কবরের আযাব সত্য-১ম পর্ব | আমার কথা
×

 

 

কবরের আযাব সত্য-১ম পর্ব

coSam ২৯


আমরা কবরের নেয়ামত অথবা শান্তি বলতে বারযাখের নেয়ামত অথবা শাস্তি বুঝি। সন্দেহ নেই যে বারযাখী জীবনটা আল্লাহ তা'আলার শাস্তি কিংবা নেয়ামতের মাধ্যমে প্রতিদান দানের একটা স্তর। এ স্তরের প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষের দেহ পঁছে গেলে তখন দেহ হতে রূহ আলাদা হয়ে যায়। কবরের নেয়ামত কিংবা আযাবের কথা পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে বলা হয়,  "সকাল সন্ধায় তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যে দিন কিয়ামত সংঘটিত হবে সেদিন আদেশ করা হবে ফির'আউন গােত্রকে কঠিনতর আযাবে দাখিল কর।”ইবনে কাসীর বলেন : এ আয়াতটি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বারযাখী জীবনে কবরের আযাব প্রমাণ করার একটি বড় ভিত্তি। সেই ভিত্তিটি হলাে সকাল সন্ধা তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন তাদেরকে ছেড়ে দিন সে দিন পর্যন্ত যেদিন তাদের উপর বজ্রাঘাত পতিত হবে। 

সেদিন তাদের চক্রান্ত তাদের কোন উপকারে আসবে না এবং তারা সাহায্য প্রাপ্তও হবে না। জালেমদের জন্য এছাড়াও আরও আযাব রয়েছে কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না। উপরােক্ত আয়াত গুলােতে জালেমদের জন্য এ ছাড়াও আরও অযাব রয়েছে কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানেনা। এই বক্তব্যে বর্ণিত শাস্তি ও আযাব দুনিয়াতেও হতে পারে। তাদেরকে হত্যা ইত্যাদির মাধ্যমে। আবার তা বারযাখেও হতে পারে। তবে এ আযাব বারযাখে হওয়াটাই যুক্তি সঙ্গত। কারণ তাদের অনেকেই দুনিয়াতে কোন শাস্তি না পেয়েই মারা যান।

অথবা আয়াতের তাৎপর্য এর চেয়েও সাধারণ। আল্লাহু তা'আলা আরও বলেন : “যারা অপকর্ম করেছে তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে মুমিনদের মত ও সৎকর্মশীলদের মত করব? তাদের জীবন কাল ও মৃত্যু পরবর্তীকাল সমান হবে? তাদের এ ধারণা খুবই মন্দ।” এ আয়াত থেকে জানা যায় যে, অপকর্মকারী এবং সৎকর্মশীল মুমিনের অবস্থান কখনও সমান হতে পারে না। তা জীবন কালেও না মৃত্যুর পরবর্তী জীবনেও না।

এখানে মামাত' বলতে মৃত্যু পরবর্তী কাল বা বারযাখী জীবনের কথা বুঝানাে হয়েছে। বারযাখী জীবনে যদি উভয়ে সমান না হয় তাহলে অবশ্যই অপকর্ম কারীরা শান্তি বা আযাব ভােগ করবে। আর সৎকর্মশীল মুমিন না কবরে নেয়ামত ভােগ করবে। আর কবর আযাব প্রসঙ্গে সহীহ হাদীস সংখ্যা অনেক। আমরা এখানে পাঠকদের কয়েকটি উপস্থাপন করছি। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ), দুটি কবরের পাশ দিয়ে একবার যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন এ কবর দুটি অধিবাসীদের উপর আযাব হচ্ছে। বড় কোন করণে আযাব হচ্ছে না । তাদের দুজনের একজন পেশাব করার পর সঠিকভাবে পবিত্রতা অর্জন করতাে না।

