উম্মে সালামা (আরবের বিধবা)-১ম পর্ব | আমার কথা
×

 

 

উম্মে সালামা (আরবের বিধবা)-১ম পর্ব

coSam ১৭


হিনদ আলমাখযুমিয়্যা একা সালামার মা থাকলেন না, হয়ে পড়লেন সকল মুমিনের মা। উম্মে সালমা, কে এই উম্মে সালামা? তাঁর পিতা মাখযুম' সগােত্রের অন্যতম বিশিষ্ট এক সরদার এবং আরবের হাতে গােণা কয়েকজন দানবীরের মাঝে বিখ্যাত এক দানবীর, এমন কি তাকে বলা হত ‘মুসাফিরের পাথেয়', কেননা তার বাড়ি যেতে চাইলে অথবা তার সঙ্গে সফর করলে কারাের পাথেয় লাগত না।

যার নাম আবু উমাইয়া ইবনুল মুগীরা আলকুরাইশী। তার স্বামী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল আসাদ, ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম। দশজনের একজন, যার পূর্বে ইসলাম গ্রহণকারী মাত্র আবু বকর রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ও হাতে গােণা কয়েকজন। তাঁর নাম হিনদ কিন্তু ডাকা হত উম্মে সালামা নামে, পরে এই ডাক নামটিই ছাপিয়ে উঠে তার আসল নামটিকে। উম্মে সালামা তাঁর স্বামীর সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করলেন, ফলে ইসলামের প্রতি অগ্রগামীদের দলে তিনিও হলেন একজন।

যেই মাত্র উম্মে সালামা ও তার স্বামীর ইসলাম গ্রহণের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল অমনি সৃষ্টি হল কুরাইশের মাঝে চরম উত্তেজনা। তাদের উপর শুরু করল চরম অত্যাচার। তাদের উপর চাপলাে পাষাণ গলিয়ে দেয় এমন দুর্বিষহ আযাব। কিন্তু সকল অত্যাচার ও শাস্তি নীরবে সহ্য করে ঈমানের উপর তারা রয়ে গেলেন অবিচল। বিন্দুমাত্র শক্তিহীন ও দুর্বল হলেন না, হলেন না ক্লান্ত ও দ্বিধান্বিত।

তাদের যন্ত্রণা যখন আরাে বৃদ্ধি পেল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের অনুমতি প্রদান করলেন হাবশায় হিজরতের। ঐ দু'জন থাকলেন হাবশায় হিজরতকারীদের তালিকার শীর্ষে।

উম্মে সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহা ও তাঁর স্বামী পারি জমালেন ভীনদেশে, মক্কায় ফেলে গেলেন বিলাসপূর্ণ বাড়ি, উচ্চ মর্যাদা আর বংশের গৌরবগাথা। সবকিছু বিসর্জন দিলেন আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাওয়ার প্রত্যাশায়, আল্লাহর রেজা ও সন্তুষ্টির কাছে সবকিছুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে।

উম্মে সালামা ও তার সাথীরা নাজাণীর সার্বিক সহযােগিতা পাওয়া সত্ত্বেও ‘অহী'র অবতরণ ক্ষেত্র মক্কার প্রতি এবং হিদায়াতের উৎস প্রিয়নবীর প্রতি হৃদয়াবেগকে দমাতে পারছিলেন না। উম্মে সালামা ও তার স্বামী তাে প্রিয়নবীর আকর্ষণে অস্থির হয়ে উঠলেন।

তাছাড়া হাবশায় হিজরতকারীদের নিকট একের পর এক সংবাদ আসতে থাকল যে, মক্কায় মুসলিমদের সংখ্যা এখন বৃদ্ধি পেয়েছে, 'হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এবং উমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম। গ্রহণের কারণে মুসলিমরা শক্তিশালী হয়েছেন এবং কুরাইশী অত্যাচারও হ্রাস পেয়েছে। এসব খবর শুনে মক্কায় ফিরে যাওয়ার জন্য কিছু মানুষ অস্থির হয়ে উঠলেন। মক্কার আকর্ষণ তাঁদেরকে টানতে লাগল রাসূলের ভালবাসা তাদেরকে কাছে ডাকতে থাকল।

