খায়বার অভিযানের সময় মক্কাবাসীদের মনোভাব | আমার কথা
×

 

 

খায়বার অভিযানের সময় মক্কাবাসীদের মনোভাব

coSam ১৪৪


খায়বার বিজয় এবং যয়নব নামে এক ইহুদী রমণী কর্তৃক রাসূল (সাঃ)-কে তার খাদ্যে বিষ প্রদানের অব্যবহিত পরেই হাজ্জাজ নামক জনৈক ইহুদী ধনকুবের স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। ইহুদীদের চরম শত্রুতা, এমনকি সামনাসামনি যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পরও রাসূল (সাঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র করার পরও তিনি যে উদারতা, মহানুভবতা প্রদর্শন করেন, তা ইহুদী ধনকুবের হাজ্জাজের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে।

ফলে তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়ে নিজেকে ধন্য করেন। ধনকুবের হাজ্জাজ সমগ্র হেজাযের মধ্যে একজন নামজাদা মহাজনও। মক্কার ব্যবসায়ীদের নিকট তাঁর বহু অর্থকড়ি এবং ব্যবসায় পণ্য ছিল। তিনি ভাবলেন, তাঁর ইসলাম গ্রহণের সংবাদ যদি সর্বসাধারণের ছড়িয়ে যায়, তবে বণিকদের থেকে প্রাপ্য আদায়ে অসুবিধা হতে পারে। তাই তিনি স্বীয় ইসলাম গ্রহণের সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পূর্বেই অর্থসম্পদ সংগ্রহের মানসে অবিলম্বে মক্কা গমন করেন।

পরবর্তীকালে তাঁর বর্ণনা থেকে জানা যায়, খায়বার বিজয়ের পর তিনি মক্কাবাসীদের নিকট তাঁর পাওনা আদায়ের মানসে মক্কায় উপনীত হন। মক্কাবাসীরা পূর্ব থেকেই রাসূল (সাঃ)-এর খায়বার অভিযানের সংবাদ জানতে ব্যাকুল ছিল। ফলে তাকে দেখা মাত্র মক্কাবাসীরা সমস্বরে চিৎকার করে বলতে লাগল। আরে বল, খায়বারের সংবাদ কি? তিনি বলেন, আমি বললাম, খুব ভাল। আমি খুব ভাল বলার পর তারা আমার বাহন উটের চতুপার্শ্বে সমবেত হয়ে কি, কি, বলে চিৎকার করতে লাগল।

আমি বললাম, একটি সংবাদের বটে! এমন সংবাদ শুনার তোমাদের আর ভাগ্যে হয়নি। খায়বর যুদ্ধে মুহাম্মাদ ও তার লোকজন ভীষণভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে- যাকে বলে একেবারে নাস্তানাবুদ। তাদের মেরুদণ্ড চিরকালের জন্য চুর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। অধিকন্তু মুহাম্মাদ ইহুদীদের হাতে বন্দী। খায়বার প্রধানদের অভিমত, মুহাম্মাদকে বেঁধে মক্কায় চালান দিবে। তোমরা স্বহস্তে তার মুণ্ডপাত করবে। হাজ্জাজের নিকট মুসলিম বাহিনীর কল্পিত পতনের সংবাদ শোনার পর লোকগুলো ঊর্ধ্বশ্বাসে মক্কাপানে ছুটে যায় এবং তার দেয়া কল্পিত খবর প্রচার করে সারা শহরটা একেবারে সরগরম করে তোলে।

