ইসলাম পূর্ব যুগে আরবদের চরিত্র

সায়লে আরেমের পর ইয়ামনের অধিবাসিরা বিভিন্নদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের একটি শাখা মক্কায় বসতি স্থাপন করে। আর অপর এক শাখা মদীনায় চলে যায়। মক্কার শাখা প্রধান ছিল ইয়ারিব বিন কাহতান এবং মদীনার শাখা প্রধানের নাম ইয়াছরি। এ কারণে ইয়ারিবের নামানুসারে মক্কাকে আরব এবং ইয়াসরিবের নামানুসারে মদীনাকে ইয়াছরিব বলা হত।

ইয়ামনের বাসিন্দাদের দ্বারাই মক্কা মদিনা তথা আরবদেশ আবাদ হয়। কালক্রমে তাদের চরিত্রের চরম অবনতি ঘটে। সমগ্র আরবদেশ শিরকে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। অসংখ্য দেব-দেবীর উপাসনা প্রচলিত হতো তাদের নামে। অবশ্য তারা সৃষ্টিকর্তা হিসেবে এক আল্লাহকে স্বীকার করত। জিন-ফেরশতা এবং বহু প্রস্তর নির্মিত মূর্তির পূজা এ উদ্দেশ্যে করতে যেন তাদেরকে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করিয়ে দেয়। পবিত্র কাবাগৃহেই ৩৬০ টি দেবতার মূর্তি ছিল। এক বছরে ৩৬০ দিন। এক এক দিনের জন্য তারা এক এক মাবুদের পূজা করত।

এ ছাড়াও আরো অসংখ্য কল্পিত মাবুদের উপসনা করত। অবশ্য স্বল্প সংখ্যক লোক তারকারও পূজা করত। তাদের দেবতাদের মধ্যে লাত, উজ্জা, মানাত, হুবাল ইত্যাদি প্রসিদ্ধ এবং প্রধান দেবতা ছিল। আরবের মুশরিকরা ফেরেশতাদেরকে আল্লাহর কন্যা বলে আখ্যায়িত করত। জ্যোতিষির কথার উপর ছিল তাদের পূর্ণ আস্থা। জ্যোতিষিরা কিছু জিন হাসিল করে তাদের মাধ্যমে বহু কল্পিত মিথ্যা ভবিষ্যদ্বানী করে জনসাধারণ হতে বহু অর্থ উপার্জন করত। মূলত এটা ছিল ওদের উপার্জনের মাধ্যম। মানুষকে ধোকা দিয়ে টাকা পয়সা লুট করাই ছিল তাদের পেশা।

গরীবের আশঙ্কায়ও অথবা পরের নিকট হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে আপন জীবন্ত কণ্যাকে দাফন করে দেয়া কিছু সংখ্যক আরবের মধ্যে প্রচলিত ছিল। মদ্যপান, জুয়া, রাহাজানি, ব্যভিচার তাদের গর্বের বিষয় ছিল।

নতুন বিবাহিত স্ত্রীকে প্রথম এক সপ্তাহ মহল্লার সরদারের নিকট রাখতে হত। তাকে এক সপ্তাহ ব্যবহার করার পর স্বামীর নিকট হস্তান্তর করত। উলংগ অবস্থায় কাবা গৃহ তাওয়াফ করত। মক্কার শ্রেষ্ঠ বংশ কুরাইশ বংশের লোকেরাও এ স্বভাব হতে মুক্ত ছিল না।

মেয়েদেরকে করা হত সম্পত্তি হতে বঞ্চিত। তারা কোন প্রকার ওয়ারিশ হত না। নারীরা ছিল তাদের নিকটি পণ্যের মত। তাদের কোন মর্যাদা ছিল না। তাই কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করাকে তারা অত্যন্ত লজ্জাস্কর ব্যাপার মনে করত। জন্মের সাথে সাথে পিতা নিজ হাতে ঐ কন্যাকে জীবন্ত কবর দিত। কন্যা জন্মের খবর পিতার নিকট পৌঁছালে পিতা অত্যন্ত মর্মাহত হতেন।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে – “যখন তাদের কাউকেও কন্যার সুসংবাদ প্রদান করা হয় তখন তার মুখমন্ডল মলীন হয়ে যায় এবং হৃদয় দগ্ধ হতে থাকে। যে বস্তুর সুসংবাদ তাকে দেয়া হয়েছিল তার লজ্জায় সে নিজেকে কওম হতে লুকিয়ে চলে এবং মনে মনে চিন্তা করে যে, সে কি ওকে অপমানের সাথে গ্রহণ করব, না কি তাকে মাটির মধ্যে পুতে রাখবে”। (সূরা নাহলঃ আয়াত-৫৮-৮৯)

তৎকালীন সময়ে কত নিষ্পাপ শিশুর বিলাপ আরবের মরুবক্ষে মিশে আছে, তার হিসেব কে দেবে। এ ধরনের কত যে ঘৃণা ও জঘণ্য প্রথা তাদের মধ্যে বিরাজিত ছিল, তার কোন হিসেব নেই। কথায় কথায় যুদ্ধ লাগত। বংশপরম্পরায় শত্রুতার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য এক জঘন্য হিংসাত্নক চেতনা ছিল তাদের মধ্যে। অতি সাধারণ, বিষয় নিয়ে দু’গোত্রের দু’ ব্যক্তির মধ্যে ঝগড়া বা কথা কাটাকাটি হলে তা সমগ্র গোত্রের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত এক অমানবিক প্রতিহিংসার রুপ নিয়ে।

সামান্য কথা কাটাকাটি সমগ্র গোত্রের ঝগড়ার রুপ পরিগ্রহ করত এবং তরবারী নিয়ে উভয় গোত্রে যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে যেত এবং বংশানুক্রমে এ যুদ্ধ শতাব্দির পর শতাব্দি ধরে বিরাজিত থাকত। এই সকল যুদ্ধকে আরব ঐতিহাসিক আইয়্যামূল আরব নামে অভিহিত করেছেন। তবে এসব ব্যাপারে মদীনার অবস্থা একটু ভিন্ন ছিল। মদীনায় তূলনামূলক এ ধরনের কুপ্রথা কম ছিল। সেখানে ইহুদীদের আগমণে আগমণে স্থানীয় লোকদের উপর অনেকটা ধর্মের প্রভাব বিস্তার লাভ করেছিল।

আরো পড়তে পারেন

দুঃখিত, কপি করবেন না।