আয়েশা রাঃ সংসার-জীবন নবীপরিবারের বাসগৃহের চিত্র | আমার কথা
×

 

 

আয়েশা রাঃ সংসার-জীবন নবীপরিবারের বাসগৃহের চিত্র

coSam


হযরত আয়েশা রাযি. পিতৃগৃহ ত্যাগ করে যে ঘরে এসেছিলেন তা কোনাে সুউচ্চ শানদার অট্টালিকা ছিল না; বরং বনু নিযারের মহল্লায় মসজিদে নববীর পাশে ছােট-ছােট অনেক হুজরা ছিল, এগুলােরই একটি ছিল হযরত আয়েশা রাযি.-এর বাসস্থান। হযরত আয়েশা রাযি.-এর হুজরার অবস্থান ছিল মসজিদে নববীর পূর্ব দিকে। হুজরার একটি দরজা মসজিদের ভেতরে পশ্চিম দিকে এমনভাবে ছিল যে, মনে হতাে— মসজিদে নববীই হুজরার আঙিনা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দরজা দিয়েই মসজিদে নববীতে প্রবেশ করতেন। ইতিকাফরত অবস্থায় হুজরার দিকে মাথা এগিয়ে দিতেন আর হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর কেশ মােবারক আঁচড়ে দিতেন। কখনাে কখনাে মসজিদে বসেই হুজরার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে কোনাে কিছু চেয়ে নিতেন।

হুজরার প্রশস্ততা ছিল ছয়-সাত হাতের মতাে। দেয়াল ছিল মাটির। ছাউনি ছিল খেজুরপাতা ও খেজুরডালের। বৃষ্টির পানি এড়ানাের জন্য ওপর থেকে কম্বলজাতীয় মােটা কাপড় বিছানাে থাকত। উচচতা এটুকু ছিল যে, কেউ দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালে ছাউনিতে হাত ঠেকে যেত। দরজার কপাট ছিল এক পাটের। তাও সারা জীবনে কখনাে বন্ধ হয়নি। পর্দাস্বরূপ কাপড় ঝােলানাে থাকত। হুজরার সঙ্গে লাগানাে একটি ওপরতলা ছিল। ঈলার দিনগুলােতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাস এখানেই অবস্থান করেছিলেন।

ঘরের আসবাবপত্র
ঘরে সব মিলিয়ে যা ছিল : একটা চকি, একটা চাটাই, একটা বিছানা, একটা ছালের বালিশ, খেজুর ও জব রাখার দু-একটা পাত্র, একটা জগ, একটা মগ। এর বেশি কিছু ছিল না। সত্যিকার অর্থে যেই ঘরটা ছিল পৃথিবী ও পৃথিবীবাসীর আলাের উৎস—সেই ঘরেই আলাে জ্বালানাের সামর্থ্য ঘরওয়ালার ছিল না। রাতের পর রাত পার হয়ে যেত, কিন্তু ঘরে আলাে জ্বলত না। সদস্যসংখ্যা মাত্র দুজন : হযরত আয়েশা রাযি. ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কয়দিন পর হযরত বারীরাহ রাযি. নান্মী দাসীও যােগ হলাে।

যতদিন পর্যন্ত হযরত আয়েশা রাযি. ও হযরত সাওদা রাযি. কেবল দুজনই পবিত্র স্ত্রীর মর্যাদায় ভূষিত ছিলেন, ততদিন পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন পরপর হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে অবস্থান করতেন। পরবর্তীতে যখন আরও অনেক মহীয়সী এই বৈশিষ্ট্যে বিশিষ্টতা লাভ করেন, তখন বার্ধক্যজনিত কারণে হযরত সাওদা রাযি. তার অধিকার হযরত আয়েশা রাযি. এর অনুকূলে ছেড়ে দেন। সুতরাং নয় দিনে দুই দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে অবস্থান করতেন।

অভাব-অনটন
ঘরের কাজ বেশি ছিল না। খানা পাকানাের সুযােগও কম হতাে। স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, একটানা তিন দিন ঠিকমতাে আহার জুটেছে নবীপরিবারে কখনাে এমন হয়নি। তিনি আরও বলেন, মাসের পর মাস চুলােয় আগুন জ্বলত না। শুকনাে খেজুর ও পানিতেই দিন কাটত। অবশ্য খায়বার বিজয়ের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র স্ত্রীগণের খােরপােশস্বরূপ বার্ষিক ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন—আশি অসক শুকনাে খেজুর, বিশ অসক জব। কিন্তু সেসব তাঁরা দান-খয়রাত করে শেষ করে ফেলতেন।

