উম্মে সালামা (আরবের বিধবা)-শেষ পর্ব | আমার কথা
×

 

 

উম্মে সালামা (আরবের বিধবা)-শেষ পর্ব

coSam ১৯


আমার আশঙ্কা ছিল, জানি অকল্পনীয় কোন্ ঘটনা নতুন করে ঘটে, যা স্বামীর সাথে সাক্ষাতের পথে সৃষ্টি করে অন্তরায়! অবিলম্বে আমার উট তৈরী করলাম, কোলে তুলে নিলাম আমার সন্তানকে। বের হলাম মদীনার পথে আমার স্বামীর উদ্দেশ্যে। আমার সঙ্গে ছিল না এক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ।

মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে তাঈমে যখন পৌছলাম, সামনে পড়ল উসমান ইবনে তালহা। (তখনাে তিনি ছিলেন মুশরিক) তিনি জিজ্ঞাসা করলেন-কোথায় যাচ্ছ হে ‘যাদুররাকিব' (মুসাফিরের পাথেয়) এর কন্যা? -যাচ্ছি মদীনায় স্বামীর উদ্দেশ্যে।

তােমার সঙ্গে কি কেউ নেই? -না, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। আর আছে আমার এই ছােট্ট মেয়ে।

আল্লাহর কসম! এভাবে একাকী তােমাকে যেতে দেওয়া সম্ভব নয়, মদীনায় পৌছা পর্যন্ত আমি যাচ্ছি তােমার সঙ্গে। তিনি আমার উটের লাগাম ধরলেন, আমাকে পৌছে দেওয়ার জন্য চলতে শুরু করলেন ... আল্লাহর কসম! তার চেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও সম্রান্ত কোন আরবের সঙ্গ আমি আর কখনাে পাইনি। আমরা যখনই কোন মনজিলে যাত্রা বিরতি করতাম, তিনি আমার উটকে বসাতেন এবং দূরে সরে যেতেন।

আমি নেমে দাঁড়ানাের পর ঠিকঠাক হলে তিনি কাছে এসে উটের পিঠ থেকে সামান নামাতেন এরপর উটকে কোন গাছের সঙ্গে বাঁধতেন। আমার থেকে দূরত্ব রেখে ভিন্ন একটি গাছের ছায়ায় শুয়ে বিশ্রাম নিতেন।

পুনরায় রওনার সময় হলে তিনি আমার উট প্রস্তুত করে আমার কাছে নিয়ে আসতেন। নিজে দূরে সরে গিয়ে বলতেন – উঠে পড়। আমি উঠে সােজা হয়ে বসার পর তিনি কাছে আসতেন। উটের লাগাম ধরে আবার যাত্রা করতেন।

প্রতিদিনই তিনি আমার সঙ্গে একই আচরণ করতেন মদীনা পৌছা পর্যন্ত। মদীনা থেকে দুই মাইল দূরে ‘কুবা'র নিকটবর্তী বানূ আমর ইবনে আউফের বসতিতে পৌছার পর তিনি বললেন-তােমার স্বামী আছেন এই গ্রামেই। তুমি আল্লাহর নামে চলে যাও। তিনি সেখান থেকেই মক্কার উদ্দেশ্যে ফেরৎ যাত্রা করলেন।

দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার পর আবার এল কাঙ্খিত মিলনের ক্ষণ। উম্মে সালামার চক্ষু শীতল হল স্বামীকে দেখে।

আবু সালামা খুশি হলেন স্ত্রী ও সন্তানকে পেয়ে। এরপর চোখের পলকের মত অতি দ্রুত কেটে গেল সময়। ঘটে গেল অনেক ঘটনা। এই দেখ বদর প্রান্তর, এই যুদ্ধে হাজির হচ্ছেন আবু সালামা। অন্য মুসলিমদের সঙ্গে ফিরছেন। এখানে তারা স্পষ্ট বিজয় লাভ করেন। এই দেখাে “ওহােদ'। বদরের পর তিনি প্রবেশ করছেন ওহােদের যুদ্ধের ভিড়ে। এখানে তিনি উত্তম যােদ্ধার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করলেন। কিন্তু “ওহােদ' প্রান্তর থেকে তিনি ফিরলেন ভয়াবহ, গভীর জখম নিয়ে। অবিরাম সেই জখমের যন্ত্রণায় ভুগতে থাকলেন, অবশেষে মনে হল ঘা।

সেরে গেল, অথচ ঘা এর ভেতর থেকে পচন ধরেছিল। ফলে শীঘই ঐ স্থান ফুলে গেল যা তাকে করে দিল শয্যাশায়ী।

আবু সালামা যখন জখমের তীব্র যন্ত্রণা ভােগ করছিলেন, সে সময় একদিন তিনি বললেন স্ত্রীকে, হে উম্মে সালামা! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি  অর্থ ও কারাের কোন মুসিবত হলে সে যদি বলে ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজিউন, আর বলে“হে আল্লাহ! তােমার কাছে আমার এই মুসিবতের প্রতিদান প্রত্যাশা করি... হে আল্লাহ! তুমি আমাকে এরচেয়ে উত্তম বদলা দান কর তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তাকে সেটা দান করেন। * * * আবু সালামা কয়েকদিন পর্যন্ত শয্যাশায়ী থাকলেন।