উম্মে সালামা ও তার স্বামী হাবশা ছেড়ে মক্কায় ফিরে আসলেন। কিন্তু মক্কায় ফিরে এসে তারা বুঝতে পারলেন যে, প্রাপ্ত সংবাদ ছিল অতিরঞ্জিত। হামযা ও উমরের ইসলাম গ্রহণের কারণে মুসলিমগণ যেটুকু সাহস দেখাতে চেয়েছিলেন কুরাইশ সেটাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে নজিরবিহীন অত্যাচার চালিয়ে, তাদের বর্তমান অবস্থা আরাে নাজুক, আরাে ভয়াবহ।

এমনি সময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের অনুমতি দিলেন মদীনায় হিজরতের। উম্মে সালামা ও তাঁর স্বামী সিদ্ধান্ত নিলেন যে, কুরাইশের নির্যাতন থেকে মুক্তি ও ইসলাম রক্ষার উদ্দেশ্যে তারা থাকবেন হিজরতকারীদের প্রথম সারিতে।। কিন্তু উম্মে সালামা ও তাঁর স্বামীর জন্য হিজরত তত সহজ ছিল না যেমন তারা ভেবেছিলেন। হিজরত করতে গিয়ে তাঁরা মুখােমুখি হলেন এমন কঠিন ও বেদনাদায়ক অত্যাচারের যা রেখে গেল তাদের জীবনে ভয়াবহ ও করুণ বিয়ােগান্তক স্মৃতি।

চলাে উম্মে সালামার মুখ থেকেই শুনি তার সেই সকরুণ স্মৃতির বেদনাময় কাহিনী কারণ তার বিবরণটাই হবে সর্বাধিক গভীর ও আবেদনময়, তার বর্ণনাই হবে সবচেয়ে আবেগপূর্ণ ও সুক্ষ্ম । উম্মে সালামা বলেন আবু সালামা যখন মদীনায় হিজরতের সিদ্ধান্ত নিলেন তখন একটি উটের ব্যবস্থা করে আমাকে বসিয়ে দিলেন সেটার পিঠে, আমাদের শিশুকন্যা সালামাকে দিলেন আমার কোলে।

কোন দিকে না তাকিয়ে তিনি আমাদের উটের রশি ধরে মদীনার পথে যাত্রা শুরু করলেন। মক্কার সীমানা পার হওয়ার পূর্বেই আমার ‘মাখযুম গােত্রের কিছু লােক আমাদের দেখে পথ আগলে দাঁড়ালাে।

তারা বলল আবু  সালামাকে যদি তােমার পরাজয় ঘটে তাহলে তােমার স্ত্রীর কী হবে? সেতাে আমাদের ‘মাখযুম' গােত্রের মেয়ে, তাকে আমাদের মাঝ থেকে নিয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়াবে, তােমাকে কিসের ভিত্তিতে এই সুযােগ দিব?! তারা একসঙ্গে তাঁর উপর ঝাপিয়ে পড়ে আমাকে ছিনিয়ে নিল তাঁর কাছ থেকে। আমার স্বামীর বংশের (আব্দুল আসাদ গােত্রের লােকদের চোখে যেই পড়ল, তারা যেই দেখল আমাকে ও আমার সন্তানকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে তাদের পুত্রের নিকট থেকে অমনি তারাও জড়িয়ে পড়ল এই বিবাদে।

তারা বলল তােমরা যখন আমাদের ছেলের নিকট থেকে তােমাদের মেয়েকে কেড়ে নিয়েছ, তাহলে তােমাদের এই মেয়ের কাছে আমাদের সন্তানকে রাখতে পারবে না।

