কবরের আযাব সত্য-শেষ পর্ব | আমার কথা
×

 

 

কবরের আযাব সত্য-শেষ পর্ব

coSam ২২


গল্পের ৩য় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

ওদিকে শয়তানের লশকরসমূহ দৌড় দিয়ে এসে শয়তানকে সুসংবাদ জানাবে যে, এক ব্যক্তিকে জাহান্নাম পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছি। অতপর যখন তাকে কবরে রাখা হবে তখন কবর তার জন্য এত সংকীর্ণ হয়ে যাবে যে, তার পাঁজরের হাড়গুলি একে অন্যের ভিতর ঢুকে যাবে। তারপর তার নিকট ভয়ঙ্কর মূর্তিতে মুনকার-নাকীর হাজির হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করবে, তােমার রব কে? তােমার দ্বীন কী? তােমার নবী কে? প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তরে সে বলবে : আমি জানি না।   

উত্তর শুনে ফেরেশতাগণ গুর্জ দ্বারা তাকে ভীষণভাবে আঘাত করতে শুরু করবে। আঘাতের প্রচণ্ডতা এমন হবে যে, গুর্জের ফুলকিসমূহ কবরে ছড়িয়ে পড়বে। অতপর তাকে বলা হবে যে, উপরের দিকে দেখ। উপরের দিকে চেয়ে সে জান্নাতের দরজার দিকে তাকিয়ে সেখানকার বাগান ও সৌন্দর্য দেখতে পাবে। তখন ফেরেশতাগণ তাকে বলবেন : খােদার দুশমন! আল্লাহর ইবাদত করলে এটা তােমার জন্য চিরস্থায়ী ঠিকানা হতাে। এরপর রাসূল সা. বলেন : ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, এ কথা শুনে সে এত বেশী কষ্ট পাবে যে, সেইরূপ আর কখনাে হয়নি।

অতপর জাহান্নামের দরজা খােলা হবে। ফেরেশতাগণ বলবেন : হে আল্লাহর দুশমন! এটাই তাে তাের চিরস্থায়ী আবাসস্থল। কেননা তুই আল্লাহর নাফরমানি করেছিলি। এরপর জাহান্নাম হতে ৭৭ টি দরজা তার কবরের দিকে খুলে দেয়া হবে যেখান থেকে কিয়ামত পর্যন্ত গরম বাতাস ও ধােয়া তার কবরে আসতে থাকবে। অপর এক হাদীসের বর্ণনায় এসেছে, প্রসিদ্ধ সাহাবী আনাস ইবন মালিক রা, হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন : যমিন প্রতিদিন কয়েকটি কথা ঘােষণা দিয়ে থাকে। যেমন: ১, হে আদম সন্তান! তুমি আমার পিঠের উপর দৌড়ে চলছে, মনে রেখ, তােমাকে কিন্তু আমার পেটের ভেতরই আসতে হবে।

২. তুমি আমার উপর থেকে হারাম খেয়ে চলছে, মনে রেখাে, তােমাকে আমার পেটের ভেতর পােকা-মাকড় ভক্ষণ করবে। ৩, তুমি আমার উপর থেকে আল্লাহর নাফরমানি করছে, মনে রেখ, তােমাকে আমার পেটের ভেতর তার শাস্তিভােগ করতে হবে। ৪. তুমি আমার পিঠের উপরে চলাচলের পর হাসছে, মনে রেখ, আমার পেটের ভেতর তােমাকে কান্নাকাটি করে কাটাতে হবে। ৫. আমার উপরে থেকে তুমি অহংকার ও দাম্ভিকতা প্রকাশ করছাে, স্মরণ রেখ, আমার পেটের ভেতর তুমি অপমানিত হবে। ৬. আমার উপর তুমি হারাম মাল জমা করছে, মনে রেখ, আমার ভেতর তুমি গলে যাবে। ৭. আমার পিঠের উপর প্রফুল্ল মনে চলছে, মনে রেখ, আমার ভেতর তুমি অন্ধকারে থাকবে। ৮, আমার উপরিভাগে তুমি তােমার দলবল নিয়ে চলাফেরা করছে কিন্তু আমার ভেতর তুমি একাকী থাকবে। ৯, হে আদম সন্তান! আমার উপর তুমি আনন্দে বিভাের কিন্তু আমার ভেতর দুঃখিত এবং চিন্তাম্বিত থাকবে। হাদীসের অপর এক বর্ণনায় এসেছে, হােবায়রিশ ইবন রিবাব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন।   

