আয়েশা রাযি প্রাথমিক অবস্থা (জন্ম থেকে বিবাহ পর্যন্ত) | আমার কথা
×

 

 

আয়েশা রাযি প্রাথমিক অবস্থা (জন্ম থেকে বিবাহ পর্যন্ত)

coSam ৩১


নাম, নসব ও খানদান
নাম : আয়েশা, উপাধি : সিদ্দীকা, খেতাব : উম্মুল মুমিনীন, কুনিয়ত বা উপনাম : উম্মে আবদুল্লাহ, আরও উপাধি : হুমায়রা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনতুস সিদ্দীক বলেও সম্বােধন করেছেন। আবদুল্লাহ হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার ভাগ্নে। তিনি মূলত হযরত আসমা রাযি.-এর পুত্র। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের নামে অধিক পরিচিত। আরবে উপনাম ছিল মর্যাদার প্রতীক। যেহেতু হযরত আয়েশা রাযি-এর সন্তান ছিল না, সেহেতু উপনামও ছিল না। একবার তিনি আক্ষেপের সঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আরজ করলেন, অন্যদের কুনিয়ত তাে তাদের সন্তানদের নামে হয়েছে; কিন্তু আমার কুনিয়ত হবে কার নামে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, তােমার ভাগ্নে আবদুল্লাহর নামে। সেদিন থেকেই হযরত আয়েশা রাযি.-এর কুনিয়ত—উম্মে আবদুল্লাহ।

হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার পিতার নাম আবদুল্লাহ, উপাধি সিদ্দীক ও উপনাম আবু বকর। মাতার নাম উম্মে রুমান। পিতার দিক থেকে বংশধারা—আয়েশা বিনতে আবু বকর সিদ্দীক, ইবনে আবু কুহাফা, ইবনে উসমান, ইবনে আমের, ইবনে উমর, ইবনে কাব, ইবনে সাদ, ইবনে তাইম, ইবনে মুরা, ইবনে লুওয়াই, ইবনে গালিব, ইবনে ফির, ইবনে মালিক। মাতার দিক থেকে বংশধারা—আয়েশা বিনতে উম্মে রুমান, বিনতে আমের, ইবনে উইমের, ইবনে আবদে শামস, ইবনে ইতাব, ইবনে উযাইনা, ইবনে সাবি, ইবনে অহমান, ইবনে হারিস, ইবনে গুনাইম, ইবনে মালিক, ইবনে কিনা। সুতরাং পিতার দিক থেকে তিনি কুরাইশিয়া তাইমিয়া এবং মাতার দিক থেকে কিনানিয়া। 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হযরত আয়েশা রাযি.এর পিতৃকুলের বংশপরম্পরা সপ্তম বা অষ্টম পুরুষে এবং মাতৃকুলের বংশপরম্পরা একাদশ বা দ্বাদশ পুরুষে গিয়ে মিলিত হয়। হযরত আয়েশা রাযি-এর পিতা হযরত আবু বকর রাযি ১৩ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মাতা উম্মে রুমানের ব্যাপারে অধিকাংশ ইতিহাসিকের মত তিনি পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ হিজরীতে ইন্তেকাল করেছেন; কিন্তু এ তথ্য ভুল। একাধিক গ্রহণযােগ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, উম্মে রুমান রাযি, হযরত উসমান রাযি-এর খেলাফত পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। ষষ্ঠ হিজরীতে ঘটে যাওয়া ইফক-সংক্রান্ত প্রায় সবগুলাে হাদীসে তাঁর নাম এসেছে। সপ্তম হিজরীর তাখঈর বা ইচ্ছাধিকার প্রদানের ঘটনায়ও তিনি জীবিত। সহীহ বুখারীতে তাবেঈ মাসরুকের বর্ণনা উম্মে রুমান থেকে মুত্তাসিল সনদে বর্ণিত আছে।

ইমাম বুখারী রহ তারীখে সগীর গ্রন্থে উম্মে রুমানকে হযরত আবু বকর রাযি-এর খেলাফতকালে ইন্তেকালকারীদের তালিকায় উল্লেখ করেছেন; সঙ্গে সঙ্গে প্রথম বর্ণনার ওপর আপত্তি করেছেন। হাফিয ইবনে হাজার তাহযিব গ্রন্থে তুলনামূলক আলােচনায় প্রমাণ করেছেন যে, ইমাম বুখারী রহ-এর বক্তব্যই যথার্থ।

