খন্দক বা পরিখার যুদ্ধ | আমার কথা
×

 

 

খন্দক বা পরিখার যুদ্ধ

coSam ১৫১


খন্দক যুদ্ধ সংঘঠিত হওয়ার পিছনে কতকগুলো কারণ বিদ্যমান ছিল। ওহুদ যুদ্ধে কুরাইশ কাফিররা দৃশ্যতঃ মুসলমানদের সাময়িক বিপর্যয় ও তাদের আংশিক সফলতা দেখালেও তারা তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। তারা নিজ শহরের সাথে মদীনাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রতিরক্ষার কোন সেনাবাহিনী মদীনায় রেখে যেতে পারেনি।

তাদের বাণিজ্য পথের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হল না। তারা হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)-কেও হত্যা করতে পারল না। যার ফলে ওহুদ যুদ্ধের পর আবার স্বল্প সময়ের মধ্যেই মদীনার মুসলমানরা পুনরায় নিজেদেরকে সুসংঘঠিত করে পূর্বাপেক্ষা আরও বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠলেন।

মুসলমানদের এ শক্তি বৃদ্ধিতে মক্কার কুরাইশরা নিশ্চিত হয়ে পড়ল। এ অবস্থায় কুরাইশদের সামাজিক, ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক সব রকম সুযোগ বিনষ্ট হবার উপক্রম। তাই তারা শেষ বারের মত মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য পুনরায় একটা সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করে মদীনার উপকণ্ঠে বসবাসরত বেদুইনরা কুরাইশদের সাথে হাত মিলায়।

ইয়াহুদীরা মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করায় তাদের প্রতি কিছু কোঠর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, সে অজুহাতে মদীনা ও মদীনার বাইরের ইয়াহুদীরাও এবার কুরাইশদের সহিত যোগদান করল। যার ফলে আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে প্রায় বার হাজার সৈন্যের এক বাহিনী মদীনা আক্রমণের জন্য যাত্রা করে। তাদের সাথে অশ্ব, উট এবং রনসম্ভার ছিল বিপুল পরিমাণ।

রাসূল (সাঃ) এ সংবাদ অবগত হয়ে সাহাবাদেরকে নিয়ে পরামর্শে বসে সামগ্রিক পর্যালোচনার পর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, মদীনার বাইরে শত্রুর সম্মুখীন হওয়া ঠিক হবে না। কারণ এত বড় বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলমানদের মাত্র তিন হাজার সৈন্য খুবই নগণ্য।

হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) মদীনার তিনদিকে একটি গভীর পরিখা খননের পরামর্শ দেন। বাকী একদিকে পর্বত তাই সেদিকে পরিখা খনন কাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এমনকি খোদ রাসূল (সাঃ) পরিখা খননে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত ছিলেন। পরিশ্রমে তাঁর সর্বাঙ্গ ঘামে ভিজে পরিধেয় বস্ত্র সিক্ত হয়ে গিয়েছিল।

পরিখা খনন কাজ সমাপ্তির পর মহিলা ও শিশুদের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে রাখা হল। যুদ্ধকালে নগর রক্ষার জন্য নগরবাসীদেরকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে পাহারায় নিযুক্ত করা হল। তারপর মুসলিম সৈন্যরা শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য পরিখার তীরে দণ্ডায়মান হলেন।

কুরাইশ সেনারা মদীনার উপকণ্ঠে উপস্থিত হয়ে মদীনা রক্ষার এ অভিনব কৌশল দেখতে পেয়ে বিস্মিত হয়ে পড়ল।

পরিখা অতিক্রম করে আক্রমণ চালাতে অসমর্থ কুরাইশ সেনা সাতাশ দিন মদীনা অবরোধ করে রাখল। দূর হতে তারা প্রস্তর খণ্ড ছুড়ে মারছিল। সমস্ত খন্দকের মধ্যে কয়েকটি ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছিল। মুসলিমরা সে সকল ঘাঁটিতে থেকে কাফিরদের তীর ও প্রস্তর দ্বারা পাল্টা জবাব দিচ্ছিলেন।

