আয়েশা রাঃ তালীম ও তারবিয়াত তৎকালীন আরবে শিক্ষার স্বরূপ | আমার কথা
×

 

 

আয়েশা রাঃ তালীম ও তারবিয়াত তৎকালীন আরবে শিক্ষার স্বরূপ

coSam ১১


নারী তাে দূরের কথা, আরবে পুরুষেরই লেখাপড়ার প্রচলন ছিল না। ইসলামের আবির্ভাবের সময় সমগ্র কুরাইশে লেখাপড়া-জানা লােক ছিলেন মাত্র সতেরাে জন। তার মধ্যে শিফা আদাবিয়া ছিলেন একমাত্র নারী। ইসলামের পার্থিব কল্যাণগুলাের মধ্যে এও কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, ইসলামের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে লেখাপড়ারও প্রসার ঘটছিল। বদর যুদ্ধে বন্দী কাফেরদের মধ্যে যারা শিক্ষিত ছিল, মহানবী তাদের প্রত্যেককে মুক্তিপণ হিসেবে দশজন মুসলিম শিশুকে লেখাপড়া শেখানাের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সুফফায় প্রায় একশাে সাহাবী ছিলেন। তাদেরকে প্রয়ােজনীয় বিদ্যার পাশাপাশি লেখাপড়াও শেখানাে হতাে।

পবিত্র সহধর্মিনীগণের মধ্যে হযরত হাফসা রাযি. ও উম্মে সালামা রাযি. লেখাপড়া শিখেছিলেন। হযরত হাফসা রাযি. বিশেষভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে শিফা আদাবিয়ার কাছে এ বিদ্যা রপ্ত করেছিলেন। পবিত্র স্ত্রীগণসহ আরও অনেক সাহাবিয়া লেখাপড়া শেখার প্রয়াস পেয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনসঙ্গিনীর সংখ্যাধিক্য ও হযরত আয়েশা রাযি.-এর বাল্যবিবাহের একটি কল্যাণকর দিক এই যে, যদিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সার্বক্ষণিক সাহচর্য সাহাবা কেরামকে সৌভাগ্য ও মর্যাদার উচ্চ শিখরে পৌছে দিয়েছিল; কিন্তু স্বাভাবিকভাবে এ সুযোেগ সাহাবিয়াগণের হচ্ছিল না।

কেননা শুধু পবিত্র স্ত্রীগণই তাঁর সান্নিধ্য-শােভা ও সাহচর্যের আলোেক-আভা লাভ করছিলেন। কিন্তু এ উজ্জ্বল তারকারাজির আলােই পুরাে পৃথিবীর নারী দিগন্তকে আলােকিত করে। হযরত আয়েশা রাযি. ছাড়া অন্যান্য স্ত্রীগণ বিধবা হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। সুতরাং একমাত্র আয়েশা রাযি.-ই একক ও একনিষ্ঠভাবে নববী ফয়যানে ধন্য হয়েছিলেন। আর বাল্যকালই যেহেতু শিক্ষা-দীক্ষার প্রকৃত সময় সেহেতু এ সময়ই ভাগ্য তাকে সকল অন্ধকার ও অপূর্ণতা থেকে মুক্ত করে নববী সান্নিধ্যে পৌছে দিয়েছিল। তিনি যে পূর্ণতার আলােকবর্তিকা হয়ে থাকবেন যুগযুগের মুসলিম রমণীকুলের জন্য!

