জঙ্গে হুসাইন | আমার কথা
×

 

 

জঙ্গে হুসাইন

coSam ১৩৫


মক্কা বিজয়ের ফলে পৌত্তলিকতার প্রায় অবসান ঘটলেও কিছু কিছু সম্প্রদায় তখনও ইসলামের সাথে বিরোধিতা ও শত্রুতা পোষণ করে আসছিল। মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী অঞ্চলে কবিলায় হাওয়াজিন এবং কবিলায় সকীফের লোকদের বসবাস ছিল। এ দু'সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা ছিল অত্যাধিক। সংখ্যাধিক্যের শক্তি এবং আর্থিক স্বচ্ছলতার গৌরবে এ গোত্রদ্বয় মুসলমানের মক্কা বিজয়ের প্রতি মোটেই গুরত্ব না দিয়ে ইসলামের প্রতি অত্যাধিক ঈর্ষা বা শত্রুতার বশবর্তী হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সরদার মালেক ইবনে আওফের নেতৃত্বে উভয় সম্প্রদায় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে লাগল।

রাসূল (সাঃ) এ সংবাদ অবগত হয়ে বিস্তারিত জানবার জন্য দূত পাঠালেন। দূত পর্যবেক্ষণ করে এসে রাসূল (সাঃ)-এর নিকট তাদের সমস্ত গোপন তথ্য প্রকাশ করলেন। তাদের নিকট বিস্তারিত জানার পর রাসূল (সাঃ) ওদের বিরুদ্ধে পূর্ণোদ্যমে যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। শীঘ্রই প্রায় বার হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী গড়ে উঠল। এ বাহিনী নিয়ে অষ্টম হিজরীর ছয়ই শাওয়াল বাদ ইশা হুনাইন অভিমুখে রওয়ানা করলেন। মক্কা হতে হুনাইন যাওয়ার জন্য একটি সরু পথ ছাড়া অন্য কোন প্রশস্ত রাজপথ ছিল না। মুসলিম বাহিনী সেই পথেই এগিয়ে চলল।

বিপক্ষ নেতা ইবনে আওফ তার কিছু সংখ্যক সৈন্য ঐ পথের পার্শ্বে লুকিয়ে রাখল। তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল মুসলিম বাহিনী এ পথ দিয়ে নিশ্চিন্তে অগ্রসর হতে থাকলে তোমরা অতর্কিত তীর তলোয়ার নিয়ে ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদেরকে ধ্বংস করে ফেলবে।

শত্রুসেনারা তাদের নেতার নির্দেশ অনুসারে মুসলিম বাহিনী ঐ সরু পথ অতিক্রমকালে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুসলিম সেনারা এরূপে অতর্কিত আক্রমণ একেবারে দিশেহারা হয়ে যে যে দিকে পারলেন ছুটে পালালেন।

এ সময় রাসূল (সাঃ)-এর নিকট হযরত আবু বকর (রাঃ), আলী (রাঃ), আনাস (রাঃ), ফজল ইবনে আব্বাস, ওমর প্রমুখসহ কতিপয় আনসার সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। শত্রুপক্ষের অবিশ্রান্ত তীর নিক্ষেপের কবল থেকে নিরাপদ থাকার জন্য রাসূল (সাঃ) স্বীয় বাহন হতে অবতরণ করে তার আড়ালে আড়ালে চলতে লাগলেন। রাসূল (সাঃ)-এর চাচা আব্বাস (রাঃ) রাসূল (সাঃ)-এর অশ্বের লাগাম ধরে সামনে চলতে লাগলেন। রাসূল (সাঃ) এ অতর্কিত ভীষণ বিপদেও বিচলিত বা ভীত না হয়ে বীরোচিভাবে উচ্চঃস্বরে মুসলিম সৈন্যদেরকে আহবান করছিলেন-

অর্থঃ আমি নবী, এটা নয় মিথ্যা, আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান

এ সময়ে রাসূল (সাঃ)-এর অত্যন্ত সাহসী এবং নবীগত প্রাণের সাহাবী হযরত আয়মান রাসূল (সাঃ)-এর দেহরক্ষী হিসেবে তাঁর একান্ত গা ঘেষে চলছিলেন। তাতে রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি শত্রু নিক্ষিপ্ত একটি তীরবিদ্ধ হয়ে তিনি শহীদ হয়ে জান্নাতে গমন করলেন-

একদল শত্রুসেনা রাসূল (সাঃ)-এর প্রায় নিকটবর্তী হয়ে পড়েছিলেন। রাসূল (সাঃ)-কে হত্যা করার জন্যই এরা নিযুক্ত হয়েছিল। কিন্তু শেরে খোদা হযরত আলী (রাঃ) একে একে সবাইকে সংহার করে চলল।

এ সত্ত্বেও শত্রুদের হামলা বিন্দুমাত্র শিথিল হল না। দুর্বারভাবে তারা চতুর্দিক থেকে মুসলিম বাহিনীর উপর তীর বর্ষণ করতে লাগল। তখন হযরত আব্বাস (রাঃ) উচ্চঃস্বরে মুসলিম সেনাদের বলতে লাগলেন, হে বাবলা বৃক্ষতলে শপথকারী মুসলমানরা! তোমরা না রাসূল (সাঃ)-এর হস্তে হস্ত রেখে ইসলামের জন্য তোমাদের জানমাল কোরবান করার শপথ করেছিলে? তবে এখন তোমরা সে প্রতিজ্ঞা বিস্মৃত হয়ে কোথায় চলছে। এদিকে আস। রাসূল (সাঃ) তো এখানেই আছেন। তাদের অনেকের হৃদয়ে পুনঃ সাহসের সঞ্চার হল।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে এক দুর্ধর্ষ শত্রুবীর প্রকাণ্ড একটা কৃষ্ণকায় উটের পৃষ্টে আরোহণ করে রাসূল (সাঃ)-এর দিকে এগুতে দেখে কয়েকজন মুসলিম সৈন্য তাঁকে বাধা প্রদান করেও ব্যর্থ হলেন।সে রাসূল (সাঃ)-এর একেবারে নিকটবর্তী হয়ে তাঁকে লক্ষ্য করে সুতীক্ষ্ম তরবারি উত্তোলন করল। হযরত আলী (রাঃ) এ সময় অন্যত্র যুদ্ধরত ছিলেন, কিন্তু এদৃশ্য দেখামাত্র তিনি বিদ্যুৎগতিতে ছুটে এসে উক্ত উষ্ট্রারোহী সৈন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং জুলফিকরের এক আঘাত তার মস্তক দেহ থেকে বিছিন্ন করে দিলেন।

এই যুদ্ধে শেরে খোদা হযরত আলী (রাঃ) যে অভূতপূর্ব বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন, তার দৃষ্টান্ত বিরল। তাঁর সে বীরত্বের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ মুসলিম সেনারা বিপুল বিক্রমে আক্রমণ করে শত্রুবাহিনীকে শেষ পর্যন্ত পরাজিত ও বিতাড়িত করে ছাড়লেন।

কথিত আছে যে, এ যুদ্ধের সময় রাসূল (সাঃ) শত্রুদের প্রতি একমুষ্টি ধুলি নিক্ষেপ করেছিলেন। এ ধুলি শত্রু সেনাদের চোখে ঢুকে তাদেরকে অস্থির করে ফেলল। তারা আর এক মুহূর্তের জন্যও যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়াতে পারল না। চক্ষু রগড়াতে রগড়াতে দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে লাগল। তাদের নেতা মালেক ইবনে আওফ স্বয়ং পালিয়ে গিয়ে তায়েফের একটি দুর্গে আশ্রয় নিল।

পরবর্তী গল্প
কুরাইশদের আতঙ্কের কারণ

পূর্ববর্তী গল্প
হযরত আবূ জন্দলের উপস্থিতি

ক্যাটেগরী