আবূ তালিবের উপত্যকায় মুসলমানরা অবরুদ্ধ | আমার কথা
×

 

 

আবূ তালিবের উপত্যকায় মুসলমানরা অবরুদ্ধ

coSam ১৩৪


কুরাইশরা যখন দেখল তাদের প্রবল বাধা সত্বেও ইসলাম চারিদিকে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এ দেশ ছেড়ে বিদেশে পর্যন্ত ইসলামের বাণী পৌছে গেছে। হাবশায় অবস্থিত মুসলমানদের ফেরত আনতে ব্যার্থ হয়ে তারা একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিল যে, মুসলমানদের উৎখাত করতে হলে তাদের সঙ্গে সকল লেন-দেন, উঠাবসা, ক্রয়-বিক্রয়, কথা-বার্তা, ব্যবসা-বাণিজ্য সাথে সাথে হাশেমের সহিতও অনরুপ ব্যবহার করতে হবে।

যতক্ষণ পর্যন্ততারা মুহাম্মদকে আমাদের হাতে কতল করবার জন্য না দেবে। এ চুক্তিনামায় আরবের সকল সম্প্রদায়ের সর্দাররা স্বাক্ষর করে কাবাগৃহে ঝুলিয়ে দিয়েছে। নবুয়তের সপ্তম বছরে মহরমের প্রথম তারিখে এটা লিখিত হয়েছে। লেখক ছিল মানসুর বিন ইকরামা। এ আহাদ নামা লিখার অল্পদিন পরেই মানসুরের হাত অবাশ হয়ে গেল। এ চুক্তিনামা অন্যান্য যারা শরীক ছিল এবং একমত ছিল তাদের সবার উপর আল্লাহর অভিশাপ অবর্তীর্ণ হয়েছে। তাদের মধ্যে কারও ঈমান নসীব হয়নি। এ ঘটনার পর বনী হাশেম ও সমস্ত মুসলমান পর্বত গুহার আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। পাহাড়ের একটি গুহায় কাফেররা তাদেরকে অবরোধ করল।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চাচা আবূ তালেবও ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে সে গুহায় চলে যান। এ গুহাকেই আবূ তালিব উপত্যকা বা শোয়াবে আবু তালিব বলা হয়। সেখানে তিন বছর পর্যন্ত অবস্থান কালে মুসলমানের যে দূরাবস্থা হয়েছিল তা ভাষায় বর্ননা করার মত নয়। ইবনে সায়াদ তাবাকাতে বর্ণনা করেন, শিশুদের চিৎকারে কাফেরের অন্তরও কেঁদে উঠত। আর পাষাণ হৃদয় কাফেররা এ ক্রন্দন শুনে আনন্দ করত। হযরত

সায়াদ বিন অক্কাস বলেছেন, এক রাতে ক্ষুধায় অস্থির হয়ে শুকনা এক টুকরা চামড়া ধুয়ে আগুণে ভেজে পানিতে মিশিয়ে আহার করলাম। মরু এলাকার এক প্রকার বৃক্ষ তালহ নামে পরিচিত। বৃক্ষপত্র খেয়ে ক্ষুদার জ্বালা মেটাতে হত। একবার হাকীম বিন হেজাম তাহার ফুফু খাদীজা (রাঃ) -এর কাছে চুপে চুপে কিছু খাদ্য পাঠালেন কিন্তু পথে আবূ জাহল তা কেড়ে নিল।

এভাবে অনেক কাফেরই স্ব স্ব আত্মীয় স্বজনের জন্য কিছু পাঠাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে এভাবে দুঃখ যন্ত্রণার মধ্যে মুসলমানরা দিন কাটাতে লাগলেন। তিন বছর হওয়ার পর কাফেরদের মধ্যে অনেকের হৃদয়ে দয়ার সঞ্চার হল। বনী হাশেমের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হাশেম আমেরী গোপনে কিছু খাদ্যদ্রব্য প্রেরণ করত।