জন্মগ্রহণ
হযরত উম্মে রুমান প্রথমে আবদুল্লাহ আদির সঙ্গে এবং তার মৃত্যুর পর আবু বকর রাযি-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। আবু বকর রাযি-এর ঔরসে তার গর্ভে হযরত আবদুর রহমান রাযি ও হযরত আয়েশা রাযি-এর জন্ম। হযরত আয়েশা রাযি-এর জন্মতারিখ-নির্ণয়ে ইতিহাস ও জীবনীগ্রন্থগুলাে নীরব। ইবন সাদের অনুসরণে অধিকাংশ ঐতিহাসিক লিখেছেন, হযরত আয়েশা রাযি নবুওয়াতের চতুর্থ বছরের প্রথম দিকে জন্মগ্রহণ করেন। নবুওয়াতের দশম বর্ষে ছয় বছর বয়সে তার বিবাহ হয়। কিন্তু এ বক্তব্য কোনােভাবেই যথার্থ নয়। কেননা, যদি নবুওয়াতের চতুর্থ বছরের প্রথম দিকে তাঁর জন্ম হয়, তা হলে নবুওয়াতের দশম বর্ষে তাঁর বয়স ছয় বছর হয় না; বরং সাত বছর হয়। প্রকৃত প্রস্তাবে, হযরত আয়েশা রাযি-এর বয়স-সম্পর্কিত কয়েকটি তথ্য সর্বসম্মতিক্রমে সাব্যস্ত। হিজরতের তিন বছর পূর্বে ছয় বছর বয়সে বিবাহ হয়। শাওয়াল ১ম হিজরী রােখসতের সময় বয়স ছিল নয় বছর। রবিউল আওয়াল ১১ হিজরী আঠারাে বছর বয়সে বিধবা হন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে হযরত আয়েশা রাযি-এর জন্ম হয় নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষের শেষের দিকে অর্থাৎ হিজরতপূর্ব নবম বর্ষের শাওয়াল মাস মােতাবেক ৬১৪ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে। 

উল্লেখ্য, সামনে যে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলাের বিবরণ আসবে সেগুলাে বােঝার জন্য মনে রাখতে হবে যে, দীর্ঘ তেইশ বছরব্যাপী নবুওয়াতকালের প্রায় তেরাে বছর মক্কায় এবং দশ বছর মদীনায় অতিবাহিত হয়েছে। হযরত আয়েশা রাযি যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন নবুওয়াতের চতুর্থ বর্ষ তাে পার হয়েছেই; পঞ্চম বর্ষেরও অনেকখানি কেটে গিয়েছিল। সিদ্দীকে আকবর রাযি-এর ছােট্ট কুটিরেই ইসলামের আলাে পড়ে সবার আগে—যার কল্যাণে হযরত আয়েশা রাযি-এর আপাদমস্তক সমগ্র সত্তা পবিত্র ছিল যে-কোনাে প্রকারের কুফর ও শিরক থেকে। স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি-এর বর্ণনা যখন থেকে আমি আমার মা-বাবাকে চিনতে শুরু করেছি, তাঁদেরকে মুসলমান পেয়েছি। হযরত আয়েশা রাযি-কে দুধ পান করিয়েছিলেন ওয়াইলের পত্নী। ওয়াইলের উপনাম ছিল আবুল ফুকাইঈস। হযরত আয়েশা রাযি-এর দুধচাচা আফলাহ ও দুধভাই মাঝেমধ্যে হযরত আয়েশা রাযি-এর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুমতিক্রমে হযরত আয়েশা রাযি. তাদের সঙ্গে দেখা করতেন। 

শৈশব
যারা অসাধারণ, ছােট থেকেই অসাধারণ। আচরণ-উচ্চারণ, গতিস্থিতি, বুদ্ধি-বৃদ্ধি—সবকিছুতেই। চোখেমুখে তাদের আলাদা আকর্ষণ ললাটে তাদের জ্বলজ্বল করে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ঠিকানা। এমনই একজন অসাধারণ মুসলিম নারী-ব্যক্তিত্ব হযরত আয়েশা রাযি। বাল্যকালেই তার মাঝে ছিল মহত্ত্ব, বড়ত্ব ও সৌভাগ্যের আভাস। তবু শিশু শিশুই। খেলা আর খেলনাই তাঁর বয়সের দাবি। হযরত আয়েশা রাযি-এরও বাল্যকালে যে খেলার আগ্রহ ছিল না তা নয়। পাড়ার শিশুকন্যারা তাঁর কাছে জড়াে হতাে এবং তার সঙ্গে খেলা করত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তার শিশুমানস রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদার প্রতি কখনােই তাঁকে অমনােযােগী করেনি। প্রায়ই এমন হতাে যে, হযরত আয়েশা রাযি খেলছেন। চারপাশে তার সই-সখীদের ভিড়।

হঠাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন! হযরত আয়েশা রাযি জলদি খেলনাগুলাে লুকিয়ে ফেলতেন। শিশুরা এদিক-সেদিক লুকিয়ে পড়ত। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের ভীষণ ভালােবাসতেন। শিশুদের খেলাধুলাকে মন্দজ্ঞান করতেন না। তাই শিশুদের ডেকে ডেকে আবার হযরত আয়েশা রাযি-এর সঙ্গে খেলতে বলতেন। দুটো খেলা হযরত আয়েশা রাযি-এর সবচেয়ে প্রিয় ছিল কাপড়ের পুতুলখেলা ও দোলনায় দোল খাওয়া। একবার হযরত আয়েশা রাযি পুতুল খেলছিলেন। এমন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করলেন। পুতুলগুলাের মধ্যে একটি ঘােড়াও ছিল। ঘােড়াটির ডানে বামে দু'পাশে দুটো পেখম ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী? শিশু আয়েশা রাযি উত্তর দিলেন—ঘােড়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন—ঘােড়র পেখম হয়? হযরত আয়েশা রাযি. সঙ্গে সঙ্গে বললেন—কেন? হযরত সুলাইমান আ.-এর ঘােড়ার তাে পেখম ছিল। এমন সহজ-সরল-স্বতঃস্ফূর্ত উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃদু না হেসে পারলেন না।

এ ঘটনা থেকে  শৈশবেই হযরত আয়েশা রাযি-এর প্রকৃতিগত উপস্থিত বুদ্ধি, ধর্মীয় জ্ঞান, মেধা-প্রতিভা-বুদ্ধিমত্তা ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব অনুমান করা যায়। এ যুগে সে যুগে, বাচ্চাদের সাধারণ অবস্থা তাে এই যে, সাত-আট বছর বয়স পর্যন্ত না তাদের ভালাে-মন্দের হুশ থাকে, না কিছুর গভীরে পৌছার সক্ষমতা থাকে। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি একেবারে শৈশবের কথাগুলােও মনে রেখেছিলেন ভালােভাবে। তিনি সেগুলাের শুধু বর্ণনাই করতেন না; বরং শিশু ও শৈশবের নানা বিধানও উঘাটন করতেন। নিজের শৈশবে ঘটে-যাওয়া নানা ঘটনা থেকে। শিশুদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র নানা বিষয়ের কল্যাণ-অকল্যাণ নিয়েও আলােচনা করতেন তিনি। ছােটবেলায় খেলাধুলার মধ্যেও কোনাে আয়াত বা হাদীস তাঁর মনােযােগ এড়াত না। যেমন—তিনি বর্ণনা করেন,কুরানের একটি আয়াতটি যখন মক্কায় অবতীর্ণ হয় তখন আমি খেলছিলাম।

হিজরতের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র আট বছর। এত অল্প বয়সেও তার মনোযােগিতা ও স্মৃতিশক্তির প্রখরতা দেখুন! হিজরতে নববীর পূর্ণাঙ্গ ঘটনা সকল অনুষঙ্গসহ তিনি মনে রেখেছিলেন! অথচ কোনাে সাহাবীই হিজরতের সকল ঘটনা ধারাবাহিকভাবে তার চেয়ে চমকাররূপে সংরক্ষণ করতে পারেননি। বিবাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম স্ত্রী হযরত খাদীজা রাযি। হযরত খাদীজা রাযি-এর সঙ্গে বিবাহের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স ছিল পঁচিশ বছর; আর হযরত খাদীজা রাযি-এর বয়স ছিল চল্লিশ বছর। হযরত খাদীজা রাযি পঁচিশ বছর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্যে ধন্য হন। এরপর হিজরতের তিন বছর পূর্বে নবুওয়াতের দশম বর্ষের রমযান মাসে পরপারে পাড়ি জমান।

তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স হয়েছিল পঞ্চাশ বছর আর হযরত খাদীজা রাযি-এর বয়স হয়েছিল পঁয়ষট্টি বছর। ইসলামে স্ত্রীর অবস্থান কী হওয়া উচিত? তা এ থেকেও প্রতীয়মান হয় যে, সারা পৃথিবীতে নিজ প্রিয় স্বামীর পর হযরত খাদীজা রাযি-ই ছিলেন দ্বিতীয় মুসলমান, বন্ধুহীন-নিঃসঙ্গ জীবনের কষ্টে, বিপদ-আপদ ও মুসিবতের ভিড়ে এবং জুলুম-নির্যাতনের ভয়াল থাবার মুখে—প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি প্রিয়তম জীবনসঙ্গীর সঙ্গে থেকেছেন; নিপীড়ন ও প্রতিবন্ধকতার এরূপ সকল স্থানে তিনি সান্ত্বনা, সহযােগিতা ও সহমর্মিতায় একাত্ম হয়েছেন। এমন অন্তরঙ্গ অকৃত্রিম স্ত্রী ও বন্ধুর বিরহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষন্ন হবেন, সেটাই স্বাভাবিক। জীবন তাঁর দুর্বিষহ হয়ে উঠবে, সেটাই যৌক্তিক। অবস্থাদৃষ্টে জীবন-উৎসর্গকারী সাহাবায়ে কেরাম রাযি বিচলিত হয়ে পড়লেন।

