খাইবারের যুদ্ধ | আমার কথা
×

 

 

খাইবারের যুদ্ধ

coSam ৩৮০


রাসূল (সাঃ)-এর জীবদ্দশায় মুসলমানদের জন্য এক বিশেষ সঙ্কটজনক ঘটনা খায়বারের যুদ্ধ। মদীনা ও তাঁর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ইহুদীরা যদিও প্রথম দিকে মুসলমানদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু অল্প কিছু দিন যেতে না যেতেই তারা বিশ্বাসঘতকতা করে সে চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলমানদের সাথে গোপনে প্রকাশ্যে শত্রুতা আরম্ভ করে দেয়। এমনকি মুসলমানদের প্রধান শত্রু মক্কার কুরাইশদের সাথে মিলিত হয়ে খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল। এছাড়া কয়েকবারই তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। এভাবে বার বার তাদের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে মুসলমানরা অবশেষে তাদেরকে মদিনা থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। বহিষ্কৃত ইহুদীদের কিছু সংখ্যক এদিকে সেদিকে গিয়ে বসবাস করতে লাগল আর কিছু সংখ্যক খায়বারে গিয়ে অবস্থান নিল।

খায়বর ইহুদীদের একটি সুদৃঢ় ঘাঁটি। এটা মদীনা হতে ছিয়ানব্বই মাইল দূরে অবস্থিত। এখানে আগে থেকে বহু সংখ্যক ইহুদী বসবাস করত। মদীনা হতে বহিষ্কৃত ইহুদীরা খায়বারের ইহুদীদের সাথে মিলিত হয়ে মদীনার মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভীষণ ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা এরূপ পণ করল যে, ইসলামের নবী, ইসলাম, মুসলমান এবং আশ্রয়স্থল মদীনাকে যে পর্যন্ত না ধরাপৃষ্ঠ হতে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পারবে সে পর্যন্ত সুস্থির হয়ে বসেব না। এ উদ্দেশ্য সফলের লক্ষ্যে তাঁর অন্যান্য স্থানের ইহুদীদেরকেও খায়বার ডেকে পাঠিয়েছে। আর সে আহ্বানে বিভিন্ন এলাকায় ইহুদীরা পরমাগ্রহে ও সানন্দে খায়বার গিয়ে উপনীত হল। অল্প দিনের মধ্যেই খায়বারে ইহুদীদের একটি বিশাল বাহিনী পড়ে উঠল। এ সাথে বিশাল অস্ত্র ভাণ্ডারও সংগ্রহ করল। পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেই তারা মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা গ্রহণ করল।

খায়বার ইহুদীদের সুরক্ষিত দুর্ভেদ্য ছয়টি দূর্গ ছিল, যা কোন বিপক্ষীয়ের দ্বারা করায়ত্ব করার কল্পনাও করা যেত না। আর এ কারণেই ইহুদীরা নিজেদের প্রতি যথেষ্ট আস্থাশীল ছিল। তারা মনে করত যে, উন্মুক্ত ময়দানে যুদ্ধ করে বিপক্ষের সাথে ঘটনাক্রমে এটে উঠতে যদি নাও পারে, তবে তারা এ সমস্ত দুর্গের অভ্যন্তরভাগে অবস্থান নিয়ে শত্রুর প্রতি তীর ও পাথর দ্বারা আক্রমণ করতে পারবে আর শত্রুরা বাইরে থেকে তাদের কিছুই করতে পারবে না।

রাসূল (সাঃ)-এর নিয়োজিত গুপ্তচর ইহুদীদের উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতির সম্পূর্ণ খাবরাখবর নিয়ে যথাসময়ে মদিনায় পৌঁছে রাসূল (সাঃ)-কে অবহিত করলেন, রাসূল (সাঃ) এ সংবাদ অবগত হয়ে সাহাবীদের সাথে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় যে, ইহুদীদের অতবড় বিশাল বাহিনী নিয়ে মদীনায় হামলা করার সুযোগ না দিয়ে ওদের প্রস্তুতিকালেই ওদের কাছে গিয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি করা যাতে এরা আক্রমণাত্মক যুদ্ধের জন্য পরাপুরিভাবে তৈরি হওয়ার সুযোগ না পায়।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাসূল (সাঃ) মোট এক হাজার চারশত সৈন্য খায়বর অভিমুখে রওয়ানা হলেন। এদের মধ্যে মাত্র দু'শ ছিল অশ্বারোহী সৈন্য। রাসূল (সাঃ)-এর বাহিনী খায়বার হতে বার মাইল দূরে সাহারা নামক স্থানে পৌঁছে সেখানে আসরের নামায আদায় করলেন। অতঃপর কিছু আহারাদি সেরে পুনরায় রওয়ানা করলেন। অতঃপর খায়বার হতে মাত্র এক মাইল দূরে রজিহ নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে রাত যাপন করলেন। এস্থানে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসা এবং সেবা শুশ্রুষার জন্য শিবির তৈরি করা হল। রাসূল (সাঃ) মুসলিম বাহিনীর শিবির স্থাপনে এমন সতর্কতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিলেন যে, ইহুদীদের কেল্লাসমূহ মুসলমানদের বেষ্টনীর ভিতর পড়ে গেল। তাছাড়া খায়বরস্ত ইহুদীদের কবিলায়ে গাতফানের সাহায্যে আসার পথও রুদ্ধ হয়ে গেল।

