খিলাফতের বিষয়কে খিলাফতের বিষয়ে যোগ্য ব্যক্তিবর্গের পরামর্শের উপর ন্যস্ত করা | আমার কথা
×

 

 

খিলাফতের বিষয়কে খিলাফতের বিষয়ে যোগ্য ব্যক্তিবর্গের পরামর্শের উপর ন্যস্ত করা

coSam ১৪৭


হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন, যখন আবু লু'লুআহ হযরত ওমর (রাঃ) কে বর্শা দ্বারা দুইটি আঘাত করিল তখন হযরত ওমর (রাঃ)-এর ধারণা হইল যে, হয়ত তাহার দ্বারা লোকদের হক আদায়ের ব্যাপারে এমন কোন ত্রুটি হইয়াছে যাহা তিনি জানেন না। সুতরাং হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) কে ডাকিলেন। হযরত ওমর (রাঃ) তাহাকে অত্যন্ত মহাব্বত করিতেন। তিনি তাহাকে নিজের কাছে বসাইতেন এবং তাহার কথার গুরত্ব দিতেন।

হযরত ওমর (রাঃ) তাহাকে বলিলেন, আমি চাই যে, তুমি এই বিষয়ে খোঁজ লও যে, আমার এই হত্যাকাণ্ড লোকদের পরামর্শে ঘটানো হইয়াছে কিনা? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বাহিরে গেলেন। তিনি লোকদের যে কোন মজলিসের নিকট দিয়া গেলেন তাহাদিগকে কান্নারত দেখিতে পাইলেন। হযরত ওমর (রাঃ)এর নিকট ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন, আমীরুল মুমিনীন! আমি লোকদের যে কোন মজলিসের নিকট দিয়া অতিক্রম করিয়াছি তাহাদিগকে কান্নারত দেখিতে পাইয়াছি। মনে হইতেছিল যেন আজ তাহারা নিজেদের প্রথম সন্তান হারাইয়াছে।

হযরত ওমর (রাঃ) জিজ্ঞাসা করিলেন, আমাকে কে কতল করিয়াছে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলিলেন, হযরত মুগীরা ইবনে শা'বা (রাঃ)এর অগ্নিউপাসক গোলাম আবু লু'লুআহ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, হযরত ওমর (রাঃ) যখন জানিতে পারিলেন যে, তাহার হত্যাকারী কোন মুসলমান নয় বরং একজন অগ্নিউপাসক তখন আমি তাহার চেহারায় খুশীর ভাব দেখিতে পাইলাম এবং তিনি বলিতে লাগিলেন, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য যিনি আমার হত্যাকারী এমন লোককে বানান নাই যে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলিয়া আমার সহিত ঝগড়া করিতে পারে।

মনোযোগ দিয়া শুন, আমি তোমাদিগকে আমাদের এখানে কোন অনারব গোলাম আনিত নিষেধ করিয়াছিলাম, কিন্তু তোমরা আমার কথা মান্য কর নাই। তারপর বলিলেন, আমার ভাইদেরকে ডাকিয়া আন। লোকেরা জিজ্ঞাসা করিল, তাহারা কাহারা? তিনি বলিলেন, হযরত ওসমান, হযরত আলী, হযরত তালহা, হযরত যুবাইর, হযরত আবদুর রহমান ইবেন আউফ ও হযরত সা'দ ইবেন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)। ইহাদের নিকট লোক পাঠানো হইল। তিনি আপন মস্তক আমার কোলের উপর রাখিলেন। তাহারা উপস্থিত হইলে আমি বলিলাম, ইহারা সকলে উপস্থিত হইয়াছেন।

তিনি বলিলেন, হ্যাঁ, আমি মুসলমানদের ব্যাপারে চিন্তা করিয়া আপনাদের ছয়জনকে তাহাদের সর্দার ও নেতৃবর্গ পাইয়াছি। এই খিলাফতের বিষয়ে শুধু আপনাদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয় তবে সর্বপ্রথম তাহা আপনাদের মধ্যে সৃষ্টি হইবে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, যখন আমি হযরত ওমর (রাঃ)কে পরস্পর মতানৈক্যের কথা আলোচনা করিতে শুনিলাম তখন আমি চিন্তা করিলাম, যদিও হযরত ওমর (রাঃ) সাধারণভাবে বলিতেছেন যে, যদি মতানৈক্য দেখা দেয়- কিন্তু আমার মনে হইল এই মতানৈক্য অবশ্যই দেখা দিবে। কেননা এরূপ খুব কমই হইয়াছে যে, হযরত ওমর (রাঃ) কোন কথা বলিয়াছেন আর আমি তাহা ঘটিতে দেখি নাই