বিখ্যাত সাহাবী হযরত উসমান ইবনে মাযউন রাযি-এর স্ত্রী হযরত খাওলা রাযি রাসূলের কাছে এলেন এবং মিনতি করলেন—হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আবার বিবাহ করুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, কাকে? হযরত খাওলা রাযি. বললেন, কুমারীও আছে, বিধবাও আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কাদের কথা বলছ? হযরত খাওলা রাযি. বললেন, কুমারী আছে আবু বকরের কন্যা আয়েশা, আর বিধবা আছে যামআর কন্যা সাওদা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—আচ্ছা, কথা বলাে।
হযরত খাওলা রাযি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মতি পেয়ে আবু বকর রাযি-এর গৃহে গেলেন এবং তাঁর সঙ্গে কথা বললেন।

জাহেলি যুগে ‘আপন ভাই’-এর ছেলেমেয়ের মতাে ‘মুখে বলা ভাই’-এর ছেলেমেয়ের সঙ্গেও বিবাহ না হওয়ার রেওয়াজ ছিল। তাই আবু বকর রাযি বললেন, আয়েশা তাে রাসূলের ভাতিজি। এ বিবাহ হবে কী করে? হযরত খাওলা রাযি ফিরে এলেন এবং রাসূলের কাছে জানতে চাইলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবু বকর আমার ধর্মভাই। এমন সম্বন্ধ বিবাহের প্রতিবন্ধক নয়। হযরত আবু বকর রাযি এ কথা শুনে আর আপত্তি করলেন না।
কিন্তু এরও আগে জুবাইর ইবনে মুতইম রাযি-এর ছেলের সঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি-এর সম্বন্ধের কথা হয়েছিল।

তাই তড়িঘড়ি না করে তাকেও জিজ্ঞেস করা আবশ্যক ছিল। হযরত আবু বকর রাযি জুবাইর রাযি-এর কাছে গেলেন এবং বললেন, তুমি তাে আয়েশার সম্বন্ধ তােমার ছেলের সঙ্গে করবে বলেছিলে। তাে এখনাে কি সেই মতের উপরে আছ, অন্য কিছু ভাবছ? জুবাইর রাযি স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করতে চাইলেন। তখনাে জুবাইর-পরিবার ইসলামের আলাে থেকে দূরে ছিল। জুবাইর রাযি-এর স্ত্রী উত্তর দিলেন, এই মেয়ে বদ-দীন, এই মেয়ের মা বাপ বদদীন, এ আমাদের ঘরে এলে আমাদের পরিবারও বদ-দীন হয়ে যাবে। আমি এ সম্বন্ধ মানি না। হযরত আয়েশা রাযি-এর বয়স ছিল কম। কখনাে কখনাে মায়ের মর্জির খেলাফ কথা বলে ফেলতেন আর মা তাকে শাস্তি দিতেন, ভৎসনা করতেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এটা ভালাে লাগত না। তাই উম্মে রুমান রাযি-কে বলে দিয়েছিলেন, অন্তত আমার খাতিরে ওকে কষ্ট দিয়াে না। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর রাযি-এর গৃহে এসে দেখলেন, হযরত আয়েশা রাযি কপাটে মুখ লাগিয়ে কাঁদছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে রুমান রাযি-কে বললেন, তুমি আমার কথা রাখলে না। উম্মে রুমান রাযি আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমার বিরুদ্ধে সে বাপের কাছে নালিশ করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যা-ই হােক, আর ওকে কিছু বােলাে না। বিভিন্ন হাদীসে এসেছে, বিবাহের পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নে দেখেছিলেন, একজন ফেরেশতা রেশমের কাপড়ে করে কী যেন পেশ করলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কী এটা? ফেরেশতা বললেন, আপনার স্ত্রী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবরণ সরিয়ে দেখলেন—হযরত আয়েশা রাযি। বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি-এর বয়স ছিল মাত্র ছয় বছর। এত অল্প বয়সে বিবাহ হওয়ার রহস্য ছিল নবুওয়াত ও খেলাফতের মধ্যে দৃঢ় সম্পর্ক গড়া। প্রথমত আরবের শুষ্ক আবহাওয়ায় মেয়েরা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠত। আবার অভিজ্ঞতা বলে, বিশেষ ব্যক্তিদের মেধা-প্রতিভা-চেতনায় যেমন বিশেষত্ব থাকে, তেমনি থাকে শারীরিক গঠনেও; যাকে ইংরেজিতে বলে প্রিকৌশাস—অকালপক্ব। যাই হােক, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি-কে এত অল্প বয়সে জীবনসঙ্গিনীরূপে গ্রহণ করা প্রমাণ করে যে, শৈশবেই তার মাঝে অসাধারণ মেধা-প্রতিভা ও অস্বাভাবিক বর্ধনশীলতা লক্ষ করা গিয়েছিল। হযরত আতিয়া রাযি হযরত আয়েশা রাযি-এর বিবাহ সম্পর্কে কেমন সাদামাটা বর্ণনা দিচ্ছেন হযরত আয়েশা রাযি বাচ্চাদের সঙ্গে খেলছিলেন। দুধমা এলেন এবং নিয়ে গেলেন। হযরত আবু বকর রাযি এসে বিবাহ পড়িয়ে দিলেন। 

