তওয়াফের তরীকা ও মাসায়েল | আমার কথা
×

 

 

তওয়াফের তরীকা ও মাসায়েল

coSam ২৬


তওয়াফের তরীকা ও মাসায়েলঃ
* তওয়াফ শুরু করার পূর্ব মুহূর্তে চাদরের ডান অংশকে ডান বগলের নীচে দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের উপর রেখে দিন। এরূপ করাকে ‘এজতেবা' বলে। সম্পূর্ণ তওয়াফে এরূপ রাখতে হবে। এই এজতেবা করা সুন্নাত। তওয়াফ অবস্থা ব্যতীত অন্য কোন সময় এজতেবা' করবেন না। যে তওয়াফের পর সায়ী নেই সে তওয়াফেও এজতেবা করবেন না। নফল তওয়াফের পর যেহেতু সায়ী নেই, তাই নফল তওয়াফেও এজতে হবে না।
* অতঃপর কাবা শরীফের দিকে ফিরে হাজরে আসওয়াদকে ডান দিকে রেখে দাঁড়ান অর্থাৎ, হাজরে আসওয়াদ বরাবর মসজিদে হারামের গায়ে যে সবুজ বাতি আছে সেটাকে পিছনে ডান পার্শ্বে রেখে এমনভাবে দাঁড়ান, যেন হাজরে আসওয়াদ ডান কাঁধ বরাবর থাকে এবং এ পর্যন্ত যে তালবিয়া পড়ে আসছিলেন তা পড়া বন্ধ করুন। এই এহরাম শেষ হওয়া পর্যন্ত আর তালবিয়া পড়বেন না। তবে কেরান ও ইফরাদ হজ্জকারী তওয়াফ সায়ীর পর থেকে আবার তালবিয়া চালু করবেন।
* তারপর তওয়াফের নিয়ত করুন। নিয়ত করা শর্ত। শুধু এতটুকু নিয়ত করলেই যথেষ্ট যে, হে আল্লাহ! আমি তােমার ঘর তওয়াফ করার নিয়ত করছি, তুমি তা সহজ করে দাও এবং কবুল কর। তবে কোন্ তওয়াফ-উমরার . তওয়াফ, না তওয়াফে যিয়ারত না বিদায়ী তওয়াফ না নফল তওয়াফ ইত্যাদি নির্দিষ্ট করে নিয়ত করা উত্তম।
* আরবীতে নিয়ত করতে চাইলে এভাবে করা যায়। বাংলায় অর্থঃ
 হে আল্লাহ! আমি তােমার ঘরের তওয়াফ করার নিয়ত করছি, তুমি সহজ করে দাও এবং ককূল করে নাও।
* নিয়ত করার পর বায়তুল্লাহর দিকে ফেরা অবস্থায়ই ডান দিকে এতটুকু চলুন যেন হাজরে আসওয়াদ ঠিক আপনার বরাবর হয়ে যায়।
* তারপর ধাক্কাধাক্কি করে কাউকে কষ্ট দেয়া ছাড়া সম্ভব হলে হাজরে আসওয়াদকে চুমু দিন। এই চুমু দেয়া সুন্নাত। তিনবার চুমু দেয়া মোস্তাহাব। চমুতে যেন শব্দ না হয়। প্রতিবার চুমু দেয়ার পর মাথা হাজরে আসওয়াদের উপর রাখাও মােস্তাহাব। ভিড়ের কারণে চুমু দেয়া সম্ভব না হলে হাত দ্বারা হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে হাতে চুমু দিন। তাও সম্ভব না হলে কোন লাঠি থাকলে তা দ্বারা স্পর্শ করে তাতে চুমু দিন। তাও সম্ভব না হলে দুই হাতের তালু দিয়ে হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করে দুই হাতেই চুমু খান। হাত দ্বারা ইশারা করার সময় হাত এতটুকু উঠাবেন যে, হাতের তালু হাজরে আসওয়াদের দিকে থাকবে এবং হাতের পিঠ চেহারার দিকে থাকবে।
তবে উল্লেখ্য যে, আজকাল অনেকে হাজরে আসওয়াদ, মুলতাযাম, রুকনে ইয়ামানী প্রভৃতি স্থানে সুগন্ধি মেখে গিয়ে থাকেন তাই এহরামের অবস্থায় যে তাওয়াফ হয় তাতে সরাসরি এ সব স্থান স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। আরও মনে রাখা দরকার যে, হাজরে আসওয়াদের চতুর্পাশ্বে যে রূপার বেষ্টনী রয়েছে তাতে চুমু দেয়া বা মাথা কিংবা হাত রাখা জায়েয নয়।
* চুমু দেয়ার পর পা শক্ত রেখে একটু ডান দিকে ঘুন। এখন কা'বা শরীফ আপনার বাম দিকে হয়ে যাবে। এভাবে কা'বা শরীফ বাম দিকে রেখে তওয়াফ আরম্ভ করতে হবে+কখুনও যেন বুক কা'বা শরীফের দিকে ফিরিয়ে তওয়াফ না হয়। দুই এক কদমও যেন এমন না হয়। এমন হলে সেই পরিমাণ জায়গা পিছে এসে কা'বা শরীফকে বাম দিকে রেখে পুনরায় সামনে অগ্রসর হবেন। তওয়াফের সময় কা'বা শরীফের দিকে দৃষ্টিও ফেরাবেন না। তওয়াফের সাত চক্করের মধ্যে প্রথম তিন চক্করে বীরের ন্যায় বুক ফুলিয়ে কাঁধ দুলিয়ে ঘন ঘন কদম ফেলে কিছুটা দ্রুত গতিতে চলতে হবে। এরূপ করাকে রমল' বলা হয়। রমল করা সুন্নাত । তবে যে তওয়াফের পর সায়ী নেই সে তওয়াফে রমলও নেই । রমল ও এজতেবা শুধু পুরুষের জন্য-মহিলাদের জন্য নয়।
* তওয়াফ হাতীমের বাইরে দিয়ে করা ওয়াজিব।
* ভিড় না থাকলে এবং কাউকে কষ্ট দেয়া না হলে পুরুষের জন্য যথা সম্ভব বায়তুল্লাহর কাছাকাছি দিয়ে তওয়াফ করা উত্তম। মহিলাদের জন্য পুরুষদের থেকে দূরে থেকে, এমনিভাবে তাদের জন্য রাতে তওয়াফ করা উত্তম।
* প্রথম চক্করে রুকনে ইয়ামানীতে (কা'বা শরীফের দক্ষিণ পশ্চিম কোণে) পৌছার পূর্বে বিভিন্ন দু’আ পড়া হয়ে থাকে; রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সে সব দুআ বর্ণিত নেই- তবে সে সব দু'আ পড়া যায় বা অন্য যে কোন দুআ করা যায়, যে কোন যিকির করা যায়। সাত চক্করে এরকম বিভিন্ন দুআ বর্ণিত আছে, সবগুলাে সম্পর্কেই এ কথা । দুআ কিতাব দেখেও পড়া যায়।
* রুকনে ইয়ামানীতে পৌছে সম্ভব হলে দুই হাতে কিংবা শুধু ডান হাতে রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ করা মােস্তাহাব। চুমু খাবেননা বা হাতের দ্বারা স্পর্শ করে তাতে চুমু খাবেননা বা স্পর্শ করা সম্ভব না হলে দূর থেকে ইশারাও করবেননা।
* তারপর রুকনে ইয়ামানী থেকে হাজরে আসওয়াদের কোণে যাওয়া পর্যন্ত নিমােক্ত দুআ পড়া মােস্তাহাব।
* তারপর হাজরে আসওয়াদ বরাবর পৌছলে এক চক্কর পূর্ণ হয়ে গেল। প্রত্যেক চক্করের শুরুতেই এভাবে চুমু খাবেন, তবে প্রথম বারের ন্যায়--হাত কান পর্যন্ত উঠাবেন না, এটা শুধু তওয়াফ শুরু করার সময়েই করতে হয়। তবে চুমু খাওয়ার জন্য হাত দ্বারা ইশারা করতে হলে পূর্বের নিয়মে তা করবেন। চুমু খাওয়ার পর দ্বিতীয় চক্কর শুরু করবেন এবং পূর্বের ন্যায় রুকনে ইয়ামানীতে সম্ভব হলে হাত দ্বারা স্পর্শ করবেন। তারপর রব্বানা আতিনা ... পড়তে পড়তে হাজরে আসওয়াদ বরাবর পৌছবেন, এভাবে দ্বিতীয় চক্কর পূর্ণ হয়ে গেল, এভাবে সাত চক্কর শেষ হওয়ার পর আবার হাজরে আসওয়াদে পূর্বের মত চুমু খাবেন। এটা হবে অষ্টম বার চুমু খাওয়া। এখন আপনার তওয়াফ শেষ হল। এখন চাদরের এজতে খুলে ডান কাঁধ ঢেকে নিন।
* সম্পূর্ণ তওয়াফ উযু অবস্থায় হতে হবে। প্রথম চার চক্কর পর্যন্ত উযু ছুটে গেলে উযু করে আবার প্রথম থেকে তওয়াফ শুরু করতে হবে। আর যদি চার চক্করের পর উযূ ছুটে, তাহলে উযূ করে আবার প্রথম থেকেও তওয়াফ শুরু করা যায়, কিংবা যেখান থেকে উষ্য ছুটেছে সেখান থেকেও বাকীটা পূর্ণ করে নেয়া যায়। তওয়াফে হায়েয নেফাস অবস্থা থেকেও পবিত্র হতে হবে।
* তওয়াফ শেষ করার পর যদি বেশী ভীড় ও ধাক্কাধাক্কি না হয়, তাহলে হাজরে আসওয়াদ ও কাবা ঘরের দরজার মধ্যবর্তী স্থানকে (এ স্থানকে ‘মুলতাযাম' বলা হয়।) আঁকড়ে ধরবেন, বুক এবং চেহারা দেয়ালের সাথে লাগাবেন এবং উভয় হাত উপরে উঠিয়ে দেয়ালে স্থাপন করে খুব কাকুতি মিনতি সহকারে দুআ করবেন। এটা দুআ কবুলের স্থান। এ স্থানে এরূপ দুআ করা সুন্নাত।
* তারপর কা'বা শরীফের দরজা মােবারকের চৌকাঠ ধরে খুব দুআ করুন। সম্ভব হলে গেলাফ আঁকড়ে ধরে খুব কান্নাকাটি করুন। তবে এহরাম অবস্থায় থাকলে এসব স্থানে সতর্ক থাকতে হবে যেন কাবা শরীফের গেলাফ মাথায় না লাগে। এমনিভাবে এসব সুন্নাত আদায় করতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি করে কাউকে কষ্ট দেওয়া অন্যায়, কেননা কাউকে কষ্ট দেয়া হারাম। এরূপ কষ্ট পাওয়ার আশংকা থাকলে এসব ছেড়ে দিতে হবে। মহিলাদের পর্দা ও শালীনতা রক্ষার স্বার্থেও এ থেকে এবং কাবা শরীফের দরজা মােবারকে চৌকাঠ ধরে দুআ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কারণ মােস্তাহাব আদায় করার চেয়ে পর্দার ফর রক্ষা করা বেশী গুরুত্ত্বপূর্ণ।
* তারপর দুই রাকআত নামায পড়া ওয়াজিব, এটাকে সালাতুত্তাওয়াফ বা তওয়াফের নামায বলে। এই নামায মাকামে ইবরাহীম'-এর পিছনে পড়া মােস্তাহাব। ভীড়ের কারণে সেখানে পড়া সম্ভব না হলে আশে পাশে পড়ে নিবেন তাও সম্ভব না হলে দূরবর্তী যেখানে সম্ভব পড়ে নিবেন। তখন নিষিদ্ধ বা মাকরূহ ওয়াক্ত না হলে তওয়াফ শেষ হওয়ার সাথে সাথে এ নামায পড়ে নেয়া সুন্নাত । আর তখন নিষিদ্ধ ওয়াক্ত বা মাকরূহ ওয়াক্ত হলে তখন পড়বেননা বরং পরে সহীহ ওয়াক্তে পড়ে নিতে হবে। মাকামে ইবরাহীমের দিকে যাওয়ার সময় এই পড়তে পড়তে যাবেন। এই নামাযে প্রথম রাকআতে সূরা কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকআতে সূরা এখলাস পড়ুন। এই নামাযের পরও দুআ কবুল হয়ে থাকে। মাকামে ইবরাহীম' একটি বেহেশতী পাথরের নাম, যার উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ) কা'বা শরীফের উঁচু দেয়াল নির্মাণ  করেছিলেন। তখন প্রয়ােজন অনুসারে এ পাথরটি আপনা আপনি উপরে নীচে উঠানামা করত। এ পাথরের গায়ে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কদম মুবারকের চিহ্ন রয়েছে। পাথরটি কা'বা শরীফের পূর্ব দিকে একটি পিতলের জালির মধ্যে রাখা অবস্থায় সংরক্ষিত আছে।
* তওয়াফের দুই রাকআত নামায পড়ার পর যমযম কুয়ার নিকট গিয়ে যমযমের পানি পান করা এবং দুআ করা মােস্তাহাব। এটাও দুআ কবুল হওয়ার স্থান। (উল্লেখ্যঃ আজকাল যমযম কুয়ার নিকটে যাওয়া যায়না, সেক্ষেত্রে আশপাশ থেকেই যমযমের পানি পান করে নিন ।)
* যমযমের পানি কা'বা শরীফের দিকে মুখ করে পান করা মােস্তাহাব। এ পানি পঁড়িয়ে বসে উভয় ভাবে পান করা যায় । যমযমের পানি পান করার সময় নিম্নোক্ত দুআ পড়তে হয়ঃ
অর্থঃ হে আল্লাহ, আমি তােমার নিকট চাই উপকারী জ্ঞান এবং প্রশস্ত রিযিক, আর সব রােগ-ব্যাধি থেকে শেফা। এ পর্যন্ত তওয়াফ ও তার আনুষঙ্গিক কার্যাবলী সম্পন্ন হল।

সূত্রঃ আহকামে যিন্দেগী

 

পরবর্তী গল্প
সায়ীর তরীকা ও মাসায়েল

পূর্ববর্তী গল্প
মক্কা ও হারাম শরীফে প্রবেশের সুন্নাত ও আদব সমূহ

ক্যাটেগরী