সে আমাদের সন্তান, তার ব্যাপারে আমাদের অধিকার বেশি। এই কথা বলেই তারা আমার শিশুকন্যা সালামাকে আমার চোখের সামনেই টানাটানি করে বলপূর্বক কেড়ে নিয়ে গেল। মাত্র কয়েকটি মুহূর্তের ব্যবধানে আমার সাজানাে বাগান তছনছ হয়ে গেল। আমি হলাম ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন। বিশাল এই পৃথিবীতে একেবারে একাকী এক ভবঘুরে।

আমার স্বামী জান ও ঈমান বাঁচাতে চলে গেলেন মদীনায় আমার সন্তানকে আমার কোল থেকে কেড়ে নিল আমার শ্বশুর গােত্র ‘আব্দুল আসাদ'। আর আমি, আমার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করল আমারই বংশের লােকেরা । আমাকে আটকে রাখল তারা আমাকে, আমার স্বামীকে আর আমাদের সন্তানকে আলাদা করে ফেলা। হল অল্প সময়ের মধ্যে। সেই দিনের পর থেকে প্রতিটি সকালে আমি বালুর সেই উপত্যকায় যাই, প্রতিদিনই গিয়ে বসে থাকি সেই স্থানটিতে যা আমার করুণ কাহিনীর প্রত্যক্ষদর্শী।

সেই বিশেষ সময়ের চিত্রগুলি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কল্পনায় দেখতে থাকি যা আমার স্বামীর ও সন্তানের মাঝে বিচ্ছেদের দেওয়াল খাড়া করে দিয়েছে। আমি সেখানে বসে বসে বিলাপ করতে থাকি রাতের অন্ধকার নেমে আসা পর্যন্ত। এভাবে আমি কাটালাম দীর্ঘ প্রায় একটি বছর।

একদিন আমার শ্বশুর গােত্রের এক ব্যক্তি আমার পাশ দিয়ে যেতে যেতে, আমার দূরবস্থা। দেখে তার হৃদয় কোমল হল, আমার জন্য তার মনে জাগল করুণা। ফলে সে গিয়ে ধরল আমার গােত্রের লােকদের। বললতােমরা কি এই বেচারীকে ছেড়ে দিতে পার না! এমনিতেই তাে তাকে স্বামী-সন্তান থেকে আলাদা করে রেখেছ।

এভাবেই লােকটি তাদের হৃদয়ে কোমলতার উদ্রেক করতে চেষ্টা চালাতে থাকল, চেষ্টা করল তাদের আবেগ ও করুণা জাগিয়ে তুলতে, অবশেষে তারা বলল আমাকে তুমি যাও, তােমার স্বামীর কাছে চলে যাও কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব! ‘আব্দুল আসাদ গােত্রের কাছে মক্কায় আমার কলিজার টুকরা সন্তানকে ফেলে রেখে আমি মদীনায় স্বামীর নিকট কিভাবে যাব!? কিভাবে আমার মনের জ্বালা মিটবে! কিভাবে আমার অশ্রুধারা থামবে! যদি আমি চলে যাই মদীনায়; আমার ছােট্ট শিশুকে ফেলে মক্কায়, কোন খোজ তার না নিয়ে? কিছু মানুষ বুঝতে পারলেন আমার মর্মবেদনা, অন্তর্জালা।

তাদের অন্তর কোমল হল আমার প্রতি, আমার শ্বশুর গােত্রের সঙ্গে আমার ব্যাপারে আলােচনা করল। আমার প্রতি তাদের দয়া ও করুণা হল। তারা ফেরৎ দিলেন আমার কাছে আমার সন্তান সালামাকে। মক্কায় আমি আর এক মুহূর্তও বিলম্ব করলাম না।

এমন কি সফরসঙ্গীর জন্য অপেক্ষা করতেও আমার মন সায় দিল না।

গল্পের শেষ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

পরবর্তী গল্প
উম্মে সালামা (আরবের বিধবা)-শেষ পর্ব

পূর্ববর্তী গল্প
হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর মৃত্যুর আকর্ষণীয় কাহিনী

ক্যাটেগরী