একবার আমি জাহফাহর রাস্তায় আছয়া নামক স্থানের নিকট দিয়ে পথ চলছিলাম। আমি দেখলাম আগুনে জ্বলন্ত এক ব্যক্তি একটি কবর থেকে বের হলাে । তার গর্দানে লােহার জিঞ্জির, সে আমার নিকট পানি চাইল। ইতিমধ্যে ঐ কবর থেকে অন্য একজন ব্যক্তি বের হলাে সে বলল : এ কাফিরকে পানি দিও । অতপর সে প্রথমােক্ত ব্যক্তিকে ধরে ফেরত নিয়ে গেল।

হােয়রিশ রা, এর বর্ণনা যে, ঐ ঘটনা দেখে আমার উটনী ভয়ে আমার হাত থেকে ফসকে যাওয়ার উপক্রম হলাে। আমি সেখানে অবস্থান করে মাগরিব ও ইশার নামায পড়ে উটনীতে আরােহন করে মদীনায় আসলাম। উমর রা. এর নিকট এ ঘটনা বর্ণনা করলাম। এটি শ্রবণ করে তিনি বললেন : হে হােবায়রিশ! তুমি তাে সত্যবাদিতায় বিখ্যাত কিন্তু তুমি তাে এমন একটি সংবাদ প্রদান করেছ যার তথ্য উদঘাটনের খুবই আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে।

সুতরাং উমর রা, ঐ স্থানের আশে পাশের বয়স্ক লােকদেরকে আহ্বান করলেন। যারা অন্ধকার যুগের অবস্থা সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিমাণে অবগত। ঐ সমস্ত প্রাচীন লােকদের সম্মুখে হােবায়রিশ রা.-কে উপস্থিত করে এ পূর্ণ ঘটনাটি ব্যক্ত করলে তারা এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলল । আমিরুল মুমিনীন ঐ কবরস্থ ব্যক্তিটি বনু গাফফারের এবং অন্ধকার যুগে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি। সে মেহমানের কোন হক আদায় করতাে না।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবন আসাকীর রহ. হতে বর্ণিত, সাদকাহ ইবন ইয়াজিদ রহ, বলেন : ত্রিপলির এক উচ্চস্থানে পাশাপাশি তিনটি কবর দেখতে পেলাম : প্রথম কবরের উপর লেখা ছিল: যে ব্যক্তি এ কথা বিশ্বাস করে যে, মৃত্যু অনিবার্য সত্য এবং আমার করতলগত দেশ ও রাষ্ট্র অতি শীঘ্রই আমির নিকট হতে কেড়ে নেয়া হবে ও আমাকে একদিন কবরে দাফন করা হবে মৃত্যু ও পরকালের ভয়ে দুনিয়ার জীবনে সে কখনাে শান্তি লাভ করতে পারে না। দ্বিতীয় কবরের গায়ে লেখা ছিল: যে ব্যক্তি এ কথা জানে যে, হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে এবং সবাইকে কর্মফল ভােগ করতে হবে, সে তার জীবদ্দশায় কিছুতেই সুখ ভােগ করতে পারে না।

তৃতীয় কবরের গায়ে লেখা ছিল : যে ব্যক্তি এ কথা জানে যে, কবর আমাদের যৌবনকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে এবং দেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে খন্ড-বিখন্ড করে খেয়ে ফেলবে, স্বীয় জীবনে সে কখনাে আরাম উপভােগ করতে পারবে না। তিনটি কবরের পাশাপাশি অবস্থান এবং সেই অভূতপূর্ব কবর লিপি দেখে আমি অত্যন্ত বিস্মিত হলাম। অতপর পাশ্ববর্তী এক গ্রামে গিয়ে জনৈক বৃদ্ধের কাছে ঐ কবর সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলাম। বৃদ্ধ জানালাে : উক্ত কবরবাসীরা ছিল তিন ভাই। তাদের প্রথমজন ছিল বাদশাহের সেনাপতি। দ্বিতীয়জন ছিল একজন ধনাঢ্য বণিক। আর তৃতীয়জন ছিল দরবেশ। দরবেশ দিবারাত্র সব সময় ইবাদত বন্দেগীতে মশগুল থাকতাে।