মুসলিম রমণীর বিবাহ এটুকু গুরুত্বই চায়। কিন্তু আজ কোনাে মুসলিম মেয়ের বিবাহ আর্থিক অপচয়, নৈতিক অবক্ষয় এবং শিরকী ক্রিয়াকলাপের সমষ্টি ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের বিবাহই কি এর কার্যত প্রত্যাখ্যান নয়? হযরত আয়েশা রাযি. বর্ণনা করেন, যখন আমার বিবাহ হয় তখন খবরও ছিল না যে, আমার বিবাহ হয়ে গেছে। যখন আমার মা বাইরে বের হওয়ার ব্যাপারে বকাঝকা করতে শুরু করলেন, তখন বুঝতে পারলাম, আমার বিবাহ হয়ে গেছে। অবশ্য পরবর্তীতে আমার মা আমাকে বুঝিয়েও দিয়েছিলেন।

ইবনে সাদের দুটো বর্ণনা থেকে জানা যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মােহরস্বরূপ হযরত আয়েশা রাযি-কে একটি জমি দিয়েছিলেন। জমিটির মূল্য ছিল পঞ্চাশ দিরহাম। কিন্তু সূত্রের বিচারে তা তাে গ্রহণযােগ্য নয়-ই, যুক্তির বিচারেও এ তথ্য অগ্রহণযােগ্য। মাত্র পঞ্চাশ দিরহাম তাে নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতর এবং ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর জমির মূল্য হতে পারে না। ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী মােহরস্বরূপ চারশাে দিরহাম নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু ইবন সাদেরই অন্য একটি বর্ণনা, যা স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি থেকে বর্ণিত, প্রমাণ করে যে, হযরত আয়েশা রাযি-এর মােহর ছিল বারাে উকিয়া এক নশ-- অর্থাৎ পাঁচশাে দিরহাম। সহীহ মুসলিমে হযরত আয়েশা রাযি থেকে বর্ণিত আছে, উম্মাহাতুল মুমিনীনের মােহর সাধারণত পাঁচশাে দিরহাম ধার্য হতাে।

মুসনাদে আহমদেও হযরত আয়েশা রাযি-এর বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর মােহর ছিল পাঁচশাে দিরহাম। যাই হােক, উম্মাহাতুল মুমিনীনের মােহর এবং আজকালকার মেয়েদের মােহর তুলনা করে দেখুন—আকাশ-পাতাল ফারাক। ভেবে দেখুন, মােহর নিয়ে আমাদের বাড়াবাড়ি কোন পর্যায়ে পৌছেছে। মােহর কম হলে যেন বংশের অমর্যাদা হয়। অথচ মুসলিমসমাজে এমন কোনাে বংশ আছে কি, যা সিদ্দীকে আকবরের বংশের চেয়েও অধিক মর্যাদার? এমন কোনাে কন্যা আছেন কি, যিনি সিদ্দীকায়ে কুবরার চেয়েও অধিক মরতবার? হযরত আয়েশা রাযি-এর বিবাহের তারিখ নিয়েও মতভেদ আছে।

আল্লামা আইনী রহ. বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে লিখেছেন, হযরত আয়েশা রাযি-এর বিবাহ হিজরতের দুই বছর পূর্বে, অন্য বর্ণনায় তিন বছর পূর্বে এবং এও কথিত আছে যে, দেড় বছর পূর্বে হয়েছিল। আরও কিছু বর্ণনা থেকে জানা যায়, হযরত খাদীজা রাযি-এর মৃত্যুর তিন বছর পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি-কে বিবাহ করেছিলেন। আবার অনেক জীবনীকার মনে করেন, যে বছর খাদীজা রাযি-এর মৃত্যু হয় সে বছরই হযরত আয়েশা রাযি-এর বিবাহ হয়। হযরত খাদীজা রাযি-এর মৃত্যু-তারিখ থেকে হযরত আয়েশা রাযি-এর বিবাহ-তারিখ নির্ণিত হতে পারত; কিন্তু হযরত খাদীজা রাযি-এর মৃত্যু-তারিখ নিয়েও একাধিক মত।