আবু সুফিয়ানের অধীনে খালিদ বিন ওয়ালিদ, আমর বিন আস, জররার বিন খাত্তাব প্রমুখ শক্তিশালী সেনানায়করা পরিখা অতিক্রমের জন্য নানারকম চেষ্টা করছিল। প্রতিদিন পুনঃপুন তারা আক্রমণ করতে লাগল। কিন্তু কেউই খন্দক অতিক্রম করে আসতে পারল না। কেননা, রাসূল (সাঃ) খন্দকের সীমানায় সৈন্য সুবিন্যস্ত করে রেখেছিলেন।

অবশেষে আমর বিন আবদে ওয়াদ নামক জনৈক বিখ্যাত সেনাপতি অসীম সাহসে তার অশ্ব নিয়ে পরিখায় লাফিয়ে পড়ে এবং মুসলিম বাহিনীকে লক্ষ্য করে বলল, কাপুরুষোচিত যুদ্ধ পরিহার করে হিম্মত থাকলে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হও। আমি বদর যুদ্ধে আহত হয়ে শপথ করেছিলেন যে, প্রতিশোধ না নেয়া পর্যন্ত মাথায় তেল মর্দন করব না। এখন আমার বয়স নব্বই বছর। কিন্তু কোন ব্যক্তি আমার সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারবে না। যদি তোমাদের কারও আমার সাথে যুদ্ধ করার হিম্মত থাকে তবে আস। সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হও।

তার এ ধরণের দাম্ভিকতাপূর্ণ উক্তিকে হযরত আলী (রাঃ)-এর ধমনীতে রক্তপ্রবাহ চঞ্চল হয়ে উঠল। তিনি কাফিরদের কথাগুলো সহ্য করতে না পেয়ে রাসূল (সাঃ)-এর খিদমতে অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি তাঁকে অনুমতি দিয়ে স্বীয় মস্তকের আমামা তার মস্তকে পরিয়ে স্বীয় তরবারি তার হস্তে অর্পণ করে বলেন, যাও, আমি তোমাকে মহান আল্লাহর সমীপে সোপর্দ করলাম। তুমি আরবের একজন শক্তিশালী যোদ্ধার সহিত যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছ। কিন্তু আকাশে তোমার একজন সর্বশক্তিমান সাহায্যকারী আছেন। তিনি সর্বক্ষণ তোমার সাথে আছেন এবং থাকবেন।

হযরত আলী (রাঃ) তার সামনে হাজির হলে সে বলল, অসম্ভব কথা। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, তবে তুমি ফেরত যাও। সে বলল তাও অসম্ভব কথা। তখন হযরত আলী (রাঃ) বলেন, তবে তুমি আমার সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও। তারপর আলী (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বলল, ওহে বালক! তুমি কে? হযরত আলী (রাঃ) বলনে, আমি আবু তালিব তনয় আলী! সে বলল, তোমার পিতা আমার বন্ধু ছিলেন। যাও, তুমি ফিরে যাও। আমি তোমার সাথে যুদ্ধ করব না।

হযরত আলী (রাঃ) বলেন, কিন্তু আমি তো তোমার সাথে যুদ্ধ করব। তখন আমর বলল, আচ্ছা তবে তুমি আঘাত হানতে পার। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, মুসলমান কখনও আগে আঘাত হানে না, তা আমাদের রীতিবিরুদ্ধে। তুমিই আমাকে অগ্রে আঘাত হান। আমর ইবনে ওয়াদ হযরত আলী (রাঃ)-কে তরবারি দ্বারা আঘাত করল। সে আঘাতে এত প্রচণ্ড ছিল যে, হযরত আলী (রাঃ)-এর লৌহ বর্ম ভেদ করে কপালে গুরুতর আঘাত লাগল।

হযরত আলী (রাঃ) আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে হুজুর পাক (সাঃ) প্রদত্ত তরবারি দ্বারা এমন জোরে আমরের স্কন্ধে আঘাত হানলেন যে, সে আঘাতেই আমরের মস্তক দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। এতবড় বীরের সহসা পতন ঘটতে দেখে হযরত ওমর (রাঃ)-এর ভ্রাতা জরবার ও জরিবাহ দুজনে একত্রে হযরত আলী

