আবদুল মুত্তালিবের স্বপ্ন

যমযম কূপ পুনঃ খননের ব্যাপারে অধিক বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনা হল আবদুল মুত্তালিব যখন মক্কার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন তখন এক রাতে তিনি সপ্নে দেখেন এক গায়েবী আওয়াজের মাধ্যমে তাকে বলা হয়েছে, হে আবদুল মুত্তালিব । তোমার আদি পিতা ইসমাইলের যমযম কূপ পুনরুদ্ধার কর । যাকে মেজাজ বা আমর বিন হারেস নিশ্চিত করে দিয়েছিল । আবদুল মুত্তালিব এই সপ্ন দেখে হঠাৎ জাগ্রত হয়ে যান এবং সপ্নের কথা ভাবতে থাকেন । কিভাবে যমযম কূপ এর নিশানা পাওয়া যাবে ।


এই চিন্তা মাথায় নিয়ে তিনি চতুর্দিক ঘুরাফেরা করতে লাগলেন। হঠাৎ তার অন্তরে এলহাম হল যে, সাফা মারওয়ার যে দুইটি মূর্তি আছে তাদের মাঝামাঝি স্থানে যমযম কূপ । মূর্তি দুটির একটির নাম এছাপ আর অপরটির নাম নায়েলা, তখন আবদুল মুত্তালিবের মাত্র হারেচ নামে একটি পুত্র সন্তান ছিল । তিনি পুত্র হারেসকে সাথে নিয়ে গন্তব্য স্থানে যান । কিন্তু নিশ্চিহ্ন কূপের সন্ধান করে তা খনন করা খুব সহজ কাজ ছিল না । তাই তিনি কুরাইশদের নিকট সাহায্য কামনা করলেন । কিন্তু তারা এ কাজকে একটি অবাস্তব ও অসম্ভব মনে করে তাঁর সহযোগিতা করতে অসম্মতি প্রকাশ করল ।

আবদুল মুত্তালিব তখন আল্লাহর দরবারে আবেদন করলেন, হে আমার রব! আমার জাতির লোকেরা আমাকে একাজে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন । তুমি আমকে দশটি ছেলে দান করলে আমি এখন তোমার আদেশ পালনের জন্য কুরাইশের সহযোগিতা ও সাহায্যর মুখাপেক্ষী হতাম না এবং অপরাপর যে কোন জনহীতকর কাজ আমি নিজেই পুত্রদের নিয়ে সম্পন্ন করতাম । হে রাব্বুল আলামীন । তুমি যদি আমাকে দশটি ছেলে দান কর আমি একটি ছেলে তোমার নামে কুরবানী করে দেব । জাতির লোকদের সহযোগিতা হতে বঞ্চিত হয়ে অবশেষে খাজা আবদুল মুত্তালিব নিজেই স্বীয় পুত্র হারেসকে নিয়ে এ কূপ খনন করতে লাগলেন । যখন দৃঢ় মনোবলে আল্লাহর উপর ভরসা করে আল্লাহর নির্দেশ পালনে ব্রতী হলেন তখন গায়েবী সাহায্য তাঁর সঙ্গী হয়ে গেল ।

পিতা পুত্রের যৌথ প্রচেষ্টায় কিছু মাটি খনন করার পরেই ঐ সকল অস্ত্র ও স্বর্ণের হরিণী দেখতে পেলেন যা জরহাস কবীলার সর্দার মেজাজ ওতে পুতে রেখেছিল । এতেই তাঁর অন্তর পূর্ণ আশার সঞ্চার হইল এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যেই জমজমের পানি সবেগে ওপরের দিকে উঠতে লাগল । এভাবে যমযম কূপের পুনরুদ্ধারের সৌভাগ্য অর্জন করলেন । যমযম কূপ পুনরুদ্ধারের আনন্দে আবদুল মুত্তালিব আত্মহারা হয়ে পড়লেন । আল্লাহর শুক্রিয়া আদায় করলেন । সমগ্র আরবে আবদুল মুত্তালিবের জয়ধ্বনি ধ্বনিত হতে লাগল । এ ঘটনায় আবদুল মুত্তালিবের সম্মান বহু গুনে বৃদ্ধি পেল । কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র জগতের মানব জাতির ওপর অক্ষয় গৌরবের অধিকারী হয়ে গেলেন ।