আর অপরজন চোগলখুরী করে  বেড়াত। অপর খেজুর গাছের কাচা ডাল নিয়ে তা দুভাগে বিভক্ত করে অতপর প্রত্যেক কবরের উপর একটাংশ গেড়ে দিলেন। সাহাবারা বললেন হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এরূপ কেন করলেন? তখন তিনি বললেন আশা করা যায় যতক্ষণ পর্যন্ত ডাল দুটি শুকাবেনা ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের শান্তি কম হবে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত এক ইহুদী মহিলা তার কাছে এসে বলল : আল্লাহ আপনাকে কবর আযাব থেকে মুক্ত রাখুন।

তখন আয়শা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে কবর আযাব সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। তখন মহানবী (সা.) বললেন হ্যা, কবর আযাব সত্য। আয়েশা (রা.) বললেন এর পর আমি মহা নবী (সা.) কে কোন সালাত আদায় করার পর কবর আযাব থেকে আল্লাহর পানাহ না চাইতে দেখিনি। এ জাতীয় হাদীসের সংখ্যা অনেক। মৃত ব্যক্তি তার বারযাখী জীবনে কবরে থাক বা অন্য কোথাও , তার রূহ ইল্লিসনে (উর্ধ্ব জগৎ) থাক বা সিজ্জিনে (নিম্নজগতে) থাক সে হয়তবা নেয়ামত লাভ করবে। অথবা আযাবের সম্মুখীন হবে।

আর কিয়ামতের পর পুনরুত্থান না হওয়া পর্যন্ত মৃত মানুষের কবরের সাথে তার রূহের একটা সম্পর্ক থাকবে। মানুষের শরীর হতে রুহ বা আত্মাকে যখন ছিনিয়ে নেয়া হয় তখন সে রহমতে ফেরেশতা কিংবা আযাবের ফেরেস্তা দ্বারা সুখভােগ বা শাস্তি ভােগ করতে থাকে।

কুরআন এবং হাদীসে এ কথা বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন. “আর যদি তুমি দেখ যখন ফেরেশতারা কাফেরদের রূহ কবজ করে প্রহার করে তাদের মুখে এবং তাদের পশ্চাৎদেশে বলে জ্বলন্ত আযাবের স্বাদ গ্রহণ কর। উপরােক্ত আয়াতে একথা স্পষ্ট যে, এ শাস্তি কাফেরদেরকে তাদের রূহ কবজ করার সময় ফেরেশতারা দিয়ে থাকেন।

আর মুত্তাকী মুমিনদের রূহ কবজ করার সময় কি অবস্থা হয় এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেন : যখন মুমিন বান্দা দুনিয়া ছেড়ে আখিরাতের দিকে এগিয়ে যান তখন তার প্রতি আসমান থেকে শ্বেত মুখমণ্ডল বিশিষ্ট কিছু ফেরেশতা অবর্তীণ হন।

যাদের মুখমণ্ডল যেন জ্বলন্ত সূর্য। তাদের সাথে থাকে জান্নাতী কাফন। এবং জান্নাতী সুগন্ধ দ্রব্য। অবশেষে তার চোখে যতটুকু দেখা যায় এতটুকুর মধ্যেই বসে যায়। তখন মালিকুল মাউত আসেন। এসেই তার মাথার পাশে বসে যান। তারপর বলেন : হে পবিত্র রূহ! আল্লাহর মাগফিরাত/ক্ষমার এবং সম্ভষ্টির দিকে বের হয়ে আসুন। তিনি বলেন : তখন রূহ বের হয়ে আসে যেমন করে কলসির মুখ হতে পানির ফোটা বের হয়ে আসেন তেমনি।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদানুযায়ী কবরের আযাব সত্য। বিভিন্ন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, নেককার মুমিনগণ যেমন কবরের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত আরাম-আয়েশে থাকবে, তেমনি কাফির, মুনাফিক ও বদকাররা কবরের মধ্যে আযাব ভােগ করতে থাকবে।