মুসলিম বাহিনীর যথাস্থানে উপনীত হওয়ার সাথে সাথে ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। ইহুদীদের বিশাল বাহিনীর তুলনায় মুসলিম বাহিনী যদিও একেবারেই নগণ্য তবু সৈন্যব্যুহ রচনার নিপুণতায় এবং মরণপণ যুদ্ধ করায় মুসলিম বাহিনীকে হটিয়ে দেয়া ইহুদীদের পক্ষে সম্ভব হল না। উল্টা মুসলিম বাহিনীই ইহুদী সৈন্যদেরকে প্রতিমুহূর্তে চাপের মুখে রাখছিল। দেখতে দেখতে মুসলিম বাহিনী ইহুদীদের অধিকাংশ দুর্গই দখলে নিয়ে নিল। একটি মাত্র দুর্গ অবশিষ্ট রইল।

এ দুর্গটি দখল এবং চূড়ান্ত বিজয় লাভের জন্য রাসূল (সাঃ) আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন এবং প্রতিদিন প্রধান সেনা নায়কের পদে নতুন নতুন লোক নিয়োগ করেছিলেন। এমনকি হযরত আবু বকর, হযরত ওমর, হযরত ওসমান (রাঃ) প্রমুখ বুজুর্গ ও বিশিষ্ট সাহাবাদেরকেও সেনা-নায়কের পদে নিযুক্ত করছিলেন, কোন ফলোদয় হয়নি। ইহুদীদের অধিকাংশ দুর্গ হস্তগত হলেও ওদের জনশক্তি ও অস্ত্র শক্তির তেমন ক্ষতিগ্রস্থ করা গেল না।

অবশেষে একদিন সন্ধ্যাবেলায় যুদ্ধশেষে সৈন্যরা শিবিরে ফিরে এসে যখন রাসূল (সাঃ)-কে সংবাদ দিল যে, যুদ্ধের ফলাফল আজও নির্ধারিত হয়নি। তখন তিনি এরশাদ করলেন, আগামীকাল এমন লোকের হাতে সেনানায়কের পতাকা অর্পণ করব যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) উভয়েই পছন্দ করেন। আর আল্লাহ তায়ালা তাঁর হস্তেই আমাদের জয় অর্পণ করবেন।

সাহাবায়ে কিরাম রাসূল (সাঃ)-এর বাণী শ্রবনান্তে কোন কথা জিজ্ঞেস না করে যার যার জায়গায় গিয়ে কেবল ভাবতে লাগলেন, হায় কে এমন সৌভাগ্যবান পুরুষ, যার উপর আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) উভয়ে সন্তুষ্ট এবং যার হাতেই খায়বর যুদ্ধে বিজয় অর্জিত হবে।

সারারাত ফজরের নামায আদায়ের পর রাসূল (সাঃ) স্ব-স্থানে উপবেশন করলেন। সমবেত সাহাবীবৃন্দ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা ক্করতে লাগলেন রাসূল (সাঃ) এখন কার নামোচ্চারণ করেন তা শুনার জন্য। একটু পরেই রাসূল (সাঃ) সকলের সব ভাবনা চিন্তার অবসান ঘটিয়ে বলে উঠলেনঃ প্রিয় আলী। আমার নিকট এস। হযরত আলীর চোখে ছিল ভীষণ অসুখ তাই তিনি মদীনায় ছিলেন। কে একজন বলে উঠল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! হযরত আলী (রাঃ) রোগাক্রান্ত তাঁর চোখে ভীষণ অসুখ।

রাসূল (সাঃ) বলেন, তা আমি অবগত আছি। তবুও তাকে ডাক। হজরত আলী (রাঃ)-কে ডাকা হল। তিনি চোখ মুছতে মুছতে রাসূল (সাঃ)-এর সম্মুখে এসে দাঁড়ালেন। রাসূল (সাঃ) তাঁর পবিত্র মুখের সামান্য লালা হযরত আলী (রাঃ) এর রোগাক্রান্ত চুক্ষদ্বয়ে লাগিয়ে দিয়ে বলেন, আল্লাহ তোমার চক্ষুদ্বয় নিরাময় করে দিবেন-আমি দোয়া করেছি।

অতঃপর তিনি হযরত আলী (রাঃ)-এর হস্তে ইসলামের ঝাণ্ডা অর্পণ করে বলেন, আলী যাও, আজ তুমি আল্লাহর নাম নিয়ে সৈন্য পরিচালনা করে কামিয়াবী হয়ে ফিরে আস। আল্লাহর দরবারে এই প্রার্থনাই করছি।

