্প
হযরতের মক্কায় প্রত্যাবর্তন

পূর্ববর্তী গল্প
তায়েফ গমন

ক্যাটেগরী