পিতার কাছে তালীম-তারবিয়াত
হযরত আবু বকর রাযি. সারা কুরাইশে বংশবিদ্যা ও কাব্যজ্ঞানে সবচেয়ে পারদর্শী ছিলেন। কুরাইশ কবিদের প্রতিউত্তরে ইসলামের মুখপাত্র মুসলমানদের শীর্ষ কাব্য দিয়ে যে আক্রমণ চালাত, কাফেরদের বিশ্বাস হতাে না যে, তা আবু বকর রাযি.-এর সহযােগিতা ছাড়া রচিত হয়েছে। হযরত আয়েশা রাযি. এমনই একজন কাব্যরত্ন ও বংশবিদ পিতার ঘরে লালিত-পালিত হয়েছিলেন। সুতরাং বংশবিদ্যা ও কাব্যজ্ঞান তার জন্মসূত্রে পাওয়া। হযরত আবু বকর রাযি. সন্তানদের শিষ্টাচারের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর।

পুত্র আবদুর রহমান রাযি. অতিথিদের আপ্যায়নে— খাবার পরিবেশনে—বিলম্ব করেছিলেন বলে হযরত আবু বকর রাযি. তাকে প্রহার করতে গিয়েছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. বিবাহের পরও আপন ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য পিতৃভয়ে ভীত থাকতেন। হযরত আবু বকর রাযি. কর্তৃক হযরত আয়েশা রাযি.-কে বকাঝকা করার একাধিক ঘটনা পাওয়া যায়। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তিনি তাকে পিতার হাতে থাপ্পড় খাওয়া থেকে বাঁচিয়েছিলেন।

পবিত্র জীবনসঙ্গীর সান্নিধ্যে
হযরত আয়েশা রাযি.-এর শিক্ষা-দীক্ষা ও শিষ্টাচার গ্রহণের প্রকৃত ক্ষেত্র আসে রােখসতের পর—পবিত্র জীবনসঙ্গীর সান্নিধ্যে এসে। তিনি জীবনের মর্ম অনুধাবন করেন ও জ্ঞানের স্বরূপ আবিষ্কার করেন এই চিরসুন্দর, চিরমহিমান্বিত সাহচর্য থেকেই। তিনিও যে জ্ঞানের ধর্ম তুলে ধরবেন, জীবনের মর্ম ব্যাখ্যা করবেন ইসলামের আলােয়-আসা ভাগ্যবতী নারী সমাজের জন্য।

লেখাপড়া
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সান্নিধ্যে এসে হযরত আয়েশা রাযি. পড়তে শিখেছিলেন। তিনি দেখে দেখে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করতেন। একটি বর্ণনায় আছে, তিনি লিখতে পারতেন না। বিভিন্ন হাদীসে এসেছে, গােলাম যাকওয়ান হযরত আয়েশা রাযি.-কে কুরআন লিখে দিতেন। তাই অনুমান করা হয়, তিনি নিজে লিখতে পারতেন না।অবশ্য কিছু কিছু বর্ণনায় অমুক পত্রের জবাবে তিনি লিখেছেন—এমন কথাও পাওয়া যায়। হতে পারে, বর্ণনাকারী রূপকভাবে লিখিয়েছেন পরিবর্তে লিখেছেন শব্দটি প্রয়ােগ করেছেন; এবং এর প্রচলনও আছে। 

যাই হােক, লেখাপড়া তাে মানুষের বাহ্যিক শিক্ষা। প্রকৃত জ্ঞান আরও ওপরের বিষয়। মনুষ্যত্বের বিকাশ, চারিত্রিক গুণাবলি, অনিবার্য ধর্মীয় জ্ঞান, শরীয়তের রহস্য সম্পর্কে অবগতি, কালামে পাকের মারেফাত, আহকামে নববীর ইলম ইত্যাদি জ্ঞানের উন্নততর পর্যায়। আর এ শিক্ষায় হযরত আয়েশা রাযি. ছিলেন স্বয়ংসম্পূর্ণা।

