ওমরের ইসলাম গ্রহণ - শেষ পর্ব | আমার কথা
×

 

 

ওমরের ইসলাম গ্রহণ - শেষ পর্ব

coSam ১২২


আমি গতকাল রাসূল (সাঃ)-কে দোয়া করতে শুনেছি। হে আল্লাহ! তুমি আবু জাহেল অথবা ওমরের দ্বারা ইসলামকে শক্তিশালী করে দাও। হে ওমর! তুমি আল্লাহকে ভয় কর। ওমর বলল, আমাকে রাসূল (সাঃ)-এর দরবারে নিয়ে চল। রাসূল (সাঃ) তখন সাফা পর্বতের পাদদেশে জায়েদ বিন আরকামের ঘরে অবস্থান করছিলেন। হযরত ওমর (রাঃ) উন্মুক্ত তরবারী নিয়ে সেই গৃহের দিকে ধাবিত হলেন। হযরত হামযা (রাঃ) ঐ গৃহের দরজায় দাঁড়ানো ছিলেন। ওমর (রাঃ)-এর আগমনে অনেকেই ভয় পাচ্ছিলেন। গতরাতে দারুন নদওয়ায় মজলিসের সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে তাঁরা অবগত ছিল। মনে করল, সেই প্রস্তাব অনুযায়ী ওমর নবীজীকে হত্যা করার জন্য আসছে। হযরত হামযা (রাঃ) বলেন, যদি ওমর সৎ উদ্দেশ্যে এসে থাকে তা হলে তো ভাল কথা। আর যদি অসৎ উদ্দেশ্যে এসে তা হলে তার তরবারী দিয়েই তাকে খতম করে দিব।

রাসূল (সাঃ) বলেন, ওমরকে আসতে দাও, বাধা দিও না। হযরত ওমর (রাঃ) সরাসরি গৃহে প্রবেশ করে রাসূল (সাঃ) এর নুরানী চেহারা দর্শনে আত্মহারা হয়ে দ্বিধাহীন ভাবে বলে উঠল আশহাদু আল্লা ইলাহা-ইল্লাল্লাহু ওয়াআশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। হযরত ওমর (রাঃ)-এর কালিমা পড়বার সাথে সাথে মুসলমানদের মধ্যে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। রাসূল (সাঃ) খুশিতে নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত সাহাবারাও একই সঙ্গে নারায়ে তাকবীরের ধ্বনি দিলেন। সমবেত কণ্ঠে আল্লাহ আকবর ধ্বনিতে সমগ্র আরব কাঁপিয়ে উঠল। আরবের পর্বতমালায় উহার প্রতিধ্বনি উঠল। ওমরের পূর্বে মাত্র উনচল্লিশ জন নর-নারী মুসলমান হয়েছিল। হযরত ওমর (রাঃ) সহ চল্লিশ জন হল।

হযরত ওমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত মুসলমানগণ চুপে চুপে কোরআন পাঠ করত। ঈমান ও ইসলাম গ্রহণ গোপন রাখত। কাফেরদের ভয়ে প্রকাশ্য নামাজ আদায় করত না। হযরত ওমর (রাঃ) বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! জীবনে মরণে আমরা কি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নই? রাসূল (সাঃ) বলিলেন, অবশ্যই। হযরত ওমর (রাঃ) বলেন, তা হলে আমরা কেন গোপনে আল্লাহর নাম নিব। দ্বীনকে কেন গোপনে রাখব? আল্লাহর ঘরে তারা মূর্তির নাম বুলন্দ আওয়াজে নেয়। অথচ ঘরের মালিকের নাম আমরা গোপনে নেই। এটা কখনও হতে পারে না। রাসূল (সাঃ) বলেন। ওমর আমরা সংখ্যায় কম। আমাদের প্রতি যে উৎপীড়ন ও নির্যাতন চলছে তা তুমি সম্যক অবগত।