রাসূল (সাঃ)-এর নির্দেশ শীরোধার্য করে আল্লাহ তায়ালার নামোচ্চারণ করে রাসূল (সাঃ) প্রদত্ত দস্তার মস্তকে বেঁধে ও তাঁরই তরবারি যুলফিকর হস্তে ধারণ করে হযরত আলী যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হলেন।

যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করে তিনি এমন বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার সাথে সৈন্য পরিচালনা করলেন যে, মুসলিম বাহিনীর হস্তে অগণিত শত্রুসৈন্য প্রাণ হারাল। তা ছাড়া তিনি স্বীয় শত্রুসৈন্যের বুহ্যভেদ করে ভিতর ঢুকে এমনভাবে তরবারি চালালেন যে, তাঁর ছাড়া সামনে যে-ই আসল সেই নিহত হল। মোটকথা সেদিন খায়বার প্রান্তরে হযরত আলী (রাঃ)-কে বীরত্ব দেখে শত্রুসৈন্যের মধ্যে কম্পন সৃষ্টি হল। তিনি যে সত্যিই শেরে খোদা বা আল্লাহর বাঘ তার জাজ্জ্বল্যমান দৃশ্য সেদিন প্রতিভাত হল।

কথিত আছে যে, যুদ্ধের এক পর্যায়ে শত্রু সৈন্যের অসংখ্য আঘাত প্রতিরোধ করতে করতে তাঁর ঢালখানা ভেঙ্গে গেল। তখন তিনি কামুস দুর্গের দরজার সন্নিকটে পৌঁছে গিয়েছিলেন। ঢালশূন্য হয়ে মুহূর্তে তিনি কামুস দুর্গের লৌহ নির্মিত একখানা কপাট টেনে ছাড়িয়ে নিয়ে এটা একহাতে ধরে তা দ্বারা ঢালের কার্য চালিয়ে গেলেন। অবশেষে অল্পক্ষণের মধ্যেই ইহুদী সৈন্যরা দিশেহারা হয়ে দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে লাগল। এ মুহূর্তে তৎকালীন আরবের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর মারহাব হযরত আলী (রাঃ)-এর সামনে উপনীত হয়ে তাকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আহবান করল। হযরত আলী (রাঃ) তার আহবানে সাথে সাথে সাড়া দিয়ে তার সম্মুখ উপস্থিত হয়ে বলেন, তুমি প্রথমে হামলা চালিয়ে তোমার শক্তি পরীক্ষা কর।

মারহাব তার সর্বশক্তি দিয়া সুকৌশল হযরত আলী (রাঃ)-এর মস্তক লক্ষ্য করে তরবারীর আঘাত করল। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) ততোধিক সুকৌশল মারহাবের আঘাত ব্যর্থ করে দিয়ে তৎক্ষণাৎ মারহাবের মস্তক এ শোচনীয় পরিণত দেখে এতক্ষণ পর্যন্ত যারা দু'একজন রণাঙ্গণে ছিল, তারাও আতঙ্ক ঊর্ধ্বশাসে যুদ্ধক্ষেত্রে ছেড়ে পালিয়ে গেল।

এভাবে যুদ্ধ সমাপ্ত হয়ে গেল। কামুস দুর্গের শীর্ষে হযরত আলী (রাঃ) ইসলামী পতাকা উড়িয়ে দিলেন। অতঃপর মহাবীর আলী তাঁর ঢালের বদলে যে, দুর্গ-লৌহ কপাট দিয়ে ঢালের কাজ চালিয়েছিলেন, সেটা রণক্ষেত্রে ফেলে রেখে তিনি রাসূল (সাঃ)-এর সমীপে উপস্থিত হলেন। রাসূল (সাঃ) এগিয়ে এসে তাঁকে পরম স্নেহে স্বীয় বক্ষের সাথে চেপে ধরে বললেন, আলী! তুমি আজ ইসলামের গৌরব যেভাবে উর্ধ্বে তুলে ধরলে, আল্লাহ তায়ালার দরবারে তোমার গৌরব ও তদ্রূপ বর্ধিত হয়ে যাবে।

এ যুদ্ধে মুসলমানরা যথেষ্ট গনীমতের মাল এবং কতিপয় রমণী লাভ করলেন। রাসূল (সাঃ) এটা মুসলিম মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। আর ইহুদী হাইয়্যের কন্যা সুফিয়া ইসলাম গ্রহণ করে রাসূল (সাঃ) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন।

যুদ্ধের পরে যুদ্ধবন্দী এবং সাধারণ ইহুদীদের সাথে অত্যন্ত উত্তম ব্যবহার প্রদর্শন করায় ইহুদীরা মুগ্ধ হয়ে মুসলমানদের সাথে শত্রুতা অনেকাংশে কমিয়ে দিল।

পরবর্তী গল্প
মক্কা বিজয়

পূর্ববর্তী গল্প
রাসূল (সাঃ)-কে বিষপ্রয়োগে হত্যার প্রচেষ্টা

ক্যাটেগরী