একবার আয়েশা রা.-এর নিকট এক ইহুদী মহিলা আসল। মহিলাটি তার সামনে কবর আযাবের আলােচনা করে বলল : ‘আল্লাহ্ আপনাকে কবর আযাব থেকে হিফাজত করুন। আয়েশা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “হ্যা কবরের আযাব সত্য।" অতপর আয়েশা সিদ্দীকা রা. বলেন : যখনই রাসূলুল্লাহ (সাঃ), নামায আদায় করেছেন, তখনই কবর আযাব থেকে মুক্তির দু'আ করেছেন।

খলিফাতুল মুসলিমীন উসমান (রাঃ) যখন কোন কবরের নিকট দাঁড়াতেন তখন এত অধিক পরিমাণ কাঁদতেন যে, চোখের পানিতে তার দাড়ি ভিজে যেত। এ সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে, আপনি জান্নাত-জাহান্নামের আলােচনায় এত অধিক পরিমাণে কাঁদেন না, কিন্তু কবর দেখে আপনার এত বেশি কান্নাকাটি করার কারণ কী? উসমান রা. উত্তরে বললেন : রাসূলুল্লাহ (সাঃ)  বলেছেন : নিশ্চয়ই কবর আখিরাতের প্রথম ঘাটি। যদি এ ঘাটি থেকে নাজাত পাও, তাহলে অবশিষ্ট ঘাটিগুলাে পার হওয়া আরও বেশি সহজ। আর যদি এ ঘাটি থেকে বাঁচতে না পার, তাহলে অবশিষ্ট ঘাটিগুলাে অতিক্রম করা আরও কঠিন হয়ে যাবে।

অপর এক হাদীসের বর্ণনায় এসেছে, আবৃ সাঈদ আল-খুদুরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ সা. বলেছেন : অবশ্যই কবরের মধ্যে কাফিরের জন্য নিরানব্বইটা অজগর সাপ নিয়ােজিত করে দেয়া হবে। আর সেগুলাে কিয়ামত পর্যন্ত তাকে অবিরতভাবে দংশন করতে থাকবে। এ অজগর এত বিষাক্ত যে, যদি একটি অজগর পৃথিবীতে শ্বাস ফেলে, তাহলে যমিনে শাক-সবজি উৎপন্ন হবে না।

অর্থাৎ সাপগুলাের বিষক্রিয়া এত মারাত্মক হবে যে, সেখান থেকে একটি অজগরও যদি পৃথিবীতে  একবার শ্বাস ফেলে তাহলে তার বিষক্রিয়ায়, জমিনের একটি ঘাসও আর উৎপাদন করার যােগ্যতা থাকবে না। এ প্রসঙ্গে অপর এক হাদীসের বর্ণনায় এসেছে, বাররা ইব্‌ন আযিব (রাঃ.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : মুনকার ও নাকীর ফেরেশতার প্রশ্নের জওয়াবে কাফির ও পাপীরা যখন উত্তর দেয়, হায়! হায়! আমি জানি না, তখন আসমান থেকে একজন ঘােষণাকারী আওয়াজ দিয়ে বলেন : “ এ ব্যক্তি মিথ্যা বলছে। তার পায়ের নীচে আগুন জ্বালিয়ে দাও।

তাকে আগুনের পােশাক পরিয়ে দাও এবং তার জন্য জাহান্নামের একটি দরজা খুলে দাও। তখন জাহান্নামের তাপ ও লু হাওয়া, তার কবরে আসতে থাকে। তার কবরকে এমন সংকীর্ণ করে দেয়া হয় যে, তার এক পাশ্বের পাঁজর অপর পার্শ্বে চলে যায়। অতপর তাকে আযাব দেয়ার জন্য এমন একজন ফেরেশতাকে নিযুক্ত করা হয়, যে চোখে দেখে না, কানে শােনে না। তার নিকট লােহার গদা থাকবে।

গল্পের ২য় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন  

পরবর্তী গল্প
কবরের আযাব সত্য-২য় পর্ব

পূর্ববর্তী গল্প
দাম্পত্যজীবন ইসলাম ও নারী

ক্যাটেগরী