অতঃপর তাহার ক্ষতস্থান হইতে অনেক রক্ত বাহির হইল যাহাতে তিনি দুর্বল হইয়া পড়িলেন। উক্ত ছয়জন নীচুস্বরে কথা বলিতে লাগিলেন। আমার আশঙ্কা হইল তাহারা এখনই হয়ত একজনের হাতে বাইয়াত হইয়া যাইবেন। সুতরাং আমি বলিলাম, আমীরুল মুমিনীন! এখনও জীবিত আছেন, অতএব একই সময়ে দুইজন খলীফা হওয়া উচিত নয় যে, একজন অপরজনের প্রতি তাকাইতে থাকেন। (অর্থাৎ এখন কাহাকেও খলীফা বানাইবেন না।) তারপর হযরত ওমর (রাঃ) বলিলেন, আমাকে উঠাও। আমরা তাহাকে উঠাইলাম।

তিনি বলিলেন, আপনারা তিনদিন পরামর্শ করিবেন এবং পরামর্শ চলাকালীন সময়ে হযরত সুহাইব (রাঃ) লোকদের নামায পড়াইবেন। তাহারা জিজ্ঞাসা করিলেন, আমীরুল মুমিনীন! আমরা কাহাদের সহিত এবং এখানে যে সকল বাহিনী উপস্থিত আছে তাহাদের নেতৃবর্গের সহিত। তারপর হযরত ওমর (রাঃ) সামান্য দুধ চাহিলেন এবং উহা পান করার পর উভয় ক্ষতস্থান হইতে দুধের সাদা পানি বাহির হইয়া আসিল। ইহা দেখিয়া হযরত ওমর (রাঃ) বুঝিয়া গেলেন যে, মৃত্যু নিকটবর্তী হইয়া গিয়াছি। তারপর বলিলেন, এখন যদি আমার নিকট সমগ্র দুনিয়াও থাকে তবে আমি উহাকে মৃত্যুর পর আগত ভয়ানক দৃশ্যের আতঙ্কের বিনিময়ে দিয়া দিতে প্রস্তুত আছি। তবে আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানীতে আশা রাখি যে, আমি মঙ্গলই দেখিব।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলিলেন, আপনি যাহা কিছু বলিয়াছেন আল্লাহ তায়ালা আপনাকে উহার উত্তম বিনিময় দান করুন। এমন নহে কি যে, যখন মুসলমানগণ মক্কায় ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় কালাতিপাত করিতেছিলেন তখন রাসূল (সাঃ) এই দোয়া করিয়াছিলেন যে, আপনাকে হেদায়াত দান করিয়া যেন আল্লাহ তায়ালা দ্বীন ও মুসলমানদিগকে সম্মানিত করেন? অতঃপর আপনি যখন ইসলাম গ্রহণ করিলেন তখন আপনার ইসলাম গ্রহণ সম্মানের কারণ হইল এবং আপনার ইসলাম গ্রহণের দ্বারা ইসলাম ও রাসূল (সাঃ) এবং তাঁহার সাহাবা (রাঃ) আত্মপ্রকাশ লাভ করিলেন। আপনি মদীনায় হিজরত করিলেন, আর আপনার এই হিজরত বিজয়ের কারণ হইল। তারপর যে সমস্ত জিহাদে রাসূল (সাঃ)-এর সহিত মুশরিকদের যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছে আপনি কোন যুদ্ধ অনুপস্থিত থাকেন নাই। অতঃপর রাসূল (সাঃ) আপনার প্রতি সন্তুষ্ট অবস্থায় দুনিয়া হইতে বিদায় গ্রহণ করিলেন।

রাসূল (সাঃ)-এর পর আপনি তাহারই তরীকায় অত্যন্ত জোরদারভাবে খলীফায়ে রাসূলের সাহায্য করিয়াছেন এবং যাহারা আনুগত্য স্বীকার করিয়াছে, তাহাদেরকে লইয়া অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে এমন সংগ্রাম করিয়াছেন যে, লোকেরা ইচ্ছায় অনিচ্ছায় ইসলামে দাখিল হইয়া গিয়াছে। (অর্থাৎ অনেকে স্বেচ্ছায় ইসলামে প্রবেশ করিয়াছেন।) তারপর সেই খলীফা আপনার প্রতি সন্তুষ্ট অবস্থায় দুনিয়া হইতে গ্রহণ করিয়াছেন। তাঁহার পর আপনাকে খলীফা বানানো হইয়াছে আর আপনি এই দায়িত্বকে উত্তমরূপে পালন করিয়াছেন। আল্লাহ তায়ালা আপনার দ্বারা অনেক নতুন নতুন শহর আবাদ করিয়াছেন। বহু মাল দৌলত জমা করিয়াছেন এবং শত্রুর মূলোৎপাটন করাইয়াছেন