ইতোমধ্যে হাজ্জাজও নগরীতে প্রবেশ করে গল্প গুজবের মাধ্যমে সকলকে মাতিয়ে অবশেষে বলে, মুহাম্মাদ ও তাঁর অনুসারীদের পরাজয়ের সংবাদ তোমাদের যে আন্দোৎসব তাতে আমরাও শরীক হবার সংকল্প করেছি। কিন্তু এখনও অনেক কাজ বাকী। মুহাম্মাদের অবস্থা তোমরা শুনলে, তবে এখনও নিশ্চিত হবার উপায় নেই। কখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়। তদুপরি তাঁর ভক্ত অনুরক্তের দলও তো একেবারে যে সে বস্তু নয়। তারা কখন কি কাণ্ড ঘটিয়ে বসে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। কাজেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মুসলমানরা নিজেদেরকে গুছিয়ে নেয়ার আগেই মদীনায় হামলা করে একেবারে লণ্ডভণ্ড করে ফেলতে হবে। যাতে মুসলমানরা আর কোন দিন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। তবেই একটা কাজের মত কাজ হবে। এ কাজের জন্য প্রয়োজন অনেক অর্থ সম্পদের। সুদীর্ঘ দিনের যুদ্ধবিগ্রহে

আমাদের একেবারে সবশেষ। আমরা মদীনা আক্রমণের কাজে নিজেদের যথাসর্বস্ব ব্যয় করার সংকল্প করেছি। তাই এ সময় তোমাদের নিকট আসা। অতএব তোমরা যথা শীঘ্র তোমাদের নিকট আমার পাওনা টাকা পয়সাগুলো দিয়ে দাও। আমি তড়িত খায়বারে প্রত্যাবর্তন করে কাজ শুরু করি। একাজে বিলম্ব করলে মূল লক্ষ্যে পৌঁছা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ প্রকার চাল চেলে ধনকুবের হাজ্জাজ মক্কাবাসীদের নিকট থেকে তার সকল পাওয়া উসল করে খায়বারের উদ্দেশ্য রওয়ানা করে। যাত্রার প্রাক্কালে তিনি রাসূল (সাঃ)-এর চাচা হযরত আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব (রাঃ)-কে খায়বার বিজয়ের সংবাদ অবহিত করে যান। হাজ্জাজ বারণ করেছিলেন, তার মক্কা ত্যাগের তিন দিনের মধ্যে বাস্তব ঘটনা কাছে যেন ব্যক্ত করা না হয়।

হাজাজ্জের চলে যাওয়ার পর তিনদিন অতিক্রান্ত হলে ৪র্থ দিনে হযরত আব্বাস (রাঃ) কাল বর্ণের জুব্বা পরে বের হন। এতে সবাই তাঁকে বিদ্রূপ করে বলতে লাগল কি ব্যাপার আপনি তো দেখছি পূর্ব থেকেই ভাতিজার জন্য শোকবেশ ধারণ করে বসেছেন। তিনি বিদ্রূপকারীদের ধিক্কার দিয়ে বলেন, হতভাগার দল, সময় আছে, এখনও সতর্ক হও। আল্লাহর নূর মুখের ফুঁৎকারে নিভানোর সাধ্য তোমাদের নেই। এতে ফুঁৎকারকারীর মুখ পুড়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহর প্রজ্বলিত নূর নিভান যাবে না।

তিনি আরও বলেন, আমি শোকবেশ নয়, উৎসবের বেশ ধারণ করেছি। আমার ভাতিজা খায়বার অভিযানে সম্পূর্ণরূপে বিজয়ী হয়েছেন। হযরত আব্বাস (রাঃ)-এর মুখে প্রকৃত ঘটনা অবহিত হয়ে কুরাইশদের অবস্থা যে কিরূপ পরিগ্রহ করেছিল, তা বলে বুঝান অসাধ্য; বরং অনুভবের বিষয়। কুরাইশদের মনোভাব ইসলাম, মুসলমান ও ইসলামের নবী সম্পর্কে কত জঘন্য ছিল তা তুলে ধরার জন্যই ইসলামে নবদীক্ষিত ধনকুবের হাজাজ্জের কাহিনী তুলে ধরা হল।

পরবর্তী গল্প
রাসূল (সাঃ)-কে বিষপ্রয়োগে হত্যার প্রচেষ্টা

পূর্ববর্তী গল্প
খন্দক বা পরিখার যুদ্ধ

ক্যাটেগরী