জ্ঞানার্জনের নানা অনুষঙ্গ ও পদ্ধতি
ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি ইতিহাস-সাহিত্য-চিকিৎসায়ও তাঁর পাণ্ডিত্য কম ছিল না। ইতিহাস ও সাহিত্যের শিক্ষা তাে স্বয়ং পিতার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। আর চিকিৎসাবিদ্যা রপ্ত করেছিলেন দিগ্‌দিগন্ত থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আগত আরব গােত্রের প্রতিনিধিদলের কাছ থেকে। তা ছাড়া শেষ বয়সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। এ কারণে আরবের বিজ্ঞ হেকিম ও চিকিৎসকগণের গমনাগমন চলতে থাকত। তারা যখন যে ওষুধ বাতলে দিতেন, হযরত আয়েশা রাযি. সেগুলাে শিখে নিতেন।
দরসে নববী থেকে উপকৃত হওয়া ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের কোনাে নির্দিষ্ট সময় ছিল না। স্বয়ং ধর্মগুরুই তাে ঘরের মনিব।

প্রাণপ্রিয় পরম শ্রদ্ধেয় জীবনসঙ্গীর মােবারক সােহবত সবসময়ই তিনি লাভ করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তালীম ও ইরশাদের যাবতীয় মজলিস অনুষ্ঠিত হতাে মসজিদে নববীতে, যা তার ঘরের সঙ্গে লাগানাে। এজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের বাইরেও সাহাবায়ে কেরামকে যা শিক্ষা দিতেন, হযরত আয়েশা রাযি. সেগুলােতেও শরীক থাকতেন। দূরত্বের কারণে কোনাে কথা বুঝতে অসুবিধা হলে পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি  ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে ভালােভাবে বুঝে নিতেন। কখনাে উঠে মসজিদের কাছে চলে যেতেন। তা ছাড়া সপ্তাহে সাহাবিয়াগণের তালীম তালকীনের জন্য নির্ধারিত দিনটি তাে ছিলই।

আমলী সাওয়ালাত ও বাস্তবভিত্তিক জিজ্ঞাসা 
দিন-রাত অসংখ্য ইলমী আলােচনা হযরত আয়েশা রাযি.-এর কর্ণগােচর হতাে। তার অভ্যাস ছিল, তিনি যে কোনাে মাসআলা নির্দ্বিধায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করতেন। স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ক্ষান্ত হতেন না। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যার হিসাব নেওয়া হবে তার শাস্তি হবেই। হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ তাে বলেছেন, অচিরেই হিসাব নেওয়া হবে, বড় সহজ হিসাব। (সূরা ইনশিকাক, আয়াত : ৮)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ তাে হিসাব হবে— সেই কথা; কিন্তু যার হিসাব হবে, সে তাে গেল। 

একবার হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ বলেছেন,"যেদিন আসমান জমিন বদলে দেওয়া হবে। আর তারা মহাপরাক্রমশালী এক আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হবে। (সূরা ইবরাহিম, আয়াত : ৪৫)”
অন্য একটি বর্ণনা অনুযায়ী তিনি এই আয়াত উল্লেখ করেছিলেন,  "কিয়ামতের দিন গােটা পৃথিবী তাঁর মুঠোয় হবে। আসমান তাঁর হাতের মধ্যে গুটিয়ে যাবে। (সূরা যুমার, আয়াত : ৪৫)” তাঁর প্রশ্ন ছিল, যদি আসমান জমিন কিছুই না থাকে, তা হলে মানুষ থাকবে কোথায়? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পুলসিরাতে। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বয়ান করছিলেন। তিনি বললেন, কিয়ামতের দিন বিবস্ত্র অবস্থায় মানুষের উত্থান হবে।

পরে হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, নারী পুরুষ একসঙ্গে? তবে কি একে অপরের প্রতি দৃষ্টিপাত করবে না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সে বড় নাজুক মুহূর্ত হবে। কারও কোনাে খবর থাকবে না। একবার হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, কিয়ামতের দিন কেউ কাউকে স্মরণ করবে কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনটি জায়গায় কেউ কাউকে স্মরণ করবে না, কারও কথা কারও মনেও পড়বে না : এক. যখন আমল ওজন করা হবে;  দুই. যখন আমলনামা বণ্টিত হবে; তিন, যখন জাহান্নাম গর্জন শুরু করবে আর বলতে থাকবে—-আমি তিন ধরনের মানুষের জন্য তৈরি হয়েছি...