একটি বর্ণনায় হিজরতের পাঁচ বছর পূর্বে, অন্য একটি বর্ণনায় চার বছর পূর্বে এবং আরও একটি বর্ণনায় তিন বছর পূর্বে। এত সব বর্ণনার ভিড়ে স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি-এর বক্তব্য কোনাে সমাধান দিতে পারত। কিন্তু মজার ব্যাপার, খােদ তার থেকেও সহীহ বুখারী ও মুসনাদে দু'রকম বক্তব্য বিদ্যমান। একটি বর্ণনায় আছে, হযরত খাদীজা রাযি-এর ওফাতের তিন বছর পর বিবাহ হয়েছিল। অন্য একটি বর্ণনায় আছে, এটা সে বছরেরই কথা। বিশ্লেষকদের মতে—এবং বেশির ভাগ গ্রহণযােগ্য বর্ণনা এ মতেরই সমর্থন করে হযরত খাদীজা রাযি. নবুওয়াতের দশম বর্ষে হিজরতের তিন বছর পূর্বে রমযান মাসে মৃত্যুবরণ করেন। এক মাস পর সে বছরই শাওয়াল মাসে হযরত আয়েশা রাযি-এর বিবাহ হয়।

তখন হযরত আয়েশা রাযি-এর বয়স ছিল ছয় বছর। এই হিসাব অনুযায়ী হিজরতের তিন বছর আগে শাওয়ালে (মােতাবেক ৬২০ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে) বিবাহ হয়েছে। ইসতিআব গ্রন্থে আল্লামা ইবনে আবদুল বার এ মতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। হযরত আয়েশা রাযি থেকে বর্ণিত স্ববিরােধী বক্তব্য দুটো আমার মতে বর্ণনাকারীর বুঝের ভুল। বিবাহ আসলে সে বছরই হয়েছিল যে বছর হযরত খাদীজা রাযি-এর মৃত্যু হয়; কিন্তু রােখসত ও স্বামী-স্ত্রীর মিল হয়েছিল তিন বছর পর, যখন হযরত আয়েশা রাযি-এর বয়স হয়েছিল নয় বছর।

হিজরত
হযরত আয়েশা রাযি বিবাহের পরও প্রায় তিন বছর পিতৃগৃহে ছিলেন। দু'বছর তিন মাস মক্কায় এবং সাত কি আট মাস মদীনায়। মুসলিমগণ প্রিয় মাতৃভূমি মক্কা থেকে দু'বার হিজরত করেছিলেন। প্রথমবার আবিশিনিয়ায় এবং পরের বার মদীনায়। হযরত আয়েশা রাযি এর বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আবু বকর রাযি-ও আবিশিনিয়ায় হিজরত করতে চেয়েছিলেন; এমনকি বারকুল-গিমাদ পর্যন্ত অগ্রসরও হয়েছিলেন। পথিমধ্যে ইবনে দাগিনার সঙ্গে দেখা হয়। শেষ পর্যন্ত আবু বকর রাযি-ও মক্কা ত্যাগ করছেন দেখে কুরাইশদের প্রতি ইবনে দাগিনার ভীষণ আক্ষেপ হয়। অনেক অনুরােধের পর নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি আবু বকর রাযি-কে মক্কায় ফিরিয়ে আনেন।

খুব সম্ভব, এই সফরে হযরত আয়েশা রাযি-সহ পরিবারের অনেক সদস্যই হযরত আবু বকর রাযি-এর সঙ্গে ছিলেন। মক্কার মুশরিকদের নির্যাতন-নিপীড়নে মুসলমানগণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়লে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় হিজরত করার সংকল্প করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকালবেলা ও সন্ধ্যাবেলা প্রতিদিনই আবু বকর রাযি-এর গৃহে আসতেন। কিন্তু একদিন এ সাধারণ রীতির ব্যতিক্রম ঘটল। ঠিক দ্বিপ্রহরে মুখমণ্ডল চাদরাবৃত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর রাযি-এর গৃহে এলেন।

আবু বকর রাযি-এর পাশে তার দুই মেয়ে: হযরত আয়েশা রাযি ও হযরত আসমা রাযি বসা ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আওয়াজ দিলেন—আবু বকর, লােকজনকে সরিয়ে দিন, কথা আছে। আবু বকর রাযি আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, অন্য কেউ নেই, আপনারই পরিবার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভেতরে এলেন এবং হিজরতের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। হযরত আয়েশা রাযি ও হযরত আসমা রাযি দুজনে মিলে সফরের পাথেয় প্রস্তুত করে দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রিয় বন্ধু আবু বকর রাযি-কে সঙ্গে নিয়ে মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন—শত্রুভূমিতে প্রিয় পরিবারকে আল্লাহর কাছে সােপর্দ করে।