একদিন সে জোহাইরকে বলল, এটা কি ঠিক হচ্ছে যে তুমি খাদ্যদ্রব্যে তুষ্ট আর আমোদ প্রমোদে মত্ত থাকবে আর তোমার আত্মীয়-স্বজন বনী হাশেমের ভাগে এক লোকমা খাদ্য জুটবে না? জোহাইর বলল, অবশ্যই এটা ঠিক নয়। এ জন্য আমার প্রাণ নিশ্চয়ই কাঁদে কিন্তু একা আমি কি করতে পারি। আমিও তোমার সাথে আছি। অতঃপর আবূল বোখতারী, ইবন হাশেম, জাময়া এবং মুতয়েমও তাদের সাথে যোগ দিল। সকলে মিলে চুক্তিপত্রের বিরুদ্দে আন্দোলন গড়ে তুলল।

তাদের মধ্যে সদাশয় ও সহৃদয় ব্যক্তিরা বলতে লাগল, বনী হাশেম আমাদের আত্মীয়। আমরা আমোদ- প্রমোধ এবং পেট ভর্তি করে পানাহার করে জীবন যাপন করব আর তাদের ভাগ্যে একটি রুটিও জুটবে না, এটা কখনও হতে পারে না। তারা সকলে মিলে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, এ চুক্তিনামা অবশ্যই ছিড়িয়া ফেলতে হবে।

পরদিন কুরাইশদের সাথে আলোচনা চালাবার জন্য জোহাইর সকলকে নিয়ে হেরেম শরীফে হাযির হল। মক্কার সর্দার তাদের চিরাচরতি অভ্যাস অনুযায়ী হেরেম শরীফে এসে বসল। এমন সময় জোহাইরও এসে তাওয়াফ করে কাফেরদের কাছে এসে বলল, জোহাইর কুরাইশদেরকে লক্ষ্য করে বলল, আমরা সুখে স্বাচ্ছন্দে জীবন যাপন করব আর বনী হাশেম ক্ষুধ-তৃষ্ণা মরবে এটা আমরা সহ্য করব না। তার কথা শুনে আবূ জাহল লাফিয়ে উঠল এবং বলল, সাবধান কখনও তা করবে না। আবূ জাহলের কথার প্রতিবাদ করে জাময়া দাঁড়িয়ে গেল। আবূল বোখতারী উঠে বলল, জায়মা যা বলেছে এটা সম্পূর্ণ সত্য। সঙ্গে সঙ্গে মুতয়েম এবং ইবন হিশামও উঠে দাঁড়াল এবং জাময়ার সমর্থন করল।

এমন সময় আবূ তালিব উপস্থিত হল। সে বলল, আবূ জাহল! আমি গতরাতে মুহাম্মদকে বলতে শুনেছি চুক্তিপত্রের সমস্ত লেখা পোকায় খেয়ে ফেলেছে। কেবলমাত্র আল্লাহর নাম বাকী আছে। আবূ জাহল বলল, এটা হতে পারে না। আবূ তালেব বলল, যদি তার এ কথা মিথ্যা হয় তবে আমি মুহাম্মদকে তোমাদের হাতে তুলে দিব। আর যদি সত্য হয় তবে আমরা আর গুহায় থাকব না। এ কথার উপর কাবা ঘরের দরজা খুলে দেখতে পেল, সত্যই আল্লাহ নাম ছাড়া বাকী সমস্ত চুক্তিপত্রই পোকায় খেয়ে মুসলমানদের নিয়ে পর্বত গুহা হতে বের হয়ে আসলেন।

আবূ তালিব উপত্যকায় অবস্থান কালে হযরত আবুজর গেফারী (রাঃ) মদীনা হতে মক্কার আগমণ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণ উপদেশমূলক একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

পরবর্তী গল্প
আনসার ও মুহাজিরদের অনৈক্য সৃষ্টির চক্রান্ত

পূর্ববর্তী গল্প
কোবায় শুভ পদার্পণ

ক্যাটেগরী