একবার জিজ্ঞেস করার ছিল, কাফের মুশরিক যদি নেক আমল করে তবে তার সওয়াব পাবে কি না? মক্কায় আবদুল্লাহ ইবনে জাদআন নামক একজন মুশরিক ছিলেন। তিনি অত্যন্ত সৎ ও মহৎ মানুষ ছিলেন। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে কুরাইশের আত্মকলহ-নিরসনে নেতৃবর্গকে একত্র করে তিনি একটি সন্ধি স্থাপন করেছিলেন। স্বয়ং হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও সেই মহৎ উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেছিলেন। হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আবদুল্লাহ ইবনে জাদআন জাহেলি যুগেও মানুষের প্রতি সহমর্মিতা করতেন, অভাবীকে সহায়তা করতেন।

তার আমল কি কোনাে উপকারে আসবে না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন না, আয়েশা। তিনি তাে কোনােদিনই এ কথা বলেননি—হে আমার প্রভু, আমাকে ক্ষমা করুন। জিহাদ ইসলামের অন্যতম ফরজ। হযরত আয়েশা রাযি.-এর ধারণা ছিল, যেহেতু অন্যান্য ফরজে নারী-পুরুষে ব্যবধান নেই, সেহেতু জিহাদও নারীর ওপর ফরজ হবে। একদিন বিষয়টি সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, নারীর জন্য হজই জিহাদ।

বিবাহে নারীর সম্মতি শর্ত। কিন্তু কুমারী মেয়ে তাে মুখ ফুটে বলতে পারে না। তাই হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, বিবাহে নারীর সম্মতি নিতেই হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অবশ্যই। হযরত আয়েশা রাযি. আরজ করলেন, কুমারী তাে নীরব থাকবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নীরবতাই তার সম্মতি নির্দেশ করবে। 

ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার অনেক বেশি। আর এ ধরনের ক্ষেত্রগুলাে সবচেয়ে বেশি নারীকেই সামলাতে হয়। কিন্তু সমস্যা এই যে, একাধিক প্রতিবেশী হলে প্রাধান্য দেবে কাকে? হযরত আয়েশা রাযি. বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, যার ঘর তােমার ঘরের সবচেয়ে কাছে হবে, তাকেই বেশি মূল্য দেবে।

একবার হযরত আয়েশা রাযি.-এর দুধচাচা দেখা করতে এলেন। হযরত আয়েশা রাযি. প্রথমে দেখা করলেন না। তিনি মনে করলেন, আমি দুধ পান করেছি ঠিকই, কিন্তু একজন স্ত্রীলােকের; তার দেবরের সঙ্গে নিশ্চয় আমার কোনাে সম্পর্ক নেই। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাশরিফ আনলেন, বিষয়টি তাঁর কাছে উত্থাপন করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি তােমার চাচা বলেই গণ্য হবেন, তাকে ভেতরে নিয়ে এসাে। কুরআন মাজীদে একটি আয়াত আছে,  ...আর যারা আমল করে এমতাবস্থায় যে, তাদের অন্তর এই কারণে ভীতসন্ত্রস্ত যে, তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।... (সূরা মুমিনুন, আয়াত : ৬০)।

হযরত আয়েশা রাযি.-এর সন্দেহ ছিল—যারা চোর, বদমাশ, মদখাের—আবার অন্তরে আল্লাহর ভয়ও আছে, তারাও কি এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করে দিলেন না, বরং যারা নামাযী, রােযাদার এবং খােদাভীরু আয়াতে তাদের কথা বলা হয়েছে। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে আল্লাহর সাক্ষাৎ চায়, আল্লাহও তার সাক্ষাৎ চান। আর যে আল্লাহর সাক্ষাৎ চায় আল্লাহও তার সাক্ষাৎ চান না। হযরত আয়েশা রাযি. আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা তাে কেউই মৃত্যু চাই না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এর অর্থ এটা নয়; এর অর্থ হলাে যখন মুমিন বান্দা আল্লাহর রহমত, রেজামন্দি ও জান্নাতের কথা শােনে, তখন তার অন্তর আল্লাহর সাক্ষাৎ ও দীদার পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। সে অবস্থায় আল্লাহ তাআলাও সেই বান্দার সাক্ষাৎ চাইতে থাকেন। পক্ষান্তরে যখন কোনাে কাফের আল্লাহর আজাব-গজবের কথা শােনে, তখন সে আল্লাহর সাক্ষাতকে ঘৃণা করে, আল্লাহও তাকে ঘৃণা করেন।