দরবেশের মৃত্যুকালে তার ভ্রতৃদ্বয় এতে তাকে বলল। : তােমার যদি কোন অসীয়ত থাকে তাহলে তা বলতে পারাে। দরবেশ বলল । আমার নিকট কোন ধন-সম্পদ নেই এবং আমার কোন ঋণও নেই। তাই অসীয়ত করারও তেমন কিছুই নেই। তবে আমি তােমাদেরকে এ বিষয়ে অসীয়ত করে যাচ্ছি যে, আমার মৃত্যুর পর তােমরা আমাকে ত্রিপলির উঁচু টিলায় দাফন করবে এবং আমার কবরের গায়ে এ কথাগুলাে লিখে দিবে। “যে ব্যক্তি এ কথা জানে যে,

হাশরের ময়দানে মহান আল্লাহর সামনে জবাবদিহি করতে হবে এবং সবাইকে কর্মফল ভােগ করতে হবে, সে তার জীবদ্দশায় কিছুতেই সুখ ভােগ করতে পারে না। অতঃপর ক্রমাম্বয়ে তিনদিন আমার কবর যিয়ারত করবে।

ফলে তােমরা আমার কবর হতে সদুপদেশ অর্জন করতে পারবে। দরবেশের মৃত্যু হলে তাকে যথাস্থানে সমাহিত করতঃ কবরের গায়ে তার আদিষ্ট কথাগুলাে যথারীতি লিখে দেয়া হলাে। এরপর তার জীবিত দুই ভাই একাধারে তিনদিন পর্যন্ত তার কবর যিয়ারত করল।

তৃতীয় দিবসে সেনাপতি কবর যিয়ারত করে ফেরার পথে সে কবরের ভেতর থেকে দেয়াল ধ্বসে পড়ার মত এক বিকট আওয়াজ শুনতে পেলাে। ফলে ভয়ে জড়োসড়াে হয়ে কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত তার গৃহের দিকে প্রত্যাবর্তন করলাে। রাতে তার সেই মৃত ভাইকে স্বপ্নে দেখে সে জিজ্ঞেস করল।

আজ আমি তােমার কবর যিয়ারতকালে কবর হতে যে বিকট শব্দ ভেসে আসছিল সেটা কীসের আওয়াজ? সে জবাবে বলল : জনৈক আযাবের ফেরেশতা এসে তখন আমাকে ধমকিয়ে জিজ্ঞেস করছিল : একদা এক উৎপীড়িত ব্যক্তি এসে যখন তােমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছিল তখন তুমি তাকে সাহায্য করনি কেন? এ কথা বলে সে এক মজবুত ও ভারী লােহার মুগুর দ্বারা বেদম প্রহার করছিলাে।

তুমি কবর যিয়ারতকালে ফেরেশতাকর্তৃক আমাকে মুগুর দ্বারা পিটানাের সেই ভয়ঙ্কর শব্দই ভেসে আসছিল। এ স্বপ্ন দেখার পর সেনাপতি সকাল বেলা তার অপর ভাই এবং নিকটতমবন্ধু বান্ধবকে ডেকে এনে বলল : আমি আর তােমাদের মাঝে থাকতে চাই না।

বাদশাহের অধীনে চাকুরী করারও কোন প্রয়ােজন নেই। এ কথা বলে সে সকল প্রকার আরাম আয়েশ পরিত্যাগ করল এবং পার্থিব ধন-সম্পদ সবকিছু বিসর্জন দিয়ে এক নির্জন জঙ্গলে গিয়ে ঠাই নিল। সে সেখানে ইবাদত-বন্দেগী করতে থাকল।

তার ইন্তিকালের সময় তার ব্যবসায়ী ভাই এসে তাকে বলল : তােমার কোন অসীয়ত থাকলে বলতে পার। দরবেশের ন্যায় সেও বলল আমার কোন ধন-সম্পদ নেই। তবে আমার মৃত্যুর পর আমার কবরের গায়ে তুমি এই কথাটি লিখে দিবে : “যে ব্যক্তি এ কথা বিশ্বাস করে যে, মৃত্যু অনিবার্য সত্য এবং আমার করতলগত দেশ ও রাষ্ট্র অতি শীঘই আমার নিকট হতে কেড়ে নেয়া হবে ও আমাকে একদিন কবরে দাফন করা হবে মৃত্যু ও পরকালের ভয়ে দুনিয়ার জীবনে সে কখনাে শান্তি লাভ করতে পারে না।” অতপর ক্রমান্বয়ে তিনদিন আমার কবর যিয়ারত করবে।

তুর পরে মৃত্যুর পরে অনন্ত জীবন সুতার পরের অনন্ত জীবন সেনাপতি মৃত্যুর পর তার কবরে উল্লিখিত কথাগুলো লিখে দেয়া হল বণিক যে ভাই ছিল সে একাধারে তিনদিন এসে তার কবর যিয়ারত করল। শেষদিন কবর যিয়ারত করে চলে যাওয়ার সময় সে সেনাপতির কবরে একটি ভয়ঙ্কর শব্দ শুনতে পেল। সেনাপতির কবর থেকে এ ভীতিগ্রদ আওয়াজ ভেসে আসতে শুনে সে ভীত-সন্ত্রস্ত্র  হয়ে কাঁপতে কাঁপতে তার বাড়িতে ফিরে গেল। রাতের বেলায় সে সেনাপতিকে স্বপ্নে দেখে সে জিজ্ঞেস করলো : তুমি কেমন আছ? সেনাপতি জবাব দিল, ভালই আছি, তাওবা করায় আমার গোনাহ মাফ হয়ে গেছে। ফলে এখন আমি সুখেই আছি। সে তাকে আবারো বলল : দরবেশ ভাই কেমন আছে? (সেনাপতি বলল : তিনি নেককারদের সঙ্গে বেহেশৃতের উচুস্থানে সমাসীন রয়েছে।

বণিক এবার নিজের কথা জিজ্ঞেস করে বলল : আচ্ছা তাহলে আমার অবস্থা কী হবে? সেনাপতি জবাব দিল : প্রত্যেককেই নিজের কর্মফল ভোগ করতে হবে। তুখি অবসর সময়কে মূল্যবান মনে করো এবং নেক আমল দ্বারা পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করো। পরদিন সকাল বেলা বণিকও দুনিয়ার সম্পর্ক ত্যাগ করলো।

সে তার যাবতীয় ধন-সম্পদ গরীব দঃবী মানুষকে দান করে দিয়ে আল্লাহ্‌ তা'আলার ইবাদতে মশগুল হল। বণিকের মৃত্যুকালে তার ছেলে এসে বলল : হে আমার পিতা! আপনি কিছু অসীয়ত করে যান। বণিক বলল : আমার তো কোন ধন-সম্পদ নেই, যার জন্য আমি তোমাকে অসীয়ত করতে পারি।

তবে আহার সৃত্যুর পর আমার কবরের গায়ে “যে ব্যক্তি এ কথা জানে যে, কবর আমাদের যৌবনকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে এবং দেহের সমস্ত অঙগ-প্রত্যঙ্গকে খন্ড-বিখন্ড করে খেয়ে ফেলবে, স্থীয় জীবনে সে কখনো আরাম উপভোগ করতে পারবে না।”-এ কথাটি লিখে দিবে। আর অতি শীঘ্রই তোমাকেও কবরে যেতে হবে। তাই দুনিয়াদারদের মতো নিশ্চিন্ত থেকো না। তোমাকে অবশ্যই কবর গৃহে আসতে হবে। তুমি অতিসত্তর প্রস্তুত হও। অতি শীই প্রস্তুত হও।

গল্পের ১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

পরবর্তী গল্প
যাকাতের মাসায়েল

পূর্ববর্তী গল্প
কবরের আযাব সত্য-৩য় পর্ব

ক্যাটেগরী