অনন্তর আল্লাহ তায়ালা খাজা আবদুল মুত্তালিবকে একে একে দশটি পুত্র সন্তান দান করলেন । যাদের মদ্ধ সর্ব কনিষ্ঠ ছিলেন আবদুল্লাহ । যার মধ্যে ছিল নুরে মুহাম্মাদীর ঝলক তিনি অত্যন্ত সুপুরুষ ও বাহাদুর ছিলেন । একদিন রাতে খাজা আবদুল মুত্তালিব! পবিত্র কাবাগৃহের আঙ্গিনায় নিদ্রা যাচ্ছিলেন ।এমন সময় সপ্ন দেখেন কে যেন তাকে বলছে, হে আবদুল মুত্তালিব যমযম কূপ উদ্ধার কালে যে মান্নত করছিলেন সে পুরানো মান্নতের কথা ভুলে গিয়েছিলেন । সপ্নে দেখার পর তাঁর চেতনা হল । তিনি প্রথম একটি দুম্বা জবেহ করে কোরবানি দিলেন এবং মিছকিনকে খাওয়ালেন । কিন্তু পর রজনীতে আবার সপ্নে আবার দেখলেন, এটা হতে ভাল ও উত্তম প্রানী কোরবানি কর । এ দিনে প্রত্যুষে তিনি একটি গরু কোরবানি করে দিলেন । কিন্তু পরবর্তী নিশীতে আবার পূর্বানুরু সপ্নে দেখেন । তখন তিনি নিদ্রাবস্থায় এ ব্যক্তির নিকট আবেদন করেন আপনি বলে দিন, আমি কোন জিনিস কোরবানি দিলে কাবা ঘরের মালিক সন্তুষ্ট হবেন । ঐ ব্যক্তি বলল, তোমার পুত্রকে কোরবানি কর যাদের তুমি মান্নত করেছিলেন ।

এ সপ্নের পর আবদুল মুত্তালিব খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন প্রাতেই তিনি পুত্রদেরকে ডেকে সপ্নের বৃত্তান্ত তাদের সামনে পেশ করলেন ।পুত্ররা সকলেই সন্তুস্তচিত্তে আদি পিতা ইসমাইলের ন্যায় পিতার ছুরিতে জবেহ হওয়ার জন্য অপ্রত্ত্যাশিত আগ্রহ ও সম্মতি প্রকাশ করল । পিতার প্রতি পুত্রদের অবাধ ভক্তি দেখে খাজা আবদুল মুত্তালিব খুবই আনন্দ লাভ করলেন । তিনি লটারি দিলেন । এতে খাজা আব্দুল্লাহর নাম আসল । হযরত আব্দুল্লার পিতার শানদার ছুরির নিচে হযরত ইসমাইল (আঃ)-এর স্বীয় গ্রীবা পেতে দিলেন । আব্দুল্মুত্তালিবও আল্লাহর এশকের শারাব পান করে বেখোদ হয়ে গেলেন এবং পুত্রকে কোরবানি দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেন । কিন্তু আব্দুল্লার কোমল চেহারা সমগ্র আরবাসিকে পূর্ব হইতে মুগ্ধ রেখেছিল । সকলের অন্তরে তাঁর স্নেহ, মমতা আর মহাব্বতের অগ্নি প্রজ্বলিত ছিল ।

সমগ্র আরবে হাহাকার রব পড়ে গেল । চতুর্দিক হতে দলে দলে লোক এসে খাজা আবদুল মুত্তালিবকে বাধার পর বাধা দিয়ে যেতে লাগলো । বিশেষ করে আবদুল্লাহর মাতৃকুল বনী মাখজুম কিছুতেই ছুরি চালাতে দিলেন না । আবদুল মুত্তালিব এখন নিরুপায় হয়ে গেলেন । তাদেরকে প্রশ্ন করলেন, তাহলে আমার মান্নত আদায় করার উপায় কি? তারা বলল, আমাদের এলাকায় একজন দৈবজ্ঞ মহিলা আছেন, চলুন আমারা সকলে তাঁর নিকট যাই । আবদুল মুত্তালিব সেই মহিলার নিকট উপনীত হয়ে আদি অন্ত ঘোটনা বর্ণনা করলেন তখন ঐ মহিলা তাকে জিজ্ঞাস করলেন, আপনাদের মধ্যে যদি কেউ কোন ব্যক্তিকে হত্যা করে তা হলে হত্যার বিনিময় কি আদায় করে থাকেন ।