হাদীসগ্রন্থগুলাে হযরত আয়েশা রাযি. কর্তৃক এরকম অসংখ্য জিজ্ঞাসা, অসংখ্য ভাবনা, অসংখ্য আলােচনাকে ধারণ করে আছে। প্রকৃত প্রস্তাবে, এগুলাে তাঁর জীবনমুখী শিক্ষার প্রতিদিনের বিচিত্র পাঠ। বাহ্যিকভাবে যেসব ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কষ্ট পাওয়ার বা অসন্তুষ্ট হওয়ার কথা, হযরত আয়েশা রাযি. সেসব ক্ষেত্রেও প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকতেন না। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এতে মনঃক্ষুন্ন হতেন না। একবার কোনাে বিষয়ে কষ্ট পেয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈলা করেছিলেন (অর্থাৎ শপথ করেছিলেন, এক মাস পবিত্র স্ত্রীগণের কাছে যাবেন না)।

তাই উনত্রিশ দিন ওপরতলায় অবস্থান করেছিলেন। সহধর্মিনীগণ বিচলিত ছিলেন। ঘটনাক্রমে মাসটি ছিল ঊনত্রিশ দিনের। যাই হােক, ত্রিশতম দিনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওপরতলা থেকে নেমে হযরত আয়েশা রাযি.-এর ঘরে গেলেন। হযরত আয়েশা রাযি. আনন্দে সবকিছু ভুলে যাওয়ার কথা ছিল। উপরন্তু একে কেন্দ্র করে কোনাে প্রশ্ন তােলা বাহ্যিকভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আরেকবার কষ্ট দেওয়ার মতােই ছিল। কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. যেহেতু নববী-চরিত্রের মাধুরী সম্পর্কে অবগত ছিলেন, সেহেতু সবকিছুর ওপর শরীয়তের বিধিনিষেধকেই প্রাধান্য দিলেন।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি বলেছিলেন, একমাস আমাদের কাছে আসবেন না। তা হলে এক দিন আগে ঊনত্রিশ দিন পূর্ণ করে—কী করে এলেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, চন্দ্রমাস কখনাে ঊনত্রিশ দিনেও হয়। একবার জনৈক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আসার অনুমতি চাইলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে আসতে দাও, আপনজনদের সঙ্গে সে ভালাে ব্যবহার করে না। লােকটা যখন ভেতরে এসে বসল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রতি মনোেযােগী হলেন এবং খুবই কোমল ও প্রীতভাবে কথা বললেন। হযরত আয়েশা রাযি. অবাক হলেন।

লােকটা চলে গেলে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি তাে লােকটাকে ভালাে মনে করেন না; অথচ তার সঙ্গে এত কোমল ও প্রীতভাবে কথা বললেন! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—আয়েশা, নিকৃষ্ট তাে সেই, যার ব্যবহারে মানুষ দূরে সরে যায়। পল্লী আরবের বর্বর বেদুইনরা ছিল বেপরােয়া মনােভাবের। ইসলামের বিধিনিষেধ সম্পর্কে এদের পূর্ণ ধারণা ছিল না। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদের খাদ্যসামগ্রীগ্রহণে সাবধানতা অবলম্বন করতেন। একবার উম্মে সুম্বুলা নাম্নী জনৈকা মহিলা এলেন হাদিয়াস্বরূপ দুধ নিয়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান করলেন।