একদিন সকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখতে এলেন তাকে। তিনি খোজ-খবর নিয়ে ফিরছিলেন, দরজা পর্যন্ত পৌছলেন এরই মধ্যে আবু সালামা প্রাণত্যাগ করলেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের পবিত্র দুই হাতে সাহাবীর দুই চোখ বন্ধ করে দিলেন এবং আকাশের দিকে দৃষ্টি উঠিয়ে বললেন“হে আল্লাহ! আবু সালামাকে ক্ষমা করে দাও, তাঁর মর্যাদা উঁচু করে দাও তােমার নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের মাঝে তার বদলে তুমি হয়ে যাও তাঁর সন্তান ও বংশের অভিভাবক তাঁকে ও আমাদের সকলকেই ক্ষমা করে দাও ইয়া রাব্বল আলামীন তাঁর কবরকে প্রশস্ত করে দাও, করে দাও জান্নাতী আলােয়।

আলােকিত উম্মে সালামা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই বাণীর। কথা স্মরণ করলেন যা তার কাছে বর্ণনা করেছিলেন আবু সালামা। সেটা স্মরণ করে তিনি বললেন- “হে আল্লাহ! আমার এই মুসিবতের। প্রতিদান তােমার কাছে প্রত্যাশা করি।

কিন্তু তার ভাল লাগল না ঐ অংশটুকু বলতে যে, আমাকে এর চেয়ে উত্তম বদলা দাও’ কারণ মনের মধ্যে তার জিজ্ঞাসা জেগে উঠত- আবু সালামার চেয়ে উত্তম আর কে আছে? কিন্তু মনের মধ্যে দ্বিধা ও জিজ্ঞাসা থাকলেও তিনি অবিলম্বে ঐ দু’আর। শেষ অংশও বললেন এবং দু'আটিকে পূর্ণাঙ্গ করলেন। উম্মে সালামার বিপদে ব্যথিত হলেন মুসলিমগণ। এমন ব্যথিত তারা
 আর কারাের বিপদেই হননি।

তারা তাঁর নামের সঙ্গে ব্যবহার করলেন আরবের বিধবা' নামটি। কেননা তার আত্মীয়-স্বজন কেউই ছিল না মদীনায়, পাখির ছানার মত ছােট্ট একটি মেয়ে ছাড়া। মুহাজির ও আনসার সকলেই অনুভব করলেন যে, উম্মে সালামার জন্য তাদের কিছু করণীয় রয়েছে।

তাই আবু সালামার মৃত্যুতে তার শােক পালন (ইদ্দত) সমাপ্ত হতে না হতেই তার দিকে এগিয়ে আসলেন আবু বকর সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহু, তিনি প্রস্তাব দিলেন তাঁকে বিবাহের, সে প্রস্তাব গ্রহণে তিনি অসম্মতি জানালেন এরপর এগিয়ে আসলেন উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু, তিনি তাঁকেও ফেরত দিলেন যেমন ফেরত দিয়েছেন আবু বকরকে এবার প্রস্তাব দিলেন খােদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম,

তখন তিনি তাঁকে বললেনইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার তিনটি দোষ আছে-আমার আত্মসম্মানবােধ খুব তীব্র, আমার আশঙ্কা হয় যে,

আমার এই দোষ আপনার সামনে প্রকাশ পাবে যাতে আপনি কষ্ট পাবেন আর সে কারণে আল্লাহ আমাকে শাস্তি দেবেন। -আমি একজন বয়স্কা নারী, বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে। -আমার সন্তান রয়েছে।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন‘তুমি যে আত্মসম্মানবােধের কথা বলেছ, এ বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে দু'আ করব,

তিনি এই দোষ মুক্ত করে দেবেন তােমাকে। যে বয়সের কথা বলেছ, সেটাতাে আমার বেলায়ও একই। তােমার যেমন বয়স বেড়েছে আমারও বেড়েছে। আর তুমি যে সন্তানের আপত্তি তুলেছ, সে বিষয়ে কথা হচ্ছে এই যে, তােমার সন্তান হবে আমারও সন্তান । এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ করলেন উম্মে সালামাকে।

এতে প্রমাণ হল সেই হাদীসের সত্যতা, অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা উম্মে সালামার দু'আ কবুল করলেন এবং তাকে আবু সালামার চেয়ে উত্তম বদলা (রাসূলকে) দান করলেন। 

সে দিন থেকে হিদ আলমাখযুমিয়্যা একা সালামার মা রইলেন না, হয়ে গেলেন সকল মুমিন এর মা (উম্মুল মুমিনীন)। আল্লাহ তা'আলা জান্নাতের মধ্যে উম্মে সালামার চেহারা উজ্জল ও আলােকিত করুন, রাযিয়াল্লাহু আনহা ওয়া আরযাহা।

গল্পের ১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন

পরবর্তী গল্প
মদীনা মুনাওওয়ারায় যিয়ারতের বিশেষ কয়েকটি স্থান

পূর্ববর্তী গল্প
উম্মে সালামা (আরবের বিধবা)-১ম পর্ব

ক্যাটেগরী