(রাঃ)-এর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) এমনভাবে আসি সঞ্চালন করতে লাগলেন যে, উভয়ই পলায়ন করল। হযরত ওমর (রাঃ) আপন সহদর জররারকে আক্রমণ করলেন, এ সময় অন্য জনৈক কুরাইশ পালাবার সময় গর্তে নিপতিত হয়ে বলল, আমি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের ন্যায় মৃতু কামনা করি। হযরত আলী (রাঃ) গর্তের মধ্যে লাফিয়ে পড়ে তার মস্তক দ্বিখণ্ডিত করে বললেন, এরূপই সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের মৃত্যু।

হযরত আলী (রাঃ) আমর ইবনে ওয়াদকে হত্যার পর রাসূল (সাঃ)-এর দরবারে উপস্থিত হলে তিনি তাঁকে বক্ষে জড়িয়ে ধরে বললেন, আল্লাহর রহমত তোমার উপরে আলী। হযরত আলী (রাঃ)-এর ললাট হতে তখনও শোনিত ধারা প্রবাহিত হচ্ছিল। এটা দেখে হুজুর (সাঃ) বলনে, তোমার রক্ত আমার রক্ত, তোমার মাংস আমার মাংস। তোমার আজিকার এ কীর্তি শেষ দিন পর্যন্ত প্রত্যেক মুসলমানের কীর্তি হতে শ্রেষ্ঠ হয়ে থাকবে। কেননা, তুমি জীবনে-মরণে সদ্ধিক্ষণে ইসলামের মর্যাদা সমুন্নত করেছে।

এ যুদ্ধের ভয়াবহ সঙ্কটকালে রাসূল (সাঃ) ও অন্যান্য মুসলমানদের চার ওয়াক্ত নামায অসম্পন্ন রয়ে গেল। রাসূল (সাঃ) তখনও যদিও কয়েকদিনের ক্ষুধার্থ ছিলেন, তথাপি তিনি প্রত্যেক ঘাটিতে গিয়ে মুজাহিদদেরকে উৎসাহ প্রদান করছিলেন। মুসলিম মুজাহিদরা উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে শত্রু সেনার মোকাবেলা করছিলেন। ইতিপূর্বে মুসলমানদের এরূপ যুদ্ধে আর কখনও অবতীর্ণ হতে হয়নি।

অবশেষে রাসূল (সাঃ) একমুষ্টি মাটি কাফিরদের প্রতি নিক্ষেপ করলে ওদের দিকে পড়তে না পড়তে প্রবল বাতাস উত্থিত হল। কাফিরদের তাবু ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। অশ্ব ঝড়-বৃষ্টির বেগ সহ্য করতে না পেরে দিকবিদিক ছুটে পালালো। কাফির সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। তাদের দারুণ

খাদ্যভাব দেখা দিল। এ অবস্থায় বেগতিক দেখে আবু সুফিয়ান বেদুঈন এবং ইয়াহুদীরা একেবারে নিরাশ এবং হতাশাসগ্রস্ত হয়ে পড়ল। তাদের ঐক্য জোটের এখানেই সমাধি রচিত হয়ে গেল।

এ যুদ্ধটি ইতিহাস পরিখার, খন্দকের এবং জঙ্গে আহযাব নামেও সমধিক পরিচিত হয়ে থাকে, আহযাব অর্থ দলসমূহ। শত্রুপক্ষে বহু দলের সমন্বয় ঘটেছিল বলে এ যুদ্ধটি জঙ্গে আহযাব নামে কথিত হয়।

এ পরিখা যুদ্ধে মুসলমানদের একটা বড় উপকার হল যে, এতদিন পর্যন্ত মক্কার কাফের কুরাইশরা যে আক্রমণকারীর ভূমিকায় ছিল, তাদের সে ভূমিকার চির সমাধি রচিত হল।

পরবর্তী গল্প
খায়বার অভিযানের সময় মক্কাবাসীদের মনোভাব

পূর্ববর্তী গল্প
যাতুর রেখা অভিযান ও অভিযানের কারণ - শেষ পর্ব

ক্যাটেগরী