আবদুল মুত্তালিব বলিলেন, আমরা এক হত্যার বদলে দশটি উট দিয়ে থাকি । স্ত্রীলোকটি বললেন, তা হলে আপনি দশটি উট ও আব্দুল্লার মধ্যে লটারী করুন উটের নাম উঠলে দশটি উট কোরবানি করে দিবেন । আর আব্দুল্লার নাম উঠলে আরও দশটি উট যোগ করে লটারি দিবেন । যে পর্যন্ত উটের নাম লটারিতে না উঠবে সেই পর্যন্ত দশটি করে উট বৃদ্ধি করতে থাকবেন । দৈবজ্ঞ রমণীর বিজ্ঞসুলভ পরামর্শ অনুযায়ী তারা গৃহে প্রত্যাবর্তন পর উট অ আবদুল্লাহর মধ্যে লটারি দিতে শুরু করিলেন । পরিশেষে যখন দশ বার দশটি উট যোগ করে মোট একশ উট ও আব্দুল্লার মধ্যে লটারি অনুষ্ঠিত হল আল্লাহর অপার মহিমা বুঝার সাধ্য কারোর নেই । এবার উটের নাম উঠল ।

খাজা আবদুল মুত্তালিব তখন একশ উট জবেহ করে মিসকিনদের মধ্যে বিতরন করেন । তখন হতে একটি খুনের বদলে একশ উট স্থির করা হল এবং ইসলাম আসবার পরও এই প্রথা বলবৎ রইল । এ কারনে হযরত আব্দুল্লাহকে জবীহুল্লাহ বলা হয় এবং রাসুলুল্লাহ (সাঃ) নিজেই বলেছেন, আনা ইবনুজ জাবীহাইন । অর্থাৎ আমি জবেহ হওয়া দুই ব্যক্তির পুত্র । একজন হযরত ইসমাইল (আ) এবং অপরজন আব্দুল্লাহ । ঐতিহাসিক কারো কারো মতে খাজা আবদুল মুত্তালিন একদিন কাবাগৃহের আঙিনায় নিদ্রিত অবস্থায় এক খাব দর্শন করেন । কে যেন তাকে বলছিলেন, তুমি তৈয়্যেবা খনন কর । দ্বিতীয় রাতে অনুরুপ বলেন, তুমি বাবরা খনন কর । তৃতীয় রাতেও তদ্রুপ বলেন, তুমি মাছুনা খনন কর । চতুর্থ রাতে পুনরায় অনুরুপ সপ্ন দেখার পর তিনি জিজ্ঞাস করলেন, তা কি? উত্তর হল, তা যমযম কূপ ।

যার পানি নিঃশেষ হয় না যার গভিরতার শেষ নেই । আর যা কখনই শুকায় না । যা থেকে পানি পান করায় । জিজ্ঞাস করলেন, তাঁর স্থান কোথায় । তখন তাকে তাঁর নিদিষ্ট স্থান সম্নধে অবগত করা হল । তিনি প্রত্যুষে স্বীয় পুত্র হারেসকে নিয়ে উক্ত কূপ খনন করতে চেষ্টা করলে কোরাইশরা বাধা দিল এবং বলল আমদেরও এ কাজে শরীক করতে হবে । খাজা আবদুল মুত্তাল্লিব সম্মত হলেন না । পরে তারা বলল, সিরিয়াতে একজন দৈবজ্ঞ মহিলা আছেন তাঁর কাছে চলুন সে যা বলবে সেই অনুযায়ী কাজ করব । আবদুল মুত্তালিব তাদের সাথে রওয়ানা দিলেন । পথিমধ্যে আবদুল মুত্তালিব পাত্রের পানি শেষ হয়ে গেল তিনি কাফেলা অন্যান্য লোকদের কাছে পানি চাইলেন ।

কিন্তু তারা পানি দিতে অস্বীকার জানাল । অগত্য আবদুল মুত্তালিব পানির তালাশে কাদেলা হতে আলাদা হয়ে গেলেন । কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর তাঁর উটের পায়ের নীচে হতে পানি বের হতে লাগলো। তিনি নিজে সেখানে থেকে পানি বের হতে লাগল। তিনি নিজে সেখান থেকে পানি পান করলেন ও কাফেলার সকল ব্যক্তিকে ডেকে পানি দিলেন। এটা দেখে সকলে বলল, আর সেই মহিলার কাছে গমনের কোন প্রয়োজন নেই। আমাদের বিশ্বাস হয়েছে আপনিই একমাত্র জমজম কূপ খননের হকদার ।

কেননা যে খোদা আপনাকে মরু অঞ্চলে পানি দান করছেন তিনি আপনাকে জমজম কূপের পানিও পান করাবেন। তখন তারা সকলে সেখান হতে প্রত্যাবর্তন করে। তিনি পুত্র হারেসকে নিয়ে খনন কার্যে লিপ্ত হন। আর আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকেন, হে রব! তুমি যদি এ কাজে আমাকে সফলতা দান কর আর আমাকে দশটি পুত্র সন্তান দান কর তবে আমি একটি পুত্র তোমার নামে কোরবানী করব।

আরো পড়তে পারেন

দুঃখিত, কপি করবেন না।