যেদিন হিজরতে নববীর এই ক্ষুদ্র কাফেলাটি বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে মদীনা মুনাওয়ারায় পৌছে, সেদিন ছিল নবুওয়াতের দ্বাদশতম বছরের ১২ই রবিউল আওয়াল। মদীনায় স্থির হয়েই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন পরিবারকে কাছে আনার জন্য হযরত যায়েদ রাযি ও আবু রাফে রাযি কে মক্কায় পাঠান। আবু বকর রাযি-ও লােক পাঠান। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর রাযি মাতা ও ভগ্নিদ্বয়কে সঙ্গে নিয়ে মদীনার পথে পা বাড়ান। হঠাৎ হযরত আয়েশা রাযি-এর উট পলায়নপর হয়ে দৌড় শুরু করে। উটের ক্ষিপ্রতা দেখে ভয় হচ্ছিল, এই বুঝি হাওদা পড়ে যায়। মহিলাদের মধ্যে রীতিমতাে চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেল। অবশেষে উট বশে এলে স্বস্তি মেলে।

যাই হােক, নবীপরিবার ও সিদ্দীকপরিবারের এই ক্ষুদ্র কাফেলাটি মদীনায় পৌছে গেল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মসজিদে নববীর পাশে ঘর বানাচ্ছিলেন। নবীজীর কন্যা হযরত ফাতেমা রাযি ও হযরত উম্মে কুলসুম রাযি এবং নবীজীর সম্মানিতা স্ত্রী হযরত সাওদা বিনতে যামআ রাযি এই নবনির্মিত ঘরেই উঠেছিলেন।

রােখাসত
হযরত আয়েশা রাযি-এর পরিবার বনু হারিস ইবনে খাযরাজের পাড়ায় অবতরণ করেন। প্রায় সাত-আট মাস তিনি মাতার সঙ্গে সেখানেই থাকেন। অধিকাংশ মুহাজিরই নতুন জায়গার নতুন আবহাওয়া সহজে মানিয়ে নিতে পারলেন না। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আবু বকর রাযি-ও কঠিন রােগে আক্রান্ত হলেন। পিতার স্রষার দায়িত্ব নিলেন হযরত আয়েশা রাযি। তিনি বলেন, আমি আমার পিতার কাছে ভালােমন্দ জিজ্ঞেস করলে তিনি এই কবিতা আবৃত্তি করতেন।
নিজ বাসভূমেও রােগের আক্রমণ। মৃত্যুর শমন—সে তাে ছায়ার মতন। 
হযরত আয়েশা রাযি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে আবু বকর রাযি-এর অবস্থা ব্যক্ত করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সুস্থতার জন্য দুআ করলেন। আবু বকর রাযি তাে সুস্থ হলেন; কিন্তু অচিরেই হযরত আয়েশা রাযি-ও অসুস্থ হলেন।

এবার যেন পিতার পালা পুত্রীর দেখাশােনা করার। নয়নমণির করুণ অবস্থা হযরত আবু বকর রাযি-কে ভীষণ পীড়া দিত। অবস্থার এত অবনতি হয়েছিল যে, হযরত আয়েশা রাযি-এর সমস্ত চুল পড়ে গিয়েছিল। সুস্থ হলে আবু বকর রাযি রাসূলের কাছে এসে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার স্ত্রীকে ঘরে আনছেন না কেন? প্রিয়নবী বললেন, এই মুহূর্তে মােহর পরিশােধ করার মতাে পয়সা কাছে নেই। আবু বকর রাযি-এর বিনীত নিবেদন যদি আমার পয়সা কবুল করতেন! প্রিয়নবী আবু বকর রাযি থেকে বারাে উকিয়া এক নশ কর্জরূপে গ্রহণ করে আয়েশা রাযি-এর নিকট পাঠিয়ে দিলেন।

যারা মােহর পরিশােধ করা অনাবশ্যক জ্ঞান করি, তারা এ ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। মােহর তাে স্ত্রীর অধিকার। সরলতার সুযােগ নিয়ে তাকে বঞ্চিত করা অন্যায়। মদীনা যেন হযরত আয়েশা রাযি-এর শ্বশুরালয়। আনসারি মহিলাগণ কনেকে বরণ করার জন্য আবু বকর রাযি-এর গৃহে এলেন। হযরত আয়েশা রাযি তখন সখীদের সঙ্গে দোলনায় দোল খাচ্ছিলেন। হযরত উম্মে রুমান রাযি মেয়েকে ডাক দিলেন। মায়ের ডাক শুনে মেয়ে ছুটে এলেন। হাত-মুখ ধুইয়ে দিলেন, মাথা আঁচড়ে দিলেন, তারপর আনসারি অতিথিনীদের অপেক্ষাগারে নিয়ে গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি-কে ঘরে প্রবেশ করতে দেখে তারা অভ্যর্থনা জানালেন, বললেন তােমার আগমন শুভ হােক, কল্যাণকর হােক, বরকতময় হােক। 