হযরত আবু বকর রাযি. সঙ্গে ছিলেন, তিনিও পান করলেন। হযরত আয়েশা রাযি. আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি এদের খাবার খাওয়া পছন্দ করতেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, এরা ওরকম নয়। এদের ডাকা হলে এরা আসে। তাই শরীয়তের বিধি-নিষেধ সম্পর্কে এদের ধারণা আছে। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কাজে কর্মে মধ্যমতা অবলম্বন করাে, মানুষকে ডেকে সুসংবাদ দাও যে, মানুষের আমল মানুষকে জান্নাতে নেবে না; বরং আল্লাহর রহমত তাদেরকে জান্নাতে নেবে। শেষ উক্তিটি হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে অস্বাভাবিক মনে হলাে।

তিনি ভাবলেন, যারা নিস্পাপ তাদের কথা নিশ্চয় আলাদা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আপনাকেও কি আপনার আমল জান্নাতে নেবে না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না, বরং আমার আল্লাহ আমাকে আপন ক্ষমা ও করুণা দ্বারা ঢেকে নেবেন। একবার তাহাজ্জুদের পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর পড়ে শুতে চাইলেন। হযরত আয়েশা রাযি. আরজ করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, বিতর না পড়েই শুয়ে পড়ছেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, আমার চোখদুটো ঘুমায়; কিন্তু আমার হৃদয় ঘুমায় না।

বাহ্যিকভাবে এ ধরনের বেশ কিছু প্রশ্ন হযরত আয়েশা রাযি.-এর শানে অশােভন মনে হয়। কিন্তু তিনি যদি স্ত্রীসুলভ সৎসাহসটুকু না দেখাতেন, তা হলে মুসলিম উম্মাহ অবশ্যই নবুওয়াতের প্রকৃতি ও স্বরূপ সম্পর্কে অনবগত থেকে যেত।

সংশােধন, শিষ্টাচার ও মহত্ত্বের দীক্ষা 
এ তাে গেল হযরত আয়েশা রাযি.-কর্তৃক স্বতঃপ্রণােদিত কিছু জিজ্ঞাসা ও প্রয়ােজনীয় আলােচনার কথা। এগুলাে ছাড়াও স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও হযরত আয়েশা রাযি.-এর আচারব্যবহার, কথাবার্তা, চলা-বলা লক্ষ রাখতেন; কোনাে ত্রুটি পেলে শুধরে দিতেন, কিছু শেখানাের থাকলে শিখিয়ে দিতেন—এমন অনেক উদাহরণ আছে হাদীসগ্রন্থের পাতায় পাতায়।
একবার কিছু ইহুদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। এল। তারা  (আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হােক) না বলে বলল, (আপনার ওপর মৃত্যু আপতিত হােক); রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শান্তকণ্ঠে উত্তর দিলেন, (এবং আপনাদের ওপর)।

কিন্তু হযরত আয়েশা রাযি. ধৈর্য ধরতে পারলেন না; তিনি বলে উঠলেন, (আর তােমাদের ওপর মৃত্যু ও অভিশাপ নেমে আসুক)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, নম্র হও, আল্লাহ সর্ব বাক্যে নম্রতা পছন্দ করেন।
একবার হযরত আয়েশা রাযি.-এর কোনাে জিনিস চুরি হলাে। তখনকার রীতি অনুসারে হযরত আয়েশা রাযি. চোরকে অভিশাপ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, অভিশাপ করে নিজের নেকি আর পরের বদি কমিয়াে না। একবার সফরে হযরত আয়েশা রাযি. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে উটে সওয়ার ছিলেন। হঠাৎ উট কিছুটা তেজ দেখাতে লাগল। সাধারণ নারীর মতাে হযরত আয়েশা রাযি.-এর মুখেও অভিশাপের বাক্য এসে পড়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিলেন, এই উটকে ফিরিয়ে নেওয়া হােক; কোনাে অভিশপ্ত বস্তু আমার সঙ্গে থাকতে পারে না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য ছিল এটা শিক্ষা দেওয়া যে, কোনাে প্রাণীকেও মন্দ বলা অনুচিত। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, ছােটখাটো গুনাহর পরােয়া করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-কে সম্বােধন করে বলেন, ছােটখাটো ভুল-ত্রুটি থেকেও বেঁচে থেকো, এগুলােরও হিসাব হবে। একবার হযরত আয়েশা রাযি. রাসূলের কাছে জনৈকা মহিলার অবস্থা ব্যক্ত করছিলেন; কথা প্রসঙ্গে বললেন, সে বেঁটে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আয়েশা, এও গীবত।
হযরত সাফিয়্যা রাযি. কিছুটা খর্বাকৃতির ছিলেন।