আল্লাহ তায়ালা আপনার দ্বারা প্রত্যেক ঘরে দ্বীনেরও উন্নতি দান করিয়াছেন, রিজিকের স্বচ্ছলতা দান করিয়াছেন। সর্বশেষে আল্লাহ তায়ালা আপনাকে শাহাদাতের মর্তবাও দান করিয়াছেন। শাহাদাতের এই মর্তবা আপনার জন্য মোবারক হউক।

অতঃপর হযরত ওমর (রাঃ) বলিলেন, আল্লাহর কসম, তুমি (এই ধরণের কথা বলিয়া) যাহাকে ধোকা দিতেছ যদি সে নিজের ব্যাপারে এই কথাগুলো স্বীকার করিয়া লয় তবে সে ধোকা খাওয়া লোক হইবে। তারপর বলিলেন, হে আবদুল্লাহ! তুমি কি কিয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে আমার ব্যাপারে এই সকল কথার সাক্ষ্য দিবে? হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলিলেন, হ্যাঁ। হযরত ওমর (রাঃ) বলিলেন, হে আল্লাহ! তোমার জন্য সকল প্রশংসা।

হে আবদুল্লাহ ইবেন ওমর! আমার চেহারা মাটির উপর রাখিয়া দাও। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) বলেন, আমি তাঁহার মাথা আমার উরুর উপর হইতে সরাইয়া আমার পায়ের গোছার উপর রাখিলাম। তিনি বলিলেন, না, আমার চেহারাকে মাটির উপর রাখিয়া দাও, এবং নিজেই আপন দাড়ি ও চেহারা হেলাইয়া দিলেন আর চেহারা মাটিতে পড়িয়া গেল। তারপর বলিলেন, হে ওমর, যদি আল্লাহ তায়ালা তোমাকে মাফ না করেন তবে হে ওমর, তোমার জন্যও ধ্বংস তোমার মায়ের জন্যও ধ্বংস। ইহার পর তাঁহার ইন্তেকাল হইয়া গেল। আল্লাহ তায়ালা তাঁহার উপর রহমত বর্ষণ করুন।

হযরত ওমর (রাঃ)এর ইন্তেকালের পর উল্লেখিত ছয়জন সাহারা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)এর নিকট সংবাদ পাঠাইলেন। হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) বলিলেন, হযরত ওমর (রাঃ) আপনাদিগকে মুহাজিরীন ও আনসারদের সহিত এবং এখানে উপস্থিত সমস্ত বাহিনীর সর্দার ও নেতৃবর্গের সহিত পরামর্শ করিতে আদেশ করিয়া গিয়েছেন। আপনারা যদি এই কাজ সমাধা না

করেন তবে আমি আপনাদের নিকট আসিব না। হযরত হাসান বসরী (রহঃ)এর নিকট হযরত ওমর (রাঃ)এর ইন্তেকালের সময়ের আমল এবং তাহার আপন রবকে ভয় করার বিষয়ের আলোচনা করা হইলে তিনি বলিলেন, মুমিন এইরূপ হইয়া থাকে, আমলও উত্তমরূপে করে আবার আল্লাহকেও ভয় করে। আর মুনাফিক আমলও খারাপভাবে করে আবার নিজের ব্যাপারে ধোকায় লিপ্ত থাকে।

আল্লাহর কসম, আমি অতীতে ও বর্তমানে এইরূপ পাইয়াছি যে, বান্দা যতই উত্তমরূপে আমলও করিতে থাকে ততই অন্তরে আল্লাহ তায়ালার ভয় বৃদ্ধি পাইতে থাকে। আর অতীতে ও বর্তমানে আমি ততই তাহার নিজের ব্যাপারে ধোকা বৃদ্ধি পাইতে থাকে।

পরবর্তী গল্প
হযরত ওমর (রাঃ) এর খুতবা

পূর্ববর্তী গল্প
বিদায় হজ্জ দশম হিজরী

ক্যাটেগরী