তারা হযরত আয়েশা রাযি-কে সাজিয়ে নিলেন। একটু পরেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন হলাে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আপ্যায়ন করার মতাে এক পেয়ালা দুধ ছাড়া হযরত আবু বকর রাযি-এর গৃহে কিছুই ছিল না। হযরত আসমা বিনতে ইয়াযিদ হযরত আয়েশা রাযি-এর ছােটবেলার সখী ছিলেন। তিনি বলেন, আমি সেই বিয়েতে উপস্থিত ছিলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামান্য দুধ পান করে আয়েশা রাযি-এর দিকে এগিয়ে দিলেন। তিনি খুব লজ্জা পাচ্ছিলেন।

আমি বললাম, রাসূলের উপহার, ফিরিয়ে দিয়াে না। হযরত আয়েশা রাযি অত্যন্ত লাজুকভাবে পেয়ালা হাতে নিলেন এবং একটু মুখে দিয়েই রেখে দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তােমার সখীদেরও দাও। আমরা বললাম, আমাদের ইচ্ছে নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মিথ্যা বােলাে না, মানুষের সব মিথ্যাই লেখা হয়ে থাকে। সঠিক বর্ণনা অনুযায়ী হযরত আয়েশা রাযি-এর রােখসত হয় শাওয়াল ১ম হিজরী, দিনের বেলা। আল্লামা সুয়ূতি রহ. উমদাতুল কারী গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত আয়েশা রাযি-এর রােখসত হয়েছিল দ্বিতীয় হিজরী, বদর যুদ্ধের পর; কিন্তু এটা ঠিক নয়। কেননা এ হিসাব অনুযায়ী হযরত আয়েশা রাযি-এর বয়স তখন দশ বছর হয়ে যায়; যেখানে হাদীস ও ইতিহাসের সমস্ত প্রামাণ্যগ্রন্থ একমত যে, রােখসতের সময় হযরত আয়েশা রাযি-এর বয়স ছিল নয় বছর।

কুসংস্কারের অপনােদন
উপযুক্ত আলােচনা থেকে কারও বুঝতে বাকি থাকে না যে, হযরত আয়েশা রাযি-এর বিবাহ, মােহর, রােখসত কতটা সাদামাটাভাবে হয়েছিল। অপচয়, আড়ম্বরতার লেশ পর্যন্ত ছিল না।(প্রতিযােগিতা করতেই হয়, তাে এতেই করা উচিত)।
হযরত আয়েশা রাযি-এর বিবাহের কল্যাণে আরবে বিরাজিত অসংখ্য কুসংস্কারের অপনােদন ঘটে। আরবরা মুখে-বলা ভাইয়ের মেয়েকেও বিয়ে করত না। হযরত খাওলা রাযি যখন আবু বকর রাযি এর কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রস্তাব পেশ করেছিলেন তখন আবু বকর রাযি বলেছিলেন, এ কী করে সম্ভব? আয়েশা তাে রাসূলের ভাতিজি! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিয়েছিলেন, তুমি আমার ভাই; কিন্তু ধর্মের সূত্রে। আরবরা শাওয়াল মাসে বিবাহ করত না। 

কোনাে এককালে এ মাসে আরবে মহামারী দেখা দিয়েছিল। তাই এ মাস তাদের দৃষ্টিতে ছিল অশুভ। হযরত আয়েশা রাযি-এর বিবাহ, রােখসত উভয়ই শাওয়াল মাসে হয়েছিল। এ জন্য তিনি শাওয়াল মাসেই এসব অনুষ্ঠান পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, আমার বিবাহ রােখসত উভয়ই শাওয়াল মাসে হয়েছে। জীবনসঙ্গীর বিচারে আমার চেয়ে ভাগ্যবতী কে আছে? আরবে পূর্ব থেকেই রীতি ছিল যে, কন্যার সামনে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত থাকতে হবে। এও রীতি ছিল যে, স্বামী-স্ত্রীর প্রথম সাক্ষাৎ হবে পালকির ভেতর। ইমাম বুখারী রহ. এবং ইমাম কসতলানি রহ. লিখেছেন—এই সব কুসংস্কার হযরত আয়েশা রাযি-এর বিবাহের মধ্য দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়।


 

পরবর্তী গল্প
মৃত্যুর সময় শয়তানের চক্রান্ত

পূর্ববর্তী গল্প
বে-ঈমানদারের রূহ কবজ

ক্যাটেগরী