একদিন হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আর কী বলবেন, সাফিয়্যা তাে এটুক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি এমন কথা বললে, যদি সমুদ্রের পানিতে মেশানাে হয়, মিশে যাবে (অর্থাৎ তােমার এ কথা এতই লােনা যে যদি সমুদ্রে মেশানাে হয় তা হলে সমুদয় পানি লােনা হয়ে যাবে)। হযরত আয়েশা রাযি. বললেন, আমি তাে কারও সম্পর্কে বাস্তবতাই তুলে ধরেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যদি এত-এত-এতও আমাকে দেওয়া হয়, তবু এ ধরনের কথা বলব না (অর্থাৎ যত লােভই আমাকে দেখানাে হােক, কারও সম্পর্কে এহেন মন্তব্য করব না)।।

একবার এক ভিক্ষুক ভিক্ষা চাইল। হযরত আয়েশা রাযি.-এর ইশারায় দাসী কিছু দান নিয়ে এগিয়ে এল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, গুনে গুনে দান কোরাে না, তা হলে আল্লাহও তােমাকে শুনে শুনে দান করবেন। আরেক জায়গায় বলেন, আয়েশা, এক টুকরাে শুকনাে খেজুরও যদি থাকে, তাও ভিক্ষুককে দিয়ে জাহান্নামের আগুন থেকে আত্মরক্ষা করাে। এক টুকরাে শুকনাে খেজুর যদি ক্ষুধার্ত আহার করে তাও কাজে লাগবে। অপ্রয়ােজনে নিজের পেটে দিয়ে কী এমন লাভ হবে? একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করলেন, আয় আল্লাহ, আমাকে মিসকিনভাবে জীবিত রাখুন, মিসকিনভাবে মৃত্যু দান করুন, মিসকিনদের সঙ্গেই হাশর করান। 

হযরত আয়েশা রাযি. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, এমন দুআ কেন করছেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশা, মিসকিনরা ধনীদের চল্লিশ বছর আগে জান্নাতে যাবে। আয়েশা, কখনাে কোনাে মিসকিনকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিয়াে না। এক টুকরাে শুকনাে খেজুর হলেও দিয়াে। আয়েশা, মিসকিনদের ভালােবেসাে, তাদেরকে কাছে আসার সুযােগ দিয়াে।
এরকম অনেক নৈতিক উপদেশ ছাড়াও ইবাদত-বন্দেগী, দুআ-জিকির ও ধর্ম-কর্মের অধিকাংশ বিষয়ই স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-কে শিক্ষা দিতেন। হযরত আয়েশা রাযি. খুবই আগ্রহের সঙ্গে সেগুলাে শিখতেন এবং অত্যন্ত কঠোরভাবে একেকটা নির্দেশ পালন করতেন।

   

পরবর্তী গল্প
আয়েশা রাঃ সংসার-জীবন নবীপরিবারের বাসগৃহের চিত্র

পূর্ববর্তী গল্প
কবরে দুজন ফেরেশতা কর্তৃক মৃত ব্যক্তিকে সাওয়াল-জবাব

ক্যাটেগরী