হযরত ওমর (রাঃ) বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর কসম, আমি কাফেরদের মজলিসে ঈমানের কালিমা বুলন্দ করব। এ বলে হযরত ওমর সোজা কাবা ঘরে চলে যান। খানায়ে কাবার তাওয়াফ করতে লাগলেন। তাঁর উন্মক্ত তরবারী এখনও উন্মুক্ত অবস্থায় রয়ে গেছে। হযরত ওমর (রাঃ) উচ্চঃস্বরে কালিমা পড়তে লাগলেন। আর কুরাইশ নেতৃবর্গের নাম ধরে ডেকে ডেকে বলতে লাগলেন। তোমাদের মধ্যে কে আছ আমাদের বাধা দেয়ার-আস, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। যদি কারো তাঁর স্ত্রীকে বিধবা করতে ইচ্ছা থাকে অথবা ছোট শিশুকে এতিম করতে চাও, তা হলে ওমরের সামনে আস।

আবু জাহেল আবু লাহাব প্রমুখ কুরাইশ নেতৃবর্গ চতুর্দিকে সমবেত হয়ে ওমরের মুখপানে এক দৃষ্টিতে কেবল তাকিয়ে রইল কারও সাহস হয়নি ওমরের কথার উত্তর দিতে। হযরত ওমর (রাঃ)-এর এরূপ নাটকীয়ভাবে ইসলাম গ্রহণের কথা কোন ঐতিহাসিক স্বীকার করেন না। তাদের মতে, এ নাটকীয়তা সৃষ্টির পিছনে এর পূর্বের আরও কিছু ঘটনা কাজ করেছে। আমের বিন রবিয়ার স্ত্রীর বর্ণনা থেকে জানা যায়। কুরাইশদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে অপরাপর মুসলমানদের ন্যায় তারাও দেশ ত্যাগের আয়োজন করছিলেন সে সময়ও ওমর সেখানে উপস্থিত ছিল তখন হযরত ওমর (রাঃ) এ দুস্থ পরিবারের অবস্থা দেখে খুবই বিচলিত হয়ে পড়েন।

হাদিস গ্রন্থে স্বয়ং হযরত ওমরের বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে, একদা তিনি গভীর রাতে রাসূল (সাঃ) কাবায় প্রবেশ করে নামাজ পড়ছিলেন। হযরত ওমর (রাঃ) বলেন, আমি কাবার পর্দার আড়ালে একেবারে সন্নিকটে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন। নবীজী (সাঃ) নামাজে আলহাক্কা সূরা তিলাওয়াত করছিলেন। তাঁর তিলাওয়াত শুনতে শুনতে মুহূর্তে মুহূর্তে আমার মন পরিবর্তিত হচ্ছিল। তখন আমার মনে হল, কোরাইশরা ঠিকই বলেছে ইনি আসলে একজন উঁচু মানের কবি। ঠিক তখনই তিনি তিলাওয়াত করলেন-
অর্থঃ যা কিছু দেখছ আর যা দেখছ না, এ সবের কসম! এ আমার রাসূল কর্তৃক প্রচারিত আমার বাণী, তা করিব কল্পনা নয়, কিন্তু তোমরা তাতে কমই বিশ্বাস করে থাক।

এবার ওমর (রাঃ) ভাবনায় পড়লেন- ইনি নিশ্চয় কোন গনক হবেন, নতুবা আমার মনের কল্পনা জানতে পারলেন কি করে? আমার মনে এভাবের উদয় হতেই রাসূল (সাঃ) তিলাওয়াত করলেন-
অর্থঃ এ কোন গনকের উক্তি নয়, তোমরা খুব কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।

হযরত ওমর (রাঃ) বলেন, উক্ত ঘটনার পরই ইসলাম আমার হৃদয়ে যথেষ্ট স্থান করে নেয়। উল্লেখিত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয়, হযরত ওমর (রাঃ)-এর ইসলাম গ্রহণ কোন নাটকীয় ব্যাপার নয়, বরং আগে থেকেই সংঘঠিত কিছু ঘটনার ফল নাটকীয়ভাবে নোয়াইম বিন আবদুল্লাহ সংক্রান্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে।

ওমরের ইসলাম গ্রহণ - প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

পরবর্তী গল্প
কুরাইশদের চৈতন্যোদয়

পূর্ববর্তী গল্প
ওমরের ইসলাম গ্রহণ - পর্ব ১

ক্যাটেগরী