ওহুদের যুদ্ধ ঘটনাবলী | আমার কথা
×

 

 

ওহুদের যুদ্ধ ঘটনাবলী

coSam ২৩৭


বদরের যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য কুরাইশরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বদর যুদ্ধে যে সকল নারী তার আপন জনকে হারিয়েছিল তারা তার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য প্রায় সবাই পুরুষদের সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল। এবারকার সেনা প্রধান আবূ সুফিয়ান স্বয়ং। অচিরেই একটা বিরাট বাহিনী প্রস্তুত করে কুরাইশরা যুদ্ধাভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। ফেরেশতা জিবরাঈল (আ) এসে হুজুরে পাক (স)-কে এ সংবাদ অবহিত করেন।

হুযুর (সঃ) সাহাবীদের সাথে এ বিষয়ে পরামর্শ করে কুরাইশদের প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল ইতোমধ্যে কাফের সৈন্যবাহিনী প্রায় মদীনার দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হল। কাফের বাহিনীতে তিন সহস্র সৈন্য। রাসূলুল্লাহ (সঃ) মাত্র এক হাজার মুজাহিদসহ দ্রুত শত্রু সৈন্যের মোকাবেলার বের হয়ে ওহুদ প্রান্তর পার হয়ে যথাস্থানে শিবির স্থাপন করলেন। অবশ্য ওহুদ প্রান্তে পৌছার পূর্বেই তাঁর একহাজার সৈন্যের প্রায় তিনশত সৈন্য মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবনে উবাইর নেতৃত্বে বের হয়ে গেল। তখন মুজাহিদ বাহীনীর সৈন্য সংখ্যা দাঁড়াল মাত্র সাত'শ।

কুরাইশ বাহিনী সামনে ওহুদ প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীর শিবির দেখে আর সামনে অগ্রসর না হয়ে ওহুদ পাহাড়ের অপর প্রান্তে শিবির স্থাপন করল।

রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুসলিম বাহিনীকে ওহুদ পাহাড়ের দিকে পৃষ্ঠ রেখে দাঁড় করালেন। মুসলিম বাহিনীর পিছনে একটি গিরিপথ ছিল। দূরদর্শী নবীজী (সঃ) পিছন দিক পাহারার জন্য আবদুল্লাহ ইবনে জোবায়ের (রা)-এর নেতৃত্বে সত্তরজন সুদক্ষ তীরন্দাস সৈন্যকে এ গিরিপথের মুখে মোতায়েন করে। তাদেরকে নির্দেশ দেন। যুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের পরেও নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তারা যেন নিজেদের স্থান কোন ভাবেই পরিত্যাগ না করে।

শত্রু বাহিনী ও সর্বপ্রকার প্রস্তুতি সম্পন্ন করল। মহাবীর খালিদ বিন ওয়ালিদ, ইকরামা ইবনে আবূ জাহল, সাফোয়ান ইবনে উমাইয়া এবং আবদুল্লাহ ইবনে রাবিয়া প্রমুখ বড় বড় যোদ্ধা পরিচালনার ভার গ্রহণ করল।

মুসলিম বাহিনীর ডানবাহু পরিচালনায় ভার গ্রহণ করলেন জোবায়ের ইবনে আওয়াম এবং বামবাহু পরিচালনার ভার ন্যস্ত হল মুনজের ইবনে আমেরের উপর। বাহিনীর মূল পতাকাধারী নিযুক্ত হলেন মোসআব ইবনে উমাইর (রা)।

কাফিরদের পতাকাধারী অগ্রসর হয়ে বলল, আমার সাথে যুদ্ধ করার মত কোন মুসলমান আছে কি? যদি থাকে তাহলে সামনে এসে হয় আমাকে হত্যা কর, নতুবা নিজের হত্যা ডেকে আন। হযরত আলী (রা) তার সাথে মোকাবেলার জন্য অগ্রসর হলে কাফের যোদ্ধা তাঁকে আঘাত হানল। আলী (রা) তা প্রতিহত করে এক আঘাতেই তার জীবন সাঙ্গ করলেন। নিহতের পুত্র দোঁড়ে এসে পতাকা ধারণ করল। হযরত হামজাহ (রা) ছুটে গিয়ে এক আঘাতে তাকেও সাঙ্গ করলেন একের পর এক কাফির সৈন্য নিহত হচ্ছিল।

ঠিক এমনি মুহুর্তে কাফির সৈন্য ওহশী আড়াল থেকে বর্শা নিক্ষেপ করে মহাবীর হামজাহ (রা)-কে শহীদ করে ফেলল। তৎক্ষণাৎ হযরত আলী (রা) ও আবু দাজানা (রা) শত্রু সৈন্য ধ্বংস করতে করতে বীর বিক্রমে আবু সুফিয়ানের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। অতর্কিত সাদ্দাম ইবনে আসোয়াদ তাঁর উপর হামলা করলে তিনি শাহাদত বরণ করেন।

রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট হতে একখানা তরবারী নিয়ে আবূ দাজানা শত্রু সৈন্যের মধ্যে প্রবেশ করে। সম্মুখে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দাকে দর্শন মাত্র তার মাথা বরাবর তরবারী উত্তোলন করলেন, কিন্তু আঘাত না করে বলেন এ তরবারী রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রদত্ত সুতরাং দুর্বল নারীর উপর এটা চালনা করলাম না। নতুবা তুমি আজ অবশ্যই জাহান্নামে প্রেরিত হতে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসলিম বাহিনীর প্রবল হামলায় শত্রুপক্ষ ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। তারা আর রণক্ষেত্রে দণ্ডায়মান থাকতে না পেরে যেদিকে পারল ছুটে পালাল। ক্ষণকাল মধ্যে রণক্ষেত্রে শত্রুসৈন্য শূন্য হয়ে গেল। মুসলিম বাহিনীও শত্রুপরিত্যক্ত মাল কুড়াতে শুরু করলেন। এ দৃশ্য অবলোকন করে যে সকল মুসলিম সেনা মুসলামদের পশ্চাদ্ভাগে গীরিপথ পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন, তাদেরও গনীমতের মাল সংগ্রহের আকাঙ্ক্ষা জাগল। ফলে তারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নির্দেশ বিস্মৃত হয়ে স্থান ত্যাগ করে শত্রুদের মাল লুন্ঠনে শরীক হলেন।

দূর থেকে শত্রু সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ এদৃশ্য লক্ষ্য করলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ সেনাপতি। তাই অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এ উন্মুক্ত গিরিপথ দিয়ে প্রবেশ করে মুসলিম বাহিনী উপর পিছন দিক থেকে হামলা করলেন। এ অবস্থা লক্ষ্য করে পলায়নপর শত্রু সৈন্যরা প্রত্যাবর্তন করে মুসলমানদের সম্মুখে দাঁড়াল। ফলে মুসলিম বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন। এ সময় শত্রুপক্ষের একটি লোক সজোরে চিৎকার দিয়ে বলল, মুহাম্মদ নিহত হয়েছে।

এ সংবাদ শুনে মুসলিম সেনাদের মনোবল একেবারেই ভেঙ্গে গেল। আর যুদ্ধ করা বৃথা মনে করে কতক সৈন্য মদীনাভিমুখে রওয়ানা হল। কতক সৈন্য স্ব স্ব স্থানে যুদ্ধ করে শহীদ হলেন। ঠিক সে মুহূর্তে ইবনে মালেক (রা) দূর হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে দেখতে পেয়ে চীৎকার করে বলে উঠলেন, মুসলিম সৈন্যগণ! তোমাদের জন্য সুসংবাদ। আমাদের নবী জীবিত আছেন।

হযরত ইবনে মালেক (রা)-এর একথায় প্রাণ সঞ্জীবনী শক্তির ন্যায় ভগ্নমনা মুসলিম সৈন্যদের মন চাঙ্গা করে তুলল। যারা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় এদিকে সেদিকে ছড়িয়ে ছিল, তারা দ্রুত ছুটে এসে হুযুরে পাক (স)-এর চারপার্শ্বে বুহ্য তৈরি করে দাঁড়িয়ে গেলেন। অপরপক্ষে কাফিররাও তাদের হামলা জোরদার করল। সাহাবী যিয়াদ (রা) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে নিজের আড়ালে রেখে কতিপয় আনসারসহ লড়াই করতে করতে শাহাদত বরণ করলেন।

ঠিক এ মুহূর্তে দূর হতে এক পাষণ্ড কাফির রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দিকে একটি প্রস্তর খণ্ড নিক্ষেপের আঘাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)এর পবিত্র দান্দান মোবারক শহীদ হল। ঠিক একই মুহূর্তে পাপিষ্ঠ ইবনে কুমাইয়া রাসূল (স) এর মস্তক লক্ষ্য করে তরবারীর প্রচণ্ড আঘাত হানলে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পরিহিত লৌহ বর্মের দুটি পেরেখ তার ললাটে গভীরভাবে গেঁথে গেলে আঘাতের প্রচণ্ড ধাক্কায় তিনি একটি পর্বত গর্তে কাত হয়ে পড়ে গেলেন। এ সময়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) -এর পবিত্র মুখ হতে বের হল, সে সম্প্রদায়ের কি কখনও কল্যাণ হতে পারে যারা তাদের নবীর উপরে আঘাত করে।

হযরত আবূ ওবায়দা ইবনে জারযাহ (রা) দৌড়ে এসে স্বীয় দন্ত মোবারক তুলতে (সঃ)-এর ললাটদেশ হতে পেরেক দুটি তুলে ফেললেন। নবীজী (সঃ)-এ দন্ত মোবারক তুলতে গিয়ে তার দুটি দাঁত পড়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর দেহ মোবারক হতে অবিরাম

ধারায় রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল। সাহাবা আবূ সাঈদ (রা)-এর বৃদ্ধ মাতা নিজের মুখ দিয়ে এ রক্ত চুষে নিতেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)স্বহস্তে রক্ত মুছতে মুছতে বলেন, হে মাবুদ! তুমি এ হতভাগ্য জাতিকে ক্ষমা কর। কেননা, এরা কি করেছে তা নিজেরাই বুঝতে পারছে না। এ সময় কুরাইশরা চতুর্দ্দিক হতে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি অজস্র ধারায় তি ছুড়ছিল।

হযরত আবূ দাজানা স্বীয় দেহকে ঢাল বানিয়ে সমস্ত তির নিজের পৃষ্ঠে উপরে গ্রহণ করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর বক্ষের সাথে স্বীয় বক্ষ মিলিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) -কে শত্রুর আঘাত থেকে বাঁচিয়ে রাখেছিলেন। আবূ দাজানা (রা)-এর পৃষ্টদেশে তীরের আঘাতে ঝঁঝারা হয়ে গিয়েছিল, সেদিকে এতটুকুমাত্র খেয়াল না করে তিনি দু-হাতে নবীজী (সঃ)-কে আকড়াইয়া ধরে রেখেছিলেন।

পরবর্তী গল্প
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ওফাত

পূর্ববর্তী গল্প
হযরত ফাতেমা (রা)-এর শাদী মোবারক

ক্যাটেগরী