অভাব-অনটন সবসময় লেগেই থাকত।। সাহাবা কেরাম রাযি. মহব্বত করে মাঝেমধ্যে হাদিয়া-তােহফা পাঠাতেন—বিশেষ করে, যেদিন হযরত আয়েশা রাযি.-এর হুজরায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের থাকার কথা থাকত, সেদিন তাঁরা হাদিয়া পাঠানাের চেষ্টা করতেন বেশি। প্রায়ই এমন হতাে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাইরে থেকে এসে জিজ্ঞেস করতেন, আয়েশা, ঘরে খাবার কিছু আছে? হযরত আয়েশা রাযি. উত্তর দিতেন, হে আল্লাহর রাসূল, ঘরে কিছু নেই। আর কী! দুজনেই উপােস। কখনােকখনাে কোনাে আনসারি সাহাবী দুধ পাঠিয়ে দিতেন। নবীপরিবার তুষ্ট।

নিজ হাতে খানা পাকানাে
আল্লাহপ্রদত্ত এমন বিবেক, বুদ্ধি ও চেতনা সত্ত্বেও বিশেষ করে বয়স যেহেতু খুবই কম ছিল—ভুল-ত্রুটি করে ফেলতেন। আটা পিষে রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন, আর বকরি এসে খেয়ে ফেলত। একদিনের ঘটনা হযরত আয়েশা রাযি. নিজ হাতে আটা পিষে রুটি বানিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপেক্ষায় আছেন। রাতের বেলা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন এবং নামাযে দাঁড়ালেন। হযরত আয়েশা রাযি. একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন। পাশের বাড়ির বকরি এসে সব খেয়ে চলে গেল। অন্য স্ত্রীগণের তুলনায় হযরত আয়েশা রাযি. ভালাে রান্না করতে পারতেন না।

বাজারসদাই ও খরচপাতি
নবীপরিবারের বাজারসদাই ও খরচপাতির দায়িত্ব ছিল হযরত বেলাল রাযি.-এর ওপর। তিনিই নবীপরিবারের সারা বছরের ধােরপােশ বণ্টন করতেন। প্রয়ােজনে ধারকর্জও করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের সময় পুরাে আরব ছিল বশীভূত। সকল প্রদেশ থেকে একের পর এক ধনভাণ্ডার বাইতুল মালে এসে জড়াে হতাে। অথচ যেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকাল হলাে, সেদিন হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে একদিন পার হওয়ার মতাে খাবারও ছিল না। 

হযরত আবু বকর রাযি.-এর খেলাফতের সময় খায়বারের নীতি অনুসারে নির্ধারিত পরিমাণ ফসল আসত। পরে হযরত উমর রাযি. সবার জন্য নগদ অর্থ নির্ধারণ করেন। অন্য স্ত্রীগণ পেতেন দশ হাজার দিরহাম, আর হযরত আয়েশা রাযি. পেতেন বারাে হাজার। একটি বর্ণনায় আছে : হযরত উমর রাযি. ইচ্ছাধিকার দিয়েছিলেন—চাইলে ফসল নিতে পারেন, কিংবা জমিও নিতে পারেন। হযরত আয়েশা রাযি. জমি নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই অর্থের অধিকাংশই ছিল ফকির-মিসকিনের জন্য ওয়াকফকৃত। হযরত উসমান রাযি., হযরত আলী রাযি. ও আমীর মুয়াবিয়া রাযি.-এর সময়ও সাধারণভাবে এ নীতিই চালু ছিল। আমীর মুআবিয়া রাযি.-এর অব্যবহিত পরই হেজাজের খলীফা হয়েছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি.।

তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর আপন ভাগ্নে ছিলেন। সম্মানিতা খালার যাবতীয় ব্যয়ভার-দায়ভার বহন করতেন তিনি নিজে। কিন্তু যেদিনই বাইতুল মাল থেকে হাদিয়া আসত, সেদিনই সব দান-খয়রাত করে শেষ করে ফেলতেন। সন্ধ্যায় ঘরে আর কিছু থাকত না।

 

পরবর্তী গল্প
দাম্পত্যজীবন ইসলাম ও নারী

পূর্ববর্তী গল্প
আয়েশা রাঃ তালীম ও তারবিয়াত তৎকালীন আরবে শিক্ষার স্বরূপ

ক্যাটেগরী