জমজম কুপের পুনঃখনন | আমার কথা
×

 

 

জমজম কুপের পুনঃখনন

coSam ১৩৩


জমজম কূপ এমন একটি কুপ যার নাম নিশানা মানুশের জ্ঞাত ছিল না। বস্তুতঃ এ কূপটি আদম আলাইহিস সালাম- এরও বহু পূর্বে জগতের বুকে সৃষ্টি হয়েছিল বলে মনে করা হয়। কেননা, কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে হযরত আদম (আঃ) এর জন্য আল্লাহ তাআলা এ কূপের প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন এবং পরে হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর জন্য আল্লাহ তাআলা মোট দু'বার এর প্রকাশ করেছিলেন। সৃষ্টি রহস্য বুঝা ভার। আমাদের চোখের সামনে যে ধূলিকণা বিরাজিত তার প্রত্যেকটি কণাও অনন্ত রহস্যের ভান্ডার।

পবিত্র জমজম কূপের ব্যাপারও তাই। হযরত ইবরাহীম (আঃ) বিবি হাজেরা ও সদ্যজাত পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে জনমানব শূন্য মক্কার গাছপালা বিহীন মরুপ্রান্তরে উন্মুক্ত আকাশের নিচে ছেড়ে আসলে দুগ্ধপোষ্য মাছুম শিশুর করুন ক্রন্দনে ছাফা ও মারওয়ার মাঝখানে আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিবরাঈল (আঃ) ইসমাঈল (আঃ) এর পায়ের নিচে ঐ কূপের প্রকাশ ঘটান।

ইয়ামনের জারহাস গোত্র একবার শাম সিরিয়া দেশে ব্যবসার উদ্দেশ্যে গমনের প্রাক্কালে মক্কার মরু অঞ্চলে এক স্থানে অনেক পাখি উড়তে দেখে সেই দিকে অগ্রসর হল। আগের থেকেই তারা পাখির অন্বেষণে চতুর্দিকে ঘুরাফেরা করছিল। উড়ন্ত পাখি লক্ষ্য করে সেখানে পৌঁছার পর অতি উত্তম পানির সন্ধান পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হল। বিবি হাজেরার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তার আশেপাশে বসবাস আরম্ভ করল। পরে জারহাস কবীলারই জনৈকা মহিলার সাথে ইসমাইলের বিবাহ হয়।

কালক্রমে সেই জারহাস কবিলা কাবাশরীফের জিম্মাদার হন। পরবর্তীতে তারা পবিত্র কাবাগৃহের সম্মানের কথা ভুলে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। কিন্তু তাদের সরদার মেজাজ অথবা ওমর বিন হারেস খানায়ে কাবার ইজ্জত ও হুরমাত সম্পর্কে সম্যক অবগত ছিলেন। তিনি তাদের অবজ্ঞা বেয়াদবীর পরিণাম সম্পর্কে কঠোর সর্তক বাণী উচ্চারণ করার পরও তারা আদৌ কর্ণপাত না করায় তিনি আল্লাহর আজাব ও গযবের ভয়ে কওম হতে সরে যাওয়া অপরিহার্য মনে করলেন।

কাবা শরীফের অভ্যন্তরে একটি গর্ত ছিল। কাবা শরীফের হাদিয়াস্বরুপ যে সব মূল্যবান সামগ্রী আনত তা ওতে সংরক্ষিত থাকত। তার নাম ছিল কাবার খাজিনা। এতে দুটি স্বর্ণের হরিণী, অনেক মূল্যবান তরবারী বর্ম ও অন্যান্য বহু জিনিস ছিল। এ সব মূল্যবান দ্রব্য সামগ্রী লুন্ঠিত হয়ে যাওয়ার আশংকায় মেজাজ রাতে শুষ্ক জমজম কূপটি খনন করে এতে পুতে রেখে তিনি ঐ দেশ ছেড়ে চলে যান। কওমে জারহাসের উপর আল্লাহর আযাব অবতীর্ণ হয়ে গেল।

মেজাজ সরদার চলে যাওয়ার কিছুদিন পরেই খোজায়া নামক এক শক্তিশালী গোত্র মক্কা আক্রমণ করে দুর্দান্ত জারহাস কবিলাকে হেরেম শরীফ হতে বহিষ্কৃত ও বিতারিত করে দেয়। তখন থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আবদুল মুত্তালিবের যুগ পর্যন্ত কূপটি সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন ও অজ্ঞাত অবস্থায় পড়ে থাকে।

আবদুল মুত্তালিব ছিলেন হাশেমের পুত্র এবং হাশেম ছিলেন আবদে মুনাফের পুত্র। আবদুল মুত্তালেবের প্রকৃত নাম ছিল শায়বা। আবদুল মুত্তালিব নাম হওয়ার কারণ হল যে, আবদে মুনাফের ছয় পুত্র ছিল। তন্মধ্যে হাশেম সবচেয়ে বেশি প্রতিভাবান ও জনপ্রিয় ছিলেন। হজ্জের মৌসুমে হাজীদের পানি সরবরাহ ও অভ্যর্থনা করার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব ছিল তাঁর। আর তিনি এ দায়িত্ব অত্যন্ত সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করতেন। ব্যবসা বাণিজ্যে দেশ বিদেশ ভ্রমণ করতেন।

এসব কারণে দেশ বিদেশেও তাঁর নাম খুব ছড়িয়ে পড়ল। এভাবে একবার ব্যবসার উদ্দেশ্যে শাম যাওয়ার প্রাক্কালে মদীনার তখনকার ইয়াসরিবের বনী নাজ্জার গোত্রের ছালমা নাম্নী জনৈকা লাবণ্যময়ী সুন্দরী তরুণীর পানি গ্রহণ করেন। ছালমার গর্ভে তাঁর এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাঁর নাম রাখা হয়েছে শায়বা। হাশেম মদীনার পুত্র সন্তান জন্ম গ্রহণের পর আরও কিছু দিন অবস্থানের পর শাম যাওয়ার পথে গোজ্জা নামক স্থানে ইন্তিকাল করেন।

এদিকে তাঁর মৃত্যুর পর দীর্ঘকাল পর্যন্ত তাঁর সন্তানের খবর তাঁর ভাই বেরাদরের নিকট অজ্ঞাত থেকে যায়। দীর্ঘ আট বছর পর তাঁর ভ্রাতা মুত্তালিব শায়বার সংবাদ পেয়ে মদীনায় গিয়ে শায়বাকে সাথে নিয়ে আসেন এবং লালন পালন করেন। মুত্তালিব যতই তাকে তাঁর ভাতিজা বলে পরিচিত করতে চাইলেন কোন লাভ হল না। জনগণ শায়বাকে আবদুল মুত্তালিব বলত। আবদুল মুত্তালিবের মধ্যে আমানত ছিল প্রতীক্ষিত নূরে মুহাম্মদী (সাঃ) মিল্লাতে ইবরাহীমিয়াকে পুনরায় ধরণী বুকে জিন্দা করবেন তিনি। কুদরতের অপার মহীমা কে বুঝতে পারে। কালের অতলে অজ্ঞাত এই জমজম কূপের পুনরুদ্ধার আবদুল মুত্তালিবের জীবনের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা

পরবর্তী গল্প
ইসলাম পূর্ব যুগে আরবদের চরিত্র – পর্ব ১

পূর্ববর্তী গল্প
মহানবী (সাঃ)-এর বংশের পবিত্রতা ও উচ্চ মর্